সাইফুল আজম: এক যোদ্ধা ‘ঈগলের’ উপাখ্যান

ইতিহাসে সেই লড়াই ‘ছয় দিনের যুদ্ধ’ হিসেবে পরিচিত। ১৯৬৭ সালের ৫ জুন অতর্কিত হামলায় মুহুর্মুহু বোমা ফেলে মিশরের প্রায় সব জঙ্গি বিমান ধ্বংস করে দেয় তখনকার অত্যাধুনিক জেট ফাইটার ‘মিরাজ’ আর ’সুপার মিসটেয়ার’ সজ্জিত ইসরায়েলি বাহিনী।

মাসুম বিল্লাহগোলাম মুজতবা ধ্রুব ও , নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 17 June 2020, 01:25 PM
Updated : 17 June 2020, 02:13 PM

মিশরে এমন তাণ্ডবের পর ইসরায়েল একই রকম হামলা চালাতে যায় আরব মিত্র জর্ডানে। অনেকটা বিনা বাধায় ইসরায়েলি ফাইটার জর্ডানে ঢুকে মাফরাক বিমানঘাঁটিতে হামলা শুরু করে।

সে সময় প্রতিরোধ গড়তে পেরেছিলেন কেবল পাকিস্তান বিমানবাহিনী থেকে ডেপুটেশনে আসা দুঃসাহসী বাঙালি তরুণ- সাইফুল আজম সুজা, যিনি পরে সত্তরের দশকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর গ্রুপ কাপ্টেন হিসেবে অবসরে যান।

রয়্যাল জর্ডানিয়ান এয়ারফোর্সের একটি হকার হান্টার নিয়ে সেদিন আকাশে উড়ে সাইফুল ফ্রান্সে তৈরি একটি ইসরায়েলি সুপার মিসটেয়ার জেট ভূপাতিত করেন। তার ছোড়া গোলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আরেকটি ইসরায়েলি ফাইটার পালানোর পথে বিধ্বস্ত হয়।

তরুণ অফিসার সাইফুল আজমসহ তখনকার পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একটি দল মাত্র কয়েক মাসের জন্য আরবের দেশ জর্ডানে গিয়েছিলেন বৈমানিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য। কিন্তু মিশরের পর ইসরায়েল যখন জর্ডানে জঙ্গি বিমান পাঠাল, সাইফুলদের ওপর ভার পড়েছিল প্রতিরোধ গড়ার।    

তাদের সেই চেষ্টায় জর্ডানের শেষ রক্ষা হয়নি, বোমা ফেলে একদিনে কেবল যুদ্ধবিমান নয়, যাত্রীবাহী সব উড়োজাহাজও ধ্বংস করে দিয়েছিল ইসরায়েলিরা।

তবুও এমন বীরত্বের জন্য জর্ডানের বাদশাহর কাছ থেকে ‘ওয়াসাম-আল-ইসতিকবাল’ খেতাব পেয়েছিলেন বৈমানিক সাইফুল আজম।

মাফরাক বিমানঘাঁটি থেকে সেই যুদ্ধের দুদিনের মাথায় সাইফুল আজমের ডাক পড়ে যুদ্ধের আরেক ফ্রন্ট ইরাকে; সেখানেও ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে পেরেছিলেন তিনি।

এক জর্ডানি ও দুই ইরাকি বৈমানিককে সঙ্গে নিয়ে বাঙালি যোদ্ধা সাইফুল আজম সেদিন ওড়েন ইরাকি বিমানবাহিনীর হয়ে।

পশ্চিম ইরাকের আকাশে ডগ ফাইটে সাইফুল ধরাশায়ী করেন ইসরায়েলের একটি মিরাজ ফাইটারকে। পরে ভূপাতিত করেন ইসরায়েলের ভুতুর বোমারু বিমান। দুই ইসরায়েলি বৈমানিক ধরা পড়ে ইরাকি বাহিনীর হাতে।

ইরাকি বাহিনীর হয়ে এমন বীরোচিত লড়াইয়ের জন্য দেশটির তরফ থেকে ’নাওত-আল সুজা’ পদকে ভূষিত হন সাইফুল।

ইসরায়েলি বাহিনীর চারটি যুদ্ধ বিমান ভূপাতিত করার রেকর্ড সাইফুল আজম ছাড়া আর কোনো বৈমানিকের নেই। জেট ফাইটার নিয়ে তিনি আকাশে উড়েছেন চার দেশের হয়ে, এটাও একটি রেকর্ড।

আকাশ যুদ্ধের বীর সেনানী সাইফুল আজম বিমানবাহিনী থেকে অবসরের পর দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান হিসেবে। রাজনীতিতে নেমে পাবনার এমপি হিসেবে গেছেন সংসদে।

গত ১৪ জুন ৭৯ বছর বয়সে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এই সাবেক গ্রুপ ক্যাপ্টেন। 

ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাইফুল আজমের মৃত্যু হয়। সোমবার বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ঘাঁটি বাশারে জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শাহীন কবরস্থানে সমাহিত করা হয় তাকে।

সাইফুল আজমের মৃত্যু শোকগ্রস্ত করেছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদেরও। ফিলিস্তিনের ইতিহাসবিদ ওসামা আল-আশকার তাকে বর্ণনা করেছেন একজন ‘মহান বৈমানিক’হিসেবে।

ফেইসবুকে এক পোস্টে শোক জানাতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা মসজিদকে রক্ষার লড়াইয়ে এই ‘বাংলাদেশি ভাইও’ শামিল হয়েছিলেন।

ফিলিস্তিনের অধ্যাপক নাজি শুকরি এক টুইটে সাইফুল আজমের প্রতি স্যালুট জানিয়ে লিখেছেন, “তিনি ফিলিস্তিনকে ভালোবাসতেন এবং জেরুজালেমের স্বার্থে লড়াই করেছিলেন।”

মৃত্যুতে সাইফুল আজমকে স্মরণ করেছে জর্ডানও। দেশটির যুবরাজ হাসান বিন তালাল এক শোকবার্তায় এই বাংলাদেশি বৈমানিকের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। 

১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতে পূর্ববাংলার পাবনায় সাইফুল আজমের জন্ম। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দিয়ে দুই বছর পর কমিশন পান।

তার চাচাত ভাই বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান ফখরুল আজম জানান, ছেলেবেলা থেকেই সাইফুল ছিলেন চৌকস, খেলাধুলায় পারদর্শী।

“তিনি ছোটবেলা থেকে আমার কাছে ছিলেন রোল মডেলের মত। যেমন খেলাধুলায়, তেমন লেখাপড়ায়। তাকে দেখেই আমি মূলত বিমান বাহিনীর দিকে ঝুঁকেছিলাম।”

‘প্রিয় ভাইজান’ সাইফুল আজম সেই দক্ষতা আর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাফল্য পেয়েছেন বলে মনে করেন অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল ফখরুল আজম।

পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে কমিশন পাওয়ার পর প্রশিক্ষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের লুক এয়ার ফোর্স বেইজে পাঠানো হয় তরুণ অফিসার সাইফুল আজমকে। সেখানে বম্বিংয়ে নিখুঁত নিশানার ট্রেইনিংয়ে প্রথম স্থান অর্জন করে তিনি ‘টপ গান’ উপাধি পান।

অ্যারিজোনার ওই ঘাঁটিতে প্রশিক্ষণ নিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এসে মিলিটারি ফ্লাইট ইনস্ট্রাক্টর হিসাবে যোগ দেন জুনিয়র পাইলট সাইফুল। ১৯৬৫ সালের কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ জড়ালে পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবে ডাক পড়ে তার।

২৪ বছর বয়সী সাইফুল আজম সেই যুদ্ধে অংশ নেন কানাডায় নির্মিত একটি সেবার জেট নিয়ে। ব্রিটেনে তৈরি ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি ফোল্যান্ড নাট ফাইটারের ধাওয়া এড়িয়ে পাল্টা আক্রমণ চালান। আকাশযুদ্ধে ভূপাতিত করেন একটি ভারতীয় বিমান।

সেই বীরত্বের জন্য ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হন সাইফুল আজম। পাকিস্তান সরকার তাকে তৃতীয় সর্বোচ্চ সামরিক পদক ’সিতারা-এ-জুরাআত’ এ ভূষিত করে।

২০১৮ সালে ’লিভিং ঈগল: সাইফুল আজম’ শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্রে ভারতের সেই ফোল্যান্ড নাট বিমান ভূপাতিত করার একটা বর্ণনা দেন এই যোদ্ধা।

আকাশে যথাযথভাবে নিশানা ঠিক করতে পারাকে নিজের সাফল্যের মূল কারণ হিসাবে বর্ণনা করে সেখানে তিনি বলেন, “আমার টার্গেট স্পটিং ছিল সুচারু, সে কারণে আমি সফল হতাম।”

যুদ্ধক্ষেত্রে সাহসিকতা আর কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাদারিং অব ঈগলস ফাউন্ডেশন বিশ্বের যে ২২ বৈমানিককে ‘লিভিং ঈগল’ সম্মাননা দিয়েছিল, সাইফুল আজম তাদেরই একজন।

লড়া হয়নি দেশের জন্য

যে তিন দেশের বিমান বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন, সবগুলো থেকে বীরত্বের স্বীকৃতি পেয়েছেন সাইফুল আজম। কিন্তু চেষ্টা চালিয়েও জন্মভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ে যোগ দিতে পারেননি এই বৈমানিক।

১৯৭১ সালের অগাস্টে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ছয় মাসের মাথায় পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসতে চেয়ে ব্যর্থ হন সাইফুল আজম। কয়েকজন বাঙালি সহকর্মীকে নিয়ে একটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে পালানোর পরিকল্পনা করে ধরা পড়ে যান।

তার চাচাত ভাই ফখরুল আজম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, টানা ২১ দিন নির্জন সেলে আটকে রেখে নির্মম অত্যাচার চালানো হয় সাইফুলের ওপর। তাকে সামরিক আদালতের মুখোমুখি করা হলেও জর্ডানের বাদশাহ হুসেইন বিন তালালের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত তিনি রক্ষা পান।

“নির্যাতনে ভাইজানের শরীরে অনেক জখম ছিল, শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। জর্ডানের পদকপ্রাপ্ত হওয়ায় বাদশাহ হস্তক্ষেপ করেছিলেন।”

বিচার থেকে রেহাই পেলেও পরিবারসহ সাইফুল আজমকে গৃহবন্দি থাকতে হয় দীর্ঘদিন। শেষ পর্যন্ত তার মুক্তি মেলে ১৯৭৪ সালে। পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে কর্মরত বাঙালিদের সর্বশেষ ব্যাচের সঙ্গে ৯ জানুয়ারি তিনি দেশে ফেরেন।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ফ্লাইট সেফটি পরিচালক এবং পরে ডিরেক্টর অব অপারেশনসের দায়িত্ব পালন করেন সাইফুল আজম। ১৯৭৭ সালে পদোন্নতি পেয়ে হন উইং কমান্ডার, পান ঢাকায় বিমান ঘাঁটির দায়িত্ব।

১৯৭৯ সালে গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে বিমান বাহিনীর ২১ বছরের ক্যারিয়ারের ইতি টানেন তিনি।

ঘনিষ্ঠজনরা জানান, অবসরে গেলেও প্রশিক্ষণ দেওয়া থেকে শুরু করে আকাশে ওড়ায় বিরাম ছিল না সাইফুল আজমের।

বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তিনি মূলত বিমানবাহিনীতে ছিলেন। বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমিতেও অনারারি ইন্সট্রাকটর হিসেবে আসতেন।

”১৯৮৭-৮৮ সালের দিকে ফ্লাইং একাডেমিতে যখন ফ্লাই করতেন তখন তার সঙ্গে অনেকেই ফ্লাই করেছেন। এখন আমরা বিমানে অনেকেই যারা ক্যাপ্টেন আছি, ৭৭৭, ৭৮৭ বা এসব জাহাজের, অনেকেই তার ছাত্র। আমি তার সরাসরি ছাত্র না হলেও তার অনেক ব্রিফিং আমি ১৯৮৭-৮৮ সালের দিকে পেয়েছি।”

সাইফুল আজম ১৯৮২-৮৪ এবং ১৯৮৭-৮৮ সাল পর্যন্ত বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদে সাইফুল আজম পৈত্রিক এলাকা পাবনার একটি আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। এক সময় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করেপারেশনের (এফডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।

জীবনের শেষ সময়ে নাতাশা ট্রেডিং এজেন্সির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন সাইফুল আজম। এমএএএস নামে একটি ট্রাভেল এজেন্সিও ছিল তার।

পেশাগত জীবনে উচ্চশিখরে ওঠার স্বীকৃতি পেলেও সেভাবে প্রচারের আলোয় আসেননি বৈমানিক সাইফুল আজম।

মৃত্যুর পর ‘বিনয়ী, প্রচারবিমুখ ও স্বল্পভাষী’ সেই সাইফুল আজমকে স্মরণ করেছেন এভিয়েশন খাতের পত্রিকা পাক্ষিক মনিটরের সম্পাদক কাজী ওয়াহিদুল আলম।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ”তার যে বীরত্বপূর্ণ আর গৌরবোজ্জ্বল একটা অতীত রয়েছে, সেটা নিজে থেকে তিনি কখনোই কাউকে বলতেন না। এ কারণে মৃত্যুর পর আজ তার বীরত্বপূর্ণ অবদানের কথা সামনে আসছে।”

’লিভিং ঈগল: সাইফুল আজম’ প্রামাণ্যচিত্রে বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান এজি মাহমুদ বলেছিলেন, “সে কখনো ওই বিষয়গুলো গল্প হিসাবেও বলেনি। আমি তাকে খুবই সজ্জন হিসাবে জানি। এই মডেস্টিই তাকে নেতৃত্বের সারিতে নিয়ে আসে।

”একজন ক্যাডেট হিসাবে আমি তাকে মনে করতে পারি। সে সময়ে আমি একজন প্রশিক্ষক ছিলাম। আমি সাইফুল আজমের জন্য খুবই গর্বিত, কারণ তার অর্জনগুলো এসেছে ৩০ বছর বয়স হওয়ার আগেই।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক