সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য:ভাষারাজ্যের তীর্থযাত্রী ঝুম্পা লাহিড়ী ও টেন্টাকলের মার্গারেট এটউড

বিপাশা চক্রবর্তীবিপাশা চক্রবর্তী
Published : 23 March 2016, 02:36 PM
Updated : 23 March 2016, 02:36 PM

ইটালিয়ান ঝুম্পা লাহিড়ী

"যখন আপনি প্রেমে পড়বেন, তখন চিরকাল বেঁচে থাকতে চাইবেন। আপনি আবেগ উত্তেজনার শেষ বিন্দুটুকু অনুভব করতে চাইবেন। ইতালিয়ান ভাষায় পড়তে গিয়ে আমার এমনই অনুভব হচ্ছিল। আমি মরতে চাই না, কেননা আমার মৃত্যুর অর্থ হবে ভাষা আবিস্কারের অবসান। কারণ প্রতিদিনই নতুন নতুন শব্দ শেখার আছে। এভাবেই সত্যিকারের ভালবাসা চিরন্তন হয়"।

ঝুম্পা লাহিড়ী তাঁর জমকালো স্মৃতিকথা ইন আদার ওয়ার্ডস সম্পর্কে এভাবেই নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন 'দ্য নিউইয়র্ক টাইমস'কে দেয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে। বইটি তিনি লিখেছেন ইটালিয়ান ভাষায়।
ঝুম্পার বাবা মায়ের ভাষা ছিল বাংলা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রথম ইংল্যান্ডে যান সপরিবারে , এখানেই লন্ডন শহরে জন্ম হয় নিলাঞ্জনা সুদেষ্ণা'র। হ্যাঁ, ঝুম্পা লাহিড়ীর ওটাই ছিল জন্ম নাম, কিন্তু পরিচিতি পেলেন ডাকনামে। কেননা ঐ নামটার উচ্চারণ সহজ ছিল না ইংরেজি ভাষাভাষীদের কাছে। তারপর বাবা মায়ের সাথে আমেরিকায় অভিবাসন ও বেড়ে ওঠা। তবে কোলকাতায় নিয়মিত আসা যাওয়া লেগেই থাকত ঝুম্পার। কারণ বাবা মা সবসময় চাইতেন তাদের সন্তান নিজের সংস্কৃতিকে জানুক। তাই ছোটবেলা থেকেই বাংলা ও ইংরেজি এই দুই ভাষার সান্নিধ্যেই বড় হয়েছেন এই ভারতীয়-মার্কিন লেখক। যদিও তিনি খুব ভালভাবে বাংলা লিখতে পড়তে পারেন না, তবুও ছোটবেলায় মাকে দেখেছেন বাংলায় কবিতা লিখতে। যখন বয়স ৩২ তখন ইংরেজি ভাষায় লেখা প্রথম বই ইন্টারপ্রেটার অফ মালাদিস-এর জন্য পেলেন পুলিটজার পুরস্কার। এরপরের বইটি দ্য নেমসেক নিউইয়র্ক টাইমস বেস্ট সেলার, এমনকি একই নামে একটি চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছিল। ইংরেজিতে লেখা সর্বশেষ দ্য লো ল্যান্ড বইটিও দারুন জনপ্রিয়তা পেয়েছে।


আর এখন ৪৮ বছরের ঝুম্পা লিখছেন ভিন্ন এক ভাষায়। স্প্যানিশ স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে বর্তমানে রোমে বাস করছেন ঝুম্পা লাহিড়ী। ইতালিতে তাঁর বসবাসের প্রথমদিককার দিনগুলোর স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন In Altre Parole যার ইংরেজী অর্থ হচ্ছে In Other Words । বইটি পাঠক হাতে নিলেই দেখতে পাবেন বাম পাশে ইতালিয়ান ভাষায় লেখা আর ডান পৃষ্ঠায় তার ইংরেজি তর্জমা। তবে ইংরেজিটা লাহিড়ীর লেখা নয়। ইন আদার ওয়ার্ডস ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন অ্যান গোল্ডস্ট্যান। যিনি এলেনা ফ্রন্তে'র নিয়াপলিটান সিরিজ ও প্রিমো লেভি ইংরেজিতে অনুবাদ করে ইতিমধ্যে সুনাম কুড়িয়েছেন। অনুবাদ প্রসঙ্গে লাহিড়ী অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলেন 'আমি যদি এটা করতাম তাহলে লেখায় আবেগীয় পরিবর্তন আসত। অনুবাদটা অ্যানের নিজের কাজ। কারণ বেশকিছু বছর ধরে ইটালিয়ান অনুবাদ করার ফলে সে ধারাবাহিকতা রাখতে সক্ষম হয়েছে। ২৩৩ পৃষ্ঠার ইন আদার ওয়ার্ডস বলতে গেলে লাহিড়ীর প্রথম নন-ফিকশন বই। ইটালিয়ান ভাষায় লেখা এ বইকে তিনি 'নুন-বিহীন রুটি'র একটি টুকরা বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন 'এটি নির্ভুল কিন্তু এতে মূল নির্যাসের অভাব আছে'। ইটালিয়ান সাহিত্যের কোন ছাত্র কোনদিন এ শব্দগুলো শোনেনি এবং এভাবে ভাবতে ব্যর্থ হবে যেভাবে দান্তের বিখ্যাত ডিভাইন কমেডির 'প্যারাডিসোতে' নির্বাসনের যাবার কথা বলা হয়েছে, যেখানে দান্তে উল্লেখ করেছেন ফ্লোরেন্স থেকে বিতাড়িত হয়ে তিনি দেখতে পেয়েছেন 'অন্যদের নোনতা রুটির স্বাদ'। চিত্রটি ব্যাঙ্গাত্মক, রূপক ও আক্ষরিক। সেই মধ্যযুগ থেকে ফ্লোরেন্সের লোকরা নিজেদের জন্যও রুটি লবনছাড়া তৈরি করে। যাদের এবং যা কিছু আপনি ভালবাসেন অর্থাৎ প্রিয়জন ও প্রিয় সবকিছুর কাছ থেকে হৃদয়বিদারক বিচ্ছেদ কতটা তীব্র হতে পারে দান্তের এই বাক্যে তা প্রমাণিত হয়। ভিন্ন কিছুর স্বাদ নিতে গিয়ে লাহিড়ীও কি তাই হলেন? নিজের কমফোরট জোন থেকে বেরিয়ে একটি অপরিচিত ভাষাকে আপন করে নেয়ার চেষ্টা। যে ইংরেজি ভাষা তাঁকে বিখ্যাত করেছিল সে ভাষা থেকে দূরে সরে গিয়ে কেন ভিন্ন একটি ভাষায় লিখতে শুরু করলেন? এ যেন অনেকটা প্রাসাদ ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসার মতো। এত সহজে কি কোন আশ্রয় ভেঙে দেয়া যায়?
এখন লাহিড়ী শুধু ইতালিয়ানে লেখেন পড়েনই না, ভাবেন ও চিন্তাও করেন এই ভাষায়।
লাহিড়ীর ভাষায়, " ইতালিয়ানে আমি পড়ছি, ধীরে ধীরে। কঠিনভাবে। প্রতিটি পৃষ্ঠা আমার কাছে কুয়াশার হালকা আচ্ছাদন মনে হয় । আর এই আচ্ছাদনের অবমুক্তি আমাকে আনন্দ দেয়, অভিভূত করে। একজন লেখক হিসেবে আমি ভাষাকে পুনরায় আবিষ্কার করছি। প্রতিদিনই শিখছি। কারণ প্রতিটি নতুন শব্দকে আমার কাছে এক একটি মণি মুক্তো মনে হয়। নিজেকে ভাষারাজ্যের তীর্থযাত্রী মনে হয়'।
তাহলে কি লাহিড়ী প্রেমে পড়ছেন ইটালিয়ান ভাষার? হ্যাঁ, ইটালিয়ান ভাষা সম্পর্কে লাহিড়ীর উচ্ছ্বসিত উচ্চারণ পাঠকরা এই লেখার শুরুতেই পড়েছেন। ভাষার সীমা দিয়ে তিনি নিজের জগতের সীমারেখা টানতে চান না। ভাষা হচ্ছে মহাসাগরের মতো। আর সেই মহাসাগরের রত্নসন্ধানী ঝুম্পা লাহিড়ীকে বলা যেতে পারে এই সময়ের বিশ্বসাহিত্যের ভাষিক যাযাবর। ঝুম্পা লাহিড়ীর এই নতুন প্রচেষ্টাকে বিশ্বসাহিত্যের পাঠক হিসেবে স্বাগত জানাতে নিশ্চই আপনার ভুল হবে না ।

কিৎসেস রেড টেন্টাকল পুরস্কার পেলেন মার্গারেট এটউড

অতিসম্প্রতি কিৎসেস ব্রিটিশ সাহিত্য পুরস্কার 'রেড টেন্টাকল' জিতে নিলেন কানাডিয়ান কথাসাহিত্যিক মার্গারেট এটউড। তাঁর হার্ট গোজ লাস্ট উপন্যাসের জন্য প্রদান করা হয় এ পুরস্কার। গত ৭ মার্চ সন্ধ্যায় লন্ডনে এ পুরস্কার গ্রহণ করেন এটউড।
বছরের সবচেয়ে প্রগতিশীল, বুদ্ধিদীপ্ত ও উচ্ছল কাজ, যেগুলো মূলত কল্পনাপ্রসূত ও আনন্দদায়ক উপাদানে সমৃদ্ধ, সেই কাজগুলোই এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়ে থাকে। ২০০৯ সাল থেকে শুরু হওয়া কিৎসেস সাহিত্য পুরস্কার মোট পাঁচটি বিভাগে প্রদান করা হয় ।
রেড টেন্টাকল ( শ্রেষ্ঠ উপন্যাস)
গোল্ডেন টেন্টাকল ( সেরা ডেব্যু বা প্রথম আত্মপ্রকাশমূলক উপন্যাস)
ইংকি টেন্টাকল ( সেরা প্রচ্ছদ)
ইনভিজিবল টেন্টাকল ( শ্রেষ্ঠ নেটিভ ডিজিটাল কথাসাহিত্য )
ব্লাক টেন্টাকল (বিবেচনামূলক)
কয়েকবছর যাবত সম্ভাব্য নোবেল বিজয়ীদের তালিকায় আছেন মার্গারেট এটউড। কিৎসেস পুরস্কার প্রাপ্তদের নাম ঘোষণার পরপর টুইটারে কানাডিয়ান জনপ্রিয় এ কথাসাহিত্যিকের উচ্ছসিত বার্তা "শিহরিত"! আদুরে কিৎসেস রেড টেন্টাকল জিতে নিল হার্ট গোজ লাস্ট"!
দ্য হার্ট গোজ লাস্ট, উপন্যাসে দেখা যায় এক দম্পতি বাস করে একটি গাড়িতে। আর কোন আবাসস্থল নেই তাদের। পজিট্রন নামে একটি প্রজেক্ট তাদের প্রস্তাব দেয় নিজস্ব একটি বাড়ির এবং সেখানে বাস করবার। কিন্তু সেখানে তাদের বাস করবার প্রতি দ্বিতীয় মাসটি কাটাতে হবে কারাগারে।
এমন অভিনব গল্প নিয়ে দ্য হার্ট গোজ লাস্ট পেল সেরা উপন্যাসের পুরস্কার। বিচারক ও উপন্যাসিক জেমস স্মিথ বলেন, "শক্তিশালী একটি শর্টলিস্ট থেকে সেরাটি বাছাই করে নেয়া কঠিনই ছিল তবে দ্য হার্ট গোজ লাস্ট সত্যিই চমকপ্রদ অর্জন। এটউডের অন্যান্য লেখার মত এটিও দূরদর্শী এবং বিনোদনে ভরপুর। উপন্যাসটি একই সাথে মজার এবং বিধ্বংসী। জুরি বোর্ডের সবাই এটিকে পছন্দ করেছে"।
অন্যদিকে সেরা ডেব্যু উপন্যাস মেকিং উলফ-এর জন্য গ্লোডেন টেন্টাকল পুরস্কার পেয়েছে টেড থমসন।

(তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।)

আর্টস বিভাগে প্রকাশিত বিপাশা চক্রবর্তীর আরও লেখা:
জীবন ও মৃত্যুর সঙ্গম: অর্ধনারীশ্বর অথবা তৃতীয় প্রকৃতি

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক