মুনিয়ার মৃত্যু: হাই কোর্টে আগাম জামিন পাননি বসুন্ধরার এমডি আনভীর

কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়াকে ‘ধর্ষণ ও হত্যার’ অভিযোগে তার বোনের দায়ের করা মামলায় বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরের আগাম জামিনের আবেদনে সাড়া দেয়নি হাই কোর্ট।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 Sept 2021, 10:37 AM
Updated : 29 Sept 2021, 12:33 PM

বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ারের ভার্চুয়াল হাই কোর্ট বেঞ্চ বুধবার আনভীরের ক্ষেত্রে আগাম জামিনের অবেদনটি আদালতের কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছে।

তবে আনভীরের স্ত্রী সাবরিনা সায়েমের আবেদন মঞ্জুর করে তাকে এ মামলায় ৬ সপ্তাহের আগাম জামিন দিয়েছে হাই কোর্টের এই বেঞ্চ।

আদালত বলেছে, মুনিয়ার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ‘আঘাতের চিহ্ন’ থাকায় প্রথম আবেদনকারীর (আনভীর) বিষয়ে হাই কোর্ট বেঞ্চ আপাতত হস্তক্ষেপ করবে না।

সায়েম সোবহান আনভীর এবং সাবরিনা সায়েম দুজনেই এ সময় আদালতে উপস্থিতি ছিলেন। তাদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, এম হাসান ইমাম ও বদিউজ্জামান তরফদার।

আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন শুনানিতে মুনিয়ার বোন নুসরাত জাহান তানিয়ার করা ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনার’ মামলা থেকে আনভীরের অব্যাহতি পাওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, বাদী পরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে মামলা করে।

আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগে কী- বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক তা জানতে চাইলে ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন মামলার অভিযোগ থেকে পড়ে শোনান।

পরে আদালত রষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য জানতে চাইলে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মিজানুর রহমান বলেন, “এ বিষয়ে আমাদের কোনো অবস্থান নেই।”

বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম তখন বলেন, ‘আগাম জামিনের আবেদনকারী এক-এর (সায়েম সোবহান আনভীর) বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, দুইয়ের (আনভীরের স্ত্রী সাবরিনা সায়েম) বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই। আমরা শুধু দুই নম্বরকে দিচ্ছি, ছয় সপ্তাহ।”

এরপরও আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন শুনানি চালিয়ে যেতে থাকলে বিচারক বলেন, “এই মুহূর্তে আমরা হস্তক্ষেপ করব না। শুধু এক জনকে জামিন দেব। আমরা আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে ডিলিট করে দিচ্ছি।”

এরপরও ইউসুফ হোসেন হুমায়ন তার শুনানি চালিয়ে যেতে থাকলে আদালত পরবর্তী ক্রমিক ডেকে সে মামলার শুনানি শুরু করেন।

বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম বলেন, “মিস্টার ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে ভিকটিমের চারটা ইনজুরি আছে। অনেক মামলা আছে, এগুলো আমাদের শেষ করতে হবে। আমরা একজনকে দিচ্ছি। আরেকজনকে ডিলিট করে দিচ্ছি। আরও পরে আসেন, এখন না।” 

মুনিয়ার বোন নুসরাত জাহান তানিয়া এর আগে ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনার’ মামলা করেছিলেন বসুন্ধরার এমডির বিরুদ্ধে। পুলিশ ওই মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পর ‘ধর্ষণ ও হত্যার’ অভিযোগ এনে আনভীর ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নতুন মামলা করেন তানিয়া।

ঢাকার ৮ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক বেগম মাফরুজা পারভীন গত ৬ সেপ্টেম্বর বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

বসুন্ধরার এমডি আনভীরের পাশাপাশি তার বাবা বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান, মা আফরোজা সোবহান, আনভীরের স্ত্রী সাবরিনা সায়েম, মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা, চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনের সাবেক স্ত্রী সাইফা রহমান মিম, ফ্ল্যাট মালিক ইব্রাহিম আহমেদ রিপন এবং তার স্ত্রী শারমিন আক্তারকে এ মামলায় আসামি করা হয়েছে।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর হাই কোর্টের এ বেঞ্চ থেকেই ইব্রাহিম আহমেদ রিপনকে ছয় সপ্তাহের আগাম জামিন দেওয়া হয়। গুলশানের যে ফ্ল্যাট থেকে গত এপ্রিলে মুনিয়ার লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল, রিপন সেই ফ্ল্যাটের মালিক।

ঢাকার গুলশানের এই ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়ার লাশ উদ্ধার করা হয়।

গত ২৬ এপ্রিল রাতে ওই ফ্ল্যাট থেকে গলায় ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় ২১ বছর বয়সী মোশারাত জাহান মুনিয়ার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সেই রাতেই আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ এনে আনভীরের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মামলা করেছিলেন ওই তরুণীর বোন তানিয়া।

সেখানে বলা হয়, ‘বিয়ের প্রলোভন’ দেখিয়ে সায়েম সোবহান আনভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন মুনিয়ার সঙ্গে। ওই বাসায় তার যাতায়াত ছিল। কিন্তু বিয়ে না করে তিনি উল্টো ‘হুমকি’ দিয়েছিলেন মুনিয়াকে।

সেই অভিযোগের বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কখনো কথা বলেননি বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি। মুনিয়ার মৃত্যুর সঙ্গে তার কোনো ‘সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি’ জানিয়ে গত ১৯ জুলাই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ।

পুলিশের ওই প্রতিবেদনে অনাস্থা (নারাজি) জানিয়ে মুনিয়ার বোন তানিয়া অন্য কেনো সংস্থার মাধ্যমে মামলাটি তদন্তের আবেদন করেছিলেন।

তা খারিজ করে ঢাকার মহানগর হাকিম রাজেশ চৌধুরী গত ১৮ অগাস্ট চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে সায়েম সোবহান আনভীরকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন।

বাদীর অন্যতম আইনজীবী এম সরোয়ার হোসেন সেদিন বলেছিলেন, এ অব্যাহতি আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আবেদন করবেন তারা। তবে পরে আদালতে নতুন মামলাটি করেন মুনিয়ার বোন।

মুনিয়া ঢাকার মিরপুর ক্যান্টনম্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি কুমিল্লার মনোহরপুরে; পরিবার সেখানেই থাকেন। মৃত্যুর মাস দুয়েক আগে এক লাখ টাকায় ভাড়া নেওয়া ওই ফ্ল্যাটে উঠেছিলেন তিনি।

মুনিয়ার মৃতদেহ উদ্ধারের পর সেখান থেকে তার মোবাইলসহ বিভিন্ন ধরনের আলামত উদ্ধার করে পুলিশ, যার মধ্যে ছয়টি ডায়েরি ছিল। সিসিটিভির ভিডিও পরীক্ষা করে মুনিয়ার ফ্ল্যাটে আনভীরের যাতায়াতের ‘প্রমাণ পাওয়ার’ কথাও সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল।

তবে তদন্ত শেষে প্রতিবেদনে মুনিয়ার ‘আত্মহত্যায়’ আনভীরের ‘সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ার’ কথা বলা হয় পুলিশের পক্ষ থেকে।

ধর্ষণ ও হত্যা মামলার আর্জিতে বলা হয়েছে, আসামি আনভীর ২০১৯ সালের জুন মাসে বনানীতে ‘৬৫ হাজার টাকায়’ একটি বাসা ভাড়া নেন এবং ‘বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে’ মুনিয়াকে নিয়ে সেখানে ওঠেন।

“আনভীর ৭/৮ ধরে তাকে ধর্ষণ করে। বিষয়টি জানাজানি হলে আনভীরের মা,বাবা ও মডেল পিয়াসা  তাদের বাসায় মুনিয়াকে ডেকে নিয়ে ঢাকা থেকে চলে যেতে বলে এবং তা না করলে হত্যার হুমকি দেয়।”

এরপর মুনিয়া কুমিল্লায় বাবার বাড়িতে চলে যান। কিন্তু পরে চলতি বছরের মার্চে মুনিয়াকে ‘বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে’ আবারও ঢাকায় নিয়ে আসেন আসামি এবং গুলশানের ওই বাসায় তাকে রাখেন বলে আর্জিতে লিখেছেন তানিয়া।

“মুনিয়া ২/৩ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যায়। বিষয়টি আনভীরকে জানিয়ে সে বিয়ে করার জন্য চাপ দেয়। বিষয়টি এ মামলার অপর আসামিদের মধ্যে জানাজানি হলে তারা পারিবারিক সুনাম, সুখ্যাতি রক্ষায় মুনিয়াকে হত্যার হুমকি দেয়।”

আরজিতে বলা হয়, “২০২১  সালের ২৬ এপ্রিল সকাল ৯টায় মুনিয়া তার বোনকে (মামলার বাদী) ফোনে বলে, ‘আপু আমার বিপদ, আনভীর আমাকে ধোঁকা দিয়েছে।  সে আমাকে বিয়ে করবে না, ভোগ করেছে মাত্র। তুমি তাড়াতাড়ি এসো, আমার বড় দুর্ঘটনা হয়ে যেতে পার।”

এরপর তানিয়া কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসে ওই ভবনের ম্যনেজারের সাহায্যে তালা ভেঙে বাসায় ঢুকে মুনিয়ার ঝুলন্ত লাশ পান বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

পুরনো খবর