কুমিল্লায় ইভিএম কি পাস করল?

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএমেরও পরীক্ষা ছিল, তাতে কি উৎরে যেতে পারল নির্বাচন কমিশন?

গোলাম মর্তুজা অন্তু জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 15 June 2022, 12:17 PM
Updated : 15 June 2022, 12:17 PM

যন্ত্রে ভোট গ্রহণ দ্রুত হওয়ার কথা থাকলেও কুমিল্লার ভোটারদের অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। তারা ইভিএমে দেরির অভিযোগই করেছেন।

ক্ষমতাসীন দলের মেয়র প্রার্থীর এজেন্টও ইভিএমে দেরিতে ভোট নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন।

কয়েকটি কেন্দ্রে ইভিএমে ত্রুটির অভিযোগও করেছেন সরকারবিরোধী দুই প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু ও নিজাম উদ্দিন কায়সার।

তবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ভোটারদের অনভ্যস্থতাকে দায়ী করা হয়েছে। ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, ইভিএমে কোনো ত্রুটি ছিল না।

আগামী সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের ভার নিয়ে এবছর দায়িত্ব নেওয়া কাজী হাবিবুল আউয়াল নেতৃত্বাধীন নতুন ইসি ইভিএম নিয়ে এগোতে চাইছেন।

সেই লক্ষ্যে বুধবার অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১০৫টি ভোট কেন্দ্রের প্রতিটিতেই ভোটগ্রহণ হয় যন্ত্রে, যেখানে ভোটার সোয়া ২ লাখ।

সকালে ভোটগ্রহণ শুরুর পর থেকেই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) নিয়ে অভিযোগ আসতে শুরু করে।

ইভিএমে সমস্যার কারণে একটি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ শুরু হয় ৪১ মিনিট দেরিতে। অন্যান্য কেন্দ্রেও ভোটগ্রহণ হয়ে যায় ধীর।

সকাল ৮টায় নগরীর ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কুমিল্লা হাইস্কুল নারী ভোটার কেন্দ্রে ইভিএমে সমস্যা দেখা দেয়। ছয়টি বুথের এক নম্বর বুথের মেশিনটি বিকল হয়ে যাওয়ায় ৪১ মিনিট কোনো ভোট কাস্টিং হয়নি ওই বুথে। পরে ইভিএম যন্ত্রটি পাল্টে ভোট শুরু হয়।

কুমিল্লা হাইস্কুল নারী ভোটার কেন্দ্রে ইভিএমে সমস্যা দেখা দেয় বলে ভোটগ্রহণ শুরু হয় দেরিতে।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ কেন্দ্রে দুপুর ২টা পর্যন্ত ৩১ শতাংশ ভোট পড়ার তথ্য জানান প্রিজাইডিং অফিসার মিজানুর রহমান; যদিও কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি ছিল বেশ।

বেলা সাড়ে ১২টার দিকে মডার্ন বিদ্যালয় নারী কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা রফিজুল ইসলামের কাছে তথ্য মেলে, সাড়ে চার ঘণ্টায় ভোট পড়েছে মোটে ২৫ শতাংশ।

মডার্ন বিদ্যালয়ে স্থাপিত আরেকটি কেন্দ্রে (কেন্দ্র নং ৩০) দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোট পড়ে মোটে ৬৩৩টি (৩১ দশমিক ৪১ শতাংশ), সেখানে মোট ভোটার ২০১৫ জন।

পাশের ফরিদা বিদ্যায়তন কেন্দ্রে ১২টা পর্যন্ত ভোট পড়ে ২৪ শতাংশ। একই বিদ্যায়তনে অবস্থিত আরেকটি কেন্দ্রে (কেন্দ্র নং ৩৭) ১২টা পর্যন্ত ভোট পড়ে ৩৯৮টি (১৯ দশমিক ৫ শতাংশ), সেখানে মোট ভোটার ২০৪২ জন।

দুপুর ১টার দিকে মডার্ন বিদ্যালয় কেন্দ্রের শেখ রাসেল ভবনের সামনে কথা হয় ষাটোর্ধ্ব সাবিনা রানী দাসের সঙ্গে। লম্বা লাইন দেখে তিনি তখন ফিরে যাচ্ছিলেন।

সাবিনা বলেন, “অনেক ভিড়! এহন ভোটটা দিবার পারি নাই। ঘর গুছাইয়া ৩টার দিকে আবার আসমু।”

সাবিনার সঙ্গে থাকা গীতা রানী একটি হাসপাতালে কাজ করেন। তিনি এক ঘণ্টার বেশি সময় অপেক্ষার পর ফিরে যাচ্ছিলেন।

তিনি বললেন, “কম্পিউটারে ভোট দিতে সময় লাগতাছে অনেক বেশি। আমার ডিউটি আছে, পরে সময় পাইলে আবার আসমু।”

মডার্ন বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভেতরে গিয়ে দেখা গেল দীর্ঘ লাইন। ভেতরে থাকা বিভিন্ন প্রার্থীর এজেন্টরা জানালেন, একেকজনের ভোট দিতে গড়ে এক মিনিটের বেশি সময় লাগছে। ভোটটি কীভাবে দেবেন, অনেকে বুঝতেই পারছেন না।

প্রিজাইডিং কর্মকর্তা রফিজুল ইসলামকে দেখা গেল, দাঁড়িয়ে ভোটারদের বুঝিয়ে বলছেন কী করতে হবে।

অনিতা রানী নামে একজন বললেন, “বলছে মার্কার পাশের সাদা বাটনে চাপ দিতে হবে। মানে আমি যেই মার্কা পছন্দ করি তার পাশের বাটনে চাপ দিলেই ভোট হয়ে গেল। তবে কেন্দ্রে ঢোকার পর কেমন যেন উল্টাপাল্টা হয়ে যায়। তারপরেও নিজের ভোটটা দিতে পারছি।”

কুমিল্লা সদর দক্ষিণের জয়পুর সার্বজনীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা ভোটাররা জানান, ইভিএমে ভোট দিতে সময় দিতে লাগছে, সেজন্য অপেক্ষা বাড়ছে।

কুমিল্লা আদর্শ সদরের কাটাবিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নারী কেন্দ্রেও ইভিএমে ভোটগ্রহণে দেরির অভিযোগ করেন ভোটাররা।

ইভিএম নিয়ে সকালে টেবিল ঘড়ি প্রতীকের মেয়রপ্রার্থী মনিরুল হক সাক্কুও অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, “ইভিএম পদ্ধতিতে একটু ত্রুটি আছে, মেশিনে কোনো কোনো কেন্দ্রে কাজ করতাছে না।”

যন্ত্রের সমস্যা ব্যাখ্যা করে দুই বারের মেয়র সাক্কু বলেন “আমি তো ভোট দিয়া আইলাম। টিপ দিলে তো (প্রতীক) শো করবে, আপনি কাকে ভোট দিছেন শো করবে, কিন্তু (এখানে) শো করে না। একটা কেন্দ্রে গেছি, (প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে) বলছি।

“কাপ্তানবাজার গেছি… ছবি উঠে না। যারেই ভোট দেই ছবিডা তো উঠব, (কিন্তু) ছবিই উঠে না।”

ইভিএম নিয়ে একই রকম অভিযোগ করেন আরেক মেয়রপ্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সারও।

সাক্কু ও কায়সার দুজনই বিএনপিতে ছিলেন। দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে ভোটে অংশ নেওয়ায় তারা বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন।

নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন না হলে কোনো ভোটে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া বিএনপির ইভিএম নিয়ে রয়েছে প্রবল আপত্তি।

আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী আরফানুল হক রিফাতের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট আতিকুল্লাহ খোকন ইভিএম নিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইভিএম স্লো। তাই কোথাও ভিড়।”

“আবার কোন কোন কেন্দ্রে কিন্তু ভোটার নাই, কর্মকর্তারা বসে আছেন”, একইসঙ্গে বলেন তিনি।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বুধবার সকালে ভিক্টোরিয়া কলেজ কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট দিচ্ছেন এক নারী । ছবি: মাহমুদ জামান অভি

চল্লিশটি ভোট কেন্দ্র পরিদর্শন করে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে থাকা ইলেকশন মনিটরিং ফোরামের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবেদ আলী সাংবাদিকদের বলেন, “ভোটাররা ছিলেন খুবই আন্তরিক। তবে ইভিএমে ভোটগ্রহণে ধীর গতির অভিযোগ পাওয়া গেছে বিভিন্ন কেন্দ্রে। এতে ভোটাররা কষ্ট পাচ্ছেন।”

তার মতে, ইভিএমে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি ভোটারদের ভালোভাবে শেখানোর প্রয়োজন ছিল।

“সাধারণ ভোটাররা ইভিএমের সাথে আগে পরিচিত হতে পারেননি। অনেককে ভোট দিতে গিয়ে দুই-তিনবার চেষ্টা করতে হয়েছে।

ইভিএম নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে এই নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহেদুন্নবী চৌধুরী বলেন, “আসলে এটা একটা টেকনোলজির বিষয়, অনেক ভোটার ওইভাবে পরিচিত না; ভোট কেন্দ্রে এসে ভাবে, কীভাবে এখানে ভোট দেবে?”

ইভিএমে শ্লথ গতির বিষয়ে ইসি সচিব হুমায়ুন কবীর খোন্দকার দুপুরে ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেন, “শুরুর দিকে আমাদের বলা হয়েছে যে ইভিএমে ভোট দিতে অনেকের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে রিটার্নিং অফিসারকে নির্দেশ দিয়েছি-যাদের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে তাদের যেন বুঝিয়ে দেন। এখন স্পিড বেড়েছে।”

ইভিএমে জটিলতা বা কোনো কারিগরি ত্রুটিও দেখা যায়নি বলে জানান তিনি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক