মাহবুবুল হক শাকিলের প্রেম ও অপ্রেমের নান্দনিক পৃথিবী

নওশাদ জামিল
Published : 26 Feb 2016, 05:05 AM
Updated : 26 Feb 2016, 05:05 AM

প্রেমের কবিতা রচনা, অনেকেই মনে করেন, কাজটা খুব সহজ নয়। কেননা আবেগের আতিশয্যে এ ধারার কবিতা কখনো কখনো তরল হয়ে যেতে পারে, যায়ও। মাহবুবুল হক শাকিলের কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়–প্রেমের কবিতা লেখাটা তাঁর কাছে তেমন কঠিন নয়। শ্রাবণের বর্ষণে কিংবা ঝর ঝর বাদল সন্ধ্যায় ঘোরলাগা সুরে গেয়ে ওঠে তাঁর প্রেমিকমন। কবি ভর করেন অদ্ভুত এক শকটে–মাঠঘাট, সুবজ বনানী, তেপান্তর, রাজপথ ছাড়িয়ে তা ছুটে চলে প্রেমানুভূতির ঠিকানায়–গূঢ় ও গভীর একটা প্রেমতীর্থে। যাত্রাপথে তাঁর নিজস্ব দর্পনে ভেসে ওঠে ব্রহ্মপুত্রপাড়ের রাশি রাশি স্মৃতিসম্ভার, জেগে ওঠে ফেলে আসা শৈশব, দূরন্ত কৈশোর, যৌবনের টানাপোড়েন অথবা রত্নখচিত প্রেমের স্বরলিপি।

প্রেমকে কাব্যকলায় নান্দনিক রূপ দেয়ার এক স্বভাবগুণ তাঁর কবিমানসে প্রোথিত, আর ওই সত্তার প্রাণোচ্ছ্বল উৎসারণে মাহবুবুল হক শাকিলের কবিতাগুলো হয়ে উঠেছে নান্দনিক মর্মরিত ও শিল্পমণ্ডিত।

শাকিলের কাব্যগ্রন্থ মন খারাপের গাড়ি পাঠশেষে মনে হয়, তাঁর কবিতার কেন্দ্রবিন্দুই প্রেমবোধ ও রাজনীতি। বলা বাহুল্য প্রেম যেমন চিরায়ত, কবিতায় তা বহুল ব্যবহৃতও। ঠিক তেমনভাবে রাজনীতিও কবিতার প্রাচীনতম অনুষঙ্গ। শাকিলের বাহাদুরিটা এই যে, বহুলচর্চিত এসব বিষয় তিনি ব্যবহার করেছেন দক্ষতার সঙ্গে। প্রেমের প্রথাগত বাহন 'আমি' আর 'তুমি' থেকে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে নির্মোহভাবে রচনা করেছেন অসাধারণ কিছু পংক্তিনিচয়। অনুরূপভাবে, রাজনীতির উচ্চস্বর ও শ্লোগানমুখরতা বর্জন করে কবিতায় তুলে ধরেছেন সমাজমনস্কতার নান্দনিক বয়নশিল্প।

কবিতায় যখন তিনি প্রেমিকার কথা বলেন, যাকে নিয়ে সৃষ্টি করতে চান পদ্যসংহিতা, কবির সেই প্রেমিকা ধরা দেয় নানা প্রতীক, নানা উপমা-উৎপ্রেক্ষা হয়ে। তখন 'তুমি' হয়ে ওঠে কোথাও ঈশ্বর, জীবনবিধাতা, কখনো বন্ধু বা জনসমাজ, মিছিলের মুখ, কখনো মা ও মাতৃভূমি, অথবা নিসর্গ এবং নিরুপাধিক সত্তা। অনুরূপভাবে তাঁর কবিতায় 'আমি' শুধু ব্যক্তি নয়, অন্তর্লীন সত্তাও নয়–এ 'আমি' অন্যতর 'আমরা'। কবি যখন বলেন, "ও আমার চিরচেনা দুঃখ/ আজো আমি কেনো/ তোমারই দাসানুদাস? কবেকার কিশোর প্রভাতে/ ব্রহ্মপুত্র ভিজে তুমি/ আমাতে সংলগ্ন হলে; এই অবেলায় তবু/ কেনো বাঁধন ছিঁড়ে না?" তখনই মনস্ক পাঠক টের পান, এই 'আমি' এবং 'তুমি' মিশে আছে সমষ্টির মোহনীয় মোহনায়। কবিতায় তা শুধু দুঃখবোধ নয়, হাহাকারও নয়; প্রেম ও প্রকৃতির প্রতি এক নিখাঁদ ভালোবাসা। মানব-মানবীর প্রেম শুধু নয়, প্রকৃতিলগ্ন ও মাটিবর্তী মরমী ও সহজিয়া আখ্যান হয়ে ওঠে তাঁর কবিতা, যা তাঁর কবিতাকে দিয়েছে অনন্যমাত্রা।

রাজনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়েও কবিতায় নিত্যবসত শাকিলের। রোজকার রাজনৈতিক নানা টানাপোড়েন, ব্যস্ততা, কাঠখোট্টা জীবনের বাইরেও সদাজাগ্রত তাঁর কবিমন। আপাদমস্তক এক কবিহৃদয় তাঁর সত্তাজুড়ে। শাকিলকে যাঁরা চিনেন, তাঁর সম্পর্কে জানেন, জীবনযাপনেও তাঁর কবিত্বের ছাপ প্রবল। কবির এ মন বড় অনুভূতিময়, সংবেদনশীল। ফেলে আসা শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি, স্মৃতির শহর ময়মনসিংহের স্মৃতি-বিস্মৃতি, ব্রহ্মপুত্রের জলহাওয়া তাঁকে যেমন আন্দোলিত করে, তেমনই আলোড়িত করে দেশ-বিদেশের নানা জলছবি, মূর্ত-বিমূর্ত নানা ভাবনাপুঞ্জ। প্রেম ও সৌন্দর্যের পাশাপাশি স্বদেশ প্রেম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সময়, সমাজ, রাজনীতি, আন্তর্জাতিকতাসহ নানা অনুষঙ্গ উঠে এসেছে সমান গুরুত্ব নিয়ে।

প্রথমপাঠে মনে হবে মাহবুবুল হক শাকিলের কবিতা সহজ, নিরাভরণ, কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যাবে, অন্তর্ভেদী, মসৃণ সংবেদী এবং তীব্র অনুভূতিশীল। তাঁর কবিতার ভাষা স্বাদু ও চিত্তাকর্ষক। স্বতস্ফূর্ত স্রোতের মতোই স্বচ্ছন্দে গতিশীল ও প্রবহামন। 'স্বভাব কবি' শব্দদ্বয় তাঁর সঙ্গে বেশ যুৎসই। কবিতার নানা ডিকশন, ছন্দ, আধুনিক কবিতার নানাধর্মী নিরীক্ষা হয়তো তাঁর কবিতায় নেই। কিন্তু তাঁর মধ্যে আছে স্বতস্ফূর্ত আবেগ, আছে কবিতা রচনার প্রবল ইচ্ছা আরাধনা। কবির ওই সাধানাই তাঁর গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। কবি সাবলীল ভঙ্গিমায়, শাণিত শব্দমালায় তুলে ধরেছেন তাঁর প্রেম ও অপ্রেমের আখ্যান। প্রেম তো মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ অনুভূতির নাম, কিন্ত আধুনিক সময়ই যেখানে অস্থিরতায় চঞ্চল, মানুষে মানুষে বিভেদ, সম্পর্ক ঘুরপাক খাচ্ছে অনিশ্চয়তায়, তখন কবির সেই বিচ্ছিন্নতাবোধেও কাতর হন। তিনি মানুষের এক গভীর গভীরতর অসুখের কথা ভাবেন, নিরাময়ের কথা বলেন তাঁর কবিতায়। কবি যখন বলেন, "খুব বেশি দেখতে নেই ভালোবাসা, জানতে নেই কত বেশি/ জীবনের ভুল। মাঝরাতে খুঁজে ফিরি ভুল কবিতা, বিষণ্ণ অনুবাদ/ মন খারাপের গাড়ি অভিমানের এভিনিউয়ে খুঁজে ফেরে দূর সমুদ্দুর।" তখনই টের পাই–এ শুধু গভীর উপলব্দিই নয়, শ্বাশত অভিজ্ঞানও।

মাহবুবুল হক শাকিলের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ মন খারাপের গাড়ি পাঠশেষে বলা যায়–তাঁর মানবিক ও নান্দনিক কাব্যপ্রয়াসের এক অনন্য দলিল এ বই। তাতে তিনি দেশ ও বিশ্বের জীবনচিত্র বিক্ষণের পাশাপাশি মানুষের ভেতরের সত্তার দ্বার উন্মোচন করার প্রয়াস পেয়েছেন। সব মিলিয়ে তাঁর কবিতা নির্মল, অজটিল এক আত্ম-উন্মোচন।

বইটির শুরুতেই আছে একটি সমৃদ্ধ ভূমিকা, লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। 'মন খারাপের জল হাওয়া' শীর্ষক রচনায় তিনি লিখেছেন, "বইটির কবিতায় আছে প্রেম-অপ্রেম, স্মৃতি, বিরহ, দুঃখ, অভিজ্ঞান, ভুলে যাবার প্রয়াস এবং ভুলে যাওয়ার অসম্ভবতা; নিসর্গের সবুজ-নীল-ধূসর; কবির অহংকার, পাগলামি, বোহেমিয়তা, ছুটে বেড়ানো; ভুল গল্প, ভুল সময়ের কষ্ট।" বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম যথার্থই লিখেছেন, অনুজকে দিয়েছেন তাঁর প্রাপ্য ভালোবাসা।

মাহবুবুল হক শাকিলের অধিকাংশ কবিতা ছোট লিরিকের চলচঞ্চল, অবিরল প্রাণোচ্ছ্বল। তাঁর কবিতা লিরিক্যাল, গীতলও বটে। রাজনীতি করেন বটে, রাজনীতিই তাঁর প্রধানতম পরিচয়, তবে তাঁর কবিতা উচ্চকিত নয়। শ্লোগানমুখরও নয়। প্রায় নিভৃত, বিনীত ভঙ্গিমায় রাজপথ থেকে মেঠোপথ–এই সবুজ বদ্বীপ থেকে নানা দেশে নানা শহরে ছুটে চলে তাঁর গাড়ি। কবিতা পড়তে পড়তে মনের অজান্তে পাঠকও সহযাত্রী হন কবির সঙ্গে একই বাহনে, একই ভূবনে। কবির এ অবিনাশী যাত্রা শুভ হোক, নিরন্তর শুভকামনা।

মন খারাপের গাড়ি
মাহবুবুল হক শাকিল
প্রকাশক: অন্বেষা
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
মূল্য : ২০০ টাকা

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক