নিউ মার্কেটে সংঘর্ষের মধ্যে সাংবাদিকরাও আক্রান্ত, অ্যাম্বুলেন্স ভাঙচুর

রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় দোকানিদের সঙ্গে ঢাকা কলেজ শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষের মধ্যে বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মী দোকান কর্মচারীদের হামলার শিকার হয়েছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 19 April 2022, 09:17 AM
Updated : 19 April 2022, 05:46 PM

সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে ‘সঠিক তথ্য না দেওয়ার’ অভিযোগ তুলে লাইভে থাকা সাংবাদিকদের বাধাও দিয়েছেন তারা।  

এক দোকানে খাবারের বিল পরিশোধ নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে সোমবার মধ্যরাতে দোকান কর্মচারীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রায় আড়াই ঘণ্টা সংঘর্ষ চলে।

পুলিশের হস্তক্ষেপে রাত আড়াইটার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়, যা বেলা আড়াইটার সময়ও চলছিল।

ঢাকা কলেজ প্রান্তে একদল সাংবাদিক এবং নিউ মার্কেট প্রান্তে আরেকদল সাংবাদিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খবর সংগ্রহ করছিলেন। বিভিন্ন টেলিভিশন সেখান থেকে সরাসরি সম্প্রচারও করছিল। সে সময় দোকান কর্মচারীদের একটি দল কয়েকজন সাংবাদিকের ওপর চড়াও হয়।

ঘটনাস্থল থেকে আমাদের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক কামাল তালুকদার বলেন, “প্রথমে কথা কাটাকাটি ও পরে কিল ঘুষি মারা শুরু হয়। পরে অন্য ব্যবসায়ীরা এসে আহত সাংবাদিকদের উদ্ধার করেন।

“একাত্তর টিভির মহিম মিজান ও তার সঙ্গে থাকা ক্যামেরা পারসনকে কিলঘুষি মেরেছে তারা। দীপ্ত টিভির আসিফ সুমিতকে নাজেহাল করতে দেখা গেছে। এসএ টিভির সাংবাদিক তুহিন ও ক্যামেরা পার্সন কবিরসহ একটি টিমের ওপরও হামলা করা হয়েছে। এছাড়া মোবাইলে ও ফেইসবুকে লাইভ সম্প্রচারকারী বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীদেরকেও মারধর করে তাড়িয়ে দেয় দোকানিরা।”

নিউ মার্কেট ফুটব্রিজের ওপর থেকে ছবি তোলার সময় ঢিলের আঘাতে আহত হন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আলোকচিত্রী মাহমুদ জামান অভি।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত আমাদের আরেক প্রতিবেদক রাসেল সরকার বলেন, “ইটের আঘাতে অন্তত ছয়জন সাংবাদিককে আহত হতে দেখেছি। একজন আহত ব্যক্তি অথবা অন্য কোনো রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়ার পথে দোকানিরা হামলা চালিয়ে কাচ ভেঙে দেয়।”

দুপুরে নূরজাহান মার্কেটের নিচে এবং চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় আগুন জ্বলতে দেখা যায়। চন্দ্রিমার আগুন কর্মীরাই নিভিয়ে ফেলেন।

ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মোবিলাইজিং অফিসার দেওয়ান আজাদ হোসেন বলেন, “বেলা আড়াইটার দিকে আমাদের তিনটি ইউনিট আগুন নেভাতে গেছে। সেখানে এখনও কাজ চলছে।”

সকাল থেকে দফায় দফায় দফায় সংঘর্ষ চললেও পুলিশের উপস্থিতি তেমন ছিল না। বেলা ১টার আগে আগে সাঁজোয়া যান ও জলকামান নিয়ে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়, টিয়ার শেল ছুড়ে সংঘর্ষ থামানোর চেষ্টা চলে।

পুলিশের তৎপর হতে বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে রমনা বিভাগের পুলিশের উপ কমিশনার মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সকালে শিক্ষার্থীরা কলেজের সামনে সড়ক অবরোধ করে বসে ছিল। হঠাৎ করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। পুলিশ তখন ব্যবসায়ী নেতা ও কলেজ কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে সুষ্ঠু সমাধানের উপায় বের করার চেষ্টা করে। সে কারণে এই সময়টা লেগেছে।”

এই সংঘর্ষের মধ্যে তাৎক্ষণিক দুই পক্ষের মাঝামাঝি অবস্থান নেওয়া পুলিশের জন্য সহজ ছিল না বলেও জানান ঘটনাস্থলে আসা কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা।

দুই পক্ষের দীর্ঘ সংঘর্ষের ফলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বলেন, “পুলিশ ইন করলে ত্রিমুখী সংঘর্ষটা শুরু হবে। যেহেতু শুরু থেকেই পুলিশ মাঝে অবস্থান করতে পারেনি তাই টেকনিক্যাল কারণে আলোচনা করে সমাধানের পথ বের করার চেষ্টা করছে।”

পুরোনো অভিজ্ঞতার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “যতই ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হোক, শিক্ষার্থীরা মার্কেটে ঢুকবে না, আর ব্যবসায়ীরাও কলেজের ভেতরে যাবে না।”

এদিকে বেলা ১২টার দিকে পুলিশ আসার কিছুক্ষণ আগে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে নীলক্ষেত মোড়ে বিক্ষোভ মিছিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হলের একদল শিক্ষার্থী। নীলক্ষেত মোড় থেকে নিউ মার্কেট মোড় ঘুরে মিছিল নিয়ে তারা আবার ক্যাম্পাসে ফিরে যান।

আহত ২০ জন হাসপাতালে

নিউ মার্কেট এলাকায় ব্যারসায়ী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষে পথচারী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, হকার, সাংবাদিকসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

আহতদের মধ্যে রয়েছেন সাজ্জাদ, সেলিম, রাজু, কাওসার, রাহাদ, আলিফ, ইয়াসিন, রুবেল, রাজু, সাংবাদিক আসিফ ও এসএটিভির ক্যামেরা পার্সন কবির হোসেন।

জরুরি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. আলাউদ্দিন জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের মাথায় আঘাত রয়েছে, তাদেরকে নিউরোসার্জারি বিভাগে পাঠানো হয়েছে। বাকিদেরকে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

“আমাদের এখানে যাদেরকে আহত অবস্থায় পেয়েছি এদের মধ্যে কেউ আশঙ্কাজনক নয়। আমরা এ পর্যন্ত ২০ জনের মতো পেয়েছি। এদের মধ্যে অনেককে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকিদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক