খুলছে অফিস, শঙ্কায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা

বৈশ্বিক মহামারী রূপ নেওয়া অতি সংক্রামক রোগ কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ আটকাতে টানা ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটি শেষে রোববার খুলছে অফিস।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকশহীদুল ইসলাম, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 May 2020, 04:58 PM
Updated : 30 May 2020, 06:03 PM

নতুন রোগীর পাশাপাশি এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা যখন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে সেই পরিস্থিতিতে খুলে দেওয়া হচ্ছে অফিস। এদিনই ট্রেন ও লঞ্চ এবং সোমবার থেকে দূরপাল্লার বাস-মিনিবাস চলাচলও শুরু হচ্ছে।

গত ২৬ মার্চ থেকে চলা সাধারণ ছুটির মেয়াদ না বাড়িয়ে ৩১ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে অফিস খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

এই সময় স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে জারিকৃত ১৩ দফা নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের পাশাপাশি সবাইকে অবশ্যই মাস্ক পরে অফিসে আসতে বলা হয়েছে। তবে বয়স্ক, অসুস্থ ও সন্তান সম্ভবাদের এ সময় অফিসে আসা মানা।

সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বলা হলেও প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে রোববার থেকে যারা অফিস করবেন তাদের অনেকের মধ্যেই প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে সংক্রমণের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

সচিবালয়ের ২২তলা ৬ নম্বর ভবনের উপরের দিকের ফ্লোরে অফিস এমন একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই ভবনে উঠতে ছয়টি লিফটের একটি মন্ত্রী ও সচিবদের জন্য নির্দিষ্ট করা। অন্য পাঁচটি লিফটে গাদাগাদি-ঠাসাঠাসি করে উপরে উঠতে হয়।

“লিফটের জন্য অনেকক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে এই ভবনে উঠতে হয়। লিফট থেকেই করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকবে। আমি অফিস করতেই ভয় পাচ্ছি, কিন্তু অফিসে না এসেও কোনো উপায় নেই।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, সচিবালয়ের বিভিন্ন ভবনের কক্ষগুলো ভাগ করতে করতে অনেক ছোট ছোট করা হয়েছে। আগে যে কক্ষে একজন বসতেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংখ্যা বাড়ায় এখন সেখানে ৩-৪ জনের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। চাইলেও দূরত্ব মেনে বসা সম্ভব নয়।

“কে আক্রান্ত আর কে আক্রান্ত নয় বা কারও শরীরে কোভিড-১৯ এর উপসর্গ আছে কি না, তা তো খালি চোখে দেখার উপায় নেই; কী যে হবে! চাকরি করলে সরকারের নির্দেশ মানতেই হবে, কি আর করা!”

এসব বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মনিটরিং অনুবিভাগ) মো. হেমায়েত হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, লিফটে হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখা, দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ানোর বিষয়ে আরও আগেই নির্দেশনা দেওয়া আছে। এখন আরও বেশি সতর্কতার সঙ্গে এসব দেখা হবে।

কোভিড-১৯ সংক্রমণের পর থেকে সচিবালয়ে দর্শীনার্থী পাস ইস্যু করা বন্ধ থাকায় ভিড় কিছুটা কম হবে বলেই মনে করছেন তিনি।

হেমায়েত বলেন, “আগে বেলা ১২টা থেকে দর্শনার্থীদের প্রবেশের পাস ইস্যুর পর থেকে লিফটে ভিড় বেড়ে যেত। এখন যেহেতু পাস ইস্যু বন্ধ, তাই ভিড় কম হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সতর্কতার সঙ্গে লিফটে উঠলে সমস্যা হওয়ার কথা না।

“লিফটম্যানদের অনেক আগেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, কর্তৃপক্ষ সতর্ক আছে। আশা করি সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করেই সবাই লিফটে উঠবেন।”

সবার মুখে মাস্ক আছে কি না, তা পর্যবেক্ষণে সচিবালয়ে প্রবেশের গেইটগুলোতে নির্দেশনা দেওয়া হবে বলেও জানান এই অতিরিক্ত সচিব।

এক কক্ষে গাদাগাদি করে বসা নিয়ে অতিরিক্ত সচিব হেমায়েত বলেন, “কক্ষগুলো ভাগ করে একাধিক রুম করা হয়েছে এটা ঠিক। কিন্তু সকলেই শিক্ষিত মানুষ, জ্ঞানী-গুণী; তারা নিজ নিজ প্রোটেকশন বজায় রেখে কাজ করলে আমার মনে হয় কোনো সমস্যা হবে না। নিজেকে নিজে অবশ্যই সতর্ক রাখতে হবে।”

সচিবালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার রাজীব ঘোষ শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, যারা পায়ে হেঁটে সচিবালয়ে প্রবেশ করবেন সচিবালয় ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করবেন।

সচিবালয়ের দুটি গেইট দিয়ে যারা গাড়ি নিয়ে ঢুকবেন তাদের কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে, সেই প্রশ্নে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে এখনও কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। তবে এটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, একটা ব্যবস্থা হতে পারে।”

সচিবালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাদে আগামী ১৫ জুন পর্যন্ত অন্য কাউকে সচিবালয়ে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সচিব, তাদের একান্ত সচিব ছাড়াও বেশ কয়েকজন অতিরিক্ত সচিবের কক্ষে ওয়াশরুমের ব্যবস্থা আছে। এর বাইরে অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কমন ওয়াশরুম ব্যবহার করতে হয়।

এই প্রসঙ্গ তুলে একজন কর্মচারী বলেন, সারা দিন অফিস করলে ওয়াশরুমে যেতেই হবে। কিন্তু কমন ওয়াশরুম কতটুকু নিরাপদ? এসব বিষয়ে অবশ্যই নজর দেওয়া উচিত।

সুরক্ষার বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সোলতান আহ্মদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের ১৩ দফা নির্দেশনা সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও এসব সতর্কবাণী বিভিন্নভাবে প্রচার করা হচ্ছে।

“কোথাও গাদাগাদি করে বসলে তা অ্যাড্রেস করা হবে। আমরা এটাও ভাবছি যে, যেসব কর্মচারীর এই সময়ে প্রয়োজন নেই তাদের অফিসে না আসতেও বলা হতে পারে, এটা কাল (রোববার) অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত হবে।

“রোববার প্রথম দিনের অফিস করার সময় কোনো সমস্যা দেখা দিলে সেগুলো সমাধান করা হবে। সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।”

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, কোভিড-১৯ সংক্রমণ পরিস্থিতিতে সবগুলো মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ই-ফাইলিংয়ের পাশাপাশি সভাগুলো ভার্চুয়ালি আয়োজন করতে।

“এতে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা যাবে। ভালোমত কাজও হবে।”

আর পড়ুন-

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক