দুর্নীতির দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ৫ বছর সাজা

বিদেশ থেকে জিয়া এতিমখানা ট্রাস্টের নামে আসা দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

প্রকাশ বিশ্বাস, আদালত প্রতিবেদকও তাবারুল হকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 8 Feb 2018, 08:40 AM
Updated : 10 Oct 2018, 01:04 PM

দেশজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা আর টান টান উত্তেজনার মধ্যে পুরান ঢাকার বকশীবাজারে জনাকীর্ণ আদালতে খালেদার উপস্থিতিতে ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আখতারুজ্জামান এই রায় ঘোষণা করেন।

দশ বছর আগে জরুরি অবস্থার মধ্যে দুদকের দায়ের করা এ মামলার ছয় আসামির মধ্যে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক সাংসদ কাজী সালিমুল হক কামাল, সাবেক মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের হয়েছে দশ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড।

সেই সঙ্গে তাদের প্রত্যেককে ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার করে জরিমানা করেছেন বিচারক।

সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়ার সাজার এই রায় এসেছে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায়, ক্ষমতায় থেকে অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে ‘অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের’ কারণে।

রায়ে বিচারক বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। বয়স ও সামাজিক মর্যাদার কথা বিবেচনা করে তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

দণ্ডবিধির ৪০৯: যে ব্যক্তি তাহার সরকারি কর্মচারীজনিত ক্ষমতার বা একজন ব্যাংকার, বণিক, আড়তদার, দালাল, অ্যাটর্নি বা প্রতিভূ হিসাবে তাহার ব্যবসায় ব্যাপদেশে যে কোনো প্রকারে কোনো সম্পত্তি বা কোনো সম্পত্তির উপর আধিপত্যের ভারপ্রাপ্ত হইয়া সম্পত্তি সম্পর্কে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ করেন, সেই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা দশ বৎসর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবে এবং তদুপরি অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবে।

দুর্নীতি মামলার রায়ের আগে আদালতের পথে খালেদা জিয়া।

খালেদা জিয়াকে নিয়ে কারাগারে প্রবেশ করছে গাড়ি।

আসামিদের মধ্যে তারেক মুদ্রা পাচারের এক মামলায় সাত বছরের সাজার রায় মাথায় নিয়ে গত দশ বছর ধরে পালিয়ে আছেন দেশের বাইরে। কামাল সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমানও পলাতক।

কারাগারে থাকা সালিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিনকে রায়ের জন্য সকালে আদালতে হাজির করা হয়েছিল। সাজা ঘোষণার পর আবারও তাদের কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

জামিনে থাকা খালেদা জিয়া দুপুরে আদালতে পৌঁছানোর পথে বিএনপির কয়েক হাজার নেতাকর্মী তার গাড়ি ঘিরে মিছিল শুরু করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধে। তিনি আদালতে পৌঁছানোর পর বিচারক রায় পড়া শুরু করেন।

জনাকীর্ণ আদালত কক্ষে বিচারকের ডায়াসের খুব কাছের একটি চেয়ারে বসেছিলেন খালেদা জিয়া। সেখানে বসে চোখ বুঁজে তিনি রায় শোনেন। আগের দিনও এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিলেন। 

পুরো রায় ৬৩২ পৃষ্ঠার হলেও ১১টি বিচার্য বিষয়ের উপর এই মামলায় সিদ্ধান্ত টানার কথা জানিয়ে সাজা ঘোষণা করতে বিচারক সময় নেন ১৫ মিনিটের মত। রায়ের পরপরই কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে খালেদা জিয়াকে নিয়ে যাওয়া হয় নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কারাগার ভবনে।

সাবেক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের পর খালেদা জিয়া হলেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সরকারপ্রধান, যাকে দুর্নীতির দায়ে কারাগারে যেতে হল।

বিএনপি নেতারাও মনে করছেন, তিন যুগের রাজনৈতিক জীবনে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে খালেদা জিয়া এবারই সবচেয়ে কঠিন অবস্থায় পড়েছেন।

১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা খালেদা এই রায়ের ফলে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের ‘অযোগ্য’ হলেন। তবে হাই কোর্টে আপিল করলে তার সাজা স্থগিত হয়ে যাবে, সেক্ষেত্রে আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায় পাওয়ার আগ পর্যন্ত ভোটে দাঁড়াতে আইনি বাধা থাকবে না।

তার দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তারেক রহমান; যদিও তিনিও দেশে নেই।

কাকরাইলে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ।

সংঘর্ষের সময় মোটর সাইকেলে আগুন দেয় বিএনপিকর্মীরা।

প্রতিক্রিয়া

রায়ের পর খালেদার আইনজীবীদের এজলাসে মুষড়ে পড়তে দেখা যায়। বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন খালেদা জিয়ার সাজাকে ‘ফরমায়েশি রায়’ আখ্যায়িত করেন। ‘ফলস’,  ‘সব ফলস’ বলে চেঁচিয়ে ওঠেন মাহবুবউদ্দিন খোকন।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, “আমরা সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন আশা করেছিলাম। কিন্তু তা পাইন। তবে এতদিনে রায় পেয়ে আমি আনন্দিত।”

অন্যদিকে রায় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও জয়নুল আবেদীন বলেন, তারা আপিল করবেন।

আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিক্রিয়া জানাতে এসে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ রায়কে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক’ হিসেবে বর্ণনা করে সারাদেশে শুক্র ও শনিবার বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

তিনি বলেন, “আমরা আমাদের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানাব, দেশনেত্রীর শেষ কথা ধৈর্য্য ধরতে হবে। গণতন্ত্রের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। সেই ত্যাগ স্বীকার করে জনগণের স্বার্থে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিতে হবে।”

এ রায় ঘিরে আগের দিন থেকেই নিরাপত্তার কড়াকড়িতে রাজধানীর ঢাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। রাজপথে গণ পরিবহন একেবারেই কম থাকায় বিপাকে পড়ে অফিসগামী যাত্রী ও এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। 

রায়ের আগে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিএনপিকর্মীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। রায়ের পর সিলেটে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হন। কোথাও কোথাও যুবলীগ ও ছাত্রলীগ কর্মীদের মিষ্টি বিতরণেরও খবর পাওয়া যায়।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে এবং আইনের ঊর্ধ্বে যে কেউ নয়- তা প্রমাণ হল এই রায়ে।

আর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, “সরকার নয়, রায় দিয়েছে আদালত। নেতাকর্মীদের বলব, এ নিয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই।”

# জরুরি অবস্থার সময় ২০০৭ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর খালেদা জিয়া এক বছর সাত দিন কারাগারে থাকার সময় দুদক এ মামলা দায়ের করে। পরে এ মামলায় খালেদা ও তারেককে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

# এ মামলার বিচার শেষ করতে মোট ২৬১ কার্যদিবস আদালত বসেছে। এর মধ্যে ২৩৬ কার্য দিবসে রাষ্ট্রপক্ষে ৩২ জন সাক্ষ্য দেন।

# আসামিরা আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেন ২৮ কার্য দিবস।

# বিচারের শেষ ভাগে দুই পক্ষ মোট ১৬ কার্যদিবস যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করে।

রায়ের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসন

আদালতের পথে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর ঘিরে মিছিল

মামলা বৃত্তান্ত

জিয়া এতিমখানা ট্রাস্টে এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আসা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় এই মামলা করে দুদক।

তদন্ত শেষে ২০০৯ সালের ৫ অগাস্ট আদালতে অভিযোগপত্র দেন দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক হারুনুর রশিদ।

অভিযোগে বলা হয়, এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাৎ করেছেন এ মামলার আসামিরা।

মামলা হওয়ার পাঁচ বছর পর ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ বাসুদেব রায় ছয় আসামির বিরুদ্ধে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৪০৯, ১০৯ এবং দুদক আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ গঠন করে খালেদা জিয়াসহ ছয় আসামির বিচার শুরু করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য ও জেরা শেষে খালেদা জিয়া এ মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে ছয় দিন বক্তব্য দেন। পরে ১৯ ডিসেম্বর জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় যুক্তি উপস্থাপন শুরু হলে প্রথম দিন দুদকের পক্ষে মোশাররফ হোসেন কাজল যুক্তি উপস্থাপন করেন।

এরপর দশ কার্যদিবসে খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এজে মোহাম্মাদ আলী, সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আব্দুর রেজাক খান, সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ও অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন।

উভয় পক্ষের বক্তব্য শেষে বিচারক এতিমখানা দুর্নীতি মামলার রায়ের জন্য ৮ ফেব্রুয়ারি দিন ঠিক করে দেন।

বকশীবাজারের বিশেষ আদালতের পথে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

দীর্ঘ এই বিচার প্রক্রিয়ায় মামলা থেকে রেহাই পেতে খালেদা জিয়া উচ্চ আদালতে গেছেন বার বার। তার অনাস্থার কারণে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তিনবার এ মামলার বিচারক বদল হয়। শুনানিতে হাজির না হওয়ায় তিনবার তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করে আদালত।

এসব কারণে দুদক ও আওয়ামী লীগ নেতারা খালেদা জিয়া ও তার আইনজীবীদের বিরুদ্ধে  মামলা বিলম্বিত করারও অভিযোগ করেছে বহুবার।

অন্যদিকে বিএনপির অভিযোগ, ক্ষমতাসীনরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে জরুরি অবস্থার সময় দায়ের করা এই ‘মিথ্যা’ মামলাকে রায় পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। তাদের মূল লক্ষ্য রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে খালেদা জিয়াকে ‘সরাতে তাকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার নীলনকশা’ বাস্তবায়ন করা।

রায়ের আগের দিন বুধবার গুলশানে নিজের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনেও খালেদা জিয়া ন্যায় বিচার পাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে নেতাকর্মীদের ‘শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক’ আন্দোলনের নির্দেশনা দেন।

তিনি বলেন, খালেদা বলেন, “দেশবাসীর প্রতি আমার আবেদন, আমাকে আপনাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা হলেও বিশ্বাস করবেন, আমি আপনাদের সঙ্গেই আছি।

“আপনারা গণতন্ত্রের জন্য, অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য, জনগণের সরকার কায়েমের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।”

[প্রতিবেদনটি সম্পাদনায় সহযোগিতা করেছেন মাসুম বিল্লাহ, তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন মঈনুল হক চৌধুরী, সাজিদুল হক, ওবায়দুর মাসুম, সালাহউদ্দিন ওয়াহেদ প্রীতম, ফয়সাল আতিক, নাফিয়া রহমান ও রিফাত রহমান।]

আরও পড়ুন

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক