হলি অর্টিজানে নিহত অবিন্তার ‘স্বপ্ন’ বাস্তবায়নে ফাউন্ডেশন

গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় নিহত অবিন্তা কবিরের ‘স্বপ্ন’ বাস্তবে রূপ দিতে ‘অবিন্তা কবীর ফাউন্ডেশন’ নামের একটি সেবামূলক সংগঠন করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 4 March 2017, 12:21 PM
Updated : 4 March 2017, 05:39 PM

শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে এক অনুষ্ঠানে এই ফাউন্ডেশনে উদ্বোধন করা হয়। নিহতের পরিবারের সদস্য, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন সেখানে।

অনুষ্ঠানে ‘অ্যান ইনটিমেট পোট্রেট অব অবিন্তা কবির’ শিরোনামের একটি বই ও একটি ওয়েবসাইটও উন্মোচন করা হয়। অবিন্তার ছবি, হাতে লেখা কিছু নোট, মাকে লেখা চিঠি ও তাকে নিয়ে নির্মিত ভিডিও চিত্রও প্রদর্শিত হয়।

১৯ বছর বয়সী অবিন্তা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইমোরি অক্সফোর্ড কলেজের শিক্ষার্থী। ২০১৯ সালে তার গ্র্যাজুয়েট হওয়ার কথা ছিল। পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাবেন বলে গত ২৭ জুন দেশে আসেন তিনি। ইফতারের পরপরই তিনি তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আরেক বন্ধু ও এই ঘটনায় নিহত ফারাজ আইয়াজ হোসেনের সঙ্গে দেখা করতে হলি আর্টিজানে যান।

অবিন্তার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে দেখা যায় যে সদা হাস্যোজ্জ্ব্বল তরুণীটি ছিলেন স্টুডেন্ট অ্যাক্টিভিটিজ কমিটির সঙ্গে জড়িত। তবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও অবিন্তা তার প্রোফাইলে যুক্তরাষ্ট্র না লিখে তিনি প্রিয় দেশ বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ থেকে তার দেশের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ পায়।

অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেন, “অবিন্তা কবির ইউনাইটেড স্টেটসের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিদেশে থেকেও তিনি দেশে ফিরে এদেশের মানুষের পাশে থাকতে চেয়েছিলেন, দেশের সুবিধা বঞ্চিত মানুষের মানুষের পাশে থাকতে চেয়েছিলেন। এতে বোঝা যায় অবিন্তা পৃথিবীকে বিশেষ করে বাংলাদেশকে মানুষের বসবাসযোগ্য করতে কাজ করতে চেয়েছিলেন।

“তার সঙ্গে কখনও দেখা হয়নি। তার মা, পরিবারের সদস্য ও বন্ধুরা জানিয়েছে, অবিন্তা সব সময় কারো প্রতি ঘৃণা না দেখিয়ে বরং উন্নয়ন ও অগ্রগতির দিকে মনোযোগ দিতে বলতেন।”

অনুষ্ঠানে অবিন্তা কবিরের মা রুবা আহমেদ বলেন, “অবিন্তা, ফারাজ ও তারিশী ছিল ভালো বন্ধু। তাদের জীবনে অনেক স্বপ্ন ছিল। জীবনের সংকটময় মুহূর্তে তারা পাশাপাশি ছিল। তারা প্রত্যেকে বিশেষ ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ ছিল।”

মেয়েকে উদ্দেশ্য কিছু বলার ইচ্ছে প্রকাশ করে মেয়ের সঙ্গে কাটানো জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন রুবা আহমেদ বলেন, “তাকে হারানোর যে যন্ত্রণা তা কখনও বর্ণনা করা যাবে না। যারা এই সময়টা অতিক্রম করেছেন তারাই কেবল বলতে পারবেন আমরা কেমন সময় কাটিয়েছি। কতবার আমরা ভেঙে পড়েছি।”

মেয়েকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “তোমাকে নিয়ে চিন্তা করতে চমৎকার লাগে তবে তুমি ছাড়া বেঁচে থাকা খুব কঠিন। তুমি আমার আত্মার অংশ।”

“অবিন্তার সঙ্গে কাটানো আমার সময়ের কথা শুনলে আপনারাও বুঝতে পারবেন কতটা আলাদা ও মূল্যবান ছিল ও আমার কাছে, কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন তিনি।

“তাকে আমি একবারই বলেছিলাম তোমার নিজের দেশকে কখনও ভুলে যেও না। নিজের পরিচয়টা কখনও ভুলে যেও না। অবিন্তা আমার কথা ভুলে যায়নি। ২০০৭ সালে যখন ঢাকা আসি ও ছিল খুব খুশি। ও সব সময় এখানে থাকতে চাইতো। আমি কখনও কখনও ভুল থাকলেও অবিন্তা তুমি কখনও ১৯ বছরের জীবনে অবাধ্য হওনি।” বলেন রুবা আহমেদ।

রুবা আহমেদ কথা বলার সময় পুরো ঘটনাস্থল জুড়ে ছিল নীরবতা। তিনি মঞ্চে যেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন তার ঠিক পেছনে কিছু সময় জুড়ে ছিল অবিন্তার সঙ্গে তার ছবি। উপস্থিত অনেককেই তখন চোখ মুছতে থাকেন।

বিদেশি বন্ধুদের কাছেও নিজের দেশ নিয়ে কথা বলতেন অবিন্তা।

রুবা বলেন, “তুমি চাইতে এমন কিছু হতে যেন তোমার মা গর্ববোধ করেন। তুমি তোমার মায়ের মতো হতে চাইতে। আমার মতো হতে পারা সহজ তবে তোমার মতো হওয়া কারো পক্ষে অসম্ভব। আমি একজন গর্বিত মা হয়ে এখানে দাঁড়িয়েছি।”

কান্নাজড়িত কন্ঠে রুবা বলেন, “আমি জীবনে যেখানেই গিয়েছি, তোমাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছি। আমার দিন, রাত..আমার জীবন..আমার সন্তান….আমি তোমার কথা সব সময় ভাবি। আমি এখনও তোমার দেখা পাবার অপেক্ষায় রয়েছি..কখন তোমার সঙ্গে দেখা হবে..তোমাকে স্পর্শ করব, তোমাকে জড়িয়ে ধরতে পারব।”

“ধন্যবাদ মা”- বলে কান্নাভেজা চোখ মুছতে মুছতে বক্তব্য শেষ করেন রুবা। এরপর অনুষ্ঠানে অবিন্তাকে নিয়ে নির্মাণ করা একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়।

ভিডিও চিত্রে দেখা যায় রুবা আহমেদ বলছেন, ‘ও ঢাকা নিয়ে কোনো কমপ্লেইন শুনতে পারত না। শুধু জানতে চাইত কখন ঢাকা যাবে।”

ভিডিওতে অবিন্তার পাওয়া বিভিন্ন পুরস্কার ও মেডেল তার মা কাচ দিয়ে পড়ার টেবিলে বাঁধিয়ে রেখেছেন বলে মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলতে দেখা যায় রুবা আহমেদকে।

রুবা আহমেদ ভিডিও চিত্রে বলেন, ছোটবেলা থেকে অবিন্তা ছিল অত্যন্ত চাপা স্বভাবের। অভিযোগহীন আর সহজ।

“তোর লেখাগুলো পড়তে পড়তে অনেক সময় থেমে যাই…ছবিগুলো যেন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে..” অবিন্তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন তিনি।

তার নানা  সুপার স্টোর ল্যাভেন্ডারের মালিক মঞ্জুর মোরশেদকে বলতে দেখা যায়, “ওর চোখ সুন্দর ছবি খুব সহজে চিনে ফেলতে পারত।  অবিন্তা চেয়েছিল সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কিছু করতে। একটা কম্পাউন্ডে একটা বাড়ি থাকবে বড়দের ও আরেকটা ঘরে থাকবে শিশু, যাদের দেখার কেউ নেই। তারা একজন আরেকজনকে দেখাশোনা করবে।”

তার নানী নিলু মোরশেদ বলেন, “বারান্দায় অনেক পাখি আসত। বিশেষ করে টুনটুনি পাখি। আমার ওকে পাখির মতোই মনে হতো। খুব মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। জীবনের শেষ একাডেমিক পরীক্ষায়ও জিপিএ ৪ এ পেয়েছিলেন ৩.৯৮। ওর মা ছিল ওর আদর্শ।”

মেয়ের শোবার ঘরে বারবার উকিঁ দিয়ে তার স্মৃতি খুঁজে ফেরেন বলেও ভিডিওচিত্রে জানান রুবা আহমেদ।

একবার বিদেশে এক জায়গায় বিভিন্ন দেশের পতাকা দেখে নিজের দেশের পতাকা না থাকাটা অবিন্তার চোখে পড়ার কথাও জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে অবিন্তার মামা তানভীর আহমেদ বলেন, “আমরা ‘বিল্লু’ নামে ডাকতাম। ওর সঙ্গে যখনই দেখা হতো দেখতাম হাতে কোন না কোনো বই। একবার তাকে বলেছিলাম, পড়াশোনা শেষ করার পর তুমি কি যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞানী হবে। ওর উত্তর ছিল- না, আমি দেশে গিয়ে সেখানকার সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে থাকতে চাই।”

এছাড়াও অনুষ্ঠানে অবিন্তার পরিবারের শুভাকাঙ্ক্ষি নাজমা চৌধুরী বক্তব্য রাখেন।

গতবছরের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে অস্ত্র নিয়ে ঢুকে পড়ে কয়েক তরুণ, শুরু হয় গুলি আর বিস্ফোরণ। ভেতরে আটকা পড়েন কয়েক ডজন দেশি-বিদেশি অতিথি। তৈরি হয় জিম্মি সঙ্কট।   

পরদিন ভোরে শুরু হয় সামরিক বাহিনীর সদস‌্যদের অভিযান; নিহত হন ছয় হামলাকারী। জানা যায়, ১৭ বিদেশিসহ আটকে পড়া ২০ জনকে অভিযানের আগেই হত‌্যা করেছে জঙ্গিরা।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক