জাদুঘরে নজরুলের পাণ্ডুলিপি

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী
Published : 28 August 2021, 06:35 AM
Updated : 28 August 2021, 06:35 AM


বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সংগ্রহশালা এবং স্থায়ী প্রদর্শনীতে হিন্দু ধর্ম এবং বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিফলন থাকলেও ইসলাম ধর্মের তেমন কোনো প্রতিফলন নেই। একইভাবে বাংলাদেশের গড়পরতা মানুষ সাহিত্যামোদি হলেও সাহিত্যের বিষয়টি উপেক্ষিত বললে নিন্দা করা হয় না। সংগ্রহে ও প্রদর্শনীতে সাহিত্য বলতে যা কিছু আছে তার পরিমাণ নগণ্য। আধুনিক সাহিত্যের কিছু নেই বললেই চলে। এই নেই -নেই অবস্থার মধ্যেও উল্লেখযোগ্য বলতে যা বোঝায় তা হলো মাইকেল মধুসূদন দত্ত, মীর মোশারফ হোসেন ও কাজী নজরুল ইসলামের হাতেলেখা কিছু পান্ডুলিপি। এছাড়া কাজী নজরুল ইসলামের ব্যবহৃত কিছু সামগ্রীও আছে।

২০১৫ সালে আমরা আধুনিক কবি-সাহিত্যিকদের হাতে লেখা পান্ডুলিপি সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। ২০১৫-এর এপ্রিলে কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক তাঁর 'সাবিত্রী উপাখ্যান'-এর পাণ্ডুলিপি উপহার দিলে উদ্যোগটি সফলতার মুখ দেখতে শুরু করে। প্রতিশ্রুতি দিলেও কোনো পাণ্ডুলিপি হস্তান্তরের আগেই সৈয়দ শামসুল হক প্রয়াত হন। আলাউদ্দিন আল আজাদ ও হুমায়ূন আহমেদেরও কিছু স্মারক ইতোমধ্যে সংগৃহীত হয়েছে। আবদুল মান্নান সৈয়দের পরিবার সহযোগিতা করেন নি।

জাদুঘরের অভিলেখাগারে লাল কাপড়ে মোড়ানো বেশ কিছু পুরনো পুথি সংরক্ষিত আছে। অধিকাংশই সংস্কৃত ভাষায় রচিত। ২০১৪-২০১৫ পর্বে যখন এসব পুথির বর্ণনামূলক তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছিল সে সময় নজরে এলো কাজী নজরুল ইসলামের কিছু পান্ডুলিপি সংগ্রহে আছে। জাদুঘরের ইতিহাস বিভাগের অধীক্ষক ডঃ স্বপন কুমার বিশ্বাস জানালেন, ১৯৮৭তে তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সৌজন্যে নজরুলের এগারটি পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়েছিল। জাদুঘরের নিদর্শন সংগ্রহের বালামবই ঘেঁটে দেখা গেল এই পান্ডুলিপিগুলিতে ১৯৮৭.৪৫৮৪ থেকে ১৯৮৭.৪৫৯৭ নম্বর দেয়া আছে; লেখা আছে রাষ্ট্রপতির সরাসরি উদ্যোগে এইসব পান্ডুলিপি সংগৃহীত হয়েছে; বঙ্গভবনের তোষাগার থেকে সরবরাহ করা হয়েছে।

জাদুঘরের অভিলেখাগারে কাজী নজরুল ইসলামের আরো ১৬টি পান্ডুলিপি আছে। যা চমকপ্রদ তা হল এই যে, ১৯৮৯ সালে কথাশিল্পী শওকত ওসমান এই পান্ডুলিপিগুলি জাতীয় জাদুঘরের নিকট বিক্রি করেছিলেন । তবে শওকত ওসমান কীভাবে এই পান্ডুলিপিগুলি হাতে পেয়েছিলেন কোনো ইতিহাস নেই।
মহামান্য রাষ্ট্রপতির বদান্যতায় যে ১১টি পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়েছিল সে বিষয়ে জাদুঘরের খাতায় প্রয়োজনীয় তথ্য না-থাকার বিষয়টি মনে গেঁথে ছিল। ২০১৭ সালে বিশিষ্ট সাংবাদিক নাঈমুল ইসলাম খানের বাসায় আয়োজিত এক নৈশভোজে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এরশাদ সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে যায়। তাকে ঐ এগারটি পান্ডুলিপির উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বিশদ তথ্য দিতে সক্ষম হননি। কলকাতার জনৈক ব্যক্তির সূত্রে তিনি এগুলোর সন্ধান পেয়েছিলেন, ঐ ব্যক্তি তাঁকে দান করেছিল; — এর বেশী আর কিছু প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি মহোদয় স্মরণ করতে পারলেন না। অনেক আগের কথা। তবে বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করে আহসান মঞ্জিলকে জাদুঘরে রূপান্তরে তাঁর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের কথা বেশ মনে করতে পারলেন। তিনি ১৯৮৫এ নজরুল ইনস্টিটিউট স্থাপনেও তাঁর ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। এখনও পর্যন্ত কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি বলে সরকারী ঘোষণার বা গেজেটভুক্ত আদেশ নেই জেনে অবাক হলেন। তাঁর ধারণা ছিল বঙ্গবন্ধুর আমলেই এ কাজটি সম্পন্ন হয়েছে।

জাতীয় জাদুঘরের তিনতলার স্থায়ী প্রদর্শনীর ৩৭ নম্বর কক্ষের উত্তর পাশের দেয়ালে কাচঘেরা দেয়াল বাক্সে নজরুলের কিছু স্মারকসামগ্রী সংস্থাপিত রয়েছে। এগুলোর মধ্যে নজরুলের নিজের হাতের লেখা একটি পান্ডুলিপিও আছে। লক্ষ্য করেছি দর্শকরা এই পান্ডুলিপি দেখতে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করে থাকে। স্মরণীয়, এর আগে জাতীয় জাদুঘরে একটি নজরুল কর্নার ছিল যাতে নজরুলের ব্যবহৃত পোশাক, দাড়ি কাটার সামগ্রী, হ্যাঙ্গার, সুটকেস ইত্যাদিও ছিল। এগুলো এখন সংগ্রহশালায় সুরক্ষিত।
কবি নজরুলের স্মারকসামগ্রীর মধ্যে পান্ডুলিপি ছাড়াও যে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটি রয়েছে তা হলো ১৯৭৬ সালে নজরুলকে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের প্রদানের সনদ। ১৮ ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ তারিখে জারীকৃত ঐ নাগরিকত্ব সনদে স্বাক্ষর করেছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জয়েণ্ট সেক্রেটারী মনযূর-উল-করিম। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে ১৯৭২ এর ২৪শে মে তারিখে কবি নজরুলকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয় এবং এখানেই ১৯৭৬-এর ২৯শে আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়। কলকাতা থেকে ঢাকা আগমনের সময় নিশ্চয় একটি পাসপোর্ট ব্যবহৃত হয়েছিল। পাসপোর্টটি কার অধিকারে আছে সে প্রশ্ন মনে জাগে।


(আলোকচিত্র: নাগরিকত্বের প্রদানের সনদ)

জাদুঘরে রক্ষিত এগারটি পান্ডুলিপি পরীক্ষা করে দেখা যায় আটটি পান্ডুলিপি নজরুলের নিজের হাতের লেখা; বাকি তিনটি পান্ডুলিপি অন্য কারও হাতে লেখা; তবে কার হাতে লেখা জানা যায়নি। এখানে জাদুঘরের তৎপরতার ঘাটতি রয়েছে। প্রতিটি নিদর্শন সংগ্রহের পর অবিলম্বে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধানপূর্বক সংশ্লিষ্ট তথ্য উদ্ধার ও লিপিবদ্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে তা করা হয় নি। তবে নিদর্শনগুলো যে অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল তার বিবরণ লিপিবদ্ধ করা আছে। উদাহরণস্বরূপ ১৯৮৭.৪৫৮৭ সংখ্যক নিদর্শনটি কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এটি একটি ছোট আকারের নোটবই যার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ১৭.৫×১১.৫ সেন্টিমিটার । নোটবইটিতে লাল রঙের মলাট রয়েছে। এটির মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৭৮ যার ৩১টি পৃষ্ঠায় কবি নিজ হাতে কবিতা ও গান লিখেছেন; বাকি পাতাগুলো খালি। উল্লেখ করা দরকার সংগ্রহের সব কিছু লেখার খাতা তা নয়, খোলা কাগজও রয়েছে।

কথাশিল্পী শওকত ওসমান জাদুঘরের নিকট যে ১৬টি পান্ডুলিপি ১৯৮৯ সালে বিক্রি করেছিলেন তার মধ্যে আটটি কাজী নজরুল ইসলামের নিজের হাতের লেখা। একটি বাদে বাকি ১৫টি পান্ডুলিপি শওকত ওসমানের হাতে কোনো সূত্রে পৌঁছেছিল সে তথ্য জাদুঘরের দলিলপত্রে লিখিত নেই।
জাদুঘরে রক্ষিত কাজী নজরুল ইসলামের পাণ্ডুলিপিতে যে কবিতা ও গানগুলি রয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশ বিভিন্ন গ্রন্থে মুদ্রিত হয়েছে। জাদুঘরের ইতিহাস বিভাগের অধীক্ষক ডঃ স্বপন কুমার বিশ্বাস আমাকে অবহিত করেছেন যে কবিতা ও গানের মুদ্রিত পাঠের সঙ্গে জাদুঘরে রক্ষিত পান্ডুলিপির মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পার্থক্য ও অসঙ্গতি রয়েছে। এই বিষয়ে দু-একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে:
(ক) বিখ্যাত গান 'তৌহীদেরই মুর্শিদ আমার মোহাম্মদের নাম'। এর দ্বিতীয় চরণ 'মুর্শিদ মোহাম্মদের নাম'। শেষোক্ত অংশটি পাণ্ডুলিপিতে থাকলেও রশিদুন্নবী সম্পাদিত 'নজরুল সংগীত সংগ্রহে' নেই।


আলোকচিত্র: যাদুঘরে সংরক্ষিত নজরুলের গানের নমুনা

(খ) আরেকটি গান 'এলে কি স্বপন মায়া আবার আমার গান গাওয়াতে'। আবদুল মান্নান সৈয়দ জাদুঘর থেকে পাণ্ডুলিপির কিছু ফটোকপি নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর 'লেখার রেখায় রইল আড়াল' গ্রন্থে নবম পংক্তিতে আছে 'শুষ্ক ডালে'। পাণ্ডুলিপিতে আছে 'শুষ্ক শাখে'।

পাণ্ডুলিপির অবস্থা সম্পর্কে বলা যায় এগুলো কাগজের ওপর সাধারণ লেখারকালিতে লেখা। যত সময় যাচ্ছে, কালি শুকিয়ে লেখা অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তবে ২০১৫-১৬ পর্বে স্ক্যান করে এগুলোর ডিজিটাল প্রতিলিপি তৈরী করা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তায় ২০১৬-১৭ সালে একটি আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে এবং জাদুঘরের তিনজন কর্মকর্তাকে অন্যান্য সামগ্রী সহ কাগজরূপী নিদর্শন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। আশা করা যায়, এখন উন্নতমানের সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু হয়েছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক