জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কোর্সে বাধ্যতামূলক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইতে ভুল তথ্যের দায় কার?

এম এম আর জালাল
Published : 9 July 2018, 09:26 AM
Updated : 9 July 2018, 09:26 AM

সম্প্রতি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৯তম একাডেমিক কাউন্সিল কর্তৃক অনুমোদিত স্নাতক (পাস ও সম্মান) শ্রেণির সকল ধারার শিক্ষার্থীদের জন্য ১০০ নম্বরের বাধ্যতামূলক সাবজেক্ট চালুর সিদ্ধান্ত হয় এবং একটি পাঠ্যবইও তৈরি করা হয়েছে। এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটি বইতে যদি ভুল তথ্য থাকে তাহলে সকল ছাত্রছাত্রীরা ভুল ইতিহাস শিখবে। যার পরিণতি হবে ভয়াবহ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা
বইয়ের "বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা" অংশে প্রথম প্যারাতে লেখা আছে "বঙ্গবন্ধু বন্দি হওয়ার পূর্বেই চট্টগ্রামস্থ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব এম.এ. হান্নানের নিকট স্বাধীনতার ঘোষণা বাণী প্রেরণ করেন।" (ছবি -১)। এই রকম একটা তথ্য ইতিহাসের অধ্যাপকবৃন্দ কোথায় পেলেন! এটা একটা ভুল তথ্য ।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস গ্রন্থের পৃষ্ঠা

হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পাদিত), বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র । ৩য় খণ্ডে

দ্বিতীয়ত, বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্য ডঃ হারুন-অর-রশিদকে। উল্লেখ্য, তিনিই বইয়ের অনুমোদনকারী।

বইটির নাম "স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস"।
লেখক বৃন্দ ১। ডঃ মুনতাসীর মামুন ও ২। ডঃ মোঃ মাহবুবুর রহমান।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা
বঙ্গবন্ধু বন্দি হওয়ার পূর্বেই চট্টগ্রামস্থ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব এম.এ. হান্নানের নিকট স্বাধীনতার ঘোষণা বাণী প্রেরণ করেন। বাণীটি স্বাধীন। দলিলপত্র তৃতীয় খণ্ডে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে (পৃ.১)। বাণীটি নিম্নরূপ :
"This may be my last message. from today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.

বাংলা অনুবাদ এর বেলায় কোন সূত্র উল্লেখ করা হয়নি। বাংলা অনুবাদ কি লেখকের নিজেদের করা ?
(বাংলা অনুবাদ) : আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। এই আমার শেষ কথা । যে যেখানেই থাকুন না কেন সকলের প্রতি আমার আবেদন রইল, যার কাছে যা আছে তাই নিয়ে দখলদার বাহিনীর মোকাবিলা করুন এবং বাংলার মাটি থেকে পাক দখলদার বাহিনীকে সমূলে উৎখাত করে চূড়ান্ত বিজয় না-হওয়া পর্যন্ত লড়ে যান।
হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পাদিত), বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র । ৩য় খণ্ডে ,
নিচের ছবিটি   দেখুন,  এখানে বাংলা অনুবাদ নাই ।


হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পাদিত), বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র । ৩য় খণ্ড

এছাড়া সংবিধান-এ যে বাংলা অনুবাদ আছে তার সাথেও মিল নাই ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা
২৭ মার্চ কালুরঘাটে স্থাপিত স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র (পরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ) থেকে মেজর জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এই ঘোষণাটিও স্বাধীনতার দলিলপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে পাদটীকায় মন্তব্য করা হয়েছে যে, "মেজর জিয়াউর রহমানের ২৭ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের ঐতিহাসিক মূল কপিটি নিরাপত্তার কারণে নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল। মেজর জিয়া পঠিত ঘোষণাপত্রটি ছিল নিম্নরূপ :
Major Zia, Provisional Commander-in-Chief of the Bangladesh Liberation Army hereby proclaims, on behalf of Sheikh Mujibur Rahman, the independence of Bangladesh,
I also declare, we have already framed a sovereign, legal government under Sheikh Mujibur Rahman which pledges to function as per law and the constitution. The new democratic Government is committed to a policy of non-alignment in international relations. It will seek friendship with all nations and strive for international peace. I appeal to all government to mobilize public opinion in their respective countries against be brutal genocide in Bangladesh. The Government under Sheikh Mujibur Rahman is sovereign legal Government of Bangladesh and is entitled to recognition from all democratic nation of the world.'
পাক সেনাবাহিনীর অঘোষিত যুদ্ধের প্রতিবাদে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে যে স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয় তা চলে নয় মাস । অতঃপর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়ে বিজয় অর্জন করে ।
এখানে লক্ষ্য করুন বলা হচ্ছে " মেজর জিয়া পঠিত ঘোষণাপত্রটি ছিল নিম্নরূপ :" কিন্তু আমরা দেখছি "Major Zia, Provisional Commander-in-Chief of the Bangladesh Liberation Army hereby proclaims, on behalf of Sheikh Mujibur Rahman, the independence of Bangladesh," ।
ইংরেজি ঘোষণার প্রথম প্যারাটি শুরু হয়েছে Major Zia দিয়ে। শুরুতে ইংরেজি "I" অক্ষরটি নেই। (যদি থাকতো, I Major Zia" – তাতে অর্থ হতো "আমি মেজর জিয়া')। তাছাড়া একই বাক্যে hereby proclaims লেখা – এতে বোঝা যায় এই অংশটি একজন তৃতীয় ব্যক্তির বক্তব্যের আকারে গঠিত হয়েছে। First person হিসেবে বক্তব্যটি থাকলে হবার কথা ছিলো "hereby proclaiming" বা এরকম কিছু।
আবার দ্বিতীয় বাক্য শুরু হয়েছে "I" অক্ষর দিয়ে। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে এটি first person এর মত করে বর্ণিত। তাহলে দুটো বিষয় পরস্পর সাঙ্ঘর্ষিক।
দলিল এর বিজ্ঞ সম্পাদকবৃন্দ এবং চার গবেষক তাহলে ওনারা কী গবেষণা করলেন? তাদের একজন গবেষক তো টেলিভিশনে অনেক বড় বড় গবেষণার কথা বলেন এই দলিলের উপর।

হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পাদিত), বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র । ৩য় খণ্ডে ;

এছাড়া দলিলে সূত্র হিসেবে লেখা আছে " স্বাধীন বাংলা বেতার প্রচারিত অনুষ্ঠান মালার টেপরেকর্ড , ২৭ মার্চ ১৯৭১ ; দি স্টেটসম্যান । দিল্লী ,২৭ মার্চ, ১৯৭১ ।"
এখানেও আমরা দেখি প্রথম সূত্র " স্বাধীন বাংলা বেতার প্রচারিত অনুষ্ঠান মালার টেপরেকর্ড , ২৭ মার্চ ১৯৭১" এর কোন টেপ আমাদের জানামতে কোথাও নাই । থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র , ৫ম খণ্ডে " টেপ থেকে উদ্ধৃত ", ২৬-৩০ মার্চ, ১৯৭১ এ পৃষ্ঠা ১ – ১২ তে এই জাতীয় কোন লেখা নাই কেনো ? ,


হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পাদিত), বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র । ৫ম খণ্ডে ;

আর অন্য সূত্র "দি স্টেটসম্যান । দিল্লী ,২৭ মার্চ, ১৯৭১" তো কোনভাবেই হতে পারে না কারণ ২৭ মার্চ কালুরঘাটে স্থাপিত স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র (পরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ) থেকে মেজর জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। পত্রিকাতে উঠলে তো ২৮ তারিখের পত্রিকাতে আসবে। আমাদের কাছে "দি স্টেটসম্যান , দিল্লী ,২৭ মার্চ, ১৯৭১" , পত্রিকাটি আছে । সেখানে মেজর জিয়াউর রহমান এর কোন নাম নাই ।

এখানে স্পষ্ট ভাবে বলা যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র , ৩য় খণ্ডে মেজর জিয়াউর রহমান এর ২৭ মার্চ, ১৯৭১ এর যে টেক্সট লেখা আছে তার কোন সঠিক সূত্র নাই।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কোর্সে বাধ্যতামূলক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইতে ভুল তথ্যের দায় কার? এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষন করছি।

সূত্র – হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পাদিত), বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র । ৩য় এবং ৫ম খণ্ড, ।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক