বাড়ি ফেরার দুশ্চিন্তা নিয়ে টার্মিনালে ‘অপেক্ষা’, বিকল্প গাড়িতে দ্বিগুণ ভাড়া

শুধু হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া রোগী-স্বজন নন, পরীক্ষার্থীদেরও বাস না পেয়ে ঢাকায় রাত কাটানোর দুশ্চিন্তা করতে দেখা গেছে; আর যাদের সামর্থ্য আছে তারা বাড়তি ভাড়ায় প্রাইভেট কার-মাইক্রোবাসে ধরেছেন বাড়ির পথ।

জাফর আহমেদও কাজী মোবারক হোসেনবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 6 Nov 2021, 03:08 PM
Updated : 6 Nov 2021, 03:10 PM

শনিবার দিনভর রাজধানী ঢাকার বাসস্ট্যান্ডগুলোতে ম্লানমুখে বসে থাকা এমন অনেক যাত্রীর দুর্ভোগের খণ্ড খণ্ড চিত্রের দেখা মিলেছে।

যশোরের বেনাপোলের রহিমা বেগমকে দেখা গেল গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের এদিক ওদিক ছুটাছুটি করতে। একটা পর্যায়ে গাড়ির খোঁজ না পেয়ে টার্মিনালের সামনের একটি গাছের ছায়ায় রাস্তার ফুটপাতে বসে পড়লেন।

কাছে গিয়ে জানতে চাইলে মাঝবয়সী এই নারী বলেন, মিরপুরের ডেল্টা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে এসেছিলেন তারা।

“হাসপাতাল থেকে ছাড় পাওয়ার পর গাবতলীতে আসলাম বেনাপোলের বাস ধরার জন্য। বাস বন্ধ শুনেছি। তারপরও একটু আশা ছিল একটা দুইডা গাড়ি হলেও চলতে পারে। কিন্তু এভাবে একটা বাসও চলবে না তা কল্পনাও করিনি, হতাশাই ঝরে পড়ল তার কণ্ঠে।

তিনি বলেন, “সাত বছরের বাচ্চাসহ আমরা চারজন। হাসপাতালের বিল দিয়ে বাকি যে টাকা আছে তা দিয়ে কোনও রকম বাস ভাড়া হয়। কিন্তু এখন কী করব কিছুই ভাবতে পারছি না।”

প্রায় একই অবস্থা গাবতলী বাস টার্মিনালের হানিফ পরিবহনের কাউন্টারের পাশে নির্লিপ্ত বসে থাকা রংপুরের মুজিবুল হাসানের।

এই তরুণ গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় আসেন সরকারি ব্যাংকের পরীক্ষায় অংশ নিতে। শুক্রবার পরীক্ষার পর বাড়ি ফিরে যেতে চাইলেও পরিবহন ধর্মঘটের কারণে পারেননি।

বাস না পেয়ে গাবতলীতে একটি প্রাইভেটকারে যেতে দরকষাকষি চলছিল শনিবার সকালে। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

হতাশ কণ্ঠে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বৃহস্পতি ও শুক্রবার দুই দিন বন্ধুর সঙ্গে মেসে ছিলাম। কিন্তু আরও একরাত থাকব এ পরিবেশ সেখানে নেই। তাই বন্ধুর পরামর্শে যে কোনোভাবে বাড়ি চলে যাওয়ার জন্য এসেছি।

“সকাল থেকে সম্ভাব্য সব পরিবহনের কাউন্টারে গিয়ে চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোনও গাড়ি না ছাড়ায় শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে বসে আছি।“

হাতে যে টাকাপয়সা আছে তা হোটেলে থাকার মতো নয় ম্লান কণ্ঠে যোগ করে তিনি বলেন, “আছে শুধু বাড়ি ফেরার মতো বাস ভাড়া। এ টাকাও শেষ হয়ে গেলে আরও বিপদে পড়ে যাব। দেখি কোনও সুযোগ আসে কি না।“

রাজধানীতে আর কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকায় এখানেই রাত কাটার আশংকা প্রকাশ করেন তিনি।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে পরিবহন ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনেও দূরপাল্লার যাত্রীদের এমন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।

বাস না পেয়ে কেউ কেউ যেমন অপেক্ষায় রযেছেন টার্মিনালে। তেমনি অনেকে প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসে অনেক দূরের পথে রওনা দিয়েছেন।

পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের ডাকা ধর্মঘটে শুক্রবার সারাদেশে বাস চলাচল বন্ধ থাকায় পিকআপ ভ্যানে গাদাগাদি করে গন্তব্যের পথে রওনা হন। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

কিছুটা কাছের দূরত্বে গন্তব্য যাদের তারা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ভেঙে ভেঙে বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

সরকার ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে দিলে ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে শুক্রবার থেকে দেশব্যাপী ধর্মঘটে নামে বাস ও ট্রাক-কভার্ড ভ্যানসহ পণ্যবাহী যানের মালিক ও শ্রমিক নেতারা।

ধর্মঘটের কারণে শুক্রবার সকাল থেকে বাস-ট্রাক চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে যাত্রীরা যেমন ভোগান্তিতে পড়েছেন, পণ্য পরিবহনও আটকে গেছে।

পরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে বিআরটিএ রোববার বৈঠক ডেকেছে। এর আগে সুরাহার কোন দেখছেন না কেউ।

শনিবার গাবতলী বাস টার্মিনালে দেখা যায়, কিছু কিছু প্রাইভেট কার আরিচাঘাট পর্যন্ত কয়েকগুণ বেশি ভাড়া হাঁকিয়ে যাত্রী ডাকছেন।

একটি কারের চালক হাকিম উদ্দিন বলেন, আরিচাঘাট পর্যন্ত ৪০০ টাকা ভাড়া।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই চার জন যাত্রী নিয়ে রওনা দেন তিনি।

একটি হাইয়েস মাইক্রোবাসের চালক ফরিদ গাড়ী ভরলে যশোর যাবেন তিনি। ভাড়া চাইছেন ১২০০ টাকা করে। অর্থাৎ ১৮ সিটের মাইক্রোবাসে তিনি ২১ হাজার ৬০০ টাকা ভাড়া চান।

ডিজেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুক্রবার পরিবহন ধর্মঘটের মধ্যে ঢাকার সায়দাবাদ বাস টার্মিনালে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন দূরপাল্লার যাত্রীরা। ছবি: কাজী সালাহউদ্দিন রাজু

সাধারণ সময়ের ভাড়া কত, জানতে চাইলে নির্বিকার ভঙ্গিতে তিনি বলেন, “ওই কথা বলে লাভ নেই।”

সাধারণ সময়ে ভাড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বলে জানান উপস্থিত যাত্রীরা।

রাজধানীর আরেক প্রান্তের সায়দাবাদ টার্মিনালে দিনটি ছিল প্রাইভেট কার কিংবা সিএনজি অটোরিকশার।

দুপুর আড়াইটার দিকে দেখা যায় শত শত মানুষ গন্তব্যে যেতে এদিক সেদিক ঘুরছেন। ব্যাগ-বোঁচকা নিয়ে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়েও ছিলেন অনেকে। বাস না পেয়ে সিএনজি বা কার চালকদের সঙ্গে দরদাম করছেন।

পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চালকরা ভাড়াও হাঁকছিলেন স্বাভাবিকের চেয়ে দুই-তিনগুণের বেশি।

আজিমপুরের বাসিন্দা মো. সালাহউদ্দিন জমির জরুরি কাগজপত্র ঠিক করতে যাবেন কুমিল্লায়।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের তো আর প্রাইভেট গাড়িতে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই সায়দাবাদ আসছি, দেখি কিভাবে যাওয়া যায়। একজন সিএনজি ড্রাইভার চাইলো এক হাজার টাকা। ৬০০ বলেছি, যেতে তো হবেই। বিকল্প কিছু তো আর পাই না।”

এদিনও সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। এই এলাকা দিয়ে প্রবেশও করেনি কোনো বাস।

ব্যাংকের চাকরির পরীক্ষা দিয়ে চট্টগ্রামে ফিরবেন নূর সোলাইমান। সকাল থেকে কমলাপুর রেল স্টেশনে ট্রেনের টিকিট না পেয়ে সায়দাবাদ টার্মিনালে অপেক্ষা করছিলেন পরিবহনের জন্য।

কয়েকজন মিলে প্রাইভেট কার ভাড়া করতে চাইলেও চালক চাচ্ছেন পাঁচগুণ বেশি ভাড়া।

নূর সোলাইমান বলেন, “পরীক্ষার কারণে বৃহস্পতিবার ঢাকায় এসেছি। একদিন থেকে টাকা শেষ, ফোন করে বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে আসছি। কারে গেলে জনপ্রতি ৩৫০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। এত টাকা দিয়ে বাড়ি ফেরা সম্ভব না।”

রংপুরের শারমিন আক্তার স্বামীসহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসার পর এখন যাওয়ার সময় বিপত্তিতে পড়েছেন।

তিনি বলেন, “বাস মালিকরা এভাবে সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা চিন্তা না করে একেবারে বাস বন্ধ করে দেবে এটা দায়িত্বজ্ঞানহীন কাণ্ড। অন্তত দুই দিন আগে ঘোষণা দিয়ে তারা বাস চলাচল বন্ধ করতে পারত।”

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরতে চান জানিয়ে তিনি বলেন, “স্বামী গাড়ি খুঁজছের। প্রাইভেট গাড়ি পেলেও বেশি টাকা দিয়ে হলেও বাড়ি ফিরতে চাই।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক