মনজুরুল হক-এর ‘এই কবিতাটির কোনো শিরোনাম নেই’

মনজুরুল হক
Published : 14 Sept 2011, 09:52 AM
Updated : 4 July 2022, 07:56 AM


চিত্রকর্ম: ফ্রান্সিস্কো গোইয়া

প্রিয়তম তোমায় বলেছি,
নাজিম আমার প্রিয় কবি।
নাজিমকে ওরা ৫৬ বছর জেল দিয়েছিল!
ছাপ্পান্নটা বছর, যা তার জীবনের চেয়েও বেশী!

প্রিয়তমা ওরা আমায় জেল দেয়নি,
দিয়েছে কালাপানি, দ্বীপান্তর।
আন্দামান-নিকোবর হয়ে আরো দূরে
সেই কিরিবেতি।
আমার চারধারে অথৈ জলরাশী।
সেখানে ঢেউয়ের মাথায়
সফেদ ফেনায় রোদের লুকোচুরি,
হাওয়ায় ভাসানো গাংচিলের ডানা।
আমার চারধারে জলরাশী শেষ হলে
চার চারটি নিরেট দেয়াল।
কংক্রিটের পলেস্তারায় আমি
তোমাকে দেখি প্রিয়তমা আমার!

আমার এখানে যখন রাত নামে,
যখন পাখিরা আর ডানা মেলে ওড়ে না,
তখনো আমার ভেতরে প্রবল বাতাসে
নিজেকে অটুট রাখার আকুল ডানা ঝাপটানি!
আমি ডানা ঝাপটাই আর পালাতে থাকি।
জীবন থেকে জীবনে, মরণ থেকে মরণে!
ওরা আমায় ফাঁসী দেয়নি, দিয়েছে দ্বীপান্তর।

তোমার মনে আছে? আমি বলেছিলাম-
নাজিমের কথা? নাজিম বলেছিলো-

'প্রিয়তমা আমার
তোমার শেষ চিঠিতে
তুমি লিখেছ ;
মাথা আমার ব্যথায় টন্ টন্ করছে
দিশেহারা আমার হৃদয়।

তুমি লিখেছ ;
যদি ওরা তোমাকে ফাঁসি দেয়
তোমাকে যদি হারাই
আমি বাঁচব না।

তুমি বেঁচে থাকবে প্রিয়তমা বধু আমার,
আমার স্মৃতি কালো ধোঁয়ার মত হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে
তুমি বেঁচে থাকবে, আমার হৃদয়ের রক্তকেশী ভগিনী,
বিংশ শতাব্দীতে
মানুষের শোকের আয়ু
বড় জোর এক বছর।'

আমি জানি ওরা আমায়
ফাঁসি দেবে না।
আমার চোখে কালো কাপড় বেধে
ওরা সটান নিয়ে যাবে আমার
সেই প্রাণপ্রিয় গ্রামের
কোনো নিভৃত খোলা মাঠে।
আমাকে ওরা গোসল করাবে,
দোয়া পড়াবে।
তারপর একটা তপ্ত সীসে আমার বুকে এসে বিঁধবে!
আমি যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে
তোমাকেই ভাবব বলে মরার আগে
শেষ পর্যন্ত তোমার কথা মাথায় গেঁথে রাখব
প্রিয়তমা আমার!

আমি এখন তোমার পাশে বসে
সেই চিরচেনা তিলটি দেখছি,
তোমার অনাবৃত স্কন্ধে
সেই ছোট্ট তিলটির দিকে
অপলক তাকিয়ে আছি, ঠিক সেই সময় প্রিয়তমা,
ঠিক তখনই আরো একটি লাশ পড়ল!
আরো একজন সাথী আমার একাকী হলো!

আমি যেদিন মনে মনে
তোমার শত ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে
তোমার সিক্ত অধরে ধাবমান,
ঠিক তখনই আমার আরো একজন সাথীর বুকে
ছোট্ট এক টুকরো
সীসে ঢুকিয়ে দেয়া হলো।
প্রিয়তমা, আমি যত বার তোমাকে দেখি,
স্বপনে এবং জাগরণে,
দেখি অনিমেষ কালো রাতের
কালো জোৎস্নানায়, কালো বন্যায়,
দেখি ততবারই আমার একজন সাথীকে
ওরা হত্যা করে!

প্রিয়তম, তুমি চেয়েছিলে
আমি যেন সুস্থ্য থাকি, ভালো থাকি।
তুমি ব্যাকুল হয়ে বলেছিলে-
সময় মত ওষুধটা হাতের কাছে রেখো,
রাতে যেন ঘুমোতে ভুলো না।
প্রিয়তমা তুমি অত দূরে বসে
দেখতে পারো না,
আমি যতবার ঘুমোই-
ততবারই তোমাকে হারাই।
আমি যত বার জাগি- তোমাকে হারাই।
আমি যত বার তোমাকে ভাবি- তত বারই
আমার এক কমরেড মাটিতে লুটিয়ে পড়ে!
আমি একা হয়ে যাই,
ক্রমশঃ একা হতে থাকি।

আমি জানি নিবীর্য কাপুষের দল
তোমাকে আমার থেকে ছিনিয়ে নেয়ার
সহজতম পথটি খুঁজে পেয়েছে।
ওরা আমাকে তুমিহীন করার
অব্যর্থ উপায় পেয়েছে।

ওরা আমাকে তোমার সারা জীবনের স্মৃতি সমেত
কোন এক কালো রাতে, কালো কাপড়ে
আমার সেই চোখ; যা তুমি
বারে বারে ছুঁয়ে দেখেছ,
সেই চোখে কালো কাপড় বেধে দাঁড় করাবে
কোনো এক নির্জন ধানক্ষেতে।
তারপর নিয়ম মেনে নিয়ম শেখাবে।
আমি শুধু তোমাকে, তোমাকেই,
শুধু তোমাকেই আর একটি বার
দেখতে চাইব প্রিয়তমা!

কিন্তু আমি জানি ওরা তা দেবে না।
এই নিরেট কংক্রিটের দেয়াল,
সফেদ ফেনা, গাংচিল আর
নিকষ কালো পানিকে স্বাক্ষী রেখে
আমি তোমাকে হারাব প্রিয়তমা!

শেষের সেই সময় তোমাকে হারানোর
কষ্ট আরো তীব্র হয়ে উঠলেও
আমি শান্তিতে মরতে পারব,
কারণ আমি আর জানব না
আমার আর কোন কোন সাথী
খুব ভোর বেলায় স্বজনহীন,
প্রিয়তমহীন হয়ে তোমাদের এই
সাধের পৃথিবী থেকে চলে গেল!
শেয়াল শকুনেরা মাংস খুবলে
নেয়ার সময় ভাবে না এখানে
কার পেলব হাতের স্পর্শ ছিল!

শত শত পঁচে যাওয়া দলিত মাংস
কঙ্কাল শরীরে উঠে আসবে,
বেজন্মা জারজ সময় সাক্ষ্য দেবে না,
তবুও তারা উঠে আসবে।
প্রেয়সীর ভেজা ঠোঁট, মরাল গ্রীবা,
উন্নত নাকের ভাঁজে জমে থাকা বিন্দু,
গহিনে জড়িয়ে থাকা অবুঝ প্রেমের স্পর্শে
তারা উঠে আসবে।
কেননা তারা জানে নাজিমের সময়ে
এক বছরের শোকের আয়ু
এখন বড় জোর দুদিন!

প্রিয়তম আমার, এই শেষের বেলায়
আমার চোখে কি লেখা তা যদি
ওরা পড়তে পারে,
দেখবে সেখানে শত সহস্র শব্দে
আকাশ ছোঁয়া বিশাল ক্যানভাসে
আঁকা তোমার মুখটি দেখতে চাই।
একবার প্রাণভরে তোমকে
দেখতে চাই প্রিয়তমা!
আমার মাথার সেই পুরোনো ব্যথাটা
তোমাকে উপহার দিতে চাই!
আমার না থাকা সময়ে যেন তুমি অনুভবে
অস্তিত্বে মেখে নিতে পারো সেই ব্যথা,
যা আমি আজন্ম বয়ে বেড়িয়েছি!

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক