ক্লাসে ক্লাসে আজ ‘ঈদের আনন্দ’

শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাণ; মহামারীর মধ্যে দেড় বছর পর সেই প্রাণ ফিরল ক্লাসে ক্লাসে। ঢাকার একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক বললেন, আজ যেন ‘ঈদের আনন্দ’।

কাজী নাফিয়া রহমানআসিফ অভি, কাজী সালাহউদ্দিন ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 12 Sept 2021, 06:23 AM
Updated : 12 Sept 2021, 08:24 AM

করোনাভাইরাসের মহামারীতে ৫৪৩ দিন কার্যত ঘরে বন্দি থেকে রোববার সকাল থেকে স্কুলে-কলেজে ফিরতে শুরু করেছে শিক্ষার্থীরা, যে মুহূর্তটির জন্য দুরুদুরু বুকে গত কয়েক দিন ধরেই প্রস্তুতি চলছিল তাদের। 

অনেক দিন পর স্কুলে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ তো আছেই, কিন্তু ভাইরাসের ভয়ে বদলে যাওয়া জীবনে ক্লাসে ফেরার অভিজ্ঞতাটা হল অনেকটাই নতুন। 

মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী আয়েশা আরোয়া মেহজাবিন জানালো, এতদিন পর স্কুলে ফিরে অনেক আনন্দ লাগছে তার। স্কুলে ঢোকার সময় তাকে চকলেট দিয়েছেন শিক্ষকরা। স্কুলের গেইট সাজানো হয়েছে রঙিন বেলুন দিয়ে।

প্রথম দিন মেহজাবিনদের দুটো ক্লাস হয়েছে, বাংলা আর সমাজ। মিরপুর ১০ নম্বর সেকশানের বাসা থেকে হেঁটে হেঁটে প্রথম দিন স্কুলে এসেছে সে মায়ের সাথে। তাকে স্কুলে দিয়ে মা চলে গেছেন অফিসে। স্কুল শেষে মেহজাবিন বাসায় ফিরবে ফুপির সাথে।

বিদ্যালয়ের প্রাণ শিক্ষার্থীরা; দেড় বছর বাদে রোববার তাদের পেয়ে ফুল ও চকলেট দিয়ে স্বাগত জানান ঢাকার উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। ছবি: কাজী সালাহউদ্দিন রাজু

“হাত স্যানিটাইজ করে তারপর স্কুলে ঢুকেছি। ক্লাসে ফাঁকা ফাঁকা করে বসতে দিয়েছে। মিসরা বলেছেন, সবসময় মাস্ক পরে থাকতে হবে, হাত পরিষ্কার রাখতে হবে, দূরত্ব মেনে চলতে হবে।”

মিরপুরের এ স্কুলের প্রধান শিক্ষক জিনাত ফারহানা বললেন, “আমাদের আজকে ঈদ মনে হচ্ছে। এই ১৮ মাস পর তারা আসছে, আমরা যেমন খুব এক্সাইটেড ছিলাম শিক্ষার্থীরাও খুব এক্সাইটেড ছিল ।”

বাচ্চাদের স্কুলের ফেরার দিনটা যাতে আনন্দময় হয়, সে দিকটি মাথায় রেখেই সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল বলে জানালেন প্রধান শিক্ষক।

স্কুল খুলেছে, কিন্তু মহামারী তো এখনও শেষ হয়নি। তাই সতর্কতামূলক পদক্ষেপে রোববার বিদ্যালয়ে ঢোকানোর আগে শিক্ষার্থীদের শরীরের তাপমাত্রা মাপা হয় ঢাকার মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটে। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

“আশার বিষয় হচ্ছে যে, আজকে প্রথম দিন, আমাদের এখানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি খুবই আশাব্যঞ্জক। এতদিন পর খুলেছে, বাচ্চাদের অনেক দিন ঘরে বসে থেকে একটা অভ্যাস তৈরি হয়ে গেছে। আমরা ভাবতে পারি নাই যে প্রথম দিন এত ভালো উপস্থিতি হবে।”

স্কুল খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে জিনাত ফারহানা বলেন, “আমাদের সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই, অভিনন্দন জানাই, স্কুলগুলো খুলে দিয়েছেন। আমাদের শিক্ষার্থীদের, অভিভাবকদের অনেক প্রত্যাশিত আজকের দিনটি। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।”

মিরপুর গার্লস আইডিয়ালে প্রথম দিন প্রাথমিকে তৃতীয় ও পঞ্চম এবং মাধ্যমিকে দশম শ্রেণি ও চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়া হয়েছে। শ্রেণী অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের প্রবেশ ও বের হওয়ার আলাদা আলাদা সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঢাকার উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে রোববার শিক্ষার্থীরা নিয়ম মেনে স্কুলে ঢুকলেও অভিভাবকদের স্বাস্থ্যবিধি মানতে দেখা যায়নি। ছবি: কাজী সালাহউদ্দিন রাজু

প্রতিটি শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের আপাতত দুই ঘণ্টা করে ক্লাস নেয়া হবে। ক্লাস শেষে সবাই যেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্কুল থেকে বের হয়, তাও দেখা হবে বলে শিক্ষকরা জানালেন।

ঢাকার উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ জহুরা বেগম বলছেন, “কোভিডের মধ্যে অনেকে চিন্তিত ছিলেন, ক্লাস শুরু হলে বাচ্চারা স্কুলে গেলে আবার সংক্রমণ বেড়ে যায় কি না। সেই শঙ্কা যেন ভুল প্রমাণ করা যায়, শিক্ষক, অভিভাবক- সবাইকে নিয়ে আমরা সেই চেষ্টাই করব।”

তিনি জানালেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে যে ১৯ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা মেনেই তারা শিক্ষার্থীদের ক্লাসে স্বাগত জানাচ্ছেন।

স্কুলের গেইটে দুই পাশে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন শিক্ষক আর কর্মচারীরা। শিক্ষার্থীরা প্রবেশের সময় তাদের তাপমাত্রা মাপা হয়েছে। সবাইকে স্বাগত জানানো হয়েছে একটি করে লাল গোলাপ দিয়ে।

মহামারীকালে স্কুলশিক্ষার্থীদের মুখে মাস্কের পাশাপাশি ব্যাগে যোগ হয়েছে স্যানিটাইজার। দেড় বছর পর স্কুল খোলার প্রথম দিন রোববার ক্লাস করতে আসা সবার কাছে ছিল স্যানিটাইজারের ছোট্ট বোতল। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

মহামারীর মধ্যে ঝুঁকি কমাতে সব ক্লাসের একসঙ্গে স্কুলে ফেরানো হয়নি। কোন ক্লাসের সপ্তাহে কয়দিন ক্লাস হবে, তা ঠিক করে দিয়ে আলাদা রুটিন হয়েছে। শ্রেণিকক্ষে বসার ব্যবস্থা হয়েছে দূরত্ব রেখে।

উদয়ন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী হৃদিতা নূর সিদ্দিক বললো, অনেক দিন বাসায় থেকে থেকে এখন স্কুলে ফিরতে কেমন লাগবে তা নিয়ে খানিকটা অস্বস্তি তার ছিল। কিন্তু স্কুলে এসে তা কেটে গেছে।

“অনেক দিন পর ফিরলাম। এত সুন্দরভাবে বরণ করবে আমরা ভাবিনি। একটু অন্যরকম লাগছে, এটা ঠিক। তবে শিক্ষকরা আমাদের অনেক সহযোগিতা করছেন।”

দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী অনিন্দ্য দে নিলয়ের কলেজ জীবনের বেশিরভাগ সময় বাসাতেই পেরিয়ে গেছে মহামারীর কারণে। এতদিন পর ক্লাসে ফিরে বন্ধুদের সাথে দেখা হওয়ায় সে খুবেই খুশি।

“এতদিন অনলাইনে ক্লাস হত, অনেক কিছু বুঝতে সমস্যা হত। এখন সরাসরি শিক্ষকদের কাছ থেকে সব বুঝে নিতে পারব। খুব ভালো লাগছে ক্লাসে এসে।”

মিরপুরের এমডিসি মডেল ইনস্টিটিউটে সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়েছে দশম শ্রেণির ক্লাস। তাদের বরণ করে নিতে প্রধান ফটক সাজানো হয়েছে বেলুন দিয়ে। শিক্ষার্থীদের তাপমাত্রা মেপে স্কুলে প্রবেশ করানো হয়েছে। হাত ধুইয়ে তারপর নিয়ে যাওয়া হয়েছে ক্লাস রুমে।

দশম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সাগরিকা খান বললেন, “বাচ্চাদের আজ আনন্দের শেষ নাই। গেইটে সবাইকে মাস্ক দিয়েছে। স্কুলও সাজানো হয়েছে।

“বাচ্চারা বাসায় থেকে থেকে ভবিষ্যত নষ্ট হচ্ছে। স্কুল খুলে দেয়ায় খুব ভালো হয়েছে। পড়াশোনাটা ঠিকমত হবে।"

ঢাকার উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় রোববার খোলার পর শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা প্রতিবেঞ্চে বসেন একজন, তাও ‘জেড’ শেপে। কে কোথায় বসবে, সেটা রং রঙে চিহ্নিত করা ছিল। ছবি: কাজী সালাহউদ্দিন রাজু

এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসাইন বললেন, "যেহেতু দীর্ঘ বিরতির পর স্কুল খুলেছে। আমরা বাচ্চাদের বাড়তি আনন্দ দিতে স্কুলের ফটক সাজিয়েছি। স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মানার চেষ্টা করছি আমরা।

" প্রতিটি শ্রেণির ক্লাস ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নেওয়া হচ্ছে। একটা ক্লাস ছুটির আধা ঘন্টা পরে আরেকটা ক্লাসকে প্রবেশ করাচ্ছি।"

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে অনেকের স্কুল ড্রেস বা জুতো ছোট হয়ে গেছে, কারও বা ব্যাগ নষ্ট হয়ে গেছে।

সরকার স্কুল খোলার তারিখ ঘোষণার পর গত কয়েক দিন তাই শিক্ষার্থীদের কেটেছে প্রস্তুতি আর ক্লাসে ফেরার উত্তেজনার মধ্যে। তবে প্রথম দিন স্কুলে আসা অনেক শিক্ষার্থীর গায়ে স্কুল ড্রেস ছিল না।

মিরপুর ১২ নম্বরের লিটল ফ্লাওয়ারস প্রিপারেটরি স্কুলে দেখা গেল, প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই ইউনিফর্ম পরেনি।

এ স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী মাইমুনা ইয়াসমীন বললো, “নতুন স্কুল ড্রেস বানাতে দিয়েছি। তাই পরতে পারিনি। টিচাররাও কিছু বলেননি।”

এতদিন পর স্কুলে ফিরতে পারলেও সবকিছু যে বদলে গেছে, সেটা ভালোই বুঝতে পারছে মাইমুনা।

“বন্ধুদের সাথে আবার একসাথে ক্লাস করলাম। কিন্তু সবাই দূরে দূরে বসছে। আর মাস্ক পরায় সবাইকে দেখতেও পারিনি ঠিকমত। কিন্তু তারপরও অনেক ভালো লাগছে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক