বুলগেরিয়ার সঙ্গে নতুন সূচনার আশা

চার দশক আগে পূর্ব ইউরোপের যে দেশটির সঙ্গে সাংস্কৃতিক সহযোগিতার অঙ্গীকার করেও আটকে গিয়েছিল যাত্রা এবার সেই বুলগেরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে দেখা দিয়েছে নতুন সূচনার আশা।

রিয়াজুল বাশার সোফিয়া থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 20 May 2016, 12:48 PM
Updated : 20 May 2016, 08:50 PM

শুধু সাংস্কৃতিক সহযোগিতা নয়, দেশটির সঙ্গে এবার প্রযুক্তি বিনিময় এবং ব্যবসা-বিনিয়োগেও সহযোগিতার দ্বার উন্মুক্ত হতে চলেছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তিনদিনের বুলগেরিয়া সফরে পারস্পরিক সহযোগিতায় তিনটি সমঝোতা স্মারক এবং একটি কাঠামোগত চুক্তি নতুন যাত্রার এই আশা দেখাচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

শুক্রবার সকালে সোফিযায় বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী বয়কো বরিসভের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর একান্ত ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। এরপর দুই দেশের মধ্যে তিনটি সমঝোতা স্মারক ও একটি কাঠামো চুক্তি হয়।

দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর শহীদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা আশা করি বুলগেরিয়ার সঙ্গে একটা নতুন ধরনের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের নুতন দিগন্ত উন্মোচন হবে।”

শুক্রবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হোটেল থেকে বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর মিনিস্টার্স অব কাউন্সিলে পৌঁছান। এরপর দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে প্রথমে একান্ত বৈঠক ও পরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, “দুই প্রধানমন্ত্রী একান্ত বৈঠকে কীভাবে দুই দেশের সম্পর্ক আরও উন্নত করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

“বুলগেরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের একটা ঐতিহাসিক সম্পর্ক ছিল। আমরা পর্যালোচনা করে দেখছি যে, বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে এই সম্পর্কের একটা বড় ধরনের পতন হয়।”

ওই ‘সম্পর্কটা নতুন করে গড়ার’ জন্যই শেখ হাসিনার বুলগেরিয়া সফর বলে মন্তব্য করেন পররাষ্ট্র সচিব।

বাংলাদেশের প্রথম সরকার প্রধান হিসেবে বুধবার তিনদিনের সফরে বুলগেরিয়ায় আসেন শেখ হাসিনা। প্রথমে বুলগেরিয়ার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের পর গ্লোবাল উইমেন লিডারস ফোরামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার বুলগেরিয়ার ব্যবসায়ীদের একটি প্রতিনিধি দল শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেন।

এরপর শুক্রবার দুই সরকার প্রধানের মধ্যে বৈঠক ও তাদের উপস্থিতিতে কাঠামো চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়। 

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম হেলাল বলেন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এগোতে পারেনি। এখন পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করে দুই দেশই লাভবান হবে বলে আশা করছেন প্রধানমন্ত্রী।

বুলগেরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতিতে ইউরোপের বাজারে পণ্য প্রবেশে সুবিধার কথাও মাথায় রাখছে বাংলাদেশ।

তিনি বলেন, “আপনারা জানেন বুলগেরিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত একটা দেশ। সেই সূত্রে ইউরোপের বাজারে বুলগেরিয়ার একটি বড় একসেস আছে। আমরা সেটা এক্সপ্লোর করছি।”

বৈঠকের বিষয় তুলে ধরে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, “দুই প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করেছেন। দ্বিপক্ষীয় বিষয়ের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক শান্তি ও পিস কিপিংয়ে বাংলাদেশের যে অবদান সেটা নিয়েও আলাপ হয়েছে।”

আলোচনায় অন্যতম বিষয় ছিল বাণিজ্য ও বিনিয়োগ।

“এরা কৃষি বিশেষ করে বীজের ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগামী। সেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সহযোগিতার কথা বলেছেন। একইসঙ্গে আমাদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে তথ্য-প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।”

আলোচনায় কোনো বিষয়ে ঐক্যমত হয়েছে কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, “ঐক্যমত হয়েছে বিনিয়োগের বিষয়ে- আইটি, পর্যটন ও কৃষিতে।”

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে বুলগেরিয়ার সাংস্কৃতিক সহযোগিতা চুক্তি এবং পরে সেটা বাস্তবায়িত না হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

“মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই এগ্রিমেন্টটা পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তাব দিয়েছেন; যেটা বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করেছেন। আমরা আশা করছি, এক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের অগ্রগতি হবে।”

দুই দেশের সরকারের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিস একাডেমি ও বুলগেরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিপ্লোম্যাটিক ইনস্টিটিউটের মধ্যে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফাউন্ডেশন ও বুলগেরিয়ার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এন্টারপ্রাইজ করপোরেশনের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে সমঝোতা স্মারক তিনটি স্বাক্ষরিত হয়।

এছাড়া বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) এবং বুলগেরিয়ান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার চুক্তি হয়।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, “আমরা আশা করি, এই চারটি বিশেষ করে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও এসএমই বিষয়ে এমওইউ এবং এফবিসিসিআইয়ের সঙ্গে কাঠামো চুক্তি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।”

ইহসানুল করিম হেলাল বলেন, দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের সময় শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের উন্নয়নের ওপর আলোকপাত করেছেন।

বুলগেরিয়াতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশেও যে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে তাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

বৈঠকে বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরেরও আমন্ত্রণ জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী উপস্থিত ছিলেন।  

তিনদিনের সফর শেষে শনিবার ভোরে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে শেখ হাসিনার।