ভাস্কর্য সরানোর আগে মতামত নেন প্রধান বিচারপতি

হেফাজতে ইসলামের দাবিতে সরকার প্রধানও সায় দেওয়ার পর আইনজীবীদের মতামত নিয়েই সুপ্রিম কোর্টের মূল প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য সরানোর সিদ্ধান্ত নেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 26 May 2017, 06:38 AM
Updated : 26 May 2017, 11:24 AM

বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ভাস্কর্যটি অপসারণের কাজ শুরুর আগে দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক ও বর্তমান সভাপতি ও সম্পাদকদের ডেকেছিলেন প্রধান বিচারপতি।

পরে মধ্যরাতে সুপ্রিম কোর্টের ঢোকার পথে লিলি ফোয়ারায় স্থাপিত হাতে তলোয়ার ও দাঁড়িপাল্লা ধরা নারীর ভাস্কর্যটি অপসারণের কাজ শুরু হয়।

ভোরের আগে কাজটি শেষ হওয়া পর্যন্ত সেখানে তদারকিতে ছিলেন ভাস্কর্যটির শিল্পী মৃণাল হক। তিনি শুধু বলেছেন, ‘চাপের মুখে’ ভাস্কর্যটি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বৈঠকে থাকা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, আইনজীবী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে ভাস্কর্যটি সরানোর পক্ষে মত আসে।

দুপুরে আদালতের মধ্যাহ্ন বিরতির সময় আইনজীবী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধান বিচারপতি।

বৈঠকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির বর্তমান সভাপতি জয়নাল আবেদীন ছাড়া সাবেক সভাপতিদের মধ্যে ছিলেন কামাল হোসেন, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, রোকনউদ্দিন মাহমুদ ও খন্দকার মাহবুব হোসেন, বর্তমান সম্পাদক মাহবুবউদ্দিন খোকন, সাবেক সম্পাদক এম আমিন উদ্দিন, মাহবুব আলী ও স ম রেজাউল করিম।

বৈঠকে উপস্থিত সাবেক এক সাধারণ সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে চিফ জাস্টিস আমাদের ডেকেছিলেন। ভাস্কর্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই যে একটা ভাস্কর্য.. এটা নিয়ে কথা উঠেছে; কী করা যায়?’

“প্রধান বিচারপতির এই কথার পর কেউ কোনো কথা বলছিল না। প্রথম নীরবতা ভাঙেন আমিনউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘স্যার এটা নিয়ে কথা উঠেছে, যদি হাই কোর্টের সামনে গণ্ডগোল হয়, তাহলে কোর্টের ইমেজ নষ্ট হবে, এটা সরিয়ে দেন’।”

আমিউদ্দিনের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে মাহবুব আলীও ‘আপাতত ঝামেলা’ এড়ানোর পরামর্শ দেন বলে সাবেক ওই সাধারণ সম্পাদক জানান।

আমিন উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যেহেতু এটা নিয়ে (ভাস্কর্য) নিয়ে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তাই আমরা একটা অনুরোধ উনাদের (প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন) করেছিলাম, ভাস্কর্যটা অপসারণ নয়, স্থানান্তর করার জন্য। এটা কিন্তু অপসারণ করা হয়নি, স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে।”

ভাস্কর্যটা কোথায় স্থানান্তর হবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা এখন উনারা ঠিক করবেন।”

ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

তবে রাতেই ভাস্কর্যটি সরানো হবে, এমনটি জানতে না বলে জানান আমিন উদ্দিন।

তিনি বলেন, “আমরা জানতাম যে এটা রাতেই করা হবে। দিনে কোর্ট খোলা থাকলে গাড়ি-টাড়ি থাকে, ঝামেলা। এ জন্যেই হয়ত রাতেই সরানো হয়েছে।”

ঢোকার পথ থেকে সরিয়ে ভাস্কর্যটি রাথা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের ভেতরে এনেক্স ভবনের কাছে। এটি সেখানে স্থাপন করা হবে বলে ধারণা করছেন এর শিল্পী মৃণাল হক।

সাবেক আইনমন্ত্রী বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদও শুক্রবার এক সমাবেশে বলেন, প্রধান বিচারপতি নিজের সিদ্ধান্তেই ভাস্কর্য অপসারণের এই পদক্ষেপ নিয়েছেন।

“আমি আপনাদের জানাতে চাই, আমাদের মাননীয় প্রধান বিচারপতি তিনি এই ভাস্কর্য অপসারণের সিদ্ধান্ত নিজে নিয়েছেন। তিনি সরকারের নির্দেশে এটা করেন নাই।”

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মওদুদ তার দলের নেতা ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউদ্দিন খোবকনকে উদ্ধৃত করে একথা বলেন।

“আমাদের সেক্রেটারি খোকন এখন বললো, সমস্ত সিনিয়র আইনজীবী, সকলের সঙ্গে তিনি (প্রধান বিচারপতি) পরামর্শ করেছিলেন। কী করা যায়? তারা পরামর্শ দিয়েছিলেন, আপনি এই ভাস্কর্যটি সরিয়ে নিলে ভালো হয়।”

এই প্রসঙ্গে মওদুদ আরও বলেন, “সেটা নিয়ে কত রকমের কথা-বার্তা হয়েছে, কত রকমের বির্তক তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীসহ সকলেই এমন একটা ভাব যেন এই জিনিসটা, এই ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করার উদ্যোগ তারা নেবেন।”

রোমান যুগের ন্যায বিচারের প্রতীক ‘লেডি জাস্টিস’র আদলে এই ভাস্কর্য বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হলে গত বছর হেফাজতসহ কয়েকটি ইসলামী সংগঠন তার বিরোধিতায় নামে।

এরপর গত ১১ এপ্রিল হেফাজতের আমির শাহ আহমদ শফী নেতৃত্বাধীন এক দল ওলামার সঙ্গে গণভবনে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাস্কর্যটি সরাতে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

ভাস্কর্য অপসারণের পক্ষে যুক্তি হিসেবে এর নান্দনিক ‘ত্রুটির’ পাশাপাশি জাতীয় ঈদগাহের কাছে অবস্থানের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তবে বিভিন্ন বাম দল ও সংগঠন আওয়ামী লীগ সরকারের এই অবস্থানের সমালোচনা করে। তারা বলছে, এর মধ্য দিয়ে সরকার মৌলবাদীদের আশকারা দিচ্ছে।

[ প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন মেহেদী হাসান পিয়াস]

এই সংক্রান্ত আরও খবর

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক