শ্রদ্ধা-ভালবাসায় নজরুল স্মরণ

জীবনে যত বৈচিত্র্য, পরিচয়েও তত বিশেষণ নিয়ে বাংলা সাহিত্য জগতে স্মরণীয় হয়ে আছেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম; ১১৭তম জন্মদিনে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় তাকে স্মরণ করছে দুই বাংলা।

নিজস্ব প্রতিবেদকও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 25 May 2016, 07:41 AM
Updated : 25 May 2016, 10:45 AM

আলোচনা হচ্ছে কবির প্রেম-বিরহ, দ্রোহ-জাগরণ, দুঃখ-বেদনা, আরসব জীবন ঘনিষ্ঠ সৃষ্টিগুলো নিয়ে। বাংলা ভাষার কবিতাপ্রেমিদের কাছে তিনি প্রেমের কবি, চির যৌবনের দূত; সেইসঙ্গে তিনি বিদ্রোহী, গৃহত্যাগী বাউণ্ডুলে।

১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম।

বৈচিত্রময় জীবনের অধিকারী নজরুল ছেলেবেলায় পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন ‘দুখু মিয়া’ নামে। পিতৃহীন কবি একে একে হারিয়েছেন কাছের স্বজনদের। আর্থিক অসচ্ছলতাও তার জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল।  

সব বাধা অতিক্রম করে একসময় তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা হয়ে ওঠেন। সাম্য ও মানবতার চেতনায় সমৃদ্ধ ছিল তার লেখনী। কবিতায় বিদ্রোহী সুরের জন্য হয়ে ওঠেন ‘বিদ্রোহী কবি’।

জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তার পেইজবুক পাতায় কবিকে স্মরণ করেছেন।

বুধবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কবির সমাধিস্থলে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠান।

সকাল পৌনে ৭টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপার্চায অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং ছাত্রী-ছাত্রীরা নজরুলে কবরে অর্পণ করেন শ্রদ্ধার ফুল।

এরপর একে একে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় কবি পরিবার, বাংলা একাডেমি, নজরুল একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সমাধি প্রাঙ্গণে উপাচার্যের সভাপতিত্বে স্মরণ সভা হয়।

উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, “নজরুলের সাহিত্যকর্ম সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছে। তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে সমাজের সব সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। আমাদের সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ করে এগিয়ে যেতে হবে। এটা জাতীয় কবির স্বপ্ন ছিল।”

কবির নাতনি মিষ্টি কাজী বলেন, “শুধু একদিন দাদুকে স্মরণ করলে হবে না, সারা বছর তাকে স্মরণ করা প্রয়োজন।”

এর আগে সকাল সাড়ে ৬টার দিকে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে থেকে উপাচার্যের নেতৃত্বে একটি শোভাযাত্রা বের হয়, যা শেষ হয় কবির সমাধি প্রাঙ্গণে।

পরে সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃধর্মীয় ও আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ কেন্দ্র (সিআইআইডি) এবং বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আরও একটি শোভাযাত্রা হয়।

এ বছর জাতীয় কবির জন্মজয়ন্তীর মূল আয়োজন ছিল চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে। ওই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত বিরূপ আবহাওয়ার কারণে তার যাওয়া হয়নি। 

সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সভাপতিত্বে ওই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন নজরুল ইন্সটিটিউট ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও জাতীয় কবির পৌত্রী খিলখিল কাজী।

এছাড়া জাতীয় কবির স্মৃতি বিজড়িত ত্রিশালে স্থানীয় প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় উদযাপিত হচ্ছে তার জন্মবার্ষিকী। নজরুল ইন্সটিটিউট ও নজরুল একাডেমীও বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী সন্ধ্যায় আয়োজন করছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের।

শৈশবে পিতৃহারা নজরুলের প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয় গ্রামের মক্তবে। পরিবারের ভরণ-পোষনের জন্য মক্তব থেকে নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন। পাশাপাশি গ্রামের মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ নেন।

রাঢ় বাংলা (বর্ধমান-বীরভূম) অঞ্চলের কবিতা, গান ও নৃত্যের মিশ্র আঙ্গীক লোকনাট্য লেটো দলে যোগ দেওয়ার কিছু দিনের মধ্যে নজরুলের শিক্ষকতার সমাপ্তি ঘটে। ওই সময়ই তাৎক্ষনিক কবিতা ও গান লেখার দক্ষতার জন্য পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি।

১৯১০ সালে লেটো গানের দল ছেড়ে দিয়ে প্রথমে রানীগঞ্জ সিয়ারসোল স্কুল এবং পরে মাথরুন স্কুলে (নবীনচন্দ্র ইন্সটিটিউশন) ভর্তি হলেও আর্থিক অনটনের কারণে আবারও আসানসোলে চা-রুটির দোকানে কাজ নিতে হয় নজরুলকে। সেখানেই আসানসোলের দারোগা রফিজউল্লার সঙ্গে তার পরিচয় হয়।

রফিজউল্লার আগ্রহে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালে দরিরামপুর স্কুলের সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন নজরুল। সেখানে এক বছর ছিলেন তিনি। সেই ত্রিশালেই নজরুলের নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রবেশিকা শেষ না করেই ১৯১৭ সালের শেষ দিকে স্কুল ছেড়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন নজরুল। ১৯২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় আড়াই বছর চলে তার সেই সামরিক জীবন।

১৯২২ সালে প্রকাশিত হয় নজরুলের বিখ্যাত কবিতা 'বিদ্রোহী'। ব্রিটিশ রাজের ভিত কেঁপে উঠেছিল তার অগ্নিগর্ভ কবিতার বজ্রনির্ঘোষে। ব্রিটিশবিরোধী লেখার জন্য বেশ কয়েকবার কারারুদ্ধ হতে হয় তাকে।

জন্মজয়ন্তীতে ফুলে ফুলে ভরে উঠে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি। ছবি:আসিফ মাহমুদ অভি /বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

একে একে প্রকাশিত হতে থাকে তার গ্রন্থ অগ্নিবীনা, প্রলয়োল্লাস, আগমনী, খেয়াপারের তরণী, ছায়ানট, বিষের বাঁশি, বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী, ব্যাথার দান, ঘুমের ঘোরে, মৃত্যুক্ষুধা।

নজরুল প্রতিভার আরেকটি দিক প্রভা ছড়িয়েছে সংগীতে। শ্যামা সংগীত ও ইসলামী গজল- দুই ধারাতেই সমান দখল দেখানো নজরুলের লেখা গানের সংখ্যা চার হাজারের বেশি।

সংগীত বিশিষ্টজনদের মতে রবীন্দ্রনাথ -পরবর্তী নজরুলের গান অনেকটাই ভিন্ন ধাঁচের নির্মাণ।

সৈনিক জীবনের সমাপ্তির পর নজরুলের সঙ্গে পরিচয় ঘটে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজাফফর আহমদ এর সঙ্গে। সে সময় তিনি সাপ্তাহিক লাঙ্গল, গণবানী, ধূমকেতু, সওগাত ও সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত হন।

নজরুল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, “নজরুল ইতিহাস ও সময় সচেতন মানুষ ছিলেন যার প্রভাব তার লেখায় স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। তুরস্কে কামাল পাশার নেতৃত্বে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আর ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের তরঙ্গকে নজরুল তার সাহিত্যে বিপুলভাবে ধারণ করেছেন।”

নজরুল ছিলেন একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক ও অভিনেতা। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার পথিকৃৎ লেখক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও তার গান ও কবিতা ছিল প্রেরণার উৎস।

১৯২১ সালে কুমিল্লায় প্রমীলা দেবীর সঙ্গে পরিচয়ের তিন বছর পর পরিণয়। কবি পরিবারে আসেন কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ।

১৯৪২ সালে দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে ক্রমশ বাকশক্তি হারান নজরুল। স্বাধীনতার পরপরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসুস্থ কবিকে ভারত থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। নজরুল হন বাংলাদেশের জাতীয় কবি।

১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় কবি নজরুল ইসলামের।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক