বিজয়ের ক্ষণে কণ্ঠে কণ্ঠে বাংলা মায়ের গান

বাঙালির বিজয়ের বার্ষিকীতে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়ে ‘স্বাধীনতার উদ্যান’ মুখরিত হলো জাতীয় সংগীতে; আর তাতে কণ্ঠ মেলালো সারা বাংলার ‘কোটি নাগরিক’।

ফয়সাল আতিকআশিক হোসেন ওবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 16 Dec 2015, 11:19 AM
Updated : 17 Dec 2015, 04:52 AM

চুয়াল্লিশ বছর আগে ঢাকার এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই লেখা হয়েছিল বাঙালির মুক্তির সনদ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটে পাকিস্তানি বাহিনী এ উদ্যানেই আত্মসমর্পণের দলিলে সই করে, তখন এর নাম ছিল রেসকোর্স ময়দান।

বুধবার বিজয় দিবসের বিকালে ঠিক সেই মুহূর্তটিতে উদ্যানে স্থাপিত ‘বিজয় উৎসব’ মঞ্চের সামনে সমবেত জনতা গাইল ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানটিই একাত্তরের রণাঙ্গনে বাঙালি জাতিকে প্রেরণা যুগিয়েছিল, যা পরে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

বিজয় দিবস উদযাপন জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন-গ্রামসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এবং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের এ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল আগেই।

সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বেলা ১১টায় এবারের বিজয় উৎসবের উদ্বোধন করে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত পাকিস্তানি সেনা সদস্যদের বিচারের দাবি জানান।

সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্থাপনাগুলো সংরক্ষণেরও দাবি জানান তিনি।

এরপর বেলা সাড়ে ১১টা থেকে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘আমাদের সংস্কৃতি’। বিকাল সাড়ে ৩টায় ছিল জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব।

বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটে জাতীয় সংগীত পরিবেশন শেষে হয় ‘আগামী বাংলাদেশের শপথ’। শপথবাক্য পড়ান অধ্যাপক আবুল বারকাত।

শপথে জঙ্গিবাদ, মৌলবাদসহ সব সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করা হয়।

এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন অভিনেতা সৈয়দ হাসান ইমাম ও গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার।

অনুষ্ঠানে ১২ জন শহীদ পরিবারের সদস্য এবং মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মাননা দেওয়া হয়।

এরপর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের কণ্ঠে মুক্তিযুদ্ধের গান পরিবেশন শেষে আতশ বাজির খেলায় ‘বিজয় সন্ধ্যা’ উদযাপন করা হয়।

সবশেষে রাত ১০টা পর্যন্ত বিজয় মঞ্চে চলে দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ডদলের অংশগ্রহণে ‘কনসার্ট ফর ফ্রিডম’।

এবার বিজয় উৎসবে লোক সমাগম অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি হয় বলে জানিয়েছেন ওই এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন পুলিশ কর্মকর্তা।

পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার (পেট্রোল) ইমানুল ইসলাম বলেন, “আমার ৫০ বছরের উপরে বয়স। প্রত্যেকটি বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানেই ছিলাম। কিন্তু এ বছরের মতো এতো মানুষ কখনোই নজরে আসেনি।

“কতো মানুষ রাস্তায় নামবে তা আমাদের ধারণায় ছিল না। তারপরেও আমরা নিরাপত্তার বিষয়ে সজাগ ছিলাম, আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।”

‘নিরাপত্তা কড়াকড়িতে ভোগান্তি’

বিকাল ৪টার দিকে চার বছর বয়সী রিফাতকে নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বেশ কয়েকটি ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকতে ব্যর্থ হন মটরসাইকেলআরোহী মাসনুন সাবের। পরে শিখা চিরন্তন-এর ফটক দিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন তিনি।

কিন্তু নিরাপত্তার জন্য ওই ফটকটি বন্ধ করে দেওয়ায় আর ভেতরে ঢুকতে পারেননি তিনি।

পরে ক্ষোভের সঙ্গে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “রমনা কালী মন্দির গেইট থেকে বলা হলো এদিক দিয়ে মটরসাইকেল নিয়ে ঢোকা যাবে। এখন এখানে বলছে, গেইট বন্ধ, এটা শুধু ভিআইপিদের জন্য।”

বিজয় উৎসবে অংশ নিতে এসে তার মতো অবস্থায় পড়েছেন আরও অনেকেই।

সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকায় বিভিন্ন বয়সের ও স্তরের মানুষ ভিড় করতে থাকে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢোকার ফটকগুলোতে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় পুলিশকে। টিএসসি সংলগ্ন গেইট, রমনা কালী মন্দির সংলগ্ন গেইট এবং ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের পাশের গেইটে আর্চওয়ে দিয়ে দর্শনার্থীদের ভেতরে ঢোকানো হয়।

আর শিখা চিরন্তন-এর গেইটটি খোলা ছিল ‘ভিআইপিদের’ জন্য। এই গেইট দিয়ে সকালে মটরসাইকেল ও গাড়ি ঢুকতে দেয়া হলেও বিকেলে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে যারা ঢুকতে পারেননি তাদের অনেককেই উদ্যানের নিরাপত্তা প্রাচীর টপকে ভেতরে যেতে দেখা যায়। অনেকেই আবার ঢুকতে না পেরে ফিরে গেছেন বিজয় উৎসবে শামিল না হয়েই। 

বিকেলে মানুষের ভিড় বাড়তে বাড়ায় শাহবাগ থেকে টিএসসি যাওয়ার সড়কে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় পুলিশ।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে গোয়েন্দা পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা নামে অনীহা জানিয়ে বলেন, “শুধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানই নয়, আশপাশের এলাকাগুলোতে যতো অনুষ্ঠান হচ্ছে প্রত্যেকটি কেন্দ্র করেই আলাদা আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”