শামসুর রাহমান: সমুদয় সম্পদের সম্রাট

কামরুল হাসান
Published : 24 Oct 2015, 05:48 PM
Updated : 24 Oct 2015, 05:48 PM

ছবি: নাসির আলী মামুন
২৩শে অক্টোবর বাংলাদেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমানের জন্মদিন। ১৯২৯ সালে তিনি পুরোনো ঢাকার মাহুতটুলিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট তিনি আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। যে মৃত্যুকে তিনি ভয় পেতেন সেই মৃত্যু তাকে কালো ডানায় মুড়ে এই রৌদ্রকরোজ্জ্বল পৃথিবী থেকে নিয়ে গেছে অনন্তদূরে– তাঁর প্রিয় লেখার টেবিল থেকে সহস্র আলোকবর্ষ দূরে– যে লেখার টেবিলে বসে তিনি তাঁর জাতির হৃদস্পন্দনকে ধরে রেখেছিলেন বহুকাল। একজন সৌন্দর্যপিপাসু, শুদ্ধবাদী হয়েও তিনি তাঁর জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্তপ্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর একেকটি কবিতা আমাদের মুক্তিসংগ্রামের মহান দলিল। নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের গানের পরে যে সকল কবিতা মুক্তিসংগ্রামে আমাদের সবচেয়ে বেশি উদ্দীপ্ত করেছে সে সকল কবিতার ভেতর শামসুর রাহমানের কবিতাই সবচেয়ে শাণিত, সবচেয়ে প্রখর, সবচেয়ে জ্বলজ্বলে।

স্কুল মাধ্যমিক পরীক্ষার পর তিনি কবিতা রচনায় হাত দিয়েছিলেন, কিন্তু এরপর আর ফিরে তাকাননি, নিরন্তর লিখে গেছেন এবং কবিতাই লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা ভাষায় এত কবিতা আর কেউ লেখেননি। কবিতার এক শক্তিশালী ফল্গুধারা তাঁর ভেতর সততই প্রবহমান ছিল। 'ইচ্ছে' কবিতায় তিনি ইচ্ছে িপ্রকাশ করেছিলেন জীবনের শেষ মুহূর্তটি পর্যন্ত লিখতে 'যদি বেঁচে যাই একমাস কাল/ লিখবো।/ যদি বেঁচে যাই একদিন আরো/ লিখবো।' এবং আক্ষরিক অর্থেই জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি লিখে গেছেন। প্রথমদিকে যা ছিল ঘনিষ্ঠ কবি বন্ধুদের সাথে একধরণের প্রতিযোগিতা, পরে তা-ই হয়ে ওঠে তাঁর ধ্যান-জ্ঞান, জীবনরীতি; তিনি ছাড়িয়ে যান তাঁর সমস্ত বিখ্যাত বন্ধুদের। জীবদ্দশাতেই এত বা এর চেয়ে বেশি বিখ্যাত হয়েছিলেন কেবল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং নজরুল ইসলাম। বিখ্যাত হতে গেলে প্রতিভার সাথে সৌভাগ্যের যে হিরন্ময় হাওয়া জুড়ন লাগে, তা এই কবির চেয়ে বেশি আর কারও ভাগ্যপালে লাগেনি। তিনি ছিলেন পরিশীলিত প্রতিভা ও যুগসন্ধিক্ষণের অপরিমেয় সৌভাগ্যের এক আশ্চর্য যুগলবন্দি। যুগের হৃৎস্পন্দনকে তিনি শিল্পের অনন্য সুষমায় ধরে রেখেছেন।

একজন বড় কবি কে? একজন বড় কবি তিনিই যিনি পরবর্তী কবিদের প্রভাবিত করতে পারেন। শামসুর রাহমান প্রভাবিত করেছিলেন তার পরবর্তী কবিদের এক বিপুল গোষ্ঠিকে, যারা তাঁর নির্মিত কাব্যভাষা অনুসরণ করে কবিতা লিখেছেন। এর একটি চমৎকার উদাহরণ হচ্ছে তাঁর বিখ্যাত কবিতা 'স্বাধীনতা তুমি' কবিতায় তিনি যে ক্যাটালগিং পদ্ধতি বাংলা কবিতায় নিয়ে এলেন, সে প্যাটার্ণে পরবর্তীতে প্রায় সকল কবিই কবিতা লিখলেন। নজরুলের পরে, যদি সেভাবে বিভাজন করা হয়, তবে শামসুর রাহমানের চেয়ে বড় বাঙালি মুসলমান কবি আর কেউ নেই।

ইংরেজী সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে তিনি পাঠ করেছিলেন আধুনিক ইংরেজী কবিতার বিস্ময়কর ভাণ্ডার, যার সাথে যোগ হয়েছিল কল্লোল পরবর্তী বাংলা কবিতার পাঁচ দিকপালের কবিতার তন্মিষ্ঠ পাঠ। এ দু'য়ের সম্মিলনে গড়ে উঠেছিল তাঁর কুসংস্কারমুক্ত, মানবিক কবিমানস এবং একইসঙ্গে তাঁর কবিতার উদারজমিন। অনস্বীকার্য যে বাংলা কবিতার প্রধান কবিগণ পশ্চিমবঙ্গের, তাদের অনেকেরই, যেমন জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর, জন্ম এই পূর্ববঙ্গেই, কিন্তু তারা শেষাবধি, ঐ দেশ বিভাজনের অশুভ প্রভাবেই, পাড়ি দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গে আর সেখানেই থিতু হয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালের পর যে ক'জন মুসলমান বাঙালি কবি পূর্ববঙ্গে ছিলেন তাদের যেমন তত প্রতিভা ছিল না, তেমনি ছিল না অসাম্প্রদায়িক, গোঁড়ামীমুক্ত দৃষ্টিভঙ্গী– কবিতা লেখার জন্য যা ছিল প্রয়োজনীয়। উপরন্তু পাকিস্তান ও ইসলামপ্রীতি তাদের কাব্যের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে নিচ্ছিল সুদূরে। এমনি এক শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে এলেন আধুনিক ও অসাম্প্রদায়িক কবি শামসুর রাহমান।

তাঁর কবিতা বর্ণনাধর্মী, যে বর্ণনার ভেতর তিনি গেঁথে দেন উপমা, চিত্রকল্প আর অনুপ্রাসের বিবিধ অলঙ্কার। উপমা, চিত্রকল্প নির্মাণে তাঁর দক্ষতা এবং সেই সঙ্গে ছন্দের অনুশাসন তাঁর কবিতাকে তুলে এনেছে উপরে। আজ কবিতার বিরুদ্ধে দুর্বোধ্যতার যে অভিযোগ উঠেছে সেই দুর্বোধ্যতা থেকে মুক্ত তাঁর কবিতা। বোধকরি এ কারণেই তিনি তরুণদের কবিতার তেমন রসগ্রাহী ছিলেন না, অভিযোগ তুলতেন ঐ দুর্বোধ্যতারই । তিনি যেমন ছন্দে প্রচুর কবিতা লিখেছেন, দেখিয়েছেন ছন্দে দক্ষতা, তেমনি গদ্যছন্দে এবং ছন্দের বাইরে গিয়েও কবিতা লিখেছেন, বিশেষ করে মুক্তক অক্ষরবৃত্তে। সারাজীবন লেখালেখি করে প্রমাণ করেছেন, তিনি একজন প্রকৃত লেখক, লেখালেখি যার শ্বাস-প্রশ্বাসে, নিদ্রা-জাগরণে ও অস্থিমজ্জায় সততই বিরাজমান ছিল।

প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে-র মতো অভাবিত ও অর্থবহ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে বাংলা কবিতার ভুবনে কবি শামসুর রাহমানের পদার্পণ। কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের অনেক আগেই অবশ্য তিনি নজর কেড়েছিলেন সকলের, তাঁর কবিতা আগ্রহ নিয়ে ছেপেছেন বুদ্ধদেব বসু, তাঁর সম্পাদিত বিখ্যাত 'কবিতা' পত্রিকায়। দ্বিতীয় কাব্য রৌদ্র করোটিতে ও তৃতীয় কাব্য বিধ্বস্ত নীলিমা একেবারে বোদলেয়ারীয় প্যাটার্ণের আধুনিক কাব্য। এ তিনটি কাব্যগ্রন্থ তাকে নিয়ে এলো প্রধান কবিদের একবারে সামনের সারিতে। শামসুর রাহমান অসংখ্য কাব্যগ্রন্থের জনক; কিন্তু আর কিছু না লিখেও তিনি যদি কেবলমাত্র এই তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করতেন, তবুও বাংলা কবিতায় কাব্যমূল্যের বিচারে অক্ষয় থেকে যেতেন। তাঁর ঘরাণা তিনি এ তিনটি গ্রন্থেই তৈরি করে ফেলেছিলেন। তবে তাঁর বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কবিতাগুলো এই দু'গ্রন্থে নেই, সেগুলো রয়েছে নিজ বাসভূমেবন্দী শিবির থেকে গ্রন্থদ্বয়ে। আমাকে বেছে নিতে বলা হলে আমি তার প্রথম দশটি বই বেছে নিব। অনেক কবির মতই তিনিও তাঁর প্রথম সৃষ্টির সাফল্যকে ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। গ্রামীণ পটভুমির বাংলাদেশে একেবারে নাগরিক কবি বলতে প্রথম ভেসে ওঠে শামসুর রাহমান ও শহীদ কাদরীর নাম। উপরন্তু এ কথা বলা প্রয়োজন যে, বাংলা ভাষার কবি অনেকেই আছেন, কিন্তু বাংলাদেশের কবি বলতেই শামসুর রাহমান, যার কাব্যগ্রন্থের নামে নামে জড়িয়ে আছে স্বদেশ – বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে, উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ, নিজ বাসভূমে ইত্যাদি । বাংলাদেশ বারংবার উঠে এসেছে তাঁর কবিতায়। সমসাময়িক ঘটনাবলী তাকে আক্রান্ত করতো এবং তিনি সেসবের প্রতিক্রিয়া জানাতেন কবিতায়। সে দিক থেকে শামসুর রাহমান দু'ধরণের কবিতা লিখেছেন– চিরকালীন ও সাম্প্রতিক। একদিকে অনন্যসাধারণ ও প্রভাববিস্তারি কবিপ্রতিভা, অন্যদিকে স্বদেশ ও সমাজের প্রতি গভীর অনুরাগ ও দায়বদ্ধতা তাকে কিংবদন্তির আসনে এনে বসিয়েছিল। আজীবন তিনি কুসংস্কার, ধর্মীয় গোড়ামী, সংকীর্ণতা, ভেদাভেদ, সাম্প্রদায়িকতাসহ সকল পশ্চাৎপদতাকে ঘৃণা করে গেছেন, সোচ্চার ছিলেন কূপমণ্ডুকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিপক্ষে তিনি আজীবন বলিষ্ঠ প্রতিবাদী ভূমিকা রেখেছেন। নিছক কবিতার বাইরে তাঁর সাহসী ভূমিকা তাকে প্রগতিশীল সকল আন্দোলন ও সংগ্রামের প্রতীকি নায়কে পরিণত করেছিল। তিনি ছিলেন, এমনকি প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবিদেরও, আশার আলো এবং ভরসার জায়গা। শামসুর রাহমানের প্রবাদপ্রতিম জনপ্রিয়তার পেছনে কবিতা ছাড়াও এই ঐতিহাসিক ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছে, যেমন ঘটেছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের বেলায়।

কবি শামসুর রাহমানের সাথে আমার প্রথম ব্যক্তিগত পরিচয় হয় দৈনিক বাংলার অফিসে আশির দশকের গোড়ার দিকে। তিনি তখন পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক। শামসুর রাহমানকে উৎসর্গীত আমার একটি কবিতা তাঁর হাতে দেবার জন্য আমি গিয়েছিলাম। মনে আছে তিনি ভারি খুশি হয়েছিলেন কবিতাটি পেয়ে। কবির প্রতি আমার মুগ্ধতাবোধ প্রকাশিত ছিল সে লেখায়। আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন 'দেশ' পত্রিকায় এর কিছুদিন আগে প্রকাশিত একটি কবিতায় তিনি যে 'কামরুল হাসান' নামটি দেখেছেন, আমি সে-ই 'কামরুল হাসান' কিনা? আমি সম্মতিসূচক মাথা নাড়তেই তিনি আমাকে আরও ঘনিষ্ঠ করে নিয়েছিলেন। তাঁর পাঠবিস্তার ও স্মরণশক্তি আমাকে অবাক করেছিল। সে সময়ে আমি ভারতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তাম, তিনি আমাকে প্রকৌশলবিদ্যার খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস করেছিলেন। যা আমাকে অভিভূত করেছিল তা হলো তাঁর প্রীতিময় ব্যবহার ও সৌজন্যবোধ। লেখালেখির সূত্রে আমি মাঝে মাঝে কবিদের আড্ডাস্থল আজিজ মার্কেটের বইপাড়ায় যাই। সেখানে প্রায়শঃই যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমাকে হতে হয় তা হলো, তরুণ কবিদের অহঙ্কারভরা কথাবার্তা, যারা দু'ছত্র কবিতা লিখেই নিজেদের অসামান্য প্রতিভাবান ভাবতে শুরু করেছে। আমার তখন অনিবার্যভাবে মনে পড়ত কবি শামসুর রাহমানের কথা, যিনি বাংলা ভাষার একজন প্রধান কবি হয়েও কতখানি বিনয়ী ও নিরহঙ্কারী ছিলেন। আমার ইচ্ছে হতো ঐ অবিনয়ী নতুন লিখিয়েদের শামসুর রাহমানের কাছে পাঠিয়ে দিতে, যাতে তারা কবির কাছ থেকে সৌজন্যবোধ ও বিনয় রপ্ত করতে পারে।

১৯৮১ সালে আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ সহস্র কোকিলের গ্রীবা প্রকাশিত হলে কবিকে এর এক কপি উপহার দিই। আমি তাকে কোন অনুরোধ করিনি, কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি সে সময়ে প্রকাশিত দৈনিক ভোরের কাগজে তাঁর নিয়মিত কলাম 'অন্যের মানসে বসবাস'-এ বইটি নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি আলোচনা লিখেছিলেন। সে আলোচনায় তিনি আমার প্রশংসাই করেছিলেন বেশি, কেবল ছন্দ নিয়ে দু'একটি আপত্তি তুলেছিলেন। বাংলাদেশে অগ্রজ কবিরা অনুজদের সম্পর্কে যেখানে কিছু বলতে চান না, সেখানে শামসুর রাহমানের ঐ লেখা প্রণিধানযোগ্য। বয়স্ক বা তরুণ সবার সাথেই তিনি সহজে অন্তরঙ্গ হতে পারতেন।

আমার কলেজ জীবনের অন্তরঙ্গ বন্ধু ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক আজফার হোসেনের বিয়ের অনুষ্ঠানে তিনি এসেছিলেন, তা থেকে বোঝা যায় তিনি আজফারকে কতখানি ভালোবাসতেন। সেখানে দেখা হলে কবি জানতে চেয়েছিলেন আমার কাছে কোনো আনকোড়া কবিতা আছে কিনা। আমি 'না' বলাতে আমাকে বলেছিলেন একটি কবিতা দেওয়ার জন্য। কবিতাই যে তাঁর ধ্যানজ্ঞান ছিল, একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে এসেও তিনি তা ভোলেননি। পরে আমি তাঁর শ্যামলীর বাসায় গিয়ে তাঁর হাতে একটি কবিতা দিয়ে এসেছিলাম, যার শিরোনাম ছিল 'তিমিগান দূরবর্তী কানে'।

আমি তখন সোনারগাঁ হোটেলে চাকুরি করি, কবি সেটা জানতেন। কি এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি সেখানে এসেছিলেন । রিসেপশন ডেস্কে এসে তিনি যখন আমাকে খুঁজলেন তখন অবাক হবার পালা আমার সহকর্মীদের, কেননা কবিকে সবাই চিনতেন, কিন্তু তাঁর সাথে আমার কী সম্পর্ক তা জানা ছিল না কারও। সেদিনই প্রথম আমার সহকর্মীরা জানলো আমি কবিতা লিখি। জানিয়েছিলেন কবি শামসুর রাহমানই। তিনি তখন চোখে ঝাপসা দেখেন, সঙ্গে রাখেন আই ড্রপ, আমি ছুটে এসে তাকে অভ্যর্থনা জানানোর পর তিনি হোটেল লবির এক প্রান্তে চেয়ারে বসে আমাকে অনুরোধ করলেন তাঁর দু'চোখে আই ড্রপ দিয়ে দিতে। কবির চোখে পরম যত্নে আমি ঔষধ দিয়ে দিচ্ছি– এটা আজ আমার এক মূল্যবান স্মৃতি। আজও কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি তিনি কবি সাজ্জাদ শরীফ ও ব্রাত্য রাইসুর মাধ্যমে আমাকে খবর পাঠিয়েছিলেন আমি যেন কোলকাতা থেকে প্রকাশিতব্য কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর সাথে তাঁর যৌথ সম্পাদনার দু'টি সংকলনে আমার কবিতা দেই। আজ দুই বাংলার ভালোবাসার কবিতাদুই বাংলার বিরহের কবিতা-য় আমার কবিতা যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তা আমার ও আমার কবিতার প্রতি তাঁর স্নেহের স্বাক্ষর।

শামসুর রাহমান যে বাংলাদেশের প্রধান কবি এটা আপামর জনতার সাথে শাসকগোষ্ঠিও জানে। যার কবিতায় বাংলাদেশ উদ্দাম হয়ে উঠেছে, যার কবিতা উদ্দীপ্ত করেছে এদেশের মুক্তিকামী সংগ্রামী লাখো মানুষকে, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে যার লেখনির ভূমিকা অতুলনীয়, সেই কবিকে শাসকগোষ্ঠি কী করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদাবিহীন যেতে দিলো তা ভাবলে মাথা হেঁট হয়ে আসে। কোনো ত্যাগস্বীকার না করেই বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিরুদ্ধাচরণ করে সেসময়ে ক্ষমতার মসনদে আরোহনকারী যে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি স্বাধীনতার পিঠে ভাগাভাগি করে খাচ্ছিলো তাদের কি একবারও মনে পড়েনি কোন মসনদের চূড়ায় তারা বসে আছে, আর কাদের সৃজনশীল মেধা ও আত্মত্যাগ তা সম্ভব করেছে, যদিও ঐ আত্মত্যাগের উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। দেশবাসী অবশ্য তাদের প্রাণপ্রিয় কবিকে শ্রদ্ধা জানাতে ভুলে যায়নি। রাষ্ট্র ভুল করলেও জনগণ ভুল করেনি। শহীদ মিনারে বা বনানীর কবরস্থানে মানুষের ঢল দেখেই তা বোঝা গিয়েছিলো। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত না করে রাষ্ট্র খাটো হয়েছে, কবির মর্যাদার কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি তাতে হয়নি।

আমার তরুণ বয়সে যে কবিতাটি কবি শামসুর রাহমানকে উৎসর্গ করেছিলাম, সেই কবিতাটি দিয়েই এ লেখার সমাপ্তি টানছি। তরুণ বয়সের রচনার ছাপ এতে রয়েছে, কিন্তু এর আবেগ অকৃত্রিম। কবিতাটি যে কবিকে আনন্দিত করেছিল, সেটাই এর বড় পাওনা। আজ অবাক হয়ে লক্ষ করি এই রচনার ভেতরও শামসুর রাহমানের কবিতার গভীর প্রভাব রয়ে গেছে।

সমুদয় সম্পদের সম্রাট

কবি শামসুর রাহমানকে উৎসর্গীত

তুমি পাখিকে ডাক দিলে, টিয়া,
পাখি নীলিমার অন্তহীন ডাল থেকে নেমে
তোমার পঙ্ক্তিতে পুলকে পুচ্ছ নাড়ায়
চঞ্চুতে তুলে ধরে হিরন্ময় দানা।

তুমি নারীকে ডাক দিলে, প্রিয়া,
নারী সংসারের কালিঝুলি মুছে
তোমার অলঙ্কারে নিজেকে সাজায়
অধরে মেখে রাখে অধীর ভালবাসা।

তুমি ফুলকে ডাক দিলে, গোলাপ,
ফুল ঘাতক কাটার ভ্রুকুটি ডিঙ্গিয়ে
তোমার পঙক্তিতে পাপড়ি মেলে দেয়
অরূপ রূপের ভাঁজে সম্মোহিত মায়া।

পাখি, প্রিয়া, গোলাপের, সমুদয় সম্পদের সম্রাট
আমি আর কাকে ডাকি, আছে কেউ ডাকার?

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক