থিয়েটার মেশিন: শিল্পের বিপ্লবী প্রবাহ

কামালউদ্দিন নীলুকামালউদ্দিন নীলু
Published : 9 May 2022, 08:23 AM
Updated : 9 May 2022, 08:23 AM


বিপ্লবের দীর্ঘ প্রতিধ্বনির প্রতি সাড়া দিতে গিয়ে রিচার্ড ভাগনার এবং আনাতোলি লুনাচারস্কি "বিপ্লব ও শিল্পের সম্পর্কগুলোর জটিল রেখা" নিয়ে যা বলতে চেয়েছেন, সেইসব নিয়ে আমার এই ছোট্ট পর্যালোচনা। আমার এই পর্যালোচনাটি হয়তো কিছুটা হলেও কাজে লাগতে পারে আমাদের শিল্পের গতিপথ ও ভাবনার জায়গাটা তৈরির ক্ষেত্রে। এটাকে তত্ত্ব হিসেবে না ধরে একটা ধারণা হিসেবে ধরে এগোলেই বোধ হয় ভালো হয়; যেহেতু কথাগুলো আমি আমার অভিজ্ঞতার একটা পারস্পরিক স্থান থেকে বলার চেষ্টা করছি।

শুরুটা এইভাবে করা যাক, সময়টা ১৮৪৯ সাল, জার্মানিতে ব‍্যর্থ বুর্জোয়া বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে ভাগনার লিখেছেন "আর্ট অ‍্যান্ড দ‍্য রেভোল‍্যুশন", এবং এর সত্তর বছর পরে লুনাচারস্কি- সফল অক্টোবর বিপ্লবের পরে উত্তর-বিপ্লবী সাংস্কৃতিক নীতিগুলোর প্রথম অভিজ্ঞতাগুলোর আলোকে লিখলেন, "রেভোল‍্যুশন অ‍্যান্ড আর্ট"। এই দুটো তত্ত্বই আমার কাছে শিল্পের শিক্ষা ও জ্ঞানের মধ‍্যে ঘোরাফেরা করবার জন‍্য যথেষ্ট শক্তিশালী প্রতিনিধি বলে মনে হয়, যদিও দুজনেই তাদের বিপরীত ভাবাদর্শকে প্রতিফলিত করেছিলেন, শিল্প ও বিপ্লবের একটা ন‍্যূনতম এবং তাৎপর্যপূর্ণ ভিন্নতাকে স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করার মাধ‍্যমে। ভাগনার মনে করতেন বিপ্লব অনুসরণ করে শিল্পকে, আর লুনাচারস্কি মনে করতেন শিল্প অনুসরণ করে বিপ্লবকে।

এই দ্বৈবিধ‍্য অবস্থার মধ‍্যে আমাদের বাংলা সংস্কৃতির 'বুড়ো বুড়ো (মার্কসবাদী) পন্ডিতদের ব‍্যাখ‍্যা… স্রেফ ঢপের কর্তাভজা গান'- ঘুরপাক খেতে খেতে পাগলা ঘুড়ির মতো একটা শুন‍্য আকাশে বিচরণ করছে। কোনটা সঠিক আর কোনটা বেঠিক এই তাত্ত্বিক তর্কাতর্কির মধ‍্যেই বসবাস করতে গিয়ে আমরা আজ কোথাও থিতু হতে পারলাম(না)? এখনও খুঁজে চলেছি, শুদ্ধ ও অশুদ্ধের ভেদাভেদ। খানিকটা আমার গল্প, "মুখবিহীন কন্ঠস্বর"- এর বাঁদরদের অন্ডকোষ পরিষ্কারের মতো।

যাক সে কথা। যেটা বলতে চাইছি সেটা হচ্ছে; একদিকে রয়‍্যাল কোর্টের দক্ষ পরিচালক ও পরিপূর্ণ শিল্পকর্মের প্রতিনিধি ভাগনার, যার জাতীয়তাবাদী, উগ্র স্বদেশভক্তিসম্পন্ন, ইহুদী-বিরোধী বক্তৃতাগুলোর জন‍্যে তিনি হয়ে উঠলেন নন্দনতত্ত্বের রাজনীতির পুরোধা। অন‍্যদিকে লুনাচারস্কি, ১৯২৯ সাল অবধি লেনিন ও স্তালিনের অধীনে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক নীতিগুলোর বিকাশের জন‍্য "পৌলেটেয়‍্যারাইঅ‍্যান কালচার" তত্ত্বের প্রবক্তা বা একটু অন‍্যভাবে বলা যায় 'সর্বহারা সংস্কৃতি'র পুরুত ঠাকুর হয়ে উঠলেন- 'উত্তর-দক্ষিণ' বলয়ের মধ‍্যে।

প্রসঙ্গক্রমে একটু বলে নিই ১৮৪৮ এর কাছাকাছি সময় প্রুধোঁ, ফয়ারবাখ এবং বাকুনিনের ভাবনাগুলোর অস্পষ্ট প্রভাবের কারণে ভাগনার তার আটোঁসাঁটো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সংগীতাশ্রয়ী ভাবনা-চিন্তার বাইরেও বিচ্ছুরিত বিপ্লবী সুরকে যুক্ত করেছিলেন। অন‍্যদিকে লুনাচারস্কির মনোভাবটি গড়ে উঠেছিল শিল্পের প্রকাশের মধ‍্যে লেনিনের তত্ত্বের সদ্ব্যবহার এবং এগুলো বামপন্থী সর্বহারা সংস্কৃতির নীরিক্ষাগুলোর ভেতরে ফেলে একটা সেতুবন্ধন তৈরি করার মাধ্যমে। আমার কাছে এই সেতুবন্ধন সকল সময় মনে হয়েছে একটা অদ্ভুত রক্ষণশীল অবস্থা, যা কেবলই সমাজতান্ত্রিকদের উদ্ভাবনকেই বাধা দেয়নি, বরং বুর্জোয়া সমাজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ‍্যের মধ‍্যে নিজেকে জোরালোভাবে স্থাপন করেছেন। যেমনটি আজকাল বাংলাদেশের কোনো এক নাট‍্য কর্তাব্যক্তি থিয়েটারকে ঢুকিয়ে দিলেন বুর্জোয়া সমাজের ড্রইংরুমে। এনিয়ে কারো কোনো কথা বলার নেই যেহেতু থিয়েটার নানারূপে হবে এবং হবারই কথা। কিন্তু আমার কাছে সমস‍্যা হয়ে উঠলো তখনই যখন তিনি এই কু (সু)-কর্মটির সততা প্রতিবেদন করতে গিয়ে বলে ফেললেন, "এটা হচ্ছে, গেরিলা যুদ্ধের মতো একটা কৌশল"। শুনতে বেশ লাগে; যেমনটি লাগে দেবব্রত বিশ্বাসের কন্ঠে:
"কে গো তুমি নাটুয়া
কে গো তুমি নাটুয়া
আপন ভোলা নৃত‍্যে
তালে তালে আকাশে
বাজালে মণি- মন্দির
কে গো তুমি নাটুয়া।"


ভাগনার "আর্ট অ‍্যান্ড দ‍্য রেভোল‍্যুশন" লিখেছিলেন ১৮৪৯ সালে। এটা জেনে রাখা ভালো যে এই বছরেই তিনি ড্রেসডেন বিদ্রোহের ব‍্যর্থতার পরে জুরিখে নির্বাসিত হয়ে ছিলেন। এটা নিয়ে পরে কখনও কথা বলা যাবে। যাক যা বলছিলাম, ভাগনারের "আমাদের আধুনিক শিল্পীদের আর্তনাদ এবং বিপ্লবের প্রতি তাদের ঘৃণা" প্রবন্ধটি ইউরোপীয় শিল্প ইতিহাসের অসাধারণ মুহুর্তগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত জরিপ। ১৮৪৮/৪৯ সালে ভাগনারকে শিল্প উৎপাদনের শর্তগুলোর প্রতি মনোনিবেশ করতে গিয়ে শিল্পে অর্থায়নের ব‍্যাপারটিকে সংস্কার করতে হয়েছিল, যেগুলোকে মূলত গণতান্ত্রিক দাবিগুলো থেকে শুরু করে জার্মান রাজকুমারদের সাথে একধরনের পুনর্মিলনের মধ‍্যপন্থী পথ আবিষ্কারের কৌশল বলে ধরে নেওয়া যায়। আমরা কিন্তু আজকাল ভাগনারের এই কৌশলটি ভালোভাবেই কাজে লাগাচ্ছি, কারণ সংস্কৃতি তথা থিয়েটারকে এখন আমরা কর্পোরেট সেক্টর বা মহাজনী ব‍্যবসার মধ‍্যে নিতে চাইছি। দুই বাংলার ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছেটাও যে তাই। এটা আমার কথা নয়, এসব তাদেরই কথা। আমি কেবল ধারকর্জ করে কথা বলছি, খবরের কাগজপত্রে তাদের বিভিন্ন বক্তৃতা ও বক্তব্যের সারাংশ থেকে। পশ্চিমবঙ্গের একজন নাট‍্যপুরোধা এবং বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ আগেই বলে দিলেন 'কোম্পানি থিয়েটার'-এর মধ‍্যেই থিয়েটারের মুক্তি। এই তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে যেয়ে তিনি যে কতোকিছু বলার এবং বোঝানোর চেষ্টা করলেন, সে কি আর বলে শেষ করা যায়? সে অভিজ্ঞতা পেয়েছিলাম তার এই তত্ত্ব নিয়ে কাজ করছিলেন এমন এক গবেষকের কাছ থেকে, সাওপোলোর আন্তর্জাতিক থিয়েটার সম্মেলনে। সৌভাগ্যক্রমে অথবা ধরা যাক দুর্ভাগ্যক্রমে ঐ অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্বে ছিলাম আমি। অতএব যেটা শোনার শুনলাম, যেটা হবার সেটা হলো। সভাপতি হিসেবে ধরে নিলাম তত্ত্বটি ধোপে টিকলোনা। তবে বুঝলাম ক্ষমতার রাজনৈতিক বলয়ের মধ‍্যে থাকার একটা সুবিধা আছে আর তা হচ্ছে উনাদের ভাষায় দাদাগিরি। বাংলাদেশেও তথৈবচ। যার যেমন মনে হচ্ছে বলে দিচ্ছেন, বলে যাচ্ছেন। এমনকি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে যেয়ে নামের আগে বিশেষণের নানা রকমের 'মুষ্ক' নিজেরাই বসিয়ে দিচ্ছেন। ভাবতে চাই না তারপরও ভাবতে হয়। এইসব কর্তাব্যক্তিদের কথা ভাবতেই আমার ছেলেবেলার বন্ধু হরির কথা মনে হলো। ওর পুরো নাম হরিহর, যার অর্থ করলে দাঁড়ায় বিষ্ণু ও শিবের অভেদমূর্তি। ওর নামটা যেমন, বালকটাও তেমনই ছিল। বাবা-মা আমাদের বলতেন হরিহর আত্মা। হরি ছিল ভয়ংকর রকমের সাহসী। একদিন স্কুলে যেতেই হঠাৎ করে পন্ডিত স‍্যার অর্থাৎ শশিকান্ত স‍্যারের মুখোমুখি হলাম। হাতে লাল জোড়াবেতের লাঠি। আমাদের দেখে হঠাৎ চিৎকার দিয়ে উঠলেন: 'জ্ঞানবিজ্ঞানসম্পন্নো ভজ মাং ভক্তিভাবিতঃ'। আমরা কিছুটা শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। হরি, আমি, ছোটকু, টুনটুনি, পরিতোষ আরো অনেকে স‍্যারের দিকে ফ‍্যালফ‍্যাল করে তাকিয়ে ছিল। বুঝতে পারছিলাম না কি হলো। তবে কিছু একটা যে কিছু হয়েছে সেটা বুঝতে পারছিলাম। এবার পন্ডিত স‍্যার বলে উঠলেন: "স্নেহের বালক এবং বালিকার দল আইজ স্কুলে জেলা শিক্ষা দফতর হইতে পত্র আসিয়াছে আগামীকাল প্রাতঃকালে বিদ‍্যালয়ে বড়বাবু অর্থাৎ স্কুল পরিদর্শক মহাশয় আসিবেন। অতএব হেড স‍্যারের নির্দেশ, আইজ কোনো শ্রেণীকক্ষ খোলা থাকিবেনা কেবলই ধোয়ামোছা আর পয়ঃপরিষ্কার; আজকে তোমাদের ক্লাস হইবে মাঠে, অর্থাৎ খোলা আকাশের নিচে"। হরি কিছুটা এগিয়ে পন্ডিত স‍্যারকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো, "তাইলে স‍্যার ব্ল‍্যাকবোর্ড? উহা ছাড়া ষটকর্ম কী রূপে হইবে?" শশিকান্ত স‍্যার কিছুটা তথমত খেয়ে শ্বদন্ত বের করে বায়ু নিষ্কর্ষণের সাথে বলে উঠলেন, "না, আজ তোমাদের ক্লাসের বিষয়- বিদ‍্যালয়ের ময়দানে সকল ভাঁটফুলের মুন্ডন প্রণালি।" হরি খিলখিল করে হেসে সকলকে বললো "ষড়জ'র প্রথম স্বর সা'র মধ্যে প্যাঁচ খাইয়া গেল ভ‍্যাঁ… ভ‍্যাঁ… আ… স‍্যা… রর… র…।" একদিকে আমাদের হৈচৈ অন‍্যদিকে পন্ডিত স‍্যারের সংস্কৃত ভাষার বাণী : "শুচৌ দেশে মনঃ একাগ্রং কৃত্বা আত্মবিশুদ্বয়ে যোগং যুঞ্জ‍্যাৎ"; সঙ্গে জোড়াবেতের লাঠিপেটা, আমরা সব গরুর পাল ছুটছি গুরুর আগে আগে, ছুটছি…।

পরের দিন আমরা সকলেই স্কুলের নির্ধারিত সময়ের আগেই শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত। আমরা অপেক্ষায় বড় স‍্যার অর্থাৎ স্কুল ইন্সপেক্টর স‍্যারের। ক্লাসে কোন শব্দ নেই। খানিকক্ষণ বাদেই খট্ খট্ খট্ শব্দ। এইরকম শব্দের সাথে কেবলই তুলনা করা চলে এর এগারো বছর পরের সময়, ১৯৭১। হঠাৎ হেড স‍্যারের মিলিটারী কায়দায় চিৎকার, "ব‍্যাবাকে খাড়াইয়া পরো" । হরি আমার পাশের থেকে প্রায় সমস্বরে বলে উঠলো, "বেআক্কেলের লগে-লগে…"। কোনো শব্দ নেই। আমরা সকলেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে। এবার স্কুল ইন্সপেক্টর স‍্যার বলে উঠলেন, " ইয়ে কোন বেওকুফ্ ওস্তাদজী?" হেড স‍্যার সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, "না স‍্যার আওয়াজটা আমাদের দফতরির ষাঁড়ের। ঐ যে স‍্যার জানালার ঐপাশে।" বড়ো স‍্যার সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, "ও আচ্ছা- আই অ‍্যাম সো সরি, বয়েজ অ‍্যান্ড গার্লস। তোমরা বসে যাও"। আমরা সব যে যার যায়গায় বসে পড়লাম। এবার স্কুলের লেখাপড়ার মান পর্যালোচনা। বড় স‍্যার অর্থাৎ স্কুল ইন্সপেক্টর চেয়ারে আর হেড স‍্যার তার পাশে সিপাহীর মতো দাঁড়িয়ে। ক্লাসের বিভিন্ন বিষয়ের বই থেকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন, আমরা উত্তর দিচ্ছি। একেবারেই যে সব নির্ভুল উত্তর দিতে পেরেছিলাম সেটা বলবো না, তবে সকলের উত্তর পাঠ সন্তোষজনক হওয়ায় এবার কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হলো। ইন্সপেক্টর স‍্যার যে খুশি, সেটা তার চোখমুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল। উনি উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন "আচ্ছা এবার শেষ প্রশ্ন বলো "কুজ্ঝটিকা" মানে কি? আমরা সব চুপচাপ। পাসের থেকে হরি আমার কানের কাছে মুখ রেখে ফিসফিসিয়ে বললো, " বিহারী স‍্যার বাংলা জানলো কি করে?" আমি হরিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতেই খোট্টা স‍্যার আমাকে বলতে বললেন এর অর্থ তুমি বলো। হঠাৎ পাসের থেকে হরি বললো, "আমি বলবো স‍্যার", বড় স‍্যার বললেন, "বলো"। হরি এদিক-সেদিক তাকিয়ে আবারো জিজ্ঞেস করে, "বলবো স‍্যার"? এবার হেড স‍্যার হুকুম দিয়ে বলেন, "হরি ব…লো…"। সাথে সাথে হরির ঝটপট উত্তর 'কুজ্ঝটিকা' মানে হচ্ছে – "স‍্যার, চোদনা বনিয়া গেলাম"।

আজকাল পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের সংস্কৃতিজনদের এইসব মুষ্ক মার্কা আলাপচারিতা : 'কোম্পানি থিয়েটার', 'গেরিলা থিয়েটার ও এর কৌশল', 'ইসলামী জলসা অথবা ওয়াজ মাহ্ফিল ও একটি রাজনৈতিক থিয়েটার', 'নিজস্ব' বা 'দেশী' বা 'শুদ্ধ' বা 'বাঙালি সংস্কৃতি' তথা 'নিজস্ব রূপের খোঁজে থিয়েটার'- এইরকম অথবা এই রূপের সকল কথাবার্তা, আমার ছেলেবেলার বন্ধু হরিহরের ভাষায় বলছি ; আপনাদের এইসব তত্ত্ব, কথা ও কর্মে, আমি, "চোদনা বনে যাচ্ছি"। ক্ষমা করবেন।

'বিস্ময়কর চেখভ এখন আকাশের দিকে চেয়ে
একটা মেঘ তাঁর দিকে-
একটা গ্র্যান্ড পিয়ানোর মতো তাকিয়ে'।
এইসবের মধ‍্যেই খুঁজে পাই আমার প্রিয় কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের দারুণ কথা, "…রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে গেলে পেচ্ছাপের গন্ধ পেতে হয়। সেটা আমি বানাইনি। লোকে মুতছে তাই পাচ্ছে।"


যাক আবার হাঁটতে শুরু করা যাক- 'যুক্তি, তর্ক, গপ্পো' নিয়ে। এই যে ভাগনার, ওর মত হচ্ছে- শিল্পকে "সামাজিক পণ্য" হিসেবে গণ‍্য করা উচিত। আচ্ছা ব‍্যাপারটা কি? এই কথার অর্থের গভীরে যেতে না পারলে কিন্তু সমস্যাটা ধরা খুবই মুশকিল, আর তাই "সামাজিক পণ্য" এটার মধ‍্যে আমি কেবলই দেখতে পাই জনগণের সবচেয়ে শক্তিশালী চেতনার বিশ্বস্ত দর্পণের প্রতিচ্ছবি। আরেকটু খোলামেলাভাবে বলা যায় এইভাবে একটি শিল্পকর্মকে "জাতীয়তার সমস্ত সীমাবদ্ধতার বাইরে মুক্ত মানবতার চেতনাকে"- ধারণ করা উচিত। আশাকরি বন্ধু হরিহরের গল্পের ফ‍্যালাসি বা প্রাসঙ্গিকতা পাঠক এখানে পেলেও পেতে পারেন। যাক এইসব ওজর অছিলা রেখে অন‍্য এক বাহাসের মধ‍্যে ঢুকে দেখি; "বিপ্লব", "সমসাময়িক সমাজ", "শিল্প প্রতিষ্ঠান", এইসবের ব‍্যাখ‍্যা কি করে ভাগনার দাঁড় করালেন।

শুরুটা এইভাবে করি; একটি নিখুঁত শিল্পকর্ম হিসেবে নাটকের পুনর্জন্ম হতে পারে কেবলমাত্র বিপ্লব থেকেই এবং "প্রকৃত শিল্প… মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে শুধুমাত্র… সামাজিক আন্দোলনের কাঁধে সওয়ার হওয়ার মাধ‍্যমেই।"

এটা আমার ধারণা যে ভাগনারও আমাদেরই মতো কোথাও যেয়ে সাংস্কৃতিক হতাশাবাদ এবং বিপ্লবের বিষণ্নতার মধ‍্যেই ঘুরপাক খাচ্ছিলেন, তবুও তাঁর ভাবনাটা তাকে সম্পূর্ণতা এবং কর্তৃত্ববাদের দিকে না নিলেও, ১৮৪৯ সালে এটা তাঁকে একটি বিশাল বিবৃতির দিকে চালিত করেছিল, আর সেটা হচ্ছে; "… মানবতার মহান বিপ্লব, যার সূচনা গ্রীক ট্র্যাজেডির চূর্ণ-বিচূর্ণনের মধ‍্যে, সেই বিপ্লবই মানবতাকে নতুনভাবে এবং আরো সুন্দরভাবে, মহানভাবে, সর্বজনীনভাবে তার গভীরতম অংশ থেকে জন্ম দিতে পারে।"

এই বর্ণনাপ্রাসঙ্গিক জায়গার থেকে আমাকে মনে করে নিতে হচ্ছে, একদিকে "ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ‍্যাসোসিয়েশন (আইপিটিএ)" এবং এর পরবর্তীকালের থিয়েটার চর্চার বিপ্লবী ভূমিকার কথা, যেমন ঠিক একইভাবে অন‍্যদিকে আমাদের বর্তমান সময়কার বাংলা থিয়েটারের ছিটকে পরার দৃশ‍্যকাব‍্য ; যা ইতিমধ্যে কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক বলয়ের মধ‍্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এর বহু কারণের কারণ- একটি সীমাবদ্ধ একমুখো (রাজনৈতিক) শিক্ষা। ফলে বতর্মান সময়কালের বাংলার থিয়েটার পূর্ববর্তী সময়ের বিদ্রোহের বাইরে নুয়ে পড়েছে। এখন এটা কেবলই একটা শক্তিহীন ঝড়, প্রাণহীন ক্রিয়ারই নিঃশব্দ যাত্রা: "এইরকম একটা অবস্থায় এর সবকিছুই নিরেট কঠিন, সব বায়বীয়, আর যা কিছু পবিত্র ও পূণ্য ছিল, সমস্তকিছুই এখন কলুষিত।"

আনাতোলি লুনাচারস্কি তাঁর "রেভোল‍্যুশন আ‍্যান্ড আর্ট" নিবন্ধটি লিখেছিলেন দুটো ধাপে, প্রথম অংশটি লিখেছিলেন ১৯২০ সালে একটি সংবাদপত্রের নিবন্ধ হিসেবে, এবং দ্বিতীয়টি লিখেছিলেন অক্টোবর বিপ্লবের পঞ্চম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে একটি সাক্ষাৎকার হিসেবে। এখানে বলতেই হয় নিবন্ধটি এমন একটি সময়ে তিনি লিখিছিলেন যখন রুশ বিপ্লবের তরতাজা শক্তিটা পুরোপুরি ধরা পড়েনি বা ঠিক বুঝে ওঠা যাচ্ছিল না, কিন্তু তার পরেও তাঁর এই প্রাথমিক পর্বের পরিভাষা এবং কর্মসূচিগুলো বিশেষ বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছিল বিপ্লবকে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়োজনে। প্রথমদিকে লুনাচারস্কি শিল্পকে ফর্মালিস্টিক বলে কঠোর সমালোচনা করতে যেয়ে যা বললেন তার সারমর্মটা অনেকটা এইরকম: "বিপ্লব ছাড়া শিল্প হচ্ছে নিছক একটি কিম্ভূতকিমাকার এবং বিমূর্ত তত্ত্বের সমাবেশ"। অন‍্যদিকে বিপ্লবের বিষয়ে তিনি বললেন,"বিপ্লব হচ্ছে অসাধারণ ঔদার্য এবং গভীরতার ভাবনার ভিতরে ঢুকে পড়া"। এই দুটো কথা ও ভাবনার ভেতরের যে বিষয়টি বোঝা যায় তা হচ্ছে শিল্পের ওপরে বিপ্লব এবং এর প্রভাব। এটাকে আবার এভাবেও ব‍্যাখ‍্যা করা যায়; শিল্প হলো বিপ্লবের একটি মাধ‍্যম, কারণ এটা জনগণকে আন্দোলিত করতে পারে এবং বিপ্লবের নীতিগুলোকে যথাযথভাবে প্রকাশ করতে পারে। কথাগুলো আরো পরিষ্কার করা যায় তারই কথা ধরে- "বিপ্লব যদি শিল্পকে তার প্রাণ দিতে পারে, তাহলে বিপ্লবকে শিল্প দিতে পারবে তার ভাষা"।

অর্থাৎ লুনাচারস্কির এই নিবন্ধের ভিতরে যেটা পাওয়া যায় সেটা হচ্ছে, একটি ক্রান্তিকালীন সমাজের মধ‍্যে বিপ্লবী বিষয়বস্তুকে সঞ্চারিত করার প্রক্রিয়া এবং বিপ্লবকে উৎসাহিত করার জন‍্য শিল্পের প্রয়োজনীয়তা ও দায়বদ্ধতা। তিনি বলেছেন, আন্দোলনের জন‍্য রাষ্ট্রের প্রয়োজন হয় শিল্পের, কারণ রষ্ট্রের অন‍্য কাঠামোগুলোর ওপরেও এই কাঠামোটির প্রভাব রয়েছে, যেটাকে বলা যায় কোয়াসি সিন্থেটিকের আবরণ। এটা দর্শক এবং পাঠকদের অনুভূতিকে উত্তেজিত করে এবং তাদের ইচ্ছার ওপরে সরাসরি প্রভাব ফেলে। এটা, যেকোনো আন্দোলন বা বিপ্লবকে যেমন উত্তপ্ত করতে পারে তেমনি প্রতিফলন করাতে সক্ষম বিপ্লবের সবগুলো রঙ।

হেগেলের ধারায় কথার সুরে কথা বলতে যেয়ে নবারুণের কথাগুলো পঞ্চভূতের মতো চুপটি মেরে বসে আছে আমার মগজের সেরিব্রাল কর্ট্রেক্সে: আমাদের প্রতিরোধের ঐতিহ‍্য আছে, ঘরানা আছে, কে নেই আমাদের সঙ্গে? আমাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ আছেন, প্রেমচাঁদ আছেন, কাজী নজরুল আছেন। আমরা তাঁদের তৈরি ঐতিহ্যের ওপরে দাঁড়িয়ে আছি। আজ যখন মহাজনী সভ‍্যতা সবকিছু গ্রাস করছে তখন আমি লেখক ও শিল্পী বন্ধুদের বলবো যে, আমাদের সৃজন যেন রাষ্ট্রের ওপরে নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে। জনতার পদধ্বনি যেন আমাদের কানে থাকে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক