সহকর্মীরাই চাচ্ছেন না বিচারপতি সিনহাকে: সুপ্রিম কোর্ট

দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার ‘গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা’ না পেয়ে তার সঙ্গে এজলাসে বসতে সহকর্মীরা নারাজ বলে সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 14 Oct 2017, 10:36 AM
Updated : 14 Oct 2017, 10:36 AM

ছুটি নিয়ে বিচারপতি সিনহা একদিন আগে বিদেশে যাওয়ার আগে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা প্রত্যাখ্যান করে শনিবার সুপ্রিম কোর্টের বিরল এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়।

গত কিছুদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা বিচারপতি সিনহা বিদেশ যাওয়ার আগে বলেছিলেন, সরকারের আচরণে বিব্রত হয়ে অসুস্থ না হয়েও ছুটি নিয়েছেন তিনি।

প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে থাকা বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিঞাকে উদ্ধৃত করে আইনমন্ত্রীর এক বক্তব্য ধরে বিচার বিভাগের কাজে সরকারের হস্তক্ষেপের অভিযোগও তোলেন তিনি।

এই প্রেক্ষাপটে শনিবার দুপুরে বিচারপতি ওয়াহহাব মিঞা আপিল বিভাগ ও হাই কোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের নিয়ে বৈঠক করেন।

তাদের বৈঠকের পরই সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলামের স্বাক্ষরে বিবৃতিটি আসে।

এতে বলা হয়, প্রধান বিচারপতির পদটির মর্যাদা সুমুন্নত রাখতে ইতোপূর্বে সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়ে কথা না বললেও বিদেশ যাওয়ার আগে বিচারপতি সিনহার লিখিত ‘বিভ্রান্তিমূলক বিবৃতি’ দেখে এই বক্তব্য দিল।

গত জুলাইয়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধন বাতিলের রায় নিয়ে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনার মুখে থাকা বিচারপতি সিনহাকে ‘ছুটি নিতে বাধ্য করে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে’ বলে অভিযোগ উঠেছে।

সুপ্রিম কোর্টের বিবৃতিতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ গত ৩০ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের বিচারপতিদের ডেকে নিয়ে বিচারপতি সিনহার বিরুদ্ধে ‘১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ’ তুলে ধরেন।

বঙ্গভবনের ওই বৈঠক থেকে ফিরে পরদিন আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতি বিচারপতি ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার, বিচারপতি ইমান আলী নিজেরা বৈঠক করে বিষয়টি নিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেন।

এরপর তারা প্রধান বিচারপতির হেয়ার রোডের বাড়িতে গিয়ে এই বিষয়ে কথা বললে বিচারপতি সিনহা ‘দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম ও নৈতিক স্খলনের’ ওই অভিযোগগুলোর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে বিবৃতিতে বলা হয়।

“তার কাছ থেকে কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা ও সুদত্তর না পেয়ে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতি তাকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, এই অবস্থায় অভিযোগসমূহের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তার সঙ্গে একই বেঞ্চে বসে তাদের পক্ষে বিচারকাজ পরিচালনা সম্ভবপর হবে না।”

তখন প্রধান বিচারপতি পদত্যাগের ইচ্ছার কথা তুলে ধরে পরদিন সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে সহকর্মীদের জানান বলে বিবৃতিতে বলা হয়। কিন্তু পরদিন ২ অগাস্ট সহকর্মীদের ‘না জানিয়েই’ রাষ্ট্রপতির কাছে এক মাসের ছুটিতে যাওয়ার কথা জানান।

বিবৃতি

ছুটিভোগরত মাননীয় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা মহোদয় গত ১৩/১০/২০১৭ইং তারিখে বিদেশ গমনের প্রাক্কালে একটি লিখিত বিবৃতি উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের নিকট হস্তান্তর করেন। উক্ত লিখিত বিবৃতিটি সুপ্রীম কোর্টের দৃষ্টি গোচর হইয়াছে। উক্ত লিখিত বিবৃতি বিভ্রান্তিমূলক। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সুপ্রীম কোর্টের বক্তব্য নিম্নরূপ:

 

গত ৩০-০৯-২০১৭ইং তারিখে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মাননীয় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা মহোদয় ব্যতীত আপীল বিভাগের অন্য ৫ জন বিচারপতি মহোদয়গণকে বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানান। মাননীয় বিচারপতি মো. ইমান আলী মহোদয় দেশের বাহিরে থাকায় উক্ত আমন্ত্রণে তিনি উপস্থিত থাকিতে পারেন আই। অপর চারজন, অর্থাৎ মাননীয় বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, মাননীয় বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, মাননীয় বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী এবং মাননীয় বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার মহোদয়গণ মহামান্য রাষ্ট্রপতির সহিত সাক্ষাৎ করেন। দীর্ঘ আলোচনার এক পর্যায়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা মহোদয়ের বিরুদ্ধে ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সম্বলিত দালিলিক তথ্যাদি হস্তান্তর করেন। তন্মধ্যে বিদেশে অর্থ পাচার, আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, নৈতিক স্খলনসহ আরো সুনির্দিষ্ট গুরুতর অভিযোগ রহিয়াছে। ইতোমধ্যে মাননীয় বিচারপতি মো. ইমান আলী মহোদয় ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের পর ১ অক্টোবর, ২০১৭ ইং তারিখে আপীল বিভাগের উল্লিখিত ৫ জন বিচারপতি মহোদয় এক বৈঠকে মিলিত হইয়া উক্ত ১১টি অভিযোগ (সংযুক্তিসহ) বিষদভাবে পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ঐ সকল গুরুতর অভিযোগসমূহ মাননীয় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা মহোদয়কে অবহতি করা হইবে। তিনি যদি ঐ সকল অভিযোগের ব্যাপারে কোন সন্তোষজনক জবাব বা সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হন তাহা হইলে তাহার সঙ্গে বিচারালয়ে বসিয়া বিচারকার্য পরিচালনা করা সম্ভব হইবে না। এই সিদ্ধান্তের পর ঐ দিনই বেলা ১১.৩০ ঘটিকায় মাননীয় প্রধান বিচারপতি এস কে সিন্হা মহোদয়ের অনুমতি নিয়ে উল্লিখিত ৫ জন বিচারপতি মাননীয় প্রধান বিচারপতি মহোদয়ের ১৯, হেযার রোড, রমনা, ঢাকা বাসভবনে তাহার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অভিযোগসমূহ নিয়ে বিষদভাবে আলোচনা করেন। কিন্তু দীর্ঘ আলোচনার পরেও তাহার নিকট হইতে কোন প্রকার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা বা সদুত্তর না পাইয়া আপীল বিভাগের উল্লিখিত মাননীয় ৫ জন বিচারপতি তাহাকে সুস্পষ্টভাবে জানাইয়া দেন যে, ‘এমতাবস্থায়, উক্ত অভিযোগ সমূহের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তাঁহার সঙ্গে একই বেঞ্চে বসে তাদের পক্ষে বিচারকার্য পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। এ পর্যায়ে মাননীয় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা সুস্পষ্টভাবে বলেন যে, সেক্ষেত্রে তিনি পদত্যাগ করবেন। তবে এ ব্যাপারে পরের দিন অর্থাৎ ০২/০৯/২০১৭ ইং তারিখে তিনি তাহার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন। অতপর ০২/০৯/২০১৭ ইং তারিখে তিনি উল্লিখিত মাননীয় বিচারপতিগণকে কোন কিছু অবহিত না করেই মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিকট ১ (এক) মাসের ছুচির দরখাস্ত প্রদান করলে মহামান্য রাষ্ট্রপতি তা অনুমোদন করেন। তৎপ্রেক্ষিতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির অনুপস্থিতিতে আপীল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি, মাননীয় বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির অনুপস্থিতিতে প্রধান বিচারপতির অনুরূপ কার্যভার পালনের দায়িত্ব প্রদান করেন।

প্রধান বিচারপতির পদটি একটি প্রতিষ্ঠান। সেই পদের ও বিচার বিভাগের মর্যাদা সমুন্নত রাখার স্বার্থে ইতঃপূর্বে সুপ্রীম কোর্টের তরফ হতে কোনো প্রকার বক্তব্য বা বিবৃতি প্রদান করা হয় নাই। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে নির্দেশক্রমে উপরি-উক্ত বিবৃতি প্রদান করা হইল।

সুপ্রিম কোর্টের এই বক্তব্যের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, সত্যতা না থাকলে এই ধরনের অভিযোগ প্রধান বিচারপতির মতো কোনো পদধারীর বিরুদ্ধে ওঠার কথা নয়।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর সংসদে প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করতে গিয়ে তার নানা ‘দুর্নীতির’ কথা বলেছিলেন দুই মন্ত্রীসহ কয়েকজন সংসদ সদস্য।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বিচারপতি সিনহার ভাইয়ের নামে রাজউকের প্লট নেওয়ায় অনিয়মের কথা সংসদে বলেছিলেন। যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করার কথাও বলেছিলেন তিনি।

সংসদ সদস্য মহীউদ্দীন খান আলমগীরের মালিকানাধীন ব্যাংকে থেকে বেনামে বিচারপতি সিনহার অর্থ জমা রাখার কথা বলেছিলেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের ‘দুর্নীতির’ তদন্ত আটকাতে প্রধান বিচারপতি সিনহার পদক্ষেপের সমালোচনা করেন।

আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি আব্দুল মতিন খসরু বলেছেন, বিচারপতি সিনহার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করা হবে।

তবে বিএনপি মনে করে, প্রধান বিচারপতি সব সত্যই বলে গেছেন।

 
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক