থিয়েটারের তর্কাতর্কি

কামালউদ্দিন নীলুকামালউদ্দিন নীলু
Published : 6 Sept 2021, 06:53 AM
Updated : 6 Sept 2021, 06:53 AM


আজকের বিষয়টি নিয়ে লিখতে গিয়ে মনে পড়ছে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির সেই কথা-"আপনার ছবির বাম দিকের অংশটি আমাকে ডান দিকের অংশ দেখতে উৎসাহিত করছে"। দ্য ভিঞ্চির এই কথার ভেতরে লুকিয়ে আছে দুটো বিষয়: শিল্পের প্রকাশ ও শিল্পকর্মটি দেখার দৃষ্টিভঙ্গি; যা পুরোমাত্রায় যুক্ত হয়ে আছে নন্দনতত্ত্ব বা কান্তিবিদ্যার নানা রূপ, রস ও গন্ধের সাথে। ফলত একই গল্পের প্রকাশভঙ্গি হয়ে উঠতে পারে নানা রং ও রূপে। এই নানা রং ও রূপের মাত্রাটা যদি ভিন্ন ভিন্ন নাই হবে, তবে শিল্পের ভেতরে আনন্দকে যেমন খুঁজে পাওয়া যাবে না তেমনি আরেকটা গল্প বলারও প্রয়োজন পড়বে না।

আমাদের চারপাশে তো অনেক গল্প, মানুষজনও অনেক গল্প জানে এবং অনেক গল্প তারা বলে, সুতরাং আরেকটা গল্প একইভাবে বলার দরকারটা কি? শিল্পের বিচারে এ এক অসীম ও অন্তহীন প্রশ্ন। এবং এই প্রশ্নটাইতো শিল্পের জাদু, যে জাদুর পেছনে লুকিয়ে থাকে ব্যাখ্যা এবং এর পুনর্ব্যাখ্যা। এতে করে ফলাফল দাঁড়ালো লেখকের মৃত্যু ও পুনর্জন্ম, যেহেতু অর্থটা লেখক বা নাট্যকারের একক অবস্থান থেকে উৎপন্ন হয় না, বরং এটা পাঠক বা দর্শকের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয় বলেই এর রসায়নের গঠনটা হয়ে পড়ে জৈব বা অর্গানিক; যা পাঠক বা দর্শকের পরিপ্রেক্ষিতের ওপরে ভর করে সৃষ্টি করে একই গল্পের অধিবৃত্ত।

এই হাজারো অধিবৃত্তের কেন্দ্রের দুটো বৃত্ত অতীব প্রয়োজনীয় এই অর্থে যে, এই বৃত্তদুটি সহায়ক হয়ে ওঠে নতুন অর্থ সৃষ্টির লক্ষ্যে। ধরা যাক প্রথম বৃত্তটি হলো একটি ধারণা, যে অর্থ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে লেখক বা নাট্যকারের উদ্দেশ্যটা পাঠক কিংবা দর্শকদের শৈল্পিক কাজটি পাঠ করার ক্ষেত্রে খুব অল্প পরিমাণে সহযোগিতা করতে পারে। দ্বিতীয় বৃত্তটি হলো একটি স্বীকৃতি যে লিখিত ভাষা কখনোই পারফর্ম্যান্স কিংবা সাংস্কৃতিক প্রযোজনার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারকারী হিসেবে ধরে নেয়া যাবে না, যেহেতু লিখিত ভাষাটাই এখানে একমাত্র নয়। থিয়েটারের ভাষা হতে পারে দৃশ্যমান, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও সাংকেতিক। আসলে থিয়েটারের ভাষায় যেটা থাকে তা হলো সাংস্কৃতিক অর্থ প্রদানকারী হিসাবে একটি শৈল্পিক কাজের গাঠনিক সজ্জার টেক্সচুয়ালিটি ও আন্তঃটেক্সচুয়ালিটি। যে কারণে থিয়েটার কখনোই একটি নির্দিষ্ট অর্থ বহন করে না। সুতরাং আমি রোল্যান্ড বার্থেজ-এর সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত যে লেখক বা নাট্যকারের কর্তৃত্ব স্থির নয়, এমনকি নাটকের গল্পে একটি বস্তু এবং বস্তুটি যে অর্থে লেখক বা নাট্যকার প্রকাশ করে তাদের সম্পর্কটাও স্থির নয়। যেহেতু এর সবটাই নির্ভর করছে একটি নাট্য প্রযোজনার দর্শকের এককের পরিপ্রেক্ষিত, প্রত্যক্ষকরণ, উপলব্ধি, কল্পমূর্তি এবং দর্শকের কিংবা পাঠকের গ্রহণ প্রক্রিয়ার ওপরে। অর্থাৎ এখানে বলা চলে গল্প বা নাটকের অধিবৃত্তের কেন্দ্রীয় দুটি বৃত্তের ওপরে নির্ভর করে প্রতিটি দর্শকের নান্দনিক উৎকর্ষ- যেহেতু সৌন্দর্যদর্শন বিষয়টি যুক্ত হয়ে থাকে আত্মনিষ্ঠার ওপরে; ফলে নির্দেশক ও প্রতিটি দর্শক যেকোনোভাবেই হোক না কেন 'লেখক'-এর ভূমিকা গ্রহণ করে একটি থিয়েটার বা পারফর্ম্যান্স থেকে সম্ভাব্য 'অর্থ' উৎপাদনের ক্ষেত্রে। এটা টিম ইচেলস্ এর "স্পিক বিটারনেস" নাট্যপ্রযোজনার কথা মনে করিয়ে দেয়; যেখানে বলা হচ্ছে, 'আমরা' আদৌ কম্বলের ভেতরে থাকা যৌথ তৃপ্তি থেকে উদ্ভূত নয়, এটা প্রত্যাখ্যান করে ও অভিযুক্ত করে মিলনায়তনের আনুমানিকভাবে ভাগাভাগি করে নেওয়া, সামাজিক স্থানকে দেখা, বিভক্ত করা এবং উপবিভক্ত করাকে।


একজন সক্রিয় নাট্য নির্দেশক হিসেবে আমি মনে করি একটি নির্দিষ্ট টেক্সটকে একই ভাবে মঞ্চে উপস্থাপনার মধ্যে কোনো নতুনত্ব নেই। একটি টেক্সটকে নানাভাবে প্রকাশ করার মধ্যেই তো শিল্পের আনন্দ। যেমন ধরা যাক আমি একটি গল্পকে নানা প্রকারে বা নানা রূপের মধ্যে ফেলে প্রকাশ করতে পারি। ধরা যাক শেকস্পীয়রের 'হ্যামলেট' নাটকটি, যেটি সারা পৃথিবীতে সহস্র-কোটিবার মঞ্চস্থ হয়েছে কোটি-কোটিভাবে, অর্থাৎ এটা দাঁড়ালো যে প্রতিবারই নাটকটি কোটি-কোটি নির্দেশক পুনর্ব্যাখ্যা করেছেন কোটি-কোটি অভিব্যক্তির মাধ্যমে। এই যে কোটি-কোটি অভিব্যক্তির ভেতরে একটি বিষয়কে কোটি-কোটি ভাবে দেখা যায় বলেই কিন্তু থিয়েটার শিল্পটি জীবন্ত, সমকালীন এবং স্বাধীন।

একজন নাট্যনির্দেশক দর্শককে কী দেখাবেন, আর কী দেখাবেন না, এটা তো তাঁর ওপরে নির্ভর করছে। আমি একজন দর্শক হিসেবে সেটা গ্রহণ করতেও পারি বা নাও করতে পারি। অর্থাৎ থিয়েটারে কিন্তু নির্দেশকের যেমন একটা স্বাধীনতা থাকে তেমনি দর্শকও কিন্তু স্বাধীন এবং সেই কারণে থিয়েটারকে কখনো বেঁধে রাখা যায় না। এটা আমাদের বুঝতে হবে যে থিয়েটার কিন্তু প্রলয়ঙ্কর এক ঝড়, যে ঝড়কে বাধা দেওয়ার অর্থই কিন্তু ঝড়টাকে মহাপ্রলয়ের মধ্যে ঠেলে দেওয়া। আর যদি এটাকে বাধা দেওয়া না হয় তবে ও কিন্তু কিছুক্ষণের জন্য লম্ফঝম্ফ করে হাঁফিয়ে পড়বে এবং তারপর নিরবে প্রস্থান নেবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে থিয়েটার ও পারফর্ম্যান্স একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের মধ্যে বসবাস করে এবং সে-জন্যই এটা সমসাময়িক। পারফর্ম্যান্স কখনো রক্ষা, লিপিবদ্ধ এবং সংরক্ষণ করা যায় না। পারফর্ম্যান্স সব সময় অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মধ্যেই থাকে। অতএব তাকে বাধা দেওয়ার অর্থই কিন্তু তার মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে বাঁচিয়ে তোলা এবং তাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করা। এই ফ্যাল্যাসিটা হতে পারে এই রকম; ধরা যাক একজন পাগলের মুখোমুখি আপনি। আপনি যখন শান্তভাবে তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাবেন সে কিন্তু আপনাকে দেখে হয়তো হেসে বা রেগে আপনার দিকে তেড়ে যাবে এবং তখন যদি আপনি নিজে ভয় পেয়ে তাকে বাধা দিতে যান, তবে সে কিন্তু আরো ক্ষিপ্র হয়ে একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবে। আর আপনি যদি কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া না দেখান তবে সে কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে শান্তভাবে তার পথ ধরে চলে যাবে। এখন এই ধরনের পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেবেন সেটার সিদ্ধান্ত আপনার ও আপনাদের।


একজন সৃজনশীল নাট্যনির্দেশক একটি গল্প বা নাটকের পুনঃসৃষ্টিকারী এবং ব্যাখ্যাকারী বলেই কিন্তু সে একটি নাটকের গল্পকে নানানভাবে বলতে পারেন। যেমন ধরুন সে গল্পটাকে নিয়ে নগরকে পেছনে ফেলে গ্রামে চলে যেতে পারে, যেখানে অন্তহীন মাঠে গরু চড়ে বেড়ায়, আর রাখাল বাজায় বাঁশি। সেটা হতে পারে খাঁটি আর বিশুদ্ধ, যার মাঝে দর্শক খুঁজে নিতে পারেন মাঝির কন্ঠ নিঃসৃত গানের ছন্দ এবং সংগ্রামের ইতিহাস। আবার অন্য একজন নির্দেশক একই গল্পকে বর্তমান সময় থেকে পেছনে সরিয়ে নিয়ে পুরানের কাছে যেতে পারেন, যেখানে দেবতা আর দানবরা যুদ্ধ করে, যেখানে ভাইকে হত্যা করে ভাই, আর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেই মৃত মাঝিকে পুনরুজ্জীবিত করেন গীতা থেকে শ্লোক পাঠ করে। নির্দেশক চাইলে এখানে কথাকলির মতো মূকাভিনয়ভিত্তিক একটা অসাধারণ ঐতিহ্যকে অবলম্বন করে চমৎকার কিছু নাট্যমুহূর্ত তৈরি করতে পারেন, যেমনটা জাপানীরা তাদের 'নো' ও 'কাবুকি'-র সাহায্যে করে থাকেন। যেমনটি করেছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম নাট্যনির্দেশক বি. ভি. কারনথ তাঁর নির্দেশিত নাটক 'ম্যাকবেথ'- দক্ষিণ ভারতের লোকায়িত ফর্ম 'ইয়াকশাগানা'-র মধ্যে ফেলে।

আবার একই গল্প কোনো একজন নির্দেশক প্রকাশ করতে পারেন তাঁর বর্তমান সময়ের মধ্যে ফেলে; যেখানে তাঁর সৃষ্ট মাঝির নগরটার রূপ হতে পারে ভয়ঙ্কর, চিত্তাকর্ষক বা বিচলিত নগর। নির্দেশক চাইলে নাটক বা গল্পটির দৃশ্য, শব্দ এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার হতাশাজনক বৈসাদৃশ্যকে এক সুতায় গাঁথতে পারেন আবার নাও পারেন, যেহেতু এখানে নির্দেশকের অভীষ্ট লক্ষ্যটা হলো সমকালীন থিয়েটার। সেই জন্যে নির্দেশকের সৃষ্ট পারফর্ম্যান্সটা হলো ভৌগোলিকভাবে প্রসারণশীল গতিময়তার ক্ষেত্রে একটি ছাতার মতো, এই গতিময়তা হলো একটি বহুত্ববাদী গতিময়তা যার রয়েছে সংযুক্ত এবং অসংযুক্ত আদর্শ এবং প্রক্রিয়া ও চর্চার মনোভাব। ফলত কখনো এটা গভীর বাস্তবতার প্রতিফলন হয়ে উঠতে পারে, আবার কখনো গভীর বাস্তবতাকে ঢেকেও দিতে পারে বা নষ্ট করে ফেলতে পারে। আবার কখনো কোনো বাস্তবতার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না রেখেই সৃষ্টি করতে পারে নিজস্ব প্রতিমূর্তি।

এই নিজস্ব প্রতিমূর্তি সৃষ্টির ক্ষেত্রে অনেকেই মনে করছেন, থিয়েটারের দৃশ্যাবলীতে গত কয়েক দশক ধরে বিষয়বস্তুর অতি প্রাচুর্যতা এবং এর নান্দনিক সঙ্গতি ও উদ্ভাবনী শক্তির মাধ্যমে নাটকের প্রথাগত কাঠামো থিয়েটারকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বর্তমানে এই নতুন দৃষ্টান্ত নিয়ে কথা বলা অপরিহার্য বলে আমি মনে করছি, যেহেতু থিয়েটারের এই ধারার কাজগুলো পৃথিবীময় বিশেষ করে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে হয়ে পড়েছে দৃষ্টান্ত সম্মত এবং ব্যাপকভাবে স্বীকৃত, যদিও 'স্পেসোটেম্পোরাল' এবং কালের সাক্ষ্য হিসেবে এগুলো সর্বক্ষেত্রে সাদরে গৃহীত নয়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার থিয়েটার চর্চার ক্ষেত্রে। ফলত এখানকার থিয়েটার শিল্পের নতুন নতুন ধারা ও উদ্ভাবনী শক্তি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে গোঁড়া, সনাতন ও প্রচলিত থিয়েটারের অধিকর্তাদের দ্বারা। যেটাকে সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ববাদীর মাধ্যমে 'স্ব-সেন্সরশীপ' ও 'সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী'র বলয়ের মধ্যে ফেলে সংজ্ঞায়িত করা চলে। আমি মনে করি দক্ষিণ এশিয়ার থিয়েটারের অগ্রগতির বাধাই হচ্ছে 'স্ব-সেন্সরশীপ', যার বসবাস ভয় এবং সংস্কৃতির মধ্যে এবং যার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। ফলে সামগ্রিকভাবে এটা ঢুকে পড়ে সংস্কৃতির ত্রাসন ও সন্ত্রাসের মধ্যে। এই ত্রাসন ও সন্ত্রাস কিন্তু রাষ্ট্র, সরকার বা তার এজেন্সির দ্বারা ঘটে না। এটা ঘটে এবং ঘটছে থিয়েটারের ব্যক্তিদের দ্বারা, যে ব্যক্তিরা একটি নির্দিষ্ট ভাবাদর্শের সাংস্কৃতিক পার্শ্বচর। এই পার্শ্বচর বা সাংস্কৃতিক নন্দীভৃঙ্গীদের কাজটাই হচ্ছে নতুন থিয়েটারের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করা এবং থামিয়ে দেওয়া, যেহেতু এরা 'নন্দনতত্ত্বের রাজনীতি' বিষয়ে অজ্ঞ এবং কখনই বুঝতে পারে না বর্তমান সময়কে, যে বর্তমান সময়টিকে অবশ্যই একটি মহাজাগতিক কাল হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে। এরা বুঝতে চায় না পৃথিবীর মানুষ বাস করছে একই সময়ে, একইসঙ্গে, কাছে, দূরে, পাশাপাশি ও বিক্ষিপ্তভাবে। এরা বুঝতে চায় না বা বুঝতে সক্ষম নয় 'বাস্তব ও বাস্তবতা', 'সমকালীন ও সমকালীনতা', 'নির্মাণ ও বিনির্মাণ কাঠামো', 'উত্তরাধুনিক ও উত্তরাধুনিকতা' কিংবা 'উত্তর নাট্যকৌশল'-এর ভেদ, ভেদাভেদ ও ভেদবুদ্ধির তাৎপর্য। এরা গোঁড়া, সনাতন ও প্রচলিত থিয়েটারের মধ্যে বসবাস করে বলেই সমকালীন থিয়েটারের জটিল গতিবিজ্ঞানকে এরা ভয় পায়। এদের মেধা, মগজ ও বুদ্ধিবৃত্তি জড় ও স্থবির হয়ে পড়েছে বলেই এরা বুঝতেই চায় না যে, আমরা বর্তমানে এমন এক সংস্কৃতির মধ্যে বসবাস করছি যেটা আগের তুলনায় আরো বেশি অভিনয় ক্রিয়া সংক্রান্ত, জীবন্ত, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, মিশ্রণ যোগ্য এবং উদ্ধৃতিযোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এরা মেনে নিতে চায় না সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তির মতবিনিময় আমাদেরকে চালিত করছে এমন একটা ভবিষ্যতের দিকে যার সঙ্গে আমাদেরকে সম্পৃক্ত হতে হবে, কল্পনা ও বাস্তবতা, উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি, বস্তুর প্রকৃতি ও টেক্সটের স্থিরতার মাধ্যমে।


সমকালীন থিয়েটার চর্চা ও সমালোচনার ক্ষেত্রে যদি একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে; 'আধুনিক প্রযুক্তির অতি ব্যবহার আপত্তিকর', (না বোঝার ভান করে) 'বুঝতে পারি নি' বা 'বুঝতে অসুবিধা', 'সংলাপ আপত্তিকর', 'ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছে', 'নাটকটি অর্থহীনভাবে উপস্থাপিত', 'নাটকটি বিরক্তিকর' বা 'প্রতীত না' এবং 'নাটকটি বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ', ইত্যাদি বিমূর্ত ও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শব্দের ব্যবহার করে যদি সমকালীন থিয়েটার চর্চাকে বাধা দেওয়া হয় তবে অবশ্যই থিয়েটারের অগ্রযাত্রা লাল ট্রাফিক আলোতে আটকা পড়বে এবং থিয়েটার হয়ে পড়বে অসাড় ও নিশ্চল।

আজকে যারা থিয়েটারের অগ্রযাত্রা ও নতুন থিয়েটারের গতিকে ট্রাফিক সিগন্যালের লাল বাতির মধ্যে আটকে ফেলতে চাইছেন, তাদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা-

আমার নাটকটি এখনই শুরু হতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি একটি গল্প বলতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি একটি প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি একটি বার্তা দিতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি একটি বিষয় সম্পর্কে বলতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি মনোযোগ কেড়ে নিতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি কিছু একটা করতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি একটি সংকেত তৈরি করতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি একটি প্রসঙ্গ তৈরি করতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি প্রত্যাশার জন্ম দিতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি বোঝাপড়ার সৃষ্টি করতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি বিশালতার জন্ম দিতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি বিশ্বের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি একটি অভাববোধ তৈরি করতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি শিক্ষাদান করতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি খুব দ্রুত এগোতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি একটি স্থান তৈরি করতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি সময়কে থামিয়ে দিতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি কর্মকৌশল প্রণয়ন করতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি লুকিয়ে থাকা সবকিছু প্রকাশ করতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে তুলে ধরতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি হোঁচট খেতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি সজোরে আঘাত করতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি নির্যাতন করতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি বিমূর্ত কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি বিপথগামীদের সাহায্য করতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি যোগাযোগ সৃষ্টি করতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি ব্যর্থতাকে আলিঙ্গন করতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি কোনো কিছুতেই পরিণত হতে যাচ্ছে না
আমার নাটকটি বিলীন হতে যাচ্ছে
আমার নাটকটি শেষ হতে যাচ্ছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক