শান্তা মারিয়া’র প্রিয়াংকা

শান্তা মারিয়াশান্তা মারিয়া
Published : 8 June 2022, 03:38 AM
Updated : 8 June 2022, 03:38 AM


চিত্রকর্ম: হুয়ান সোরিয়ানো

প্রিয়াংকাকে যেদিন বনানীতে রেখে আসেন মাসুদ, ঠিক সেদিনই আবার তাকে খুঁজে পান। মাসুদ রানা তার নাম হলেও ড্যাশিং পুশিং ব্যাপারটা তার স্বভাবে বা চরিত্রে কোথাও ছিল না। ছোটবেলা থেকেই তিনি চুপচাপ, শান্ত স্বভাবের মানুষ।
কিশোরবেলায় বাবা মাকে হারানোর দিনটিতেও ছিলেন শান্ত ও স্তব্ধ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে একটি সড়ক দুর্ঘটনার খবর পত্রিকায় শিরোনাম হয়ে আসে। সকল মৃত্যুই মর্মান্তিক, এটা আরও বেশি, কারণ একটি পরিবার প্রায় শেষ হয়ে যায় এই ঘটনায়। তাদের প্রাইভেট কারটি একেবারে দুমড়ে মুচড়ে যায় মুখোমুখি এক ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে এবং কিশোর সন্তানকে রেখে পৃথিবী ছেড়ে যান স্বামী-স্ত্রী।

সেদিনের কিশোর মাসুদ রানা গাড়িতেই ছিল। বাবা গাড়ি চালাচ্ছিলেন, মা বসেছিলেন পাশে। সে ছিল পিছনের সিটে। প্রচণ্ড শব্দ, ভয়ংকর ধাক্কাতেও জ্ঞান হারায়নি সে। রাস্তার উপর জমা হওয়া মানুষরা তাকে বের করে গাড়িটির ভগ্নাবশেষ থেকে। মোটামুটি অক্ষতই বলা যায়। হাতে পায়ে সামান্য আঘাত ছিল। তার চোখের সামনেই সামনের আসন থেকে বের করা হয় বাবা মায়ের বীভৎস মৃতদেহ। যা তখন রক্ত আর মাংসের পিণ্ড। তার শুধু মনে হয়েছিল মায়ের মাথা থেকে রক্ত আর হলুদ একটা পদার্থে সারা চেহারা ঢেকে দেয়া বস্তুটিই কি মাথার মগজ? এই চিন্তাটা থেকে অনেক বছর রেহাই মেলেনি তার। এমনকি এখনও মায়ের কথা ভাবলে সেই মগজ বের হওয়া চেহারা প্রথমে মনে আসে এবং জোর করে সেটি সরিয়ে অ্যালবামে ধরে রাখা হাসিখুসি মুখ মনে করতে হয়। বাবার আঘাত লেগেছিল বুকে। তার চেহারা অক্ষত ছিল। তাই বাবার চেহারাটা খুব স্বস্তির সঙ্গে মনে করতে পারেন তিনি।

দাদা-দাদীর সঙ্গে ধানমন্ডির বাড়িতে প্রায় একাই বড় হন মাসুদ।একমাত্র চাচা থাকতেন আমেরিকায়। দুতিন বছর পর পর ফিরতেন। দাদীর মৃত্যুর পর আর ফেরেননি। দাদা চলে গিয়েছিলেন তার আগে। মাস্টার্স করার পর থেকেই মোটামুটি একা মাসুদ। না, একাকীত্ব তাকে খুব একটা বিচলিত করতে পারেনি প্রিয়াংকা থাকায়।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে প্রিয়াংকার সঙ্গে তার পরিচয় কোন নাটকীয়তার আবহে নয়, বরং সহপাঠী হিসেবে খুব স্বাভাবিকভাবে। আর স্বাভাবিকতার প্রবাহে সেই সম্পর্ক ক্রমশ বন্ধুত্ব থেকে প্রেমে গড়িয়েছে। প্রিয়াংকা তার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে সেই ফার্স্ট ইয়ার থেকে। দাদা দাদী দুজনেই শান্ত ও সুন্দরী মেয়েটিকে নাতির ভবিষ্যত জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ করে গিয়েছিলেন তাদের বিয়ের অনেক আগে। প্রিয়াংকাও ছিল একা। ফুপুর বাড়িতে বড় হওয়া এতিম প্রিয়াংকার কেউ ছিল না। সেও বাবা মাকে হারিয়েছিল ছোটবেলায়। দুর্ঘটনায় নয়, রোগে।
দুজনের এই একা হওয়ার বিষয়টিই তাদের বন্ধুত্বে সেতুবন্ধ হয়েছিল।

সমবয়সী হলেও মাসুদের প্রতি প্রিয়াংকার মনোভাব ছিল অনেকটা অভিভাবকসুলভ। বিয়ের পর তারা দুজনেই তখন দুটি নামী কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে ভালো পদে যোগ দিয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে মাসুদ বেশ মোটা অংকের সম্পদ পেয়েছিলেন। ধানমন্ডির বাড়িটিতো ছিলই। ব্যাংকেও ছিল সারাজীবন আরামে চলে যাওয়ার মতো সঞ্চয়। দাদা বেঁচে থাকতে বাড়িটিকে বহুতল বানিয়ে গেছেন। তাই তাদের নিজস্ব ফ্ল্যাটটি ছাড়া বাকিগুলো থেকে ভাড়াবাবদ আয় হয় যথেষ্ট পরিমাণে। দুজনের কারুরই চাকরির প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দামি ডিগ্রিকে কাজে লাগানোর জন্যই তারা চাকরি করতেন।
এত টাকা পয়সা, সুখ স্বাচ্ছন্দ্য। কিন্তু প্রিয়াংকা কেন যেন কোন স্থায়ী গৃহকর্মী রাখতেন না। ছুটা বুয়া ছিল। সংসারের বাকি কাজ প্রিয়াংকা একাই করতেন এবং বেশ আনন্দের সঙ্গেই।
নিজের চাকরি সত্ত্বেও ঘরের কাজ করে আলাদা তৃপ্তি পেতেন প্রিয়াংকা। বিশেষ করে তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন মাসুদ রানা। তিনি তার যত্নআত্তি করতেন অনেকটা মায়ের নিবিড়তায়।

সকালে দুজন একসঙ্গেই বের হতেন অফিসের জন্য। সেই তাড়াহুড়োর মধ্যেও ধীরস্থির প্রিয়াংকা ভোরে উঠে দুজনের লাঞ্চ রেডি করতেন। আবার কখনও লাঞ্চটাইমে মিট করতেন এবং কাছাকাছি কোন রেস্টুরেন্টে যেতেন একসঙ্গে। দুজনের অফিসই মহাখালিতে, রাস্তার এপার ওপার। অধিকাংশ দিন তারা ফিরতেনও একসঙ্গে।
প্রিয়াংকা টিভি দেখতেন না। সিরিয়াল তো নয়ই। মোবাইল গেমেও আগ্রহ ছিল না। বন্ধু বান্ধব বা শপিং কোনটা্তেই আসক্তির লেশমাত্র চোখে পড়েনি মাসুদের। তার একমাত্র আসক্তি ছিল মাসুদকে কেন্দ্র করে। ছোটবেলায় মা হারানো মাসুদ তার দাদীর কাছেও এত যত্ন পাননি কোনদিন। প্রিয়াংকা তার কাপড় চোপড় গুছিয়ে রাখতেন। খাবার টেবিলে প্লেটে খাবার উঠিয়ে না দিলে তৃপ্তি পেতেন না। প্রায় প্রতিদিন ঠিক মনে করে মাসুদের প্রিয় খাবারগুলো তৈরি করতেন। খানা খাজানার শেফের চেয়ে তার রান্নার হাত কিছু কম ভালো ছিল না।
অনেকবার রাতে ঘুম ভেঙে মাসুদ দেখেছেন প্রিয়াংকা জেগে আছে, তার মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে মাসুদের মনে হতো প্রিয়াংকা কি রাতেও তার সেবায় অতন্দ্র থাকে?
এত যত্নে তিনি নিজে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করতেন। কারণ নিজের দেখভাল নিজে করতে তিনি অভ্যস্ত হয়েছিলেন কিশোরকাল থেকেই।

তবে প্রিয়াংকার একটা ড্রব্যাক ছিল। মাসুদের কোন বন্ধুবান্ধবকে সে তেমন পছন্দ করতো না। তাদের দুজনের সহপাঠীরা মাঝে মধ্যে আসতো। কিন্তু প্রিয়াংকার দিক থেকে খুব একটা উৎসাহ ছিল না। বিশেষ করে তাদের এক অবিবাহিত বান্ধবী লীনাকে সে সবচেয়ে অপছন্দ করতো। লীনা দেখতে প্রিয়াংকার ধারে কাছেও নয় বটে, তবে তার মধ্যে একটা আলগা চটক ছিল, গালের টোলটাও ছিল মিষ্টি। শ্যামলা লীনাকে ফর্সা প্রিয়াংকার তুলনায় কোন বন্ধুর কাছেই সুন্দরী বলে মনে হয়নি কোনদিন। কথায় কথায় মাসুদ একবার লীনার গালের টোলের প্রশংসা করেছিল সেই ছাত্রজীবনে, বন্ধুদের এক আড্ডায়। কথাটা মাসুদ, লীনা এবং অন্য বন্ধুরা ভুলে গেলেও প্রিয়াংকা কোনদিন ভোলেনি।

লীনা যদি বন্ধুদের সঙ্গে কোনদিন তাদের বাড়িতে আসতো তাহলে প্রিয়াংকা কেমন যেন তীক্ষ্ম চোখে তাকাতো। যেন নজর রাখছে এমন একটা ভাব। হয়তো লীনাও এই অপছন্দের বিষয়টা বুঝতে পেরে একটু অস্বস্তিতে ভুগতো। প্রিয়াংকার সামনে সে কোনদিন সহজ হতে পারেনি। তবে মাসুদকে সে বেশ পছন্দ করতো বলেই যোগাযোগটা চালিয়ে গিয়েছিল রীতিমতো এক তরফা উৎসাহ থেকে। প্রিয়াংকাকে হঠিয়ে মাসুদের পাশে জায়গা করে নেবার কোন রকম দুরাশা লীনার ছিল না হয়তো কিন্তু মানুষ নিজের মনকেও অনেক সময় বুঝতে পারে না। নিজের অজান্তেই লীনার মধ্যে মাসুদের প্রতি একটা আকর্ষণ রয়ে গিয়েছিল, যে কারণে সে বিয়ে করেনি। পিএইচডি করার অযুহাতে সে মাস্টার্সের পর থেকে বিয়েটাকে ক্রমশ দূরে সরিয়ে রেখেছে। বিয়ের মাত্র তিন বছরের মাথায় যে প্রিয়াংকাই সরে যাবে সেটা ওরা কেউ ধারণাও করতে পারেনি।

বরাবরের মতো সেদিন বিকেলেও নিজের অফিস ছুটির পর প্রিয়াংকাকে নেয়ার জন্য ওর অফিসের সামনে গিয়েছিলেন মাসুদ। অফিস থেকে বেরিয়ে ফুটপাথ ধরে প্রিয়াংকা হেঁটে আসছিল গাড়ির দিকে। মাসুদ তাকিয়ে দেখছিলেন তার এগিয়ে আসা। হঠাৎ তিনি প্রিয়াংকাকে পড়ে যেতে দেখলেন। রাস্তায় থাকা অন্য লোকরাও ছুটে এসেছিল। প্রিয়াংকার চূর্ণবিচূর্ণ মাথা দেখেও মাসুদ বিশ্বাস করতে পারেননি এক মিনিটের কম সময়ের মধ্যে একজন মানুষ মরে যেতে পারে। একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে ইট খসে পড়েছিল প্রিয়াংকার মাথায়। নির্মাণাধীন ভবনের চারপাশে আজকাল নেট দেয়া থাকে। তবু কোন অশুভ নিয়তির বলে ইট প্রিয়াংকার মাথায় এসে পড়লো সেটা মাসুদ তাকিয়ে থেকেও বুঝতে পারেননি। প্রিয়াংকার সমস্ত মুখ ভরে ছিল রক্ত আর হলুদ রঙের মগজে। হাসপাতালের ডাক্তার বলেছিলেন স্পট ডেথ। সেটা মাসুদ জানতেন। ওকে যখন হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন তখনি বুঝেছিলেন সেটা মৃতদেহ। প্রিয়াংকার চেহারার উপর লাল ও হলুদ রঙের বীভৎস কারুকাজ তাকে ছোটবেলার সেই ভয়ংকর স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর কখন যেন মা আর প্রিয়াংকার স্মৃতি একাকার হয়ে একক একটি শূন্যতায় পরিণত হয়।

বনানী কবরস্থান থেকে ফেরার সময় তার চোখে পড়ে ছোট্ট বেড়ালছানাটি। কবরস্থানের একদম গেটের কাছেই বসেছিল ছানাটি। করুণ সুরে কাঁদছিল। কোনকিছু না ভেবেই ছানাটিকে তুলে নেন মাসুদ। তারপর বাড়িতে নিয়ে আসেন। গাড়ির ভিতর চুপচাপ বসেছিল সে। বাড়িতে এসেও তেমন কোন হৈ হল্লা করেনি। বেশি চ্যাঁচালে হয়তো ওকে ফেলে দিতে বাধ্য হতেন।

ছুটি নিতে চাননি। কিন্তু অফিস থেকে তাকে জোর করেই ছুটি দিয়েছিল। তাদের মনে হয়েছিল কর্মদক্ষ এই মানুষটির ছুটি দরকার শোককে সইয়ে নেবার জন্য। তারা বুঝতে পারেনি মাসুদ অফিস করতে চেয়েছিলেন ভয়ে। ফাঁকা বাড়িতে একা থাকার ভয়। প্রিয়াংকাহীন জীবনের অসীম শূন্যতার ভয়। সেই শূন্যতাকে কিভাবে যেন একটু একটু করে ভরিয়ে তুলছিল প্রিয়া: সদ্য আসা বেড়াল ছানাটি। ওকে প্রিয়া বলে ডাকতে শুরু করেছেন নিজে কিছু বুঝে ওঠার আগেই। প্রিয়াংকাকেও তিনি সংক্ষেপে প্রিয়াই ডাকতেন। বিড়ালটাকে টুশি, পুষি, মিনি এসব প্রচলিত নাম ধরে ডাকার আগেই তিনি প্রিয়া নামে ডেকে বসেন এবং সেও সাড়া দেয়। তারপর কখন যেন ওকে প্রিয়াংকা নামেও ডাকা শুরু করেন তিনি। কারও সামনে অবশ্য নয়। প্রয়াত স্ত্রীর নামে বিড়ালের নামকরণটা তার ভিতরে একটা অস্বস্তির সৃষ্টি করে। তাই লোকজনের সামনে ওকে তিনি নাম ধরে ডাকেন না। আর লোকজনই বা তেমন কোথায়। বন্ধু তো তার আগেও খুব বেশি ছিল না। এখনও নেই। প্রিয়াংকা মারা যাবার পর তিনি একজন কিশোর ছেলেকে রেখেছেন ঘরসংসারের টুকটাক কাজ করার জন্য। আজকাল এ ধরনের ছেলেরা বাসাবাড়িতে কাজ করতে চায় না। তারা গৃহকর্মী হওয়াটাকে অমর্যাদার মনে করে। কিন্তু রিয়াজ নামের এ ছেলেটিকে তিনি যথেষ্ট বেতন দেন, অনেক বেসরকারি অফিসের পিয়নের চেয়ে বেশি। আলাদা ঘর, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও পায়। ছেলেটিকে তিনি ঠিক গৃহকর্মী নয় বরং পিয়নের ভূমিকাই দিয়েছেন। সে বাড়ির কেয়ারটেকার। ঘরসংসার সে ভালো দেখাশোনা করে, বাজার করে, প্রিয়াংকার যত্নও নেয়।

রিয়াজের কাছেই তিনি শুনলেন যে, প্রিয়াংকা তার অফিস থেকে না ফেরা অবধি কিছু খায় না। মাসুদ অফিসে চলে যাওয়ার সময় প্রিয়াংকা লিফটের দরজা পর্যন্ত যায় তারপর ঘরে ফিরে ব্যালকনিতে চুপ করে বসে থাকে। এই ব্যালকনি থেকে নিচের তলায় অ্যাপার্টমেন্টের বিশালাকার মূল প্রবেশ ফটকটা দেখা যায়। প্রিয়াংকা সেই গেটের দিকে তাকিয়ে থাকে যতক্ষণ না মাসুদের অফিস থেকে ফেরার সময় হয়। অ্যাপার্টমেন্টের সদর দরজায় বেল বাজার আগেই সে সেখানে হাজির হয়। তাকে ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দেখেই ড্রইংরুমে টিভি দেখতে থাকা রিয়াজ বুঝতে পারে মাসুদ স্যার এসে গেছেন। মাসুদ যতক্ষণ বাড়ি থাকেন প্রিয়াংকা তার পিছু ছাড়ে না।

রাতে ঘুমায় মাসুদের খাটেই। এই অভ্যাসটা প্রথম থেকেই দূর করার অনেক চেষ্টা করেছেন মাসুদ। জুতার বাক্সে, কার্পেটের উপর, সোফায় প্রিয়াংকাকে ঘুম পাড়ানোর বহু চেষ্টা করেছেন তিনি। কিন্তু সে মাসুদের খাট ছাড়া অন্য জায়গায় রাতে কখনও ঘুমায় না। বেডরুমের বাইরে বের করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলে করুণ স্বরে কাঁদে। তার মিয়াও মিয়াও শব্দে ঘুম আসার প্রশ্নই ওঠে না। বাধ্য হয়ে তাকে ঘরে নিয়ে আসতে হয়। মাসুদের পাশে প্রিয়াংকা ঘুমিয়ে থাকে। জায়গাটি সে বেছে নিয়েছে এমন যেখানে আগে ঘুমিয়ে থাকতেন মাসুদের স্ত্রী। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে মাসুদ মাঝে মাঝে দেখেন প্রিয়াংকা ঘুমাচ্ছে না, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মানুষ প্রিয়াংকার মতোই বিড়ালীও অতন্দ্র আছে।

অফিসের কাজে মাসুদ একবার সিলেট গিয়েছিলেন। ফিরে রিয়াজের কাছে শুনলেন দুদিন ধরে প্রিয়াংকা কিছুই খায়নি। না খেয়ে নেতিয়ে পড়েছিল বেচারি, মাসুদকে দেখে লাফিয়ে উঠে এলো। মাসুদ তাকে কোলে তুলে নিয়ে স্পষ্ট দেখতে পেলেন ওর চোখে জলের বিন্দু। সেদিন থেকে মাসুদ অফিস ছুটির পর সোজা বাড়িতে চলে আসেন। অন্য কোথাও তার সময় কাটাতে ভালো লাগে না। গৃহের আকর্ষণটা দিন দিন তার প্রবল হচ্ছে এই অবোধ প্রাণীটির জন্য।
তিনি যখন খেতে বসেন তার পাশের চেয়ারেই বসে থাকে প্রিয়াংকা। কখনও কখনও খাবার টেবিলেও উঠে পড়ে। কিছুতে মুখ দেয় না কিন্তু একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে মাসুদের প্লেটের দিকে। যেন লক্ষ্য রাখে মাসুদ ঠিকমত খাচ্ছেন কিনা। ওর চোখে ঠিক সেই ধরনের যত্ন ও মমতা ঝরে পড়ে যা ছিল সেই মানবীর চোখে। মাসুদের কাছে তখন এই প্রাণীর চোখের দৃষ্টি এক হয়ে যায় মৃত প্রিয়ার স্মৃতির সঙ্গে।

মাসুদ প্রায়ই ওর সঙ্গে খুনসুটিও করেন। ল্যাজ ধরে টানেন, গায়ে হাত বুলিয়ে দেন, চিরুনি দিয়ে লোম আঁচড়ে পরিপাটি করেন। কখনও কখনও ওড়না দিয়ে ওকে শাড়ি পরিয়ে দেন। প্রিয়াংকার ওড়নাগুলো ওকে পরাতে অন্য রকম একটা অনুভূতি হয়। মনে হয়, জীবনে সত্যিকারভাবে কেউ হারিয়ে যায় না, কোন না কোন রূপে ফিরে আসে। বিশেষ করে ভালোবাসার মানুষরা কখনও ছেড়ে যায় না। মা ফিরে এসেছিলেন প্রিয়াংকার মধ্যে আর প্রিয়াংকা ফিরে এসেছে এই ছোট্ট সাদা বিড়ালীর মধ্যে।

প্রিয়াংকা অবশ্য দিনে দিনে বড় হয়ে উঠেছে। সে আর শিশু নেই। ও এখন মাসুদের সব কথাই বুঝতে পারে। মাসুদও ওর সঙ্গে কথা বলেন এমনভাবে যেন ও একটা মানুষ। তার কাছে মনে হয় মানুষও তো এক প্রজাতির পশুই। আফ্রিকার প্রান্তরে প্রথম যে হোমো স্যাপিয়েন্সের দেখা মিলেছিল এখনকার মানবের চেয়ে পশুর সঙ্গেই তার সাদৃশ্য ছিল বেশি। প্রথমে কুকুর তারপর বিড়াল হয়েছিল বিকাশমান মানব জাতির সঙ্গী। চাতালহাইয়ুকে প্রথম কৃষিক্ষেত্রের মালিক মানুষের পাশেই তখন থাকতো তার গৃহসঙ্গী বিড়াল। দুই বন্ধুর মধ্যে একজন অনেকটা পথ হেঁটে চলে এসেছে তাই ভুলে গেছে পরষ্পরের ভাষা। কিন্তু মমতা আর ভালোবাসার জন্য কোন ভাষার প্রয়োজন নেই, তার নিজস্ব ভাষা রয়েছে। সেই ভাষার আদান প্রদানে প্রিয়াংকা আর মাসুদ একে অন্যকে গ্রহণ করেছে বন্ধু হিসেবে।

মাসুদ নিজে প্রিয়াংকাকে নিয়ে নিজস্ব জগতে দিন কাটালেও অন্য বন্ধুরা তাকে ভোলেনি। ভোলোনি লীনাও। মাসুদের মতো অর্থবান বন্ধুকে ভুলতে চায়ও না কেউ। মাসুদ যদি দরিদ্র হতো তাহলে হয়তো তারা তার ছায়া মাড়ানোর আগে চিন্তা করতো কোন টাকা পয়সা ধার দিতে হবে না তো। কিন্তু এখানে উল্টো। ধার পাবার সবিশেষ সম্ভাবনা।
বউ বাচ্চা নেই, অথচ এখনও যুবক, ভালো রকম অর্থবান, ধানমন্ডিতে এত বড় বহুতল ভবনের মালিক, চকচকে গাড়ি, দামী চাকরি সবই যার আছে সে লোকটাকে ভুলে থাকা কঠিন বৈকি। দেখতেও সে খারাপ নয়। একমাত্র দোষ একটু অমিশুক টাইপ। তা সে বরং ভালো। বন্ধুবান্ধব নিয়ে লাফাংগাগিরি করে বেড়ানো কোনো কাজের কথা নয়। অন্তত লীনার চোখে মাসুদ এখনও বিশ্বের সবচেয়ে যোগ্য পাত্র।

লীনা চিরদিনই তাকে পছন্দ করেছে। মাঝখানে প্রিয়াংকা জেঁকে বসায় সে মাসুদের আশা ত্যাগ করেছিল। কিন্তু এখন তো তার সামনে আর চীনের মহাপ্রাচীরসম বাধাটা নেই। লীনা তাই প্রায়ই ইউনিভারসিটি ফেরত মাসুদের সুখদুঃখের দেখভাল করতে আসে। তার পিএইচডি থিসিস শেষ হয়েছে এবং ধানমন্ডিতেই একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানও ঘটে গেছে। এখন বিয়েতে আর কোন বাধা নেই। লীনার পরিবার এতদিন তাকে বিয়েতে রাজি করাতে পারেনি বিবিধ সুপাত্রের সন্ধান এনেও। এখন মাসুদকে তার পছন্দ জেনে তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। হলোই বা দোজবরে, আর কোনদিকে তো কোন ঘাটতি নেই ছেলেটির।

মাসুদ দ্বিতীয় বিয়েতে একদম রাজি ছিলেন না। প্রিয়াংকার মৃত্যুর তিন বছর পার হয়ে গেলেও তাকে হারানোর শোক তিনি ভুলতে পারেননি। তার স্থান জীবনে দ্বিতীয় কেউ নিতে পারবে না একথা তিনি বিশ্বাস করেন সর্ব অস্তিত্ব দিয়ে। আর বিড়ালী প্রিয়াংকার আবির্ভাবের পর তার জীবনটা আর নিঃসঙ্গ নেই এটাও ঠিক। নারীর প্রতি শারিরীক চাহিদা তার আছে কিন্তু সেটা এত বেশি গুরুত্ব ধরে না যে এখনকার স্বস্তিকর লাইফ স্টাইলটাকে ভাঙতে হবে। লীনাকে তিনি অপছন্দ করেন না। কিন্তু একটা বিষয় তাকে ভাবায়।

লীনা যখনি এ বাড়িতে আসে প্রিয়াংকা তার ক্ষোভ প্রকাশ করে। লীনা যতক্ষণ ড্রইংরুমে বসে থাকে প্রিয়াংকা তার দিকে তাকিয়ে ক্রুদ্ধ চিৎকার ছাড়ে। তার লোম খাড়া হয়ে যায়। চোখের ভিতরে একটা বন্য হিংস্রতা বিচ্ছুরিত হয়। লীনাও এই বিড়ালকে অপছন্দ করে। ওর চোখের দৃষ্টিটা যেন কেমন। আরেকজন নারীর কথা মনে পড়িয়ে দেয় যে ছিল তার প্রতিদ্বন্দ্বী এবং যে বেঁচে থাকলে তাকে এ সংসারে কখনও ঘেঁষতে দিত না।

বন্ধুবান্ধবের চাপ, প্রিয়াংকার জীবন্ত স্মৃতি সত্ত্বেও লীনার প্রতি অনুকম্পা এবং ভবিষ্যতে সন্তান লাভের আশা সবকিছু মিলিয়ে বিয়েতে নিমরাজি হন মাসুদ। সত্যিই তো এই বিয়ের বিপক্ষে যুক্তি কী?

দ্বিতীয় বিয়েতে জাঁকজমকের দরকার নেই। ছোট্ট ঘরোয়া অনুষ্ঠান একটা বড় রেস্টুরেন্টে মাত্র কিছু কাছের বন্ধু ও লীনার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। নতুন বউকে নিয়ে মাসুদ বাড়িতে ঢোকেন রাত এগারোটায়। আজকাল বউয়ের শাড়ি অন্যান্য রঙেরও হচ্ছে বটে কিন্তু লীনার শখ ট্র্যাডিশনাল লাল বেনারসীই মেনে নিয়েছেন মাসুদ। প্রিয়াংকার গয়না নয়। নতুন কয়েক সেট গয়না তাকে দিয়েছেন। প্রিয়াংকার গয়না প্রাণে ধরে লীনাকে দিতে পারেননি তিনি। সেগুলো ব্যাংকের লকারেই রয়ে গেছে।

বেডরুম সাজিয়ে রেখেছে রিয়াজ। রিয়াজ এবং শাহবাগের ফুলের দোকানদারের রুচি অনুযায়ী ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে খাটটাকে। লাল গোলাপ ব্যবহার করা হয়েছে ফুলশয্যার সাজে। বেডকভারটাও লাল। লীনাকে নিয়ে ঘরে ঢুকে মাসুদ দেখলেন খাটের উপর বসে আছে প্রিয়াংকা। মানুষ নয়, বিড়ালী। কিন্তু তার দৃষ্টিতে তিনি দেখতে পেলেন সেই মানবীর ক্রোধ, বিস্ময়। সেইসঙ্গে পশুর সবটুকু বন্যতা। ঠিক যেখানে সে প্রতিরাতে ঘুমায় সেখানেই বসে আছে সে। ওকে সরানোর মতো জোর পাচ্ছেন না মাসুদ। লীনা এগিয়ে গেল ওকে সরিয়ে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায়। দুজনেরই ভাবখানা হলো বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সুচাগ্র মেদিনী।

লীনা মাত্র ওর গায়ে হাতে দিয়ে ওকে সরাতে গেছে, একটা রক্ত হিম করা হুংকার দিয়ে প্রিয়াংকা ঝাঁপিয়ে পড়েছে লীনার কণ্ঠনালী লক্ষ্য করে। লীনার কণ্ঠনালীতে দেহের সর্বশক্তি দিয়ে সে কামড় বসিয়েছে সেই সঙ্গে থাবার তীক্ষ্ণ নখরে গলা আর মুখের নিচের অংশ ছিন্ন বিছিন্ন করে দিচ্ছে। লীনাও নিজের রক্তে দমবন্ধ অবস্থাতেই বেডসাইড টেবিলে রাখা কাঁচের ফুলদানিটা দিয়ে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করছে প্রিয়াংকার মাথায় আত্মরক্ষার তাগিদে। মাসুদের কোন ক্ষমতা নেই প্রিয়তম পুরুষকে কেন্দ্র করে মানবী ও বিড়ালীর মধ্যে চলা এই মরণযুদ্ধ থামানোর বা কোন পক্ষ অবলম্বনের।
ড্রইংরুম থেকে ছুটে এসে রিয়াজ যখন প্রিয়াংকাকে টেনে সরালো তখন খাটের উপর পড়ে গেছে লীনার দেহ। শ্বাসনালী ছিঁড়ে সেখান থেকে গলগল করে বের হচ্ছে লাল রক্ত মিশে যাচ্ছে বেনারসী, বেডকভার আর লাল গোলাপের সঙ্গে। ফুলদানীর আঘাতে বিচুর্ণ মস্তক প্রিয়াংকা পড়ে আছে তার পাশেই। তার থাবায় এখনও লেগে আছে লীনার মাংস ও রক্ত। প্রিয়াংকার সারা মুখে লীনার ও তার নিজের রক্ত। নাক ও কান দিয়ে বের হচ্ছে গলে যাওয়া মগজ। প্রিয়াংকার সারা অবয়বে লাল ও হলুদ রঙের মেলা তার সাদা লোমকে ভরিয়ে তুলেছে বিচিত্র কারুকাজে।

মাসুদ লীনার মৃত্যুতে কোন শোক অনুভব করছেন না কিন্তু প্রিয়াংকার মৃতদেহ তার অন্তরাত্মায় হাহাকার তুলছে। তিনি চিৎকার করছেন, চোখ ফেটে বেরিয়ে আসছে জল। তিনি বুঝতে পারছেন তার প্রিয়তমা স্ত্রীই বিড়ালীর বেশে এতদিন সঙ্গী হয়ে ছিল। আবার তাকে হারালেন তিনি।

ঘুমটা ভাঙলো প্রিয়াংকার থাবার স্পর্শে। বেলা দশটা বেজে গেছে। প্রিয়াংকা তার গাল চাটছে, থাবা দিয়ে মৃদু ধাক্কা দিচ্ছে আর খুব গাঢ় স্নেহের স্বরে গরগর করে তাকে ডাকছে।

ঘুম ভেঙে মাসুদ অনেকক্ষণ বুঝতে পারলেন না তিনি কোথায়, কী ঘটেছে। তার বুক তখনও তীব্র শোকে উথাল পাথাল করছে। চোখে জল। প্রিয়াংকাকে জড়িয়ে ধরে তিনি বুঝলেন পুরোটাই স্বপ্ন। লীনার সঙ্গে তার বিয়ে হয়নি এখনও। বিড়ালীও বেঁচে আছে। তার জীবন থেকে সে এখনও হারিয়ে যায়নি মা ও প্রিয়ার গন্তব্যে। প্রিয়াংকা তার কাছে কতখানি এই স্বপ্নটি না দেখলে কোনদিন বুঝতে পারতেন না তিনি। প্রিয়াংকা তার জীবনকে এতটাই ভরিয়ে রেখেছে যে আর কোনদিন নতুন কারও আগমন এখানে ঘটবে না তা নিশ্চিত। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে, ওর গলার স্বরে এতদিন পর হারিয়ে যাওয়া প্রিয়াংকাকে চিনতে পেরেছেন তিনি।

সব ঠিক হওয়ার পরও এক সপ্তাহ আগে বিয়ে ভেঙে দেয়ার জন্য মাসুদকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারেনি লীনা। সে এখন অস্ট্রেলিয়ায় তার নতুন জীবনে, নতুন সাথীকে নিয়ে হয়তো সুখে আছে, হয়তো সমঝোতা করেছে ভালোবাসা পাওয়া ও না পাওয়ার মধ্যে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক