রাজধানীজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, ভাঙচুর

বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় টানা তৃতীয় দিনের মত রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ ও ভাঙচুর চালিয়েছে স্কুল কলেরেজ শিক্ষার্থীরা।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 31 July 2018, 05:19 AM
Updated : 31 July 2018, 06:27 PM

তাদের এই বিক্ষোভে ঢাকার ফার্মগেইট, সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়, মতিঝিল, কাকরাইল ও বাড্ডায় দীর্ঘ সময় যান চলাচল বন্ধ থাকে, চলতি পথের যাত্রীদের পড়তে হয় ভোগান্তিতে।

এর মধ্যে সায়েন্স লাবরেটরি মোড় প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা আটকে রেখে অন্তত ২০টি গাড়ি ভাংচুর করে স্কুল কলেজের ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীরা।

গুরুত্বপূর্ণ এসব মোড় দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় পুরো শহরের পরিবহন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

রোববার জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর গত দুদিন ধরেই রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ চালিয়ে আসছে।

এর মধ্যে মঙ্গলবার সকালে ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট অ্যালায়েন্স’ নামের একটি ফেইসবুক গ্রুপ থেকে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে সড়ক অবরোধের আহ্বান জানানো হয়।

বেলা পৌনে ১১টার দিকে ওই পেইজ থেকে বলা হয়, “সবাই যার যার প্রতিষ্ঠানের (শিক্ষা) সামনের সকল রাস্তা বন্ধ করে দিন। এ্যাম্বুলেন্স ও হজযাত্রী ছাড়া কোনো পিঁপড়ার বাহনও যেন না চলে।”

এর আগেই সকাল ১০টার দিকে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা র‌্যাডিসন হোটেলের সামনের রাস্তার একপাশে অবস্থান নিয়ে আধা ঘণ্টা বিক্ষোভ করে।

তবে তারা পুরো রাস্তাজুড়ে অবস্থান না নেওয়ায় সেখানে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটেনি বলে ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার নাজমুল আলম জানান।

রমিজ উদ্দিন কলেজের শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি চলার মধ্যেই তেজগাঁও কলেজ ও সরকারি বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষার্থীরা ফার্মগেইটের বাবুল টাওয়ারের সামনে অবস্থান নেয়।

সেখানে তাদের বিক্ষোভের কারণে প্রায় দেড় ঘণ্টা ফার্মগেইট মোড় হয়ে রাজধানীর মিরপুর, গাবতলী, কারওয়ান বাজার ও বিমানবন্দর সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে।

পরে পুলিশ কর্মকর্তারা তাদের বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সরিয়ে নিলে যান চলাচল শুরু হয় বলে ট্রাফিক পুলিশের সহকারী কমিশনার মো. হারুন জানান।

ফার্মগেইটের বাসিন্দা মার্টিন গোমেজ তার স্ত্রীকে নিয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে শিক্ষার্থীদের ওই অবরোধের কারণে আটকা পড়েন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা একটি বাস ভাংচুর করে। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ওই বাসটি সরিয়ে নেওয়া হয়।

ফার্মগেইট থেকে সরে যাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা শাহবাগের দিকে রওনা হয়। তবে রূপসী বাংলা মোড়ে পুলিশ তাদের আটকে দেয়।

এদিকে ফার্মেগেইট খোলার আগেই সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় ও মিরপুর সনি সিনেমা হলের সামনে শিক্ষার্থীদের অবস্থানের খবর আসে।

বেপরোয়া চালকের সার্বোচ্চ শাস্তিসহ নয় দফা দাবিতে ধানমণ্ডির আইডিয়াল, গভার্নমেন্ট ল্যাবরেটরি, সিটি কলেজ ও ঢাকা কলেজের পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি ও এফিফ্যান্ট রোডে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে।

তাদের নয় দফা দাবি হল: ১. বেপোরোয়া চালককে ফাঁসি দিতে হবে এবং এই শাস্তি সংবিধানে সংযোজন করতে হবে। ২. নৌপরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। ৩. শিক্ষার্থীদের চলাচলে এমইএস ফুটওভার ব্রিজ বা বিকল্প নিরাপদ ব্যবস্থা নিতে হবে। ৪. প্রত্যেক সড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় স্পিড ব্রেকার দিতে হবে। ৫. সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্র-ছাত্রীদের দায়ভার সরকারকে নিতে হবে। ৬. শিক্ষার্থীরা বাস থামানোর সিগন্যাল দিলে থামিয়ে তাদের বাসে তুলতে হবে। ৭. শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ৮. রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল এবং লাইসেন্স ছাড়া চালকদের গাড়ি চালনা বন্ধ করতে হবে। ৯. বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া যাবে না।  

ধানমন্ডি জোনের সহকারী কমিশনার আহসান খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, শিক্ষার্থীদের অবস্থানের কারণে শাহবাগ ও নিউ মার্কেটের সঙ্গে জিগাতলা ও মিরপুর রোডের মধ্যে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তারা বুঝিয়ে তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও লাভ হয়নি। 

রাস্তায় আটকে থাকা রত্না বসাক নামের একজন উন্নয়নকর্মী বলেন, “ছেলেমেয়েরা যেসব দাবি নিয়ে আন্দোলন করছে, তা যৌক্তিক। কিন্তু এভাবে সড়ক অবরোধ করলে জনগণের ভোগান্তি বাড়বে।”

মিরপুরের সনি সিনেমা হলের সামনের বিক্ষোভে নেতৃত্বে ছিল মূলত মিরপুর কমার্স কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাদের অবরোধের কারণে বেলা ১১টা থেকে প্রায় এক ঘণ্টা সনি সিনেমা হলের সামনে থেকে চিড়িয়াখানা রোডে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে।

পরে বেলা ১২টার দিকে তারা নিজেরাই সরে যায় বলে শাহ আলী থানার এসআই খোকন চন্দ্র বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান।

বেলা সাড়ে ১২টার দিকে তিনি বলেন, “সড়কে কোনো অবরোধ নাই।  চিড়িয়াখানা সড়ক, মিরপুর-১ থেকে গাবতলী যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।”

পুলিশের মিরপুর জোনের সহকারী কমিশনার সৈয়দ মামুন মোস্তফা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, কমার্স কলেজের শিক্ষার্থীরা সনি সিনেমা হলের সামনে অবস্থান শেষে মিরপুর ১০ নম্বর গোল চক্করের দিক দিয়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করে তারা। বেলা দেড়টার পর থেকে ওই এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

 

এদিকে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের শিক্ষার্থীরা বেলা সাড়ে ১২টার দিকে কাকরাইল মোড়ে রাস্তায় নেমে এসে বিক্ষোভ শুরু করে এবং একটি বাসে ভাংচুর চালায়।

পুলিশের রমনা বিভাগের ডিসি মো. মারুফ হোসেন সরদার জানান, তারা বুঝিয়ে শিক্ষার্থীদের রাস্তা থেকে সরিয়ে নেন। পরে তারা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করে।

কাকরাইলের পরিস্থিতি শান্ত হতে না হতেই নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামে। বেলা সোয়া ১টার দিকে প্রথমে নিজেদের কলেজের সামনের রস্তায় নেমে তারা যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। পরে শাপলা চত্বরে গিয়ে সেখানে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে বলে মতিঝিল বিভাগের উপ কমিশনার মো. আনোয়র হোসেন জানান। 

পুলিশের মতিঝিল বিভাগের সহকারী কমিশনার মিশু বিশ্বাস জানান, পুলিশ দোষী চালকদের গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি করার আশ্বাস দেওয়ার পর শিক্ষার্থীরা বিকাল ৩টার দিকে শাপলা চত্বর ত্যাগ করে।

কিন্তু তারা চলে যাওয়ার সময় কমলাপুরের দিকে এক ছাত্র মারধরের শিকার হয়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়লে আবার উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।

সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ের বিক্ষোভ প্রথম দিকে শান্তিপূর্ণই ছিল। কিন্তু এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা হিমাচল পরিবহনের একটি বাস আটকে ভাঙচুর করে এবং পরে আগুন ধরিয়ে দেয়। 

বেলা ২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটো দোতলা বাস ঢাকা কলেজের সামনে দিয়ে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে  এলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সেগুলো আটকে দেয়। এ নিয়ে বাসের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের বাকবিতণ্ডাও হয়। 

পরে পুলিশ সেখানে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস দুটিকে সরে যাওয়ার ‍সুযোগ করে দেয়। পুলিশ আন্দোলনকারীদের সরাতে ধাওয়া দিলে শিক্ষার্থীরা ঢিল ছুড়তে শুরু করে এবং ল্যাবে এইডের কাছে গিয়ে আটকে থাকা যানবাহনে ভাঙচুর শুরু করে।

পুলিশ সদস্যরা জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালের একটি বাসসহ অন্তত ২০টি গাড়ি সেখানে ভাঙচুরের শিকার হয়। ভাঙচুর করে তারা চলে যাওয়ার পর বেলা ২টার পর ওই এলাকা দিয়ে যান চলাচল শুরু হয়।

এর মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক থেকে ৩০-৪০টি মোটর সাইকেলে করে একদল যুবক এসে ওই এলাকায় চক্কর দিয়ে যায়।

বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় সড়ক অবরোধ করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ছবি: আব্দুল্লাহ আল মমীন

পুলিশের ধাওয়ায় ছুটছে শিক্ষার্থীরা। সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকার চিত্র। ছবি: আব্দুল্লাহ আল মমীন

এদিকে দুপুরে জিগাতলায় জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা পুলিশের একটি রেকারে হামলা চালালে রেকার চালক দ্রুত সরে পড়ার চেষ্টা করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটান। 

তড়িঘড়ির মধ্যে রেকারটি রাস্তার পাশে থাকা একটি রিকশা এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের প্রটোকলের একটি গাড়িকে ধাক্কা দেয়।

কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, বেলা আড়াইটার দিকে আওয়ামী লীগের ধানমণ্ডি অফিসের সামনে কিছু উত্তেজিত ছাত্র রেকার ভাংচুর শুরু করে। তারা চালককেও মারধর শুরু করে।

এ সময় চালক গাড়ি টান দিলে রেকার গিয়ে ওবায়দুল কাদেরের প্রটোকল গাড়িকে ধাক্কা দেয়। তাতে গাড়ির সামনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রেকারের ধাক্কায় রিকশাটিও দুমড়ে মুচড়ে যায়।

এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে থাকা নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তারা বেরিয়ে বসে ১০/১৫ জন শিক্ষার্থীকে পালিয়ে যেতে দেখেন।

রেকারের চালক সেলিম বলেন, দুটো ছেলে বাঁশের লাঠি নিয়ে তার ওপর চড়াও হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে তিনি দ্রুত গাড়ি নিয়ে সরে পড়ার চেষ্টা করতে গিয়ে জটিলতায় পড়েন।

রাতে মহাখালীতে বেসরকারি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির কিছু শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গুলশান কমার্স কলেজ, মহাখালী টিঅ্যান্ডটি স্কুল, বিএন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরাও অবরোধে অংশ নেয়।

অবরোধের কারণে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে গুলশান থেকে মহাখালীমুখী সড়কের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশের অনুরোধে তারা অবরোধ তুলে নেয়।

গুলশান কমার্স কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাজু বলেন, “বাসচাপায় নিহত দিয়া আমাদের এই এলাকার বাসিন্দা। তার মৃত্যুতে বিচার দাবি করা আমাদের দায়িত্ব। সারাদিন আমরা শহরের বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। সন্ধ্যার পরে নিজ এলাকায় দাঁড়িয়েছি।”

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন লিটন হায়দার, কামাল তালুকদার, জয়ন্ত সাহা ও কাজী মোবারক হোসেন]

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক