হলি আর্টিজানে হামলার বছর পেরুলেও রেশ কাটেনি গুলশানে

গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার এক বছর পরও কূটনীতিক পাড়া হিসেবে পরিচিত ঢাকার অভিজাত এলাকাটি নিয়ে তৈরি হওয়া আতঙ্কের রেশ কাটেনি।

তাবারুল হক নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 June 2017, 05:31 AM
Updated : 30 June 2017, 07:12 AM

আতঙ্কের সঙ্গে নিরাপত্তার কড়াকড়িতে ভাড়াটিয়া সঙ্কটে ভুগছে ওই এলাকার বহু ভবন। নতুন ভাড়াটিয়ার অভাবে ভাড়াও অর্ধেক নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন বেশ কয়েকটি বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে একদল জঙ্গি গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিজান বেকারিতে ঢুকে ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনকে হত‌্যা করে। তাদের ঠেকাতে গিয়ে মারা যান দুই পুলিশ কর্মকর্তা। পরদিন সকালে কমান্ডো অভিযান চালিয়ে ওই রেস্তোরাঁর নিয়ন্ত্রণ নেয় নিরাপত্তা বাহিনী।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার হয়ে ঢাকায় কর্মরত বিদেশিদের একটা বড় অংশ যে গুলশানে থাকেন, সেখানে হামলার পর আতঙ্কে তাদের অনেকেই চলে যাওয়ার পর নতুন করে বিদেশিদের আসা কমে যাওয়ায় দামি এসব অ্যাপার্টমেন্ট খালি পড়ে থাকছে।

বিদায়ী অর্থ বছরের এডিপি বাস্তবায়ন না হওয়ার জন্য গুলশান হামলাকেই দায়ী করে আসছেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলছেন, অনেক বিদেশি চলে যাওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো পিছিয়ে যায়।

আবার হামলার পর থেকে গুলশান এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তার কারণে মানুষের ভোগান্তিও বেড়ে যায়। যে কারণে ওই এলাকায় অনেকেই বাসা ভাড়া নিতে যাচ্ছেন না।

গুলশাল-২ এর ৭৯ নম্বর সড়কের পূর্ব দিকের শেষ মাথার ৫ নম্বর বাড়িটিতে ছিল হলি আর্টিজান বেকারি নামে সেই রেস্তোরাঁটি।

এই বাড়িতে প্রবেশের আগে সড়কের দুই পাশে বেশ কিছু বাড়ি রয়েছে। হলি আর্টিজানের একেবারে লাগোয়া পশ্চিম পাশের ২১ নম্বর হোল্ডিংয়ের ভবনটির নাম ‘সুবাস্তু সেতারা’ ।

এই ভবনের ১৯টি অ্যাপার্টমেন্টের মধ্যে এখন মাত্র ছয়টিতে ভাড়াটিয়া রয়েছে বলে জানান বাড়িটির নিরাপত্তাকর্মী আবদুল কাইয়ুম।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ভাড়াটিয়াদের মধ্যে তিনটি অ্যাপার্টমেন্টে পাকিস্তান, সৌদি আবর ও কোরিয়ার বিদেশিরা আছেন। বাকিরা বাংলাদেশেরই।”

হলি আর্টিজান হামলার আগে সবগুলো অ্যাপার্টমেন্টে ভাড়াটিয়া ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, জঙ্গি হামলার পর যে আতঙ্ক শুরু হয়েছিল, তা মানুষের মন থেকে এখনও যায়নি।

“হলি আর্টিজানের ঘটনার কারণে এখন আগের মতো মানুষ বাড়ি ভাড়া নিতে আসছে না। এমনকি এই ঘটনার পর বহু ভাড়াটিয়া এই এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।”

বাড়ি ভাড়াও অর্ধেক কমে যাওয়ার কথা জানান কাইয়ুম।

“আগে প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্টের মাসিক ভাড়া ছিল দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা। বর্তমানে এক থেকে দেড় লাখ টাকায়ও নতুন ভাড়াটিয়া পাওয়া যাচ্ছে না।”

সেতারা নামে ভবনটির একেবারে সামনে সড়কের উল্টাপাশের ২০ নম্বর বাড়িটির নাম ‘ফ্লোরালিয়া’। এটি হলি আর্টিজানের প্রধান ফটক লাগোয়া।

এই বাড়ি দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের একজন শফিউল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আগে ওই এলাকায় বিভিন্ন বাড়ির‘ফুল ফার্নিশড’ অ্যাপার্টমেন্টগুলোর ভাড়া ছিল দুই-আড়াই লাখ টাকা।কিন্তু হামলার পর ভাড়াটিয়া পাওয়া যাচ্ছে না, ভাড়া কমে গেছে।

সেই হলি আর্টিজান এখন । মালিক নিজেই সেখানে থাকার পরিকল্পনা করেছেন।

ভাড়াটিয়ার অভাবে তাদের ভবনের দুটি অ্যাপার্টমেন্ট এখনও খালি পড়ে আছে বলে জানান তিনি।

শফিউল বলেন, “হলি আর্টিজানে ভয়াবহ হামলার পর বাংলাদেশে বিদেশিদেরই আসা কমে গেছে, যে কারণে গুলশান এলাকায় আগের মতো বাড়ি ভাড়ার চাহিদা নেই।”

পাশের ১৯ নম্বর বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী শীতল চন্দ্র বিশ্বাস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হলি আর্টিজানে হামলার পর চাকরি নিয়ে আমি এই ভবনে এসেছি। এই এলাকায় মানুষের আনাগোণা অনেক কম মনে হচ্ছে।”

হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব সম্পর্কে ওই এলাকার একাধিক ভাড়াটিয়ার মন্তব্য চাইলেও কেউ কথা বলতে রাজি হননি।

তবে হামলার পর কিছু দিন আতঙ্ক ও ভয় বিরাজ করলেও এখন সেই ভয় কেটে গেছে ১৮ নম্বর বাড়ি ‘কেরোলিনার’ স্টাফ ফরহাদ হোসেন তালুকদারের।

তিনি বলেন, “হলি আর্টিজানের জঙ্গি হামলার পর পুরো এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ঘটনার পর প্রথম চার মাস সড়কের মুখে পুলিশের ব্যারিকেড ছিল।”

ব্যারিকেড তুলে নেওয়া হলেও এই এলাকায় পুলিশসহ অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর দিনরাত নিয়মিত টহল রয়েছে বলে ফরহাদ জানান।

হলি আর্টিজান বেকারি যে বাড়িতে ছিল, তার উল্টোপাশে একই মালিকের আরেকটি প্রতিষ্ঠান ‘লেকভিউ ক্লিনিক’। জঙ্গি হামলার সময় বুলেটে এই হাসপাতালটির একটি কাচ ভেঙেছিল।

ক্লিনিকটির চিকিৎসক মাহবুব উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঘটনার পর পুরো এলাকায় নিরাপত্তাসহ নিয়মিত তল্লাশিরর কারণে ক্লিনিকে রোগী আসা কমে গেছে।”

তবে গুলশান পুলিশের উপকমিশনার মোস্তাক আহম্মেদ খান বলছেন ভিন্ন কথা।

হলি আর্টিজানে হামলার পর ৭৯ নম্বর সড়কের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হতে সময় লেগেছে বেশ কিছুদিন।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আতঙ্কের কারণে ভাড়াটিয়া না পাওয়ার ঘটনা ঠিক নয়।

“হলি অটিজেনে হামলার পর নিরাপত্তার বিষয়টিতে কোনভাবেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। এ কারণে দেশে প্রচুর বিদেশি আসছে। পাশপাশি গুলশান বারিধারা এলাকার হোটেল-গেস্ট হাউজগুলোতে বিদেশিদের ভিড় লেগেই আছে। অধিকাংশ সময় সিট পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে।”

“কোনো বাড়ির মালিক যদি বলে থাকেন নিরাপত্তার কারণে কেউ বাসা ভাড়া নিচ্ছে না বা ভাড়া কমে গেছে, তা হলে তিনি ঠিক বলেননি, এটা তার ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা,” বলেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে গুলশান সোসাইটির কার্য-নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সম্পাদক এম এ হাশেম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, হামলার পর ভয়-ভীতি সৃষ্টি হলেও তা কাটিয়ে ওঠা গেছে।

“এলাকার নিরাপত্তাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে বেশ কিছু নিয়ম-কানুন করা হয়। বর্তমানে মানুষ অনেক সতর্ক হয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও অনেক ভালো। এখন ভয়ের কারণ নেই।”

গুলশান এলাকায় বাসা ভাড়া কমে যাওয়াটা সারাদেশের মতো একটা প্রভাব বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “হলি আর্টিজানে হামলার পর হয়ত এর পাশের অনেক বিদেশি চলে যেতে পারে, কিন্তু বর্তমানে পুরো এলাকায় নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি নেই। বাইরে থেকে যা মনে করা হয়, আসলে গুলশান এলাকার ভেতরের অবস্থা তা না।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক