জোড়া খুন: কোন নম্বর থেকে হুমকি পেয়েছিলেন টিপু, খুঁজছে পুলিশ

ঢাকার শাহজাহানপুরে প্রকাশ্যে খুন হওয়ার কয়েক দিন আগেই মোবাইলে হত্যার হুমকি পেয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপু; কিন্তু তদন্তে নেমে ওই ফোন নম্বরটি শনাক্ত করার চেষ্টায় হিমশিম খেতে হচ্ছে পুলিশকে।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 25 March 2022, 04:42 PM
Updated : 2 April 2022, 06:19 AM

তদন্তকারীদের ধারণা, ওই হত্যাকাণ্ডে অন্তত দুজন সরাসরি জড়িত ছিলেন। তাদের শনাক্ত করতে প্রাথমিকভাবে পাওয়া সিসিটিভি ভিডিও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

কারো কাছে সে রকম ভিডিও কিংবা ছবি থাকলে পুলিশকে সরবরাহ করার আহ্বান জানানো হয়েছে নাম-পরিচয় গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে।

শাহজাহানপুরের আমতলী এলাকার রাস্তায় বৃহস্পতিবার রাতে অস্ত্রধারীর গুলিতে নিহত হন মাইক্রোবাসে থাকা টিপু। ওই সময় গাড়ির কাছেই রিকশায় থাকা বদরুন্নেছা সরকারী মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী সামিয়া আফনান প্রীতিও গুলিতে নিহত হন। আহত হন টিপুর গাড়ি চালক মুন্না।

মাত্র মিনিটখানেকের মধ্যে কাজ সেরে হেলমেটধারী আততায়ী সড়ক বিভাজক টপকে গুলি করতে করতে রাস্তার অন্য পাশে অপেক্ষায় থাকা একটি মোটরসাইকেলে উঠে পালিয়ে যায়।

এ ঘটনায় টিপুর স্ত্রী ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফারজানা ইসলাম ডলি শুক্রবার সকালে শাহজাহানপুর থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা দায়ের করেন।

মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু (৫৪) প্রায় এক দশক আগে যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কী হত্যা মামলার আসামি ছিলেন।

সন্দেহভাজন হিসেবে কারও নাম না বললেও স্বামীর রাজনৈতিক ‘কোন্দলের’ কথা মামলার এজাহারে উল্লেখ করেছেন ‍ডলি।

সেখানে তিনি লিখেছেন, “আমার স্বামী বিগত ১০ বছর যাবত বৃহত্তর মতিঝিল থানা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন সময়ে দলীয়ভাবে কোন্দল ছিল এবং ৪/৫দিন আগে অজ্ঞাতনামা দুস্কৃতকারীরা আমার স্বামীকে মোবাইল ফোনে হত্যার হুমকি দিয়েছিল।”

পুলিশের মতিঝিল বিভাগের সবুজবাগ জোনের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম বলেন, মামলার অভিযোগের ভিত্তিতে টিপুর মোবাইল ফোন থেকে ওই নম্বরটি শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন তারা। কিন্তু বিষয়টি সহজ হচ্ছে না। 

“উনি (টিপু) একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি। তার অসংখ্য ফোন আসে এবং তিনি করেন। কোন নাম্বার থেকে হুমকি দিয়ে ফোনটি এসেছিল সে ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।”

তবে ফোনে হত্যার হুমকি পাওয়ার বিষয়টি টিপু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাননি কিংবা থানায় কোনো জিডি করেননি জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা আখতারুল বলেন, “তিনি থানায় জিডি করলে সেই ফোন নম্বরটি অন্তত সহজে পাওয়া যেত।”

তিনি জানান, মামলার অভিযোগে দলীয় কোন্দলের যে বিষয়টি এসেছে, তার চেয়ে হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে তাদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে পুলিশ।

“আমরা হত্যাকারী দুইজনকে বের করার বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি। তাদের বের করা গেলে হত্যার পেছনে কারা কারা জড়িত সে বিষয়টি স্পষ্ট হবে এবং কি কারণে হত্যার ঘটনা ঘটেছে সেটা জানা যাবে।”

ওই এলাকার কিছু সিসিটিভি ভিডিও সংগ্রহ করা হলেও হত্যাকারীদের এখনও চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, “যে ফুটেজ আমরা পেয়েছি সেটা স্থানীয়ভাবে এবং বিভিন্নজনকে দেখিয়েছি। শরীরের ধরন দেখেও কেউ চিনতে পারে কি না সেটাও জানার চেষ্টা করছি। চিনেছে বা ধারণা করছে এমন কেউ আমাদের বলেনি।”

প্রাথমিকভাবে পাওয়া ভিডিওর সূত্র ধরে হামলাকারীরা মটরসাইকেল নিয়ে যেদিকে পালিয়ে গেছে সেদিকের ভিডিও সংগ্রহের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।

“কারো কাছে কোনো ভিডিও বা স্টিল ছবি থাকলে তারা যেন গোপনে আমাদের সরবরাহ করেন,” বলেন অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার শাহ আলম।

জাহিদুল ইসলাম টিপু

নেপথ্যে কী?

২০১৩ সালে যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক মিল্কী হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন টিপু। তবে পরে মামলা থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

জাহিদুল ইসলাম টিপু মতিঝিল এজিবি কলোনীর গ্র্যান্ড সুলতান রেস্তোরাঁর মালিক। ওই এলাকায় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কাজের ঠিকাদারির সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন বলে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী জানিয়েছেন।

এসব বিষয় নিয়ে ‘রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব’ থাকাটা ‘অস্বাভাবিক নয়’ বলে মনে করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কাজেও টিপু ঠিকাদার ছিলেন বলে জানান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. মোজাম্মেল হক।

তিনি বলেন, “আমরা যতটুকু জানি ক্রীড়া পরিষদের সাথে সবচেয়ে বেশি ঠিকাদারি ব্যবসায় জড়িত ছিলেন টিপু ভাই। তাছাড়া পিডাব্লিউডিতে (গণপূর্ত অধিদপ্তর) তার বেশ ওঠাবসা ছিল। রাজউকেও যেতেন।”

তবে তার সঙ্গে কারো বিরোধ বা তাকে কেউ হুমকি দেওয়ার কোনো তথ্য ‘জানা নেই’ মন্তব্য করে মোজাম্মেল বলেন, “টিপু ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও তিনি এ ব্যাপারে আমাকে কিছু বলেননি।”

টিপু মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পাঁচবার গভর্নিং বডির সদস্য ছিলেন জানিয়ে মামলায় বলা হয়, মতিঝিল কাঁচা বাজারে তার ‘গ্রান্ড সুলতান’ নামে একটি রেস্তোরাঁ আছে। সকালে সেখানে যাওয়ার জন্য তিনি বাসা থেকে বের হন।

ওই হোটেলে তিনি নিয়মিত বসতেন। হোটেলটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায়। ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মারুফ আহমেদ মনসুরের সঙ্গে টিপুর ভালো সম্পর্ক বলে জানান কাউন্সিলর মো. মোজাম্মেল হক।

তবে একাধিকবার ফোন করেও মারুফ আহমেদ মনসুরকে পাওয়া যায়নি। তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

বৃহস্পতিবার হামলার সময় টিপুর সঙ্গে গাড়িতে ছিলেন তার বাল্যবন্ধু মিজানুর রহমান মিরাজ, গাড়ির চালক এবং কালাম নামে একজন। মিরাজের ভাষ্য, কালাম তাদের একজন ‘সিনিয়র ভাই’।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মানামা ভবনের সামনে আসার পর সামনে-ডানে-বায়ে রিকশায় যানজটে পড়ে গাড়ি। হেলমেট পরা এক যুবক এসে টিপু যে পাশে বসেছিল, সে পাশে দাঁড়িয়ে গুলি শুরু করে।

“গাড়ির জানালা বন্ধ ছিল, কিন্তু গুলিতে গাড়ির গ্লাস ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।… গাড়ির আশপাশে হেঁটে চলা মানুষ দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে।”

বেশ কয়েক রাউন্ড গুলির পর হামলাকারী চলে যায় জানিয়ে মিরাজ বলেন, “চালক মুন্না গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নিয়েছিল টিপুকে। তারপর ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয় তাদের।”

প্রতিদিন ওই রেস্তোরাঁ থেকে রাত ১০টার আগে টিপু বাসায় ফিরতেন বলে জানিয়েছেন তার বন্ধু। তবে কেন তাকে এভাবে হত্যা করা হল, সে বিষয়ে কোনো ধারণা দিতে পারেননি মিরাজ।

সুরতহালে যা মিললো

পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টিপুর শরীরে গুলির ১৩টি ক্ষত পাওয়া গেছে। আর প্রীতির শরীরে ছিল দুটি গোলাকার ক্ষতচিহ্ন।

সে হিসাবে সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী দুজনের শরীরে মোট ১৫টি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ১২টি গুলির খোসা উদ্ধার করে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অনেক গুলি শরীরের এক দিকে ঢুকে অন্য দিক দিয়ে বের হয়ে যায়। তখন একটি গুলিতে দুটি ক্ষত হয়। তাই ক্ষত চিহ্ন দিয়ে গুলির সাংখ্যা কাউন্ট করা ঠিক হবে না।”

আগামী এপ্রিলেই একটি চাকরিতে যোগদানের কথা ছিল সামিয়া আফনান প্রীতির।

পুলিশের পাশপাশি র‌্যাব, ডিবি, সিআইডিসহ বিভিন্ন সংস্থা এ ঘটনায় ছায়া তদন্ত শুরু করেছে।

শুক্রবার কারওয়ানবাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ঘটনাস্থল থেকে তারা কিছু আলামত উদ্ধার করেছেন। তাদের তদন্তে কিছুটা অগ্রগতিও হয়েছে।  

 “আমরা ঘটনার বেশ কিছু ফুটপ্রিন্ট, তথ্য ও আলামত পেয়েছি। বেশ কিছু মোটিভ পেয়েছি। যে শ্যুটার, তাকেও আমরা সিসি ক্যামেরার ফুটেজের মাধ্যমে শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। আমরা অনেক দূর এগিয়ে গেছি।”

তবে র‌্যাব ঠিক কোন সূত্র পেয়েছে, সে বিষয়ে বিশদ কিছু বলেননি এ বাহিনীর মুখপাত্র।

চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় ধানমণ্ডির বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

হত্যার রহস্য উম্মোচনে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ ঘটনায় জড়িতরা যেই হোক কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

“নেপথ্যে থেকে যদি কেউ কলকাঠি নেড়ে থাকে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক