ভাস্কর্য অপসারণ: বিএনপি-আ. লীগ মিললেও ক্ষোভ চারদিকে

হেফাজতে ইসলামের দাবির মুখে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য অপসারণের বিষয়ে রাজনীতিতে বৈরী আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একই সুরে কথা বললেও এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন রাজনীতি, সংস্কৃতিসহ প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।

মইনুল হক চৌধুরীবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 26 May 2017, 07:59 PM
Updated : 27 May 2017, 05:59 PM

এর মধ্য দিয়ে মৌলবাদী শক্তিকে আরও প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে এবং তারা এখন রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।

ওই ভাস্কর্যটি সরিয়ে নিতে হেফাজতের দাবির প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সায় দেওয়ার পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জোট শরিক জাসদ যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল, তা থেকে সরে এসেছে দলটি। তবে সরকারের আরেক শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে একে হেফাজতসহ মৌলবাদীদের কাছে ‘নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ’ বলছে।

প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদসহ বামপন্থি দলগুলো। বিক্ষোভ করেছেন গণজাগরণ মঞ্চ এবং ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র মৈত্রীসহ বিভিন্ন ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা।

সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য সরিয়ে নেওয়ার প্রতিবাদে শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিক্ষোভ।

ভাস্কর্য অপসারণের নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় লেখক, অধ্যাপক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও অধিকার কর্মীরা। অবিলম্বে ন্যায়বিচারের প্রতীক ভাস্কর্যটি প্রতিস্থাপনের জন্য সরকার ও সুপ্রিম কোর্টের কাছে দাবি জানিয়েছেন তারা।

সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপিত রোমান যুগের ন্যায়বিচারের প্রতীক লেডি জাস্টিসের আদলে গড়া ভাস্কর্যটি সরানো হয়বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ।

কয়েক মাস আগে সুপ্রিম কোর্টের উদ্যোগে ভাস্কর্যটি স্থাপনের পর তা অপসারণের দাবিতে আন্দোলনে নামে হেফাজতে ইসলাম। গত ১১ এপ্রিল গণভবনে হেফাজত আমির শাহ আহমদ শফীসহ একদল ওলামার সঙ্গে বৈঠকে তাদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে ভাস্কর্য অপসারণে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সুপ্রিম কোর্টের প্রবেশ পথে ফোয়ারার সামনে এখন আর নেই ভাস্কর্যটি। ইসলামী সংগঠনগুলোর দাবির মুখে বৃহস্পতিবার রাতে তা সরিয়ে নেওয়া হয়।

সে সময় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার সমালোচনা করে জাসদ নেতারা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের আদর্শচ্যুতির শঙ্কা প্রকাশ করে।

তবে শুক্রবার জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের প্রাঙ্গণটি প্রধান বিচারপতির এখতিয়ারভুক্ত এলাকা। ভাস্কর্য অপসারণ নিয়ে সরকারের করার কিছুই নেই।”

এই বক্তব্যই দিয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ।

কাদের বলেছেন, “গ্রিক দেবীর মূর্তি অপসারণের ক্ষমতা সরকারের কোনো এখতিয়ারে নেই। মূর্তি সরানো সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত।”

মধ্যরাতে ভাস্কর্য অপসারণে কাজে শ্রমিকরা

প্রায় প্রতিটি বিষয়ে ভিন্নমত জানানো বিএনপি নেতা মওদুদ বলেন, “আমি আপনাদের জানাতে চাই, আমাদের মাননীয় প্রধান বিচারপতি তিনি এই ভাস্কর্য অপসারণের সিদ্ধান্ত নিজে নিয়েছেন। তিনি সরকারের নির্দেশে এটা করেন নাই।”

এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি এক বিবৃতিতে বলেছে, “ভাস্কর্য অপসারণ হেফাজতসহ মৌলবাদীদের কাছে নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিতর্কটি ভাস্কর্য বনাম মূর্তিতে রূপান্তর করা হয়েছে।

“আসলে এর সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। এই পশ্চাদপসারণ জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।”

ভাস্কর্য অপসারণের কাজ চলার মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের সামনে বিক্ষোভ করেন গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা।

সিপিবি ও বাসদের এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “হেফাজতসহ অন্যান্য সাম্প্রদায়িক শক্তির তথাকথিত আন্দোলনের হুমকিতে ভীত হয়ে সরকার হাই কোর্টের সামনে স্থাপিত ভাস্কার্য অপসারণ করেছে, যা বর্তমান সরকারের সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে নতি স্বীকারের নিদর্শন।”

বামপন্থি দল দুটি বলছে, “ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য সমর্থনের আশায় বর্তমান সরকার সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে আপসের যে পথে গেছে তা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভয়ানক বিপর্যয় ডেকে আনছে।”

সরকারের সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে ‘নতি স্বীকারের’ রাজনীতি রুখে দিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা।

ভাস্কর্য অপসারণের প্রতিবাদে প্রেস ক্লাবের সামনে এক সমাবেশে ‘ভোটের স্বার্থে মৌলবাদ তোষণনীতির’ ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) নেতারা।

এক বিবৃতিতে বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেছেন, “হেফাজতে ইসলাম, আওয়ামী ওলামা লীগসহ ধর্মান্ধ ধর্মব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ফিকিরবাজ সংগঠন ও সংস্থার দাবি ও চাপে শাসক দল ভোটের সমীকরণে প্রতারণামূলক কৌশলে এ কাজ করিয়েছে।”

ভাস্কর্য সরিয়ে নেওয়ার পর প্রতিবাদী মিছিল রুখতে পুলিশের ব্যারিকেড

ভাস্কর্য অপসারণে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, সঙ্গীতজ্ঞ সনজীদা খাতুন, প্রাবন্ধিক মফিদুল হক, সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম, নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ ও শহীদজায়া পান্না কায়সার।

যুক্ত বিবৃতিতে তারা বলেন, “আমরা ক্ষুব্ধ এবং প্রগতিবিরোধী এহেন হীনকর্মে গভীর ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করছি। এই অপসারণ কর্মের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল কর্তৃক গঠিত সরকার কার্যত ধর্মান্ধ মৌলবাদী অপশক্তির কাছে নতি স্বীকার করেছে।”

ভাস্কর্য অপসারণের দাবিকারী হেফাজতে ইসলামকে ইঙ্গিত করে বিবৃতিতে বলা হয়, “এই সাম্প্রদায়িক অপশক্তি মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের প্রতীক ‘অপরাজেয় বাংলা’ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে ব্যর্থ আক্রমণ করেছিল। এরাই ‘দুরন্ত শিশু’ ভাস্কর্য রাতের আঁধারে নিশ্চিহ্ন করেছিল।

“এরাই বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে একটি ধর্মান্ধ মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিণত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত।”

ভাস্কর্য অপসারণে ক্ষোভ প্রকাশ করে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, হেফাজত এখন রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করবে এবং তাদের চাপ আরও বাড়তে থাকবে।

ভাস্কর্য সরিয়ে নেওয়ার প্রতিবাদকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশের কাঁদুনে গ্যাস

এ ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে সংস্কৃতিকর্মী কামাল লোহানী বলেছেন, দেশ কোন পথে এগোচ্ছে সে বিষয়ে এখন ভাবার সময় হয়েছে।

এই ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপর আঘাত করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবিতে সোচ্চার শাহরিয়ার কবির।

ভাস্কর্যটি যে প্রক্রিয়ায় সরানো হয়েছে তার সমালোচনা করে চিত্রশিল্পী নিসার হোসেন বলেছেন, ভাস্কর্য বাংলাদেশের কোথায় থাকবে, কোথায় থাকবে না, তা যারা এদেশ চায়নি তাদের কথা মতো হবে না।

বিক্ষোভ থেকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা লিটন নন্দীকে- ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে সিটিজেনস রাইটস মুভমেন্ট নামে একটি সংগঠন বিবৃতিতে বলেছে, “ভাস্কর্য অপসারণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সরকারের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে।”

মধ্যরাতে ওই ভাস্কর্য অপসারণের কাজ চলার মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের ফটকের সামনে বিক্ষোভ করেন গণজাগরণ মঞ্চ ও কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

শুক্রবার দিনভরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিক্ষোভসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক