স্মার্ট, স্মার্টার, স্মার্টেস্ট

মোহাম্মদ কাজী মামুনমোহাম্মদ কাজী মামুন
Published : 12 June 2022, 07:43 AM
Updated : 12 June 2022, 07:43 AM


আপনার স্পেস দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। দয়া করে ক্লিন করুন।
আমার স্মার্টফোনটা। একের পর এক বার্তা দিয়ে যাচ্ছিল। একদিন তো বলল, তুমি বিপদসীমার খুব নিকটেই অবস্থান করছো। প্রমাদ গুনি আমি – এত অত্যাচার করছি, খাটিয়েছি; আর মনে হয় সইতে পারছে না। দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই, কখন যে বার্স্ট হয়ে যায়। সে ছিল আমার দুরন্ত ঘোড়া, তার উপর জবরদস্তির যেন অবারিত অধিকার আমার – তাই যত বেশী বোঝা চাপানো যায় চাপাই, এমনকি কোণা-কাঞ্চিটুক পর্যন্ত রাখি না ফাঁক, সমূলে উসুল করে নিতে পারলেই যেন আমার সুখ। এক সাথে অনেক বই, অনেক ওয়েব লিংক, গান – সব চালিয়ে দেই। যখন তখন তাকে ধরে বেঁধে নিয়ে যাই যেখানে সেখানে – এতটুকু সন্মান না দিয়ে, ফেলি রাখি যত্র তত্র অযত্নে- অবহেলে, ইচ্ছেমত ব্যবহার করি তার সাথে, তাকে। কিন্তু তারও তো একটা শরীর, সে তো আর ঈশ্বর নয়!

একবার এক টেকনিশিয়ান বলেছিল, ইলেকট্রিক জিনিস ফেলে রাখলে নষ্ট হয়ে যায়। একে যত ব্যবহার করবেন, তত সে ভাল থাকবে। কিন্তু আমার স্মার্টফোনটা নিজেকে হয়ত আরো কিছু মনে করে নিয়েছিল। তার আশা- আকাঙ্ক্ষাকে মনে হয় গলা টিপে ধরেছিলাম আমি, তাই সে শ্রী হারাতে থাকে দ্রুত, দগদগে ঘা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেহে, মাছের ঝোল, ফলের রস আর সিগারেটের ছাই মিলে হলদেটে ফোড়া সব, এখন আর ঘষলেও উঠে না। ব্যথার চোটে স্বচ্ছ কাঁচের চোখ ঝাপসা হয়ে যায়, স্বেতি রোগিদের মত ফ্যাকাশে আর বিবর্ণ হয়ে যায় তার দেহ, মাথায় শুরু হয় গোলমাল। একটা কমান্ড করলে কি যেন সে আকাশপাতাল চিন্তা করে। আইকনগুলিতে এত করে কড়া নাড়ি, টোকা দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে যাই, কিন্তু সে যেন শুনতে পায় না ঠিকঠাক, অথবা, বুঝতে পারে না। তাকে দেখে কেন যেন মনে হয়, সে ভুলে গেছে কাজগুলো অথবা কি করে করতে হয় সেগুলো।

আমি কিছুটা সম্বিৎ ফিরে পাই। বেশী অত্যাচার হয়ে গেছে বুঝতে কিছুটা ধীরে সয়ে চলতে থাকি, স্মার্ট ফোনটির সাথে দেয়া নোট বুক থেকে 'ডু'স' আর 'ডোন্ট'স' গুলো দেখে নেই, সতর্কতার সাথে অনুসরণ করতে থাকি। কিন্তু কঠিন অসুখ বাঁধিয়েছে সে, সেরে উঠার কোন লক্ষণ নেই। মাঝে মাঝে মনে হয়, এইতো বেশ সেরে উঠেছে, কমান্ডগুলো ঠিক ঠাক বুঝতে পারছে, আবার পরক্ষণেই সব কিছু কেমন এলোমেলো হয়ে যায় তার। আমি হতাশায় মুষড়ে পড়ি। দিন দিন আরো স্লথ হয়ে পড়ে, তার বাটনগুলো যা সাংঘাতিক টাইটফিট ছিল, সেগুলো কেমন ঢিলে হতে থাকে দিন দিন। ভাঁজ পড়ে দেহের মসৃন চামড়ায়, আলগা হয়ে যেতে থাকে সেই একহারা দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলি, ঝুলে পড়ে মুখশ্রী। আমার আর চলছিল না। এই দ্রুতগতির জীবনে, এই স্মার্ট দুনিয়ায় কাঁহাতক সম্ভব এত্ত আনস্মার্ট একটা পদার্থকে এভাবে বয়ে বেড়ানো?

পরিকল্পনা করি, আর পনের দিনের মাথায় বেতনটা ঢুকলে সেখান থেকে পেছনের দেনা শোধ করে ক্রেডিট কার্ডের জিরো ইন্টারেস্ট সিস্টেমে একটা স্মার্টার ফোন ঘরে নিয়ে আসবো। হাতে টাকা নেই, না হলে কালবিলম্ব না করে নগদই নিয়ে আসতাম। সত্যি টাকা নেই, না হলে এই শয়তান বাজাটাকে এভাবে পুষি আমি! সবটুকু সমবেদনা আমি নিমিষে হারাই, সেখানে এখন নারকীয় ক্রোধের দামামা। ফোনটার দিকে কিছুক্ষণ এক নাগাড়ে চেয়ে থাকি আমি, ফোঁড়াগুলো আরও বড় হয়েছে, সেখান থেকে ধাতব পুঁজ গুড়ো গুড়ো হয়ে পড়ে, দেখে গা ঘিন ঘিন করে উঠে আমার! কিন্তু এক্ষুনি ছেড়ে দিচ্ছি না বাপু তোমাকে! শেষ যে কটা দিন থাকবে, বাদবাকী যা আছে তোমার, সব নিংড়ে নেব আমি, খুবলে খুবলে খাব… অস্থি-মজ্জা, এমনকি এক ফোটা রক্ত পর্যন্ত নিয়ে যেতে দেব না পরপারে! তো অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলাম, কিন্ত মরার ইচ্ছে তার ছিল না, সে রয়ে যায় আর তিল তিল করে সয়ে যায়। আমার মনে হত লাগল, সে মতলব করেছে, ধুঁকে ধুঁকে হলেও সে থেকে যাবে আমার সাথে আর জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে আমার জীবনটা।

অবশ্য আমি এইসব ভগি জগিতে একদম টলি না; দিন-তারিখ-ক্ষণ মেপে নতুন সেট নিয়ে এলাম ঘরে, অনেক দোকান খুঁজে খুঁজে – অত্যাধুনিক, সুশ্রী , মসৃন, মেদহীন, হাতের আংগুলগুলো দিয়ে কিলবিল করা যায়, যেমন ইচ্ছে তেমন। তাকে হাতের উপর তুলে নিলে, তার পাতলা দেহখানা গলে মিশে যায়, তাকে কানের কাছে রেখে ঘাড়ের উপর শুইয়ে রাখা যায়, শোনা যায় কথা, গান, আর তার বুকের ধুকধুকানি। আমি অনেকদিন পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি, আনন্দে গদগদ হই, নিশ্চিত কোন পূণ্য করেছিলাম বা দোয়া ছিল কোন মুরুব্বির, নাহলে একটা উত্তম জিনিস এই বাজারে খুঁজে পাওয়া!! এই ফোনটা আগেরটা থেকে ফার বেটার, যেমনটা আমি চেয়েছিলাম। একে স্মার্ট না বলে স্মার্টার বলাই শ্রেয়। আমি শপথ করে বলতে পারি, মানুষ চোখ সরাতে পারবে না, জনে জনে কথা হবে একে নিয়ে।

কিন্তু নতুন ফোনটা ঘোমটা তুলতে একটু বেশীই দেরী করে ফেলছে মনে হয়। যখন হাত বুলাতে শুরু করি, তখন সে যে সাড়া দেয় না, তা নয়; তবে তার সাড়াগুলো যেন কেমন কেমন! উল্টা-পালটা, পাগলা কিসিমের! পুরনো বন্ধু মিনা অনেকদিন পর ফোন দিয়েছিল, সে অনেকদিন দেশের বাইরে। কথায় কথায়, আমাদের আরেক বন্ধু মুন্নির কথা জিজ্ঞেস করলো। তাকে মুন্নির নাম্বারটা সেন্ড করার আগে তার বিদেশী নাম্বারটা সেভ করতে বসি। কিন্তু এত সুন্দর যন্ত্রটার ভেতরটা ভীষণ জটিল, প্রতিটা কলকব্জায়, প্রতিটা মোচরে প্যাঁচ; চাইলেই কোন নতুন নাম সেভ করা সম্ভব নয়, অনেক কিছু বলতে হয়, লিখতে হয়। তো বিরক্তির মাথায়, মিনাকে মুন্নি নামে সেভ করে ফেলি। এরপর শুরু হয় আর এক হ্যাপা। অনেক খোঁচাখুঁচি করে ডিলিট অপশান পাওয়া গেল বটে, ডিলিট হলও বটে, কিন্তু যেই লাউ, সেই কদু – মিনা এখনো মুন্নি রয়ে গেছে, সে একটি সাময়িক বিভ্রম সৃষ্টি করেছিল মাত্র, স্থায়ীভাবে ডিলিট করেনি আমার আদেশমত। কাহিনি এখানেই শেষ না … এরপর সে আমায় অপশান দেখালো, চাইলে ঐ নাম্বারটিকে আমি দুটো নাম দিতে পারি, মানে, একবার পুঁতেছো তো, আর উপড়াতে পারবে না কোন নাম্বার। কি বিদ্ঘুটে ব্যাপার! কিন্তু আমি ধৈর্য হারাই না। নিজেকে সান্ত্বনা দেই, প্রথম প্রথম তো! একটু সময় নেবে অভ্যস্ত হতে।

কিন্তু সে যেমন ছিল, তেমনই রয়, স্বভাবচরিত্র একটুও বদলায় না। আমি কত না যত্নে আংগুল সঁপে দেই তার গায়ে, কোন বার্তা দিতে, কথা বলতে, লিখতে, দেখতে… কিন্তু সে একটা থেকে আরেকটা প্রোগ্রামে চলে যায়। এত ফাস্ট সে! তার গতির সাথে আমি পাল্লা দিয়ে উঠতে পারি নে। তাতে সার্চ দিয়ে নাম সিলেক্ট করে এক মেসেজ শতজনকে পাঠানো যায় না, ঘন্টায় ঘন্টায় সিম বদলানো যায় না, তাতে দুইরকম সিম থেকে একজনকে মেসেজ করা যায় না, দুইটা সিম রাখলে সে-ই ঠিক করে দেবে কোনটি কোন কাজের জন্য – এত্ত সেয়ানা সে। তবে নিজে ফাস্ট হলে কি হবে, তার ইউজার ফাস্ট হোক, এটি তার চাওয়া নয় – বার্তা একটির উপর আরেকটি কপি করতে গেলে সে মাইন্ড করে, যেন বলতে চায়, একটু রয়ে সয়ে বাবা! আমার স্মার্ট বন্ধুরা বলে, এই যুগের স্মার্ট ফোন সে, অত্যাধুনিক ভার্সান, তাই সে ধরে নেয়, তার ব্যবহারকারী হবে খুব খুব স্মার্ট, টাইপে কোন ভুলচুক করবে না, তাই এডিটিং অপশানগুলো ইচ্ছে করেই কঠিন করে দেয়া হয়েছে। আমি অবশেষে বুঝতে পারলাম, শান্তিতে ঘর করতে হলে, তাকে নিয়ে মুচড়ামুচড়ি বা গবেষনা চলবে না, সে যেইভাবে সেবা দিতে চায়, সেইভাবে নিতে হবে। আর তাতে তাকে দোষ দেয়ারো তো কিছু নেই… সে তো আর সেধে সেধে বলেনি, আমায় গ্রহণ করো… আমিই না তাকে বেছে নিয়েছি নিজের পছন্দমত। তার ব্যবহার বিধি, বুকে লেখা সেইসব ফর্দ, কে দেখতে গিয়েছে! আমি তো তাকে দেখেই ভালবেসে ফেলেছিলাম – কিন্তু এসব কাকে বলব? আর বললে শুনছেটাই বা কে? সুতরাং, নতুন স্মার্টফোনটার বাঁধা আচলে জীবন বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলাম।

কিন্তু দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছিলাম। আমি কিছুটা ফাস্ট ছিলাম সত্য, তাই কি নিজে ফাস্টার হয়ে আমায় টাইট দেয়ার তালে থাকে সে অনুক্ষণ? মাঝে মাঝে তাকে দেখে মনে হয়, হাসছে, বিজয়ীর – আমি সইতে পারি না। ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা হয় আমার। একদিন টিকতে না পারে পুরোনো স্মার্ট ফোনটাকে কবর থেকে টেনে তুললাম। কয়েকদিন বিক্রির জন্য ঘুরাঘুরি, ধরাধরি করেছি। নাম মূল্যেই ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম, ঘরে একটা বোঝা রেখে আর লাভ কি! কিন্তু নাম মাত্র মূল্যেরও একটা নাম থাকে, মানুষ প্রায় ফ্রিতেই নিতে চাইছিল। আর সে খানিকটা অপমান জনক, গায়ে বিঁধে … আমি তাকে একটি পুরনো বাক্সে শুইয়ে দিয়েছিলাম জোর করে, জায়গা হচ্ছিল না, তবু অনেকটা দুমড়ে মুচড়েই রাখলাম, কাগজের বাক্সটা ক্যা ক্যা শব্দ করছিল।

কিন্তু সেই ছিল আমার সত্যিকারের স্মার্ট ফোন… না ভুল হচ্ছে, স্মার্ট বললে তাকে অপমান করা হয়, সেই ছিল স্মার্টেস্ট। আমার সেই ফোনটার একটা জীবন ছিল, সে আমার কথা শুনতো, আমায় বুঝতো। সে যে আমাকে চিনতে পারত, বিশ্বাস হয় না? হাতে নিলে টের পেতেন, কেমন গাইগুই করছে! তার একটা ভাষা ছিল – আমি বুঝতে পারতাম; তার একটা আলতো স্পন্দন – সে শুধু আমার কাছেই ধরা দিত। তারও ছিল চাওয়া-পাওয়া, আমায় সে মুখ ফুটে বলেনি, কিন্তু আমি জানতাম, আমি তার কান্না অনুভব করতে পারতাম। কিন্তু কি যে হল! কি করে এতটা অমানুষ হয়ে গিয়েছিলাম?

এবার যখন কফিন বাক্সটা থেকে তাকে তুলতে গেলাম, কষ্ট হচ্ছিল খুব তাকে দেখে – ঠান্ডায় জমে শক্ত হয়ে সেধিয়ে গিয়েছিল বাক্সটার পিঠের সাথে। টেনে হিঁচড়ে তুলতে গিয়ে ঘঁষা লেগে তার মৃতপ্রায় চামড়া জায়গায় জায়গায় আরো ছিলে গেল, আরো কিছু ইষ্পাত-মাংস গুঁড়ো গুঁড়ো ঝরে গেল। অনেকক্ষন আলোয় এনে রোদে রাখলাম, চার্জ সিগনাল ফুল দেখালে অন করলাম, দেখলাম প্রাণবায়ু এখনো আছে, দৌড়াদৌড়ি করে নিয়ে গেলাম সার্ভিস সেন্টারে। চিকিৎসক প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আমার হাতে একটি প্রেস্ক্রিপশান ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ''মাদারবোর্ড, মেমরি, হার্ডডিস্ক সব ঠিক আছে; শুধু ব্যাটারি, ডিসপ্লে, ব্যাক কাভার পরিবর্তন আবশ্যক। মনে হয়, বেশী খুঁচাখুঁচি করেছেন মেশিনটা নিয়ে।'' অন্য সময় হলে হয়ত বেয়াদপিটার জন্য ক্ষমা করতাম না, কিন্তু খুব সঙ্গীন সময় পার করছিলাম সেই দিনগুলিতে, তাই উল্টো ডাক্তার সাহবকে হাত জোর করলাম, "পূর্ণ সুস্থ করে তুলুন একে, যত টাকা লাগুক দেব, কিন্তু আগের মত করে দিন একে।"

আমার আবেগ-উদ্বেগ তাকে একটুও ছুঁলো বলে মনে হল না, ভাঙা ভাঙা নিরুত্তাপ কণ্ঠে বললেন, ''সপ্তাহখানেক লেগে যেতে পারে, পার্টস স্টকে নেই, রেখে যান, ডেভলেপমেন্ট থাকলে ফোন করে জানানো হবে। ফোন নাম্বারটা লিখে দিয়ে যান।'' আমি আর কথা না বাড়িয়ে পকেট থেকে একটি ভিজিটিং কার্ড টেবিলটাতে রেখে বাড়ির পথ ধরলাম। কিন্তু অন্যের ঘরে তাকে একা ফেলে রেখে আমার মন টিকছিল না, দুশ্চিন্তায় আর উৎকন্ঠায় কাটছিল দিনগুলি। তাকে নিয়ে অবহেলা-অযত্ন হয়েছে বলে ক্ষণে ক্ষণে আফসোস করতে লাগলাম, মরমে মরে যেতে লাগলাম। খুব খুব মায়া লাগল, কাছে পেতে ব্যাকুল হয়ে উঠছিলাম। পণ করলাম, এরপর আর এমন করব না, নিয়ম মেনে চলব, অযথা হামলে পড়ব না, চালাবো না জবরদস্তি।

একান্ত বাধ্য হয়ে নতুন স্মার্ট ফোনটা তখনো ব্যবহার করছিলাম, কিন্তু এই ফোন বিশাল ভার হয়ে ছিল, ভীষন বিশ্বাসঘাতক মনে হত, এমন নয় যে সে একেবারেই ব্যবহার অনুপোযোগী ছিল, কিন্তু অনেক আশা নিয়ে তাকে নিয়ে এসেছিলাম ঘরে, কিন্তু কি পেলাম দিন শেষে! কিছুই না। সেই ব্যাপারটাই আমায় কুরে কুরে খাচ্ছিল; বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারিত হওয়ার বোধটা তার প্রতি মন বিষিয়ে তুলেছিল। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, ছুঁড়ে ফেলে দেই! কি যে একটা সময় গেছে, কি যে একটা অনুভূতির মধ্য দিয়ে গেছি সে কটা দিন। আর তর সইছিল না। এই অপেক্ষার বুঝি শেষ নেই! যতই সময় গড়াচ্ছিল, নতুন ফোনটার প্রতি ঘৃনা উত্তরোত্তর বাড়তে লাগল, পুরনোটা তখনো হাস্পাতালে, সার্জারি টেবিলে, অথচ সেই অবস্থাতেই নতুনটাকে ঘরছাড়া করার জন্য দেন দরবার শুরু করে দিয়েছিলাম। অথচ ওর যেন কোন ভাবান্তর নেই, আগে সে হাসতো মাঝে মধ্যে, কিন্তু এখন সারাদিনই হাসে। কিন্তু কেন? মুক্তি পাচ্ছে বলে? নাকি আমার বেগতিক অবস্থা তাকে অনেক আনন্দ দিচ্ছে? আমি তার কাছে স্যাটায়ার নাটকের কোন ভাঁড় চরিত্র?

অবশেষে দিনটি এল। ডাক্তার সাহেবে দেরী করছিলেন, আমি তো ওয়েটিং রুমে বসে রয়েছি অনেকক্ষণ সেই মোবাইল সার্ভিস সেন্টারের, খবর পাঠানো হয়েছে প্রায় আধ ঘন্টা হল। অবশেষে দূর থেকে ডাক্তারকে দেখা গেল, হাতে ধরা আমার সেই যন্ত্র, তার কাউন্টারে ডেকে নিলেন আমাকে, টেবিলের ওপারের চেয়ারে বসে একটি মেডিসিন লাগানো পরিষ্কার কাপড় দিয়ে তাকে ড্রেসিং করে দিতে দিতে আমার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন বার কয়েক। একটা সময় মুখে দুর্বোধ্য এক হাসি তুলে বললেন, ''আপনার সেট টা তো ভাল হয়ে গেল, ভাই।'' প্রাণ-মন জুড়িয়ে গেল আমার, প্রশান্তিতে ভরে গেল আমার মুখ, বইল খুশীর ফল্গুধারা। কতবার যে ধন্যবাদ জানালুম তাকে! ডাক্তার সাহবে বললেন, 'আমায় নয়, ধন্যবাদ জানান উপরোওয়ালাকে। আপনার ভাগ্য ভাল। প্রথমে ভেবেছিলাম সামান্য প্রব্লেম। কিন্তু পরে দেখি কিছুতেই কাজ করে না। অনেক খাটাখাটুনি গেছে, ভাই। আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম, গতকাল আচমকা সাড়া দিল।' যে বিল হয়েছে, তার থেকেও শ কয়েক টাকা বেশী তার হাতে জোর করে চেপে দিয়ে বের হলাম

বাসায় এসে সাবেক ফোনটিকে চার্জে রেখে নতুনটিকে তার পাশে শুইয়ে দিতে গেলে দেখলাম একটুও তেজ কমেনি, আগের মতই বেয়াড়া হাসি তার চোখে-মুখে! ভেবেছিলাম খেয়ে-দেয়ে সুস্থ হয়ে … কিন্তু সহ্য হল না আর, এক ঝটকায় উলটে ফেলে শরীরটা দু'ভাগ করে সিমটা বের করে নিয়ে পুরোনাটায় প্রবেশ করিয়ে হাতড়াতে শুরু করলাম। কিন্তু এ কি! এ যে আমার কথাই শুনতে চাইছে না! যাই বলি, যেখানেই ক্লিক করে, ঠিক ঠাক সাড়া দেয় না। কখনো মনে হচ্ছে খুব আড়ষ্ঠ, একটা নাই নাই স্বর, আসতে চাইছে না! আবার কখনো কখনো এত দ্রুত চলছে যে তাল সামলানোই দায়। আমি ভাল করে তাকাই তার দিকে, আমার কেবলই মনে হতে থাকে, এ আমার যন্ত্রটা নয়, একে আমি চিনি না! তাহলে কি হাসপাতালে অদল-বদল হয়েছে, ভেতরের কলকব্জা সব খুলে নেয়া হয়েছে? শুধু উপরের চামড়াটা অবিকল রেখে দেয়া হয়েছে? আমি তাকে ভাল করে খুলে দেখলাম, নাহ্‌, কোন বদল হয়নি; হয়ত সে-ই আমায় আর চিনতে পারছে না, তার স্মৃতি বিভ্রম ঘটেছে, সে ভুলে গেছে, সব ভুলে গেছে …. আমার দুচোখ বেয়ে ঘোর বর্ষা নামে! সেদিন সন্ধ্যায় সেই সাবেক স্মার্ট ফোনটিকে যত্ন করে আবার বাক্সে ঢুকাই। এরপর বাসার দারোয়ান চাচার হাতে যখন তুলে দেই তাকে, সে অনেকক্ষণ বিস্মিত নয়নে তাকিয়ে থাকে। দারোয়ান চাচা পকেটে হাত বাড়াতে গেলে তার বয়সের ভারে ন্যুজ হাতখানা চেপে ধরি আমি।

নতুন স্মার্ট ফোনটি নিয়ে জীবন চলছি এখন। একটু একটু করে মানিয়ে নিতে পারছি মনে হয়। হয়ত তারও কিছু মায়া জন্মেছে আমার উপর। বাসা থেকে বেরুলেই দারোয়ান চাচার হাতে চোখে পড়ে সাবেক ফোনটা, একদিন তাকে জিজ্ঞেস করি, 'চালিয়ে মজা পাচ্ছেন তো, চাচা?' কাকা সশব্দে হেসে ওঠে, 'আর কইয়েন না, কাকা, খাসা মাল…পঙ্খিরাজ একটা!'

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক