হ্যারিসনের ‘বাংলা দেশ’ ও বায়েজের ‘বাংলার সুর’

শামস্ রহমানশামস্ রহমান
Published : 3 Sept 2021, 07:06 PM
Updated : 3 Sept 2021, 07:06 PM

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ যেমন সংগঠিত হয় বাংলার দুয়ারে, তেমনি ঘটে বিশ্বপরিসরেও। হাতে অস্ত্র, কণ্ঠে 'জয় বাংলা'; অর্থাৎ যন্ত্র ও মন্ত্র, এ দুয়ের সম্পূরক শক্তিতে বাংলার গর্ভে গড়ে ওঠে প্রতিরোধের দুর্গ। হাতে যন্ত্রসংগীত, কণ্ঠে মানবতার গীত – এ নিয়ে 'প্রতিবাদী যুদ্ধে' সংঘবদ্ধ হন বিদেশি বন্ধুরা। জর্জ হ্যারিসন ও জোয়ান বায়েজ সে প্রতিবাদী যুদ্ধের দুই প্রধান যোদ্ধা। বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতা তাদের মনকে স্পর্শ করে। গণহত্যা ও বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন তারা। তুলে নেন গিটার, বাঁধেন গান – জর্জ হ্যারিসন 'বাংলা দেশ' (Bangla Desh) আর জোয়ান বায়েজ 'বাংলার সুর' (Song of Bangladesh)।

১৯৭১ সালের পয়লা অগাস্ট নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে অনুষ্ঠিত অনবদ্য ইতিহাস হয়ে থাকা 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'র সুবর্ণ জয়ন্তী গেল কিছুদিন আগেই। এ কনসার্টের প্রধান সংগঠক প্রাক্তন বিটলস্ তরুন গায়ক জর্জ হ্যারিসনের 'বাংলা দেশ' গানটি ছিল অনুষ্ঠানের শিরোনাম গান –

বাংলা দেশ বাংলা দেশ

হে প্রভু, বীভৎস দৃশ্য এমন দেখিনি কভু।

অকাতরে ঝরে হেথায় সহস্র প্রাণ,

      এগিয়ে এসো হে মানুষ মহান।

তুমি কি বুঝবে না?

মুখ ফিরিয়ে থেকো না

মুক্ত কর হে বাংলা দেশ।

[Bangla Desh, Bangla Desh
Where so many people are dying fast
And it sure looks like a mess
I've never seen such distress
Now won't you lend your hand
Try to understand
Relieve the people of Bangla Desh

  • George Harrison]

কনসার্টটি যখন অনুষ্ঠিত হয়, তখন মুজিবনগর সরকার প্রচণ্ড চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি – আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক, দুই ক্ষেত্রেই। স্বাধীনতা যুদ্ধের গতি তখন যেকোনও দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে একদিকে সৈয়দ নজরুল-তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে যুদ্ধ জোরদার করার প্রচেষ্টা চলছিল স্বাধীনতার পক্ষে। অন্যদিকে খন্দকার মোশতাক চক্রান্ত করছিল স্বাধীনতাকে বিসর্জন নিয়ে পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশনের পথে যাওয়ার। মোশতাকের চক্রান্ত কিসিঞ্জারের 'হোয়াইট হাউজ ইয়ার্স' বইয়ের বর্ণনা থেকেই পরিষ্কার। তিনি লিখেন–

"On July 30, an elected member of the Awami League closely associated with the Bangladesh government in exile, approached our (US) Consulate in Calcutta to say he had been designated to establish contact with the United State." (White House Years, Henry Kissinger, pp. 869-870, 1979)।

এ যোগাযোগ ঘটার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাঝেই ভারত সরকার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে সরাসরি বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পারে।  মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি জন আরউইন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রাষ্ট্রদূত এল কে ঝা-কে জানান, "কলকাতায় যুক্তরাষ্ট্রের কনসুলেট সদস্যরা ইতিমধ্যে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং তারা বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলাপ আলোচনার সম্ভাবনা অন্বেষণ করে দেখছেন"। (মূলধারা'৭১, মঈদুল হাসান, পৃঃ ৯৫-৯৬)। ঠিক এ সময় জর্জ হ্যারিসনের 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' এবং তার গাওয়া 'বাংলা দেশ' শিরোনামের গানটি পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতার চিত্র উন্মোচন করে বিশ্ব দুয়ারে, আর বেগবান করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ।

'কনসার্ট ফর বাংলাদেশের' মূল উদ্যোক্তা জর্জ হ্যারিসন আর পণ্ডিত রবি শংকর। তারা আমাদের কাছে যতটুকু পরিচিত, জোয়ান বায়েজ অপেক্ষাকৃত কম। তিনি একজন সংগীত শিল্পী। তার চেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন মানবাধিকার কর্মী; ষাটের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী কণ্ঠ। গান্ধীর আদর্শের আদলে গড়ে তোলেন – ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব নন-ভায়োলেন্স। যুদ্ধবিরোধী ভূমিকার জন্য দুইবার জেল খেটেছেন তিনি। যুদ্ধের সময় বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বর্বরতার চিত্র তুলে ধরে বাঁধেন 'Song of Bangladesh' (বাংলার সুর) শিরোনামের বিখ্যাত গান – 

'সূর্য যখন অস্ত যায় বেলাশেষে

লক্ষ প্রাণ ঝরে পড়ে নিমিষে

বাংলাদেশে, বাংলাদেশে

বাংলাদেশে, বাংলাদেশে'। 

[Bangladesh, Bangladesh
Bangladesh, Bangladesh
When the sun sinks in the west
Die a million people of the Bangladesh

                                           –  Joan Baez]

এভাবে ছোট ছোট শব্দের মাঝে তুলে ধরেন একাত্তরের নৃশংসতার চিত্র। যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের তরুণ শিল্পীদল যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শিবির এবং শরণার্থী শিবিরে 'মুক্তির গান' গেয়ে সবল রেখেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল, তেমনি জোয়ান বায়েজও 'বাংলার সুর' গেয়ে বেড়িয়েছেন বিশ্বের শহরে-বন্দরে, আর এমনি করে জনমত গড়ে তোলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে। 

Song of Bangladesh (বাংলার সুর) গানের প্রধান একটি পঙ্ক্তি – 'When the sun sinks in the west'। এখানে 'west' শব্দটি তাৎপর্যপূর্ণ। '… in the west' না হয়ে কী হতে পারতো '… in the East?' প্রকৃত অর্থে – 'সূর্য যখন বেলা যায় পূর্বে (পাকিস্তানে)', হানাদার বাহিনীর আঘাতটা আসে তখনই – রাতের গভীরে অন্ধকারে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় তাতে নিমিষেই ঝরে পড়ে লক্ষ প্রাণ। যদি শব্দটি 'East' হতো, সাহিত্যের বিবেচনায় তা হতো একান্তই প্রচ্ছন্ন হত তাতে। সেই সাথে সৌর জগতের লক্ষ-কোটি বছরের রীতি-নীতি বর্জিত হত। আর যদি শব্দটা 'west'-ই হয়ে থাকে, তবে কি এই 'west', ক্যাপিটাল 'W' এ লেখা, যে 'West' এর মানে পশ্চিমা বিশ্ব। 

সেদিন পশ্চিমা বিশ্বে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সত্যি অস্ত গিয়েছিল সূর্য। আজ আর করো অজানা নয় যে নিক্সন-কিসিঞ্জারের প্রশ্রয়েই নিশ্চিত হয়েছিল লক্ষ প্রাণ ঝরে পড়া। গ্যারি ব্যাসের 'দ্য ব্লাড পেলিগ্রাফ: নিক্সন, কিসিঞ্জার অ্যান্ড আ ফরগটেন জেনোসাইড' বইটি তার উজ্জ্বল সাক্ষী। পাকিস্তানে (ইসলামাবাদে) যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ড ২৫ মার্চের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডকে 'the brutal, ruthless and excessive use of force by Pak military' (পৃ ৬৩) আখ্যায়িত করে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে তারবার্তা পাঠান। অন্যদিকে, পূর্ব পাকিস্তানে (ঢাকায়) যুক্তরাষ্ট্রের কনসুলেট আর্চার ব্লাড এ বর্বরতাকে বর্ণনা  করেন 'Selective Genocide' (পৃ ৫৮) হিসেবে। তারপরও যুক্তরাষ্ট্র সরকার তথা নিক্সন-কিসিঞ্জার আমলে নেননি। বরং কিসিঞ্জার বিদ্রূপের স্বরে নিক্সনের কাছে মন্তব্য করেন – 'That Consul in Dacca doesn't have the strongest nerves' (পৃ ৬৫)। তাহলে নিঃসন্দেহে বলা যায় – 'Nixon and Kissinger supported Pakistan's military dictatorship as it brutally killed hundreds of thousands of people and sent ten million refugees … one of the worst humanitarian crises of the twentieth century'।

ভবিষ্যত মানবজাতির কথা ভেবে, শুধু বাংলাদেশে নয়, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, চিলির গণহত্যার জন্য কিসিঞ্জারের বিচার হওয়া উচিত কি? ক্রিস্টোফার হিচেনস তার গ্রন্থ 'দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার' এ বিশদ ব্যাখ্যা করেছেন ঠিক কোন কোন কারণে কিসিঞ্জারকে বিশ্ব আদালতে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় এবং কেন তা করা অত্যবশ্যক। 

জর্জ হ্যারিসনের 'বাংলা দেশ' (Bangla Desh) আর জোয়্যান বায়েজের 'বাংলার সুর' (Song of Bangladesh) এর মাঝে শব্দ ব্যবহার ও ভাষার বিন্যাসে ভিন্নতা অনেক। জর্জ হ্যারিসনের ভাষা মূলত আবেদনমূলক। জোয়্যান বায়েজের ভাষায় শুনি ধিক্কারের ধ্বনি। জর্জ আবেদনের কণ্ঠে গান –

'তুমি কি বুঝবে না?

মুখ ফিরিয়ে থেক না

মুক্ত কর হে বাংলা দেশ'।

[… won't you lend your hand
Try to understand
Relieve the people of Bangla Desh

        • George Harrison]

জোয়ানের একই বক্তব্য হলেও ভাষা অনেক কঠিন। তিনি গান-

পাশ ফিরে দাঁড়াই আমরা আবার,

ক্রূশবিদ্ধ হয় যখন সমাজ-সংসার'।

[Once again we stand aside
And watch the families crucified

–  Joan Baez] 

একাত্তরে এমনই ঘটেছিল। সীমাহীন নৃশংসতার পরেও বিশ্বের অনেক দেশের সরকার ও প্রশাসক ছিল প্রায় নির্বাক। বিশ্ব জনমত পক্ষে থাকলেও, প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতসহ অল্প কয়েকটি দেশের প্রশাসনই (সরকার) কেবল সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়। সমস্ত মুসলিম বিশ্ব ছিল আমাদের বিরুদ্ধে। আঞ্চলিক রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষার অজুহাতে সেদিন চীনের মত দেশও নিয়েছিল বর্বরের পক্ষ।  

অনেকে বলে, ভারতের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার পেছনে তাদের স্বার্থ ছিল। অবশ্যই ছিল। তাই বলে নিশ্চয়ই বাংলাদেশের এক কোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়ে অন্যায় করেনি। অন্যায় করেনি, বাংলাদেশের প্রবাস সরকারকে সাহায্য-স্বীকৃতি দিয়ে। নিশ্চয়ই অন্যায় করেনি, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমাদের সহযোগিতা করে। ভারত অবলম্বন করে 'zero-sum-game' এর স্থলে 'win-win' এর কৌশল, যা নিঃসন্দেহে উৎকর্ষ পন্থা। 'win-win' এর ক্ষেত্র তৈরি, কৌশল অবলম্বন ও তার প্রয়োগে চ্যালেঞ্জ অনেক। একাত্তরে ভারত এ চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে পেরেছিল। এ কৌশল অবলম্বনে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ব্যর্থ  হয়েছে বারবার। ভিয়েতনাম, ইরাক, আফগানিস্তান থেকে শুরু করে উদাহরণ বহু। প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের স্বার্থ সঙ্গায়িত করেছে 'zero-sum-game' এর আঙ্গিকে। অথচ, 'win-win'এর জন্য মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বনের প্রয়োজন।

জর্জ হ্যারিসনের 'বাংলা দেশ' গানের পরের স্তবকগুলিও একইভাবে আবেদনের সুর ফুটে। জর্জ গান –

'ঘটেছে বহু দূরে

পৃথিবীর অন্য প্রন্তরে

তবুও যায় না ফেলা

ব্যাথা যায় না ভুলা 

[Though it may seem so far
From where we all are
It's something we can't reject
That suffering I can't neglect 

        • George Harrison]

অন্যদিকে, জোয়ান বায়েজের 'বাংলার সুর' গানটির ভাষা অনেক স্পষ্ট। বাংলাদেশ শুধুই পৃথিবীর যে কোন একটি ভূখণ্ড নয়। এ ভূখণ্ডের ইতিহাস প্রাচীন, আর তার মানুষগুলো দেশ ও মানুষের জন্য আত্মত্যাগে বিশ্বাসী। জোয়ান গান – 

এদেশের জল মাটি আশ,

সোঁদা গন্ধ বাতাস,

        বীরত্বে গাঁথা ইতিহাস,

      নতুন করে দিচ্ছে নাড়া।

  'মানি না মধ্যযুগীয় অন্ধ শাসন' –

     উচ্চারণে মুষ্ঠিবদ্ধ দাঁড়ায় সবে;

           আত্মত্যাগে জন্ম নেবে

                     মাতৃভূমি তবে।

[The story of Bangladesh
Is an ancient one again made fresh
By blind men who carry out commands
Which flow out of the laws upon which nation stands
Which is to sacrifice a people for a land

–  Joan Baez]

যদিও নিক্সন ও কিসিঞ্জার ইয়াহিয়া তথা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সাহায্য সহযোগিতা এবং প্রশ্রয় দিয়েছে, তবে মার্কিন প্রশাসনিক কাঠামোতে বাংলাদেশের মানুষ ও সংগ্রামকে দেখা হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে।  বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের ডাকের পর কিসিঞ্জার ধারণা করেন, বাঙালির সংগ্রামকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। তিনি বলেন – '[Mujib]  Rahman has embarked on a Gandhian-type non-violent non-cooperation campaign which makes harder to justify repression; and … the West Pakistanis lack the military capacity to put down a full scale revolt over a longer period' (Gary Bass, 2013, p. 31)।  সিআইএ-র মূল্যায়ন ছিল ভিন্ন। তাদের মতে এ গৃহযুদ্ধ 'very bloody' হবে, তবে, 'the Bengalis are not fighters', (p. 66), তাই  পাকিস্তান সেনাবাহিনী এ আন্দোলন দমনে সক্ষম হবে। অন্যদিকে, পাকিস্তানে (ইসলামাবাদে) নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ড এর মূল্যায়ন ঠিক উল্টো। তার মতে, বাঙালির ওপর যত নিষ্ঠুর, নির্মম অত্যাচার আর হত্যাকাণ্ড চালানো হোক না কেন 'The Bengalis would not accept rule by bullet' (Gary Bass, p. 63)। পরবর্তীতে কিসিঞ্জার ধারণা বদলায় এবং নিক্সনকে আশ্বস্ত করেন এই বলে যে – 'সবকিছু ইয়াহিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং বিচ্ছিন্নবাদী সংগ্রাম দমাতে পারবে। সিআইএ-র মত তারও একই মূল্যায়ন – 'The Bengalis aren't good fighters I guess' (Gary Bass, পৃ ৫৭)। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে ফলাফল কি তা আমাদের জানা।  

জোয়ান বায়েজ 'বাংলার সুর' পঙ্ক্তি গেয়ে যান – 

'ওরা আসে অস্ত্র হাতে

মধ্যরাতে;

শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে যখন জাতি;

কাপুরুষের ঘাতে

    কেঁপে উঠে নিশ্চুপ বসতি;

ভিজে উঠে রক্ত-লালে জন্মভূমি মাটি'

[And the students at the university
Asleep at night quite peacefully
The soldiers came and shot them in their beds
And terror took the dorm awakening shrieks of dread
And silent frozen forms and pillows drenched in red

        • Joan Baez]

হ্যা, এটা সত্য, পৃথিবীতে খুব কম দেশই আছে যারা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে, দিয়েছে স্বাধীনতার জন্য। বছরের পর বছর যুদ্ধ করেও, লক্ষ ফোটা রক্ত ঝরিয়েও পারেনি তামিল, স্পেনের বাস্ক কান্ট্রি কিংবা উত্তর আয়ারল্যন্ড। আমাদের পন্থা বা কৌশল যদি শুধু সশস্ত্র সংগ্রাম হত, তাহলে কি আমরা স্বাধীনতা অর্জনে সফল হতাম? নাকি শুধুই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে পরিগণিত হয়ে তামিল কিংবা উত্তর আয়ারল্যন্ড মত অবস্থা হত? আর যদি শুধু গণতান্ত্রিক পন্থায় চেষ্টা হত, ব্যর্থতা অনিবার্য ছিল। নিকট অতীতের স্পেনের কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলন একটি দৃষ্টান্ত। পৃথিবীতে খুব কম দেশই আছে যারা গণতান্ত্রিক-সশস্ত্র সংগ্রামের সম্মন্বয়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছে। এটা আমাদের বিশাল গর্বের জায়গা। আমাদের প্রজন্মও যেন তা ধারণ করে, তার দিকে মনোযোগী হওয়া বিশেষ প্রয়োজন।

'বাংলার সুর' এর পরের স্তবকগুলিতে ফুটে ওঠে ভারতে শরণার্থী শিবিরে কিংবা শরণার্থী শিবিরের পথে 'যশোর রোডে'র (অ্যালেন গিন্সবার্গ এর কবিতা – সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড) কোথাও মা ও শিশুর সাদা-কালো স্থির ছবি। 

জোয়ান বায়েজ গেয়ে যান – 

'দেখ, ষোড়শী মায়ের দৃষ্টিহীন দৃষ্টিতে,

ব্যাধিতে জর্জরিত শিশু তার

ভেজে আষাঢ়ের বৃষ্টিতে'।

[See a teenage mother's vacant eyes
As she watches her feeble baby try
To fight the monsoon rains and the cholera flies

  • Joan Baez]

জোয়ান বায়েজের 'বাংলার সুর' গানের লাইনের ভেতর এতোদিন পরেও বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রেক্ষাপটের কি অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়! শুধু ভৌগোলিক অবস্থানই ভিন্ন। একাত্তরে বাঙালির মতো লাখ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যার শিকার হয়ে আজ বাংলাদেশে। এ কেবল বাংলাদেশ সরকার বা বাংলাদেশের মানুষের দায়িত্ব নয়, এ বিশ্ব মানবতার দায়িত্ব। বিশ্ব জনমত গঠনে আজও কেউ এগিয়ে আসেনি। আজ জর্জ হ্যারিসন, জোয়ান বায়েজের মতো কাউকে আমাদের প্রয়োজন। 

'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' এর প্রারম্ভে পণ্ডিত রবি শংকর বলেছিলেন – 'আমরা শিল্পী। মানবিক দায়বদ্ধতায় এগিয়ে এসেছি। আপনারাও আসুন, দেখুন, বাংলাদেশের সহায় সম্বলহীন মানুষের করুণ দৃশ্য'। রবি শংকরের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের পরপরই সেতার-সরোদে ধ্বনিত হয় 'বাংলার ধুন' যা দর্শক-শ্রোতাদের আকৃষ্ট করে। জর্জ হ্যারিসন-জোয়ান বায়েজের উদ্যোগ প্রমাণ করে – শাসক যেখানে বর্বর, শাসন যেখানে মানবতাবিরোধী আর শাসনের রাজনীতি যেখানে সৃজনশীলতাকে করে অপরাধী – সেখানে শিল্পীদের পক্ষে রাজনৈতিক 'সমদূরত্ব' মেনে চলা হবে আত্মবিধ্বংসী। মুক্ত চিন্তা, সুষ্ঠু শিল্পচর্চা-সাহিত্যকর্ম, এক কথায় সৃজনশীলতা বিকাশের পূর্ব সর্তই হচ্ছে সঠিক রাজনৈতিক পরিবেশ প্রবর্তন। বলাবাহুল্য, মুক্ত মনে রবীন্দ্র-নজরুল চর্চা, এমনকি প্রাণ খুলে 'ভাষার গান' গাওয়া সম্ভব হয়েছে কেবল স্বাধীনতা উত্তর রাজনৈতিক পরিবেশে।

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: জর্জ হ্যারিসনের 'Bangla Desh' ও জোয়ান বায়েজ এর 'Song of Bangladesh' গান দুই টির অনুবাদ করেছেন প্রবন্ধের লেখক।) 

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক