সাম্প্রদায়িক হামলার ইন্ধনদাতাদের আপনারা চেনেন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

কুমিল্লায় কোরআন অবমাননার কথিত অভিযোগ তুলে পূজামণ্ডপ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ‘চক্রান্তকারী ও ইন্ধনদাতারা’ সবার ‘পরিচিত’ বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 26 Oct 2021, 11:44 AM
Updated : 27 Oct 2021, 03:53 PM

মঙ্গলবার সচিবালয়ে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত সংলাপে তিনি এ মন্তব্য করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “কুমিল্লার ঘটনার পর থেকেই বলে এসেছি যে, এর পেছনে কোনো চক্রান্ত রয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো লোক এ কাজ করতে পারে না।

“নোয়াখালীতে হামলার ঘটনায় কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং অনেকে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।তাদের জবানবন্দিতে যেসব নাম এসেছে তাদের প্রায় সবাইকে আপনারা চেনেন।”

দুর্গাপূজার অষ্টমীতে গত ১৩ অক্টোবর কুমিল্লার একটি মণ্ডপে ‘কোরআন অবমাননার’ কথিত অভিযোগ তুলে সহিংসতা শুরুর পর তা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, চাঁদপুর, কক্সবাজার, ফেনী, রংপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

‌এর মধ্যে ১৫ অক্টোবর দশমীর দিন নোয়াখালীর চৌমুহনীতে কয়েকটি মন্দির ও মণ্ডপে দফায় দফায় হামলা-ভাংচুর হয়। ১৭ অক্টোবর রাতে রংপুরের পীরগঞ্জের মাঝিপাড়া জেলেপল্লীর ২৯টি বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

নোয়াখালীর ঘটনায় গ্রেপ্তার জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা ইতোমধ্যে আদালতে ‘স্বীকারোক্তিমূলক’ জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে ‘বিএনপি-জামায়াতের ১৫ নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য’ এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, “কুমিল্লার ঘটনায়ও সেরকম নাম আসছে আর রংপুরেও একই। তবে আমরা শতভাগ নিশ্চিত হয়ে আপনাদের সামনে নাম প্রকাশ করব।”

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সেখানে বিএনপি-জামায়াত আছে কি না সেটা এখনই বলতে চাচ্ছি না। আমরা নিশ্চিত হয়েই আপনাদের জানাতে চাই। গ্রেপ্তারদের জবানবন্দি নেওয়া হচ্ছে, শিগগিরই সেই ইন্ধনদাতাদের নাম প্রকাশ করা হবে।”

চাঁদপুর ও রংপুরের সহিংসতায় ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নামও এসেছে, এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মন্ত্রী বলেন, “অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে দেখা হয়, এখানে রাজনৈতিক পরিচয় নেই।”

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের কথা তুলে ধরে কামাল বলেন, “তিনি বলে গেছেন এদেশ সবার, এদেশে ধর্ম নিয়ে বৈষম্য হবে না।

“এদেশ হবে ধর্ম নিরপেক্ষ। আমরা সে আদর্শই ধারণ করে চলেছি। আমি দেখেছি হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকলে যার যার ধর্ম পালন করে আসছেন।”

পূজা মণ্ডপে ‘কে বা কারা’ কোরআন শরীফ রেখে দিয়ে সহিংস ঘটনার মাধ্যমে একটা ‘বিব্রতকর এবং উত্তেজনাকর’ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

“আমরা শুরুতেই ধরে নিয়েছিলাম যে কোরআন শরীফ রেখে দিয়েছে, কোনো এক জায়গা থেকে এসেছে। আমরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। আমাদের পুলিশের সকল পর্যায়ের টিম সেখানে পাঠিয়েছিলাম, যাতে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন হয়।”

নোয়াখালীর ঘটনার বর্ণনা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমাদের ধারণা ছিল জুমার নামাজের পর অসুবিধা হতে পারে। তাই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বলেছিলাম তার আগেই প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার জন্য এবং তারা তা করেছেন।

“আমাদের নামাজও ঠিকভাবে শেষ হল। কিন্তু দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে, এক পক্ষ পুলিশের সামনে হৈ-হল্লা শুরু করল। আরেকপক্ষ পুলিশকে ব্যস্ত রেখে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড শুরু করল।”

পরবর্তীতে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও সেখানে বেশ কিছু ভাঙচুর হওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “ওই সময় পুকুরে ঝাঁপ দেওয়ায় একজন মারা গেছেন।”

দেশকে অস্থিতিশীল করতে সহিংসতার মাধ্যমে একটি মহল ‘সুপরিকল্পিতভাবে’ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করেছে বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,”সেখানে মাল্টি ইন্টারেস্ট কাজ করে। মাদক ছাড়াও ১১ লাখ রোহিঙ্গা নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া যারা তাদেরকে (রোহিঙ্গা) জোর করে এদেশে পাঠিয়েছে, তাদেরও ইন্ধন থাকতে পারে।”

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চারিদিকে বেড়া তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে এবং বেড়া তৈরি শেষ হলে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেন আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।

জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আইন মন্ত্রণালয়কে কিছু আইন স্পষ্টকরণ করতে বলা হয়েছে। তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় পরিচয়পত্রের কাজ শুরু করতে দেরি হচ্ছে।

আন্তঃধর্মীয় সংলাপ হবে: ধর্ম প্রতিমন্ত্রী

দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রাখতে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ আয়োজনের কথা বলেছেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান দুলাল।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে দেবালয়, মন্দির ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি এবং হতাহতদের পুনর্বাসন বিষয়ক এক বিশেষ আলোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের একথা বলেন তিনি।

ফরিদুল বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে মতবিনিময় ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপের আয়োজন করা হবে।

তৃণমূল পর্যায়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রধানদের নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে বলেও জানান তিনি।

হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি এবং হতাহতদের তালিকা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংগ্রহ করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা সরকার নিচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

এ ঘটনায় দায়ের করা মামলা দ্রুত বিচার আইনে বিচারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাসও দেন তিনি।

ফরিদুল বলেন, “দেশের সম্প্রীতির পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার সম্ভাব্য সব কিছু করবে।

“মৌলবাদীদের দ্বারা সংগঠিত পূর্বপরিকল্পিত এই সহিংসতায় হিন্দু ধর্মীয় ব্যক্তিদের মনোবল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মনোবল দ্রুত ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

সভায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য, বীরেন শিকদার, মনোরঞ্জন শীল গোপাল, অসীম কুমার উকিল, পঙ্কজ দেবনাথ উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক