হলি আর্টিজান বেকারির সেই বাড়িটি এখনও সুনসান

দুই বছর আগে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার সাক্ষী গুলশানের যে বাড়িতে হলি আর্টিজান বেকারি ছিল, সেখানে এখনও সুনসান নীরবতা।

তাবারুল হক নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 June 2018, 08:12 AM
Updated : 30 June 2018, 08:35 AM

গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর বাড়িটিতে বাইরে থেকে তালা ঝোলে অধিকাংশ সময়। ভবন মালিক নিজে থাকতে বাড়িটি বসবাস উপযোগী করলেও নিয়মিত থাকেন না।

লেকের ধারের এই বাড়িতে ছিল হলি আর্টিজান বেকারি; যেখানে ২০১৬ সালের ১ জুলাই জঙ্গিরা হামলা চালিয়ে হত্যা করেছিল ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনকে; যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও শোর ফেলেছিল।

কমান্ডো হামলায় জঙ্গিরা মারা যাওয়ার পর কয়েক মাস আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল বাড়িটি। গত বছর তা বুঝিয়ে দেওয়া হয় মালিককে। তবে ওই বাড়িতে বেকারিটি আর চালু হয়নি।

ঘটনার দুই বছর পূর্তির আগে শুক্রবার গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির প্রবেশ মুখে প্রধান ফটকে নিরাপত্তাকর্মীরা পাহারা দিচ্ছেন। বাড়ির সব দরজা-জানালা বন্ধ।

নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, জঙ্গি হামলার পর বাড়ির দেয়ালের বাইরের অংশে সাদা রঙ করা হলেও দরজা-জানালায় নতুন করে আর রঙ করা হয়নি।

এই ভবনেই হয়েছিল জঙ্গি হামলা, তখন হলি আর্টিজান বেকারি ছিল বাড়িটিতে

আগে বাড়িটির পূর্বপাশে লেকের পাড় দিয়ে হাঁটার পথ থাকলেও হামলার পর সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তা এখনও খোলা হয়নি।

নিরাপত্তাকর্মী মো. হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বাড়িটি বসবাসের উপযোগী করা হয়েছে। মালিক সামিরা আহমেদ, তার স্বামী সাদাত মেহেদী ও এক সন্তান মাঝে মধ্যে থাকেন, আবার চলে যান। বাইরের মানুষ সেখানে খুব একটা আসে না।

বাড়ির পুরনো আরেক নিরাপত্তাকর্মী আকতার হোসেন বলেন, “এ বাড়িতে বসবাসের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র উঠানো হয়েছে। মালিক নিজেই সেখানে বসবাস করেন। তবে তিনি (সাদাত মেহেদী) ব্যবসায়িক কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে এখানে বেশি আসেন না। বনানীতে আরেকটি ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি।”

বাড়িতে গণমাধ্যমকর্মীসহ যে কারও প্রবেশে ‘মালিকের কড়াকড়ি’ রয়েছে বলে জানান পাহারাদার হোসেন।

জঙ্গি হামলা ও অভিযানের পর লণ্ডভণ্ড হলি আর্টিজান বেকারি (ফাইল ছবি)

সাদাত মেহেদী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ বাড়িটি এখন কোনও বেকারি না। এটিতে এখন আমরা নিজেরাই বসবাস করি। যেহেতু এ বাড়িতে বসবাস করি, তাই বাইরের মানুষদের সেখানে যেতে দিতে পারি না।”

তবে জঙ্গি হামলায় নিহতদের স্মরণ করতে ঘটনার দ্বিতীয় বার্ষিকীতে চার ঘণ্টার জন্য বাড়িটি সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে বলে জানান তিনি।

মেহেদী জানান, বাড়িটি এখন দুজন মালি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তকর্মীরা দেখাশুনা করে থাকে।

বাড়িটি নিয়ে নতুন করে আর কিছু করার পরিকল্পনা নেই বলে জানান সাদাত।

সামিরার স্বামী সাদাত ও তার এক বন্ধু মিলে ২০১৪ সালে এ বাড়িতে হলি আর্টিজান বেকারিটি গড়ে তুলেছিলেন।

১৯৭৯ সালে ‘আবাসিক ভবন কাম ক্লিনিক গড়ে তোলার জন্য’ ডা. সুরাইয়া জাবিনকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল বাড়িটি। ১৯৮২ সালে ওই প্লটের একপাশে গড়ে তোলা হয় লেকভিউ ক্লিনিক।

সুরাইয়ার মৃত্যুর পর প্লটের মালিক হন তার মেয়ে সামিরা ও সারা আহমেদ। তাদের দুটি প্লট এক করে উত্তর পাশের দোতলা ভবনটিতে গড়ে তোলা হয় হলি আর্টিজান বেকারি, আর দক্ষিণপাশে ‘লেকভিউ ক্লিনিক’।

ক্লিনিকটি সচল রয়েছে, সেখানে রোগী ও তাদের স্বজনদের যাতায়াতও চোখে পড়ে।

নতুন হলি আর্টিজান বেকারি এখন যেমন

জঙ্গি হামলার ছয় মাস পর গুলশান এভিনিউর র‌্যাংগস আর্কেডের দ্বিতীয় তলায় স্বল্প পরিসরে চালু করা হয় হলি আর্টিজান বেকারি।

সম্প্রতি সেখানে গিয়ে দেখা যায়, এক বছর আগের মতোই রয়েছে বেকারিটি।

নতুন ঠিকানায় হলি আর্টিজেন বেকারি চলছে এক বছর আগের মতোই

এখানে ২০ জন এক সঙ্গে বসার ব্যবস্থা করে চালুর পর থেকে বেকারিটি আগের মতোই চলছে বলে জানান আগের হলি আর্টিজানে হামলার পর বেঁচে যাওয়া এক কর্মচারী।

না প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “৮৯ নম্বর রোডে এই বেকারি চালুর শুরু থেকে কাজ করছি। নতুন করে চালু হওয়া হলি আর্টিজানে আমরা মোট আটজন কাজ করি। এর মধ্যে পাঁচজনই পুরনো স্টাফ।”

হামলার পর গুলশান এভিনিউর র‌্যাংগস আর্কেডের দ্বিতীয় তলায় স্বল্প পরিসরে চালু করা হয় হলি আর্টিজান বেকারি

হামলায় সময় অনেকের সঙ্গে জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পাওয়া এ কর্মচারীর কাছে সেই দিনের ঘটনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সেই ঘটনা আর নতুন করে মনে করতে চাই না। চোখের সামনে অনেকের প্রাণ নির্মমভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এসব ভুলে আমি সামনের দিকে এগুতে চাই।”

বেকারির মালিক সাদাত মেহেদী বলেন, “এত বড় একটি ঘটনায় বহু প্রাণ হারিয়েছি আমরা। সেই সাথে ব্যবসায়িকভাবে আমাকে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে। দুই বছর পরও সেই ক্ষতি পুষিয়ে উঠার চেষ্টা করছি।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক