নাহার মনিকা’র মেঘের মানসাংক

nahar_monica
Published : 28 April 2022, 04:26 PM
Updated : 28 April 2022, 04:26 PM


চিত্রকর্ম: সফিউদ্দিন আহমেদ

-'ঐ দেখ গন্ধরাজ ফুলের মত মেঘটা আমার, ঐটা খোঁপায় গুজে বাসর হবে আমার'।
-'আর ঐ যে বিরাট বাজপাখির মত, ঐটা আমার। ওর পিঠে চড়ে একদম সমুদ্রের ধারে যাওয়া যাবে'।
-'আর আর ঐ যে কোনার দিকে একাচোরা মানুষের মত, ঐটা কে'?
প্রশ্ন করে পরস্পরের দিকে একটু অপলক চেয়ে হেসে কুটিপাটি হতো, কেউ উত্তর দিতো না।

স্কুল থেকে ফেরার এক বিকেলে আকাশে হেলে পড়া এক টুকরো বড় শাদা মেঘ ভেসে বেড়াত দেখে দু'জনে থমকে দাঁড়ালো। খাড়া নাক, চুলের ছাট। গভীর চোখ দুটোও কি দেখা যাচ্ছিল!
-'এই মেঘ আমার'!- দু'জন একযোগে বলে উঠেছিলো।

আজকে তানিয়া আর হেলেনা দু'জনেই একসঙ্গে আকাশ দেখেছিল। মেঘলা দিন পেয়ে শিমফুলের শাদা আর বেগুনী রং জাংলা উজিয়ে নিজেদের রূপ দেখাচ্ছে।

হেলেনার হাতে একটা ডালা। পুরুষ্ট শীমের ছড়া তুলে ডালায় দিচ্ছে, আর খুঁজেপেতে তানিয়াকে দেখিয়ে দিচ্ছে। ওড়না কোমরে জড়িয়ে মাথা নিচু করে জাংলার ভেতরে ঢুকে পড়ে তানিয়াও। একটা লাউডগা ভাঙ্গার সময় আড়চোখে হেলেনার বাড়ানো হাত, আঙ্গুলের গিঁট, ভাঙ্গা নখে তেল মশলার দাগ দেখে নেয়। জাংলার ভেতরে আরো ছায়া ছায়া। মুখের ভাব পরিস্কার বোঝার জন্য সিধে হয়ে দাঁড়ানোর উপায় নেই।

আকাশে ভেসে থাকা শাদা মেঘ নিয়ে নিজেদের খেলা মনে পড়ে যাচ্ছে তানিয়ার। হেলেনার কি মনে আছে! এসব এখন আর জানতে চাওয়া চলে না।

পায়ের কাছে অযত্নে গজিয়ে ওঠা কিছু বথুয়া শাক সযত্নে এড়িয়ে আবারো শিম খোঁজে তানিয়া।
নিজের সঙ্গে হেলেনার দূরত্ব, যে দূরত্ব তৈরী হতে এক পাষাণভার সময় পার করতে হয়েছে।
দু'জনের পথের গতিকও মেলানো অসম্ভব কল্পনা এখন!

অথচ একটা সময় ছিল যখন 'হেলেনা-তানিয়া পরিষদ' বলে স্কুলে ছেলেরা ক্ষ্যাপাতো। পাশাপাশি বসার জন্য সমীর স্যারের কত যে ধমক খেয়েছে। স্যার চিবিয়ে চিবিয়ে বলতেন- 'এক সঙ্গে না বসলে পেটের ভাত হজম হয় না তোদের?'
এসব বকাবাদ্যি কোন কাজেই লাগতো না।
বরং সুযোগ পেলেই দু'জন একসঙ্গে। টুকরো কাপড় দিয় পুতুল বানানো দিনগুলো কবে যে আকাশের মেঘ দেখার দিনে বদলে গেছে টের পায়নি। তানিয়াদের উঠানে বিশাল খড়ের গাদার ওপরে শুয়ে বসে কত জোৎস্নারাত আর শরতের বিকেল পার হয়েছে! মেঘ দিয়ে সংসার সংসার খেলতে গেলে একটা গুরুক গুরুক আওয়াজ বুকের ভেতরটা আন্দোলিত করে যেত।

দেখা হবে ভাবেনি তানিয়া। ঘুরিয়েও বলা যায়, যে হেলেনা আসবে তাও ভাবনার অতীত ছিল। কিন্তু সত্যি হচ্ছে এই, যে তারা দু'জন হাতছোঁয়া দূরত্বে লাউ শীমের জাংলার নিচে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কারো চোখে সরাসরি চোখ ফেলছে না।
হেলেনা বলে-' অই যে পাতার নিচে পুষ্ট শীম!'
তানিয়ে অত্যুসাহে আঙ্গুল তুলে দেখায়- 'ঐ তো আরেকটা কচি লাউ!'
টেনে টেনে সুরেলা, সৌজন্যে ভরা কণ্ঠে কথা বলে দুজনে।
সব্জি তোলা শেষে ঘরের বারান্দায় চেয়ার পেতে রোদের অপেক্ষা করে তানিয়া। পাশে মেঝেয় শাক আর শীমের পাজা রেখে কুটে বেছে রাখছে হেলেনা। আপন মনে কি একটা গান করছে, সুরের মধ্যে তির তির বিষাদ আছে! গুনগুন করাটা একটু আরোপিত লাগছে কি! কিছু কি প্রমাণ করতে চাইছে? অতিরিক্ত সুখীভাবের ন্যাকামো কানে লাগছে! অথবা এসব তানিয়ার কল্পনা?

নিজের তুলনায় ভালো স্বাস্থ্য, সবসময় শক্তপোক্ত হেলেনার কাঁধের ওপরে যে ওর নিজেরই মাথা সেটা আর কেউ না জানলেও তানিয়া জানে। তবুও শীতের সকালেও তার নাকে বিজবিজ করছে ঘাম, লাল শাক থেকে আঙ্গুলের ডগায় উঠে আসা লালচে রং আর নিচু করে রাখা চোখের পাতায় কোন অধরা স্বপ্নের কথা পড়তে চায় তানিয়া।

এক টুকরো রোদ এসে তানিয়ার পায়ের কাছে লুটোপুটি খায়। শাক বাছতে থাকা হেলেনার হাতের সঙ্গে বুড়ি ছুঁই খেলে, হঠাত ত্রস্ত ভঙ্গিতে হাতের গতি বেড়ে যায় ওর, যেন কোথাও যাবার তাড়া আছে। হঠাৎ মনে হয় হেলেনার জন্যও একজন নরম মনের মানুষ থাকা উচিত। ওর বাইরের চেহারায় সবার জন্য দেয়াল তুলে দেয়া থাকলেও ভেতরে একটা কোমল পুকুর আছে, তা তো সে জানতো।

বিদ্যুতচ্চমকের মত নিজের এই ভাবনায় অবাক হয় তানিয়া। আজকের দেখার আগ পর্যন্ত সে নিজের ভেতরে হেলেনার জন্য কোন ঘাই, কোন কোমলতা অনুভব করেনি দীর্ঘকাল! বরং উল্টোটা হয়েছে। অথচ আজকে স্কুলের দিনগুলি ফিরে এসে তুমুল বর্ষা দিয়ে তাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে আহা হেলেনাও যদি ওর মত সব সুযোগ পেত!
চোখের সামনের হেলেনার চেয়ে অদৃশ্য হেলেনা বেশী শক্তিশালী, যার কথা ভাবলে তানিয়ার বুকের ভেতরে অগ্নিকুন্ড জ্বলতে থাকে। কিন্তু সামনে বসে থাকা এই হেলেনাকে দেখে তেমন কিছু হচ্ছে না।

বাবা সে বছর বদলী হয়ে সিলেট চলে গিয়েছিল তিন বছরের জন্য। তারপর নিজেরা গ্রামে ফিরলেও তানিয়ার ফেরা হয়নি।
সে তিন বছরে কি হলো- ওর কাছে সেসব প্রসঙ্গ কি তোলা যায়! সে তো এখন দূরের, সমীহ দেখানোর। শীম শাক কোটাবাছার ফাঁকে উঠে গিয়ে তানিয়ার জন্য চা আনে। রান্নাঘরে ভাপা পিঠে হচ্ছে, সেখান থেকে গরমাগরম তুলে এনে সামনে দেয়। কিন্তু চোখে চোখ রেখে কথা বলে না।

আশ্চর্যের বিষয় যে তানিয়ার ইচ্ছে করে আলাপ জমাতে। ছোটবেলার স্কুলের কথা বলতে চায়। মনে মনে এ ধরনের কথোপকথন চালিয়ে বাইরে নিরস্ত থাকে সে। কেন যেন নিজেকে দুর্বল ঠেকে। হেলেনার জোরালো কব্জির সঙ্গে কথা চালাবার জের সামাল দেয়ার মত শক্তি তিন দিনের ছুটি কাটাতে গ্রামের বাড়ি এসে তার আছে কি না যাচাই করতে ইচ্ছেও করে না।

ছ'ঘন্টার বাসজার্ণি। পরীক্ষার আগে রাতজাগার মত ঝিম ঝিম করছে শরীর। বাসে দুএকবার তন্দ্রামত এসেছে, কিন্তু রাস্তার ঝাঁকিতে ঘুম তখন স্থির- অস্থিরতার পেন্ডুলাম। ভেবেছিল, নয়নাভিরাম কোন দৃশ্য পেলে ছবি তুলবে, জয় গোস্বামী'র আলেয়া হৃদ এনেছিল, পড়বে। কতদিন কবিতা পড়ে না সে!
বাড়িতে এসে ধবধবে বিছানায় গা ছেড়ে দিয়েও লাভ হয়নি, ঘুম আসেনি।

ঘুম না আসার সঙ্গে সেই কবে তার কল্পিত দাম্পত্য শুরু হয়েছিল। নিজামের স্থান দখল করলো ইনসোমনিয়া। হাস্যকর উপমা হলেও সত্যি যে নিজাম এবং তার ঘুম না আসা দুইই গাছের গোড়ালীর মত শক্ত। তানিয়াকে কাবু করে রাখতে পারে। শারিরীক, মানসিক যে কোন পরিশ্রমে নিজামের কোন বাড়তি কোন অনুসঙ্গ দরকার হতো না। সে তুলনায় তানিয়া লতাগোত্রীয়। কে জানে এজন্যই হয়তো ওর আব্বা মেয়ের জন্য নিজামকে পছন্দ করেছিল। বিপুল প্রাণশক্তি নিয়ে ঘোরাফেরা করছে, তার মত নাজুক কাউকে দেখভাল করতে সমর্থ হবে। আব্বার এসব ভাবনা অনুমান করে নিতে সমস্যা হয় না তানিয়ার। ছিলতো অমন। স্বার্থ উদ্ধারকারী, একরোখা।

কিন্তু সেই আব্বাও টের পায়নি, যে আস্তাবলের তেজী ঘোড়ার মত নধর দেহের খাঁচায় আসলে একদলা আবেগ বাস করতো নিজামের। সংসারের জন্য যে জন্মায় না।
গ্রামের বাড়ির সরগরম গার্হস্থ্যে সেই স্কুল জীবন থেকেই তানিয়া বাইরের মানুষ। মা যখন দুই চাচী আর কাজের লোক নিয়ে উঠোন ভর্তি ধানপাট আগলায়, তানিয়া তখন খাট জুড়ে বই নিয়ে বসে থেকেছে। ক্লাসের বই, বাইরের বই। ওজর একটাই, পরীক্ষায় ভালো করা। ফলাফল- আজকে তানিয়া ডাক্তারী পাশ করে আরো বিশেষজ্ঞের পড়া পড়ছে। এতদিন পড়ার চাপে, শহরে জীবনের ধকলে সে দেখার সুযোগ পায়নি, কবে কখন কেমন বেখেয়ালে সে নাড়ী ছেঁড়া হয়ে গেল। নিজেকে মেহমান মেহমান আর না ভেবে পারে না।

এতদিন পর বাড়ি এসে নিজেকে জোর করবে বলে ঠিক করে বাইরে বেরুবার জন্য উঠে পড়লো তানিয়া। ছোটচাচী কাউকে সঙ্গে নিতে বললে গা করলো না। যদিও সে অনেক বছর আর গ্রামে থাকে না, তবু এখানে নাম ধাম বলে নিজেকে চিনিয়ে দিতে হবে না।
নিজেদের চৌহদ্দি পার হয়ে বড় রাস্তায় উঠতেই পেছনে হন্তদন্ত হয়ে হেলেনা হাজির। চাচীর কারবার! মনে মনে হাসে তানিয়া, ঠিকই পাঠিয়ে দিল কাউকে। আবার স্বস্তিও লাগে।
সড়কের পাশে জমির আলগুলো আগের মত চৌখুপি, কিন্তু সর্বগ্রাসী সবুজের কাছে শিশু হয়ে যেতে ইচ্ছে করে তানিয়ার।কোথায় যাবে সে? কিছুটা হেটে কালভার্ট পার হলে তার প্রাইমারী স্কুল। গেলে হয়, নতুন শিক্ষক, কচি মুখের ছাত্রছাত্রী দেখে এলে হয়। কিন্তু হেলেনাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে?

মিলন স্যার নাকি রিটায়ার করেছে সেই কত বছর আগে। তারপরও, স্কুলে গেলে হয়।
না কি নদীর দিকে যাবে। গতবার যখন এসেছিল, নদীর ধারে গিয়ে শোঁ শোঁ বাতাসে ফুঁসে ওঠা নদী দেখেছিল, অথচ তার চেনা এই নদী সব সময় শান্ত স্থির। মনের ভেতরও তেমনটাই বানিয়ে রাখে সে।
নদী বাদ দিলে অন্য যে ছবিটা ভেসে ওঠে সেটা ঐ গ্রামের সপ্তার হাটের পেছন দিকের হতদরিদ্র পাড়া। স্কুলে আসতে যেতে কতদিন ঐ বস্তির ঘরগুলির সামনে মেয়ে মানুষের ন্যাতানো বুকখোলা ঝগড়া দেখেছে। তখন হয়তো তাদের উঠানের চুলায় টগবগ করে ভাত ফুটছে। কোমরে ঘুনসি বাঁধা ন্যাংটা ছেলেটা ময়লা আঙ্গুল চুষেই চলেছে। নিজাম ওদের উঠানে পিড়িতে বসে খুব গল্পগাছা করতো, হেলেনাও বারান্দার খুটিতে হেলান দিয়ে হা হা হিহি করতো। তানিয়া সেখানে দূরের মানুষ। গেলেও সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তো, তাকে কোথায় বসতে দেবে, কি খেতে দেবে। ওদের সম্ভ্রমের আচরণ তানিয়ার ভেতরকে গুটিয়ে তুলতো। সুতরাং বেশীক্ষণ থাকা হতো না তার। বরং ফিরে এসে নিজের হোমওয়ার্ক হিসেবে ঐ পাড়াটার অন্য একটা নাম দিতে চাইতো। কিন্তু পারতো না। এতদিনে ঐ হতচ্ছিন্ন এলাকার কি কোন রদবদল হয়েছে, যাতে তাকে স্বর্গফেরা নামে ডাকা যায়? কে জানে হয়তো গুগল ম্যাপে খোঁজ করলে সুবেশ নরনারী, সুস্বাস্থ্যের শিশু আর সুরম্য বাগানের দেখা পাবে! দীর্ঘ, স্বাস্থ্যবান নারী, পুরুষ, শিশু। সবার চেহারা একরকম, প্রথম প্রথম চায়নিজ বা জাপানিজদের দেখলে যেমন লাগে। হোমওয়ার্ক হিসেবে এদের সবার চেহারা আলাদা করে ফেলার চেষ্টা করলে কেমন হয়?

কে কে যেন ঝগড়ায় জিতে, অথবা না জিতে বুক চাপড়ে হাসতো, অথবা পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসতো?
হেলেনার সংগে দেবে নাকি অমন একটা ঝগড়া লাগিয়ে? সে কি জিতবে? মনে হয় না।
জেতার জন্য বুকের ভেতর যে জোর চাই, তা আছে কি না তা নিয়ে তানিয়া সন্দিহান।
নিজের বালখিল্যতায় হাসি পায় তানিয়ার। নিজেকে ফেইল মার্ক দিয়ে হাল ছেড়ে দিতে দ্বিধা হয় না। দিনশেষে সে তো ঐ হাল ছেড়ে দেয়া মানুষদেরই দলে। তা না হলে এত নিশ্চিন্ত জীবন তার হয় কি করে!
হেলেনা এক কদম পিছিয়ে পিছিয়ে হাটে। তানিয়া হাসিমুখ করে তার জন্য থামে।
চট করে জিজ্ঞেস করে ফেলে- 'মিলন স্যারের কি খবর?' বলেই তানিয়া বোঝে যে বলা ঠিক হয়নি
হেলেনার মুখটা পাংশুটে দেখায়।

মিলন স্যার একলা মানুষ। ছাত্রছাত্রীরা তার বাড়ি অংক শিখতে আসতো। কেউ কেউ তার বাড়ির কাজে সাহায্যও করতো। সে অর্থে নিজাম ছিল স্যারের ডান হাত। পড়ার পাশাপাশি স্যারের সব কাজ করতো। হেলেনা আর তানিয়া যখন প্রাইভেট পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরতো, তখন নিজামই হেলেনাকে ডেকে জেনে নিতো স্যারের জন্য রান্নার ডালে কতটুকু লবণ দিতে হবে।

তানিয়ার কি তখন ঈর্ষা হতো! নিজাম কেন তাকে না ডেকে সব কাজে হেলেনাকে ডাকে! অথচ সবাই জানে তানিয়ার আব্বা নিজামকে মেয়ের জামাই করবে বলে স্থির করে রেখেছে। তানিয়াও ভালো ছাত্রী, কিন্তু নিজাম হচ্ছে, যাকে বলে প্রতিভা। এসএসসি তে সম্মিলিত মেধা তালিকায় থাকা গ্রামের একটি ছেলের জন্য সামান্য বিষয় না। তাকে টার্গেট করে রাখা বুদ্ধিমান অবিভাবকের কাজ। গরীব কৃষকের মেধাবী এবং দেখতে সুদর্শন ছেলেটিকে দখল করা পুলিশের এস আই এর কাছে তুড়ি মারার মত ব্যাপার।

হেলেনার অন্তঃস্বত্তা হয়ে যাওয়ার গুজব আর সবার মত তানিয়াও বিশ্বাস করেছিল, করতে গিয়ে নিজেকে কুঁকড়ে কুঁকড়ে দেখেছে কতগুলো বছর! এখন মনে হচ্ছে- ঐ সময়ে ফিরে গিয়ে নিজের জন্য যত মায়া হয়, হেলেনার জন্য তারচে বেশী হওয়া উচিত। সে তো নিজের হেরে যাওয়ার গ্লানি নিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়ে বেঁচেছিল, কিন্তু এই মেয়েটিকে মানুষের ঝাঁকে ঝাঁকে কথার তীর থেকে নিজেকে আড়াল করতে হয়েছে। নিজের বেআব্রু শরীর মাত্র দুটো হাত দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করতে হয়েছে।

তখন হেলেনাকে ইর্ষা হতো। এখন বুকের ভেতর ঈর্ষার ইলশেগুড়ি বৃষ্টি থেমে গেছে বলে মনে হচ্ছে কি? নিজামের গা থেকে হেলেনার গন্ধ মুছে যায়নি ভেবে এখানে আসার আগেও তার কেন কষ্ট হচ্ছিল!
পথের পাশে বুনো ফুলের ঝাড়। তানিয়াকে দাঁড়াতে দেখে হেলেনা তরতর করে ঢাল বেড়ে নেমে গিয়ে এক গোছা তুলে আনে।

***
তানিয়া আসবে জেনেই বুঝি ফুপু তাকে ডেকে এনেছে। হেলেনাও এবার জেনে বুঝেই এসেছে। কতকাল সে ফুপুর বাড়ি এড়িয়ে যাবে। তানিয়ার যা পাওয়ার কথা ছিল হেলেনা তো দিয়েই দিয়েছে।
নিজাম হেলেনাকে ছাড়তে চায়নি। তানিয়াও শেষতক নিতে চায়নি। কিন্তু ওর আব্বার জেদের কাছে সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছে। শুধু কি জেদের কাছে? টাকার কাছেও তো।
পালিয়ে যাওয়ার মত কোন ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু তারা পালিয়েছিল। বাড়ি থেকে পালাতে হলে ক্লাশ টেন হেলেনা আর এসএসসি পাশ নিজামের যে রসদ, বুদ্ধি এবং যোগাযোগ লাগে তার কোনটাই ছিল না। তবু ঘটনা ঘটে, কার্যকারণ সম্পর্ক ছাড়াই ঘটে।
নিজাম একদিন বিকেলবেলা সমীর স্যারের উঠানে কাজি পেয়ারা গাছের পাতা গুড়ো করতে করতে হেলেনাকে বলেছিল-'চলো পলায়া যাই'।
নিজামের কচি সবুজ লাউয়ের মত পিঠ , জোড়া ভ্রু'র নিচে গভীর চোখ। সে দৃষ্টির সামনে হেলেনা কাবু হয়ে গেল। কাবু হওয়া তাকে সাহসও জোগালো।
কাপড়ের ভাঁজে মায়ের জমানো টাকা নিয়ে একদিন ভোররাতে নিজামের সঙ্গে বাসে উঠে পড়ে সে। সেদিনের ভোররাত অন্ধকারকে হালকা সবুজ আবরণে মুড়িয়ে রেখেছিল।

তখনো মোরগ বাগ দেয়নি। আশ্বিনের বাতাস গায়ে অল্প শিরশিরানি আনলেও খুব ভালো লাগে হেলেনার। নিজাম তার কাঁধ একহাত দিয়ে বেড় দিয়ে রেখেছে। আড়চোখে ফিরিয়ে ফিরিয়ে ওর স্পষ্ট গোঁফের রেখা, পুরুষ্ট ঠোঁট, শ্যামবর্ণ ত্বক আর চওড়া কাঁধ দেখে হেলেনা। এই মানুষটা শুধুই ওর! আজকে থেকে আরো বেশী করে শুধুই ওর। বাস যখন ভোরের আলো ভেদ করে ভেসে আসা হাওয়ার মধ্যে দিয়ে ছোটে তখন হেলেনা তার মাথা নিজামের কাঁধে এলিয়ে দেয়। তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে নিজামের অনুচ্চারিত সব স্বপ্ন নিজের ভেতর অনুভব করতে করতে কখন তারা নগরবাড়ি ঘাটে পৌঁছে গেছে, টের পায়নি। গন্তব্য ঢাকা। সেখানে গেলে স্কুলের অত ভালো রেজাল্ট নিয়ে কিছু না কিছু করতে পারবে সে বিষয়ে নিজাম নিশ্চিত। সে নিশ্চিন্তি হেলেনাকেও নির্ভার রাখে।

ঝকঝকে দিনের আলোয়, ব্যস্ততামূখর নিজাম যখন তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে তখন সে হকচকিয়ে যায়। নাস্তা খাওয়ার জন্য কোন হোটেলটা ভালো হবে তা ঠিক করতে গিয়ে অপ্রস্তুত লাগে। কমবয়েসী ছেলেমেয়ে দুটিকে লোকজন কৌতুহলী হয়ে দেখে। হোটেলে ঢুকে নিজাম বসে বাইরের দিকে মুখ করে, আর হেলেনা ভেতরের দিকে, তার পিঠ রাস্তার দিকে।

অপেক্ষার আগেই ডিম পরোটা এসে যায়, আর দু'তিন গ্রাস মুখে তুলতে না তুলতেই কেউ একজন কাছে এসে দাঁড়ায়, বলে- 'কি ব্যাপার নিজাম? তুমি এইখানে?'
হেলেনা তখন মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকালে দেখে পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে!

তানিয়ার আব্বাকে হেলেনা চিনতে পারেনি প্রথমে। কখনো পুলিশের পোষাকে দেখেনি তো। বাড়িতে যখন আসতো তখন তার সাধারণ পোষাক, বাড়ির আশপাশের বাচ্চা, তাও মেয়েবাচ্চাদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ বা কথা বলার প্রশ্ন ওঠে না। একগ্রামে হলেও, সম্পর্কে আত্মীয় হলেও খাতির জন্মানোর প্রশ্ন ওঠেনি। পুলিশের এস আই এর সঙ্গে গরীব আত্মীয়দের দূরত্ব থাকাই সহবত। কত জায়গায়ই তো ডিউটি থাকে, কিন্তু সেটা যে নগরবাড়ি ঘাটে, আর তা যে হেলেনাকে নিয়ে নিজামের পালানোর দিনেই, কে জানতো?
নাহ, বাড়ি থেকে কেউ পুলিশে খবর দেয়নি। তানিয়ার আব্বাই নিজস্ব জেরার পর সবকিছু দ্রুত বুঝে নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দুজন'কে ধমকে পুলিশের গাড়িতে উঠিয়ে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। তার পরনে তখনো পুলিশের উর্দ্দি।
এদিকে মেয়ে হারিয়ে গেছে ভেবে হেলেনার মা ঘন ঘন ফিট হচ্ছে।

হেলেনাকে ঘরে তালাবন্ধ করে রাখার ফরমান জারি করলেন পুলিশ ফুপা। মুহূর্তের মধ্যে তার অপরাধের শাস্তি পাওয়া শুরু হলো। যেন চারদিকে ইটের দেওয়াল তোলা হচ্ছে, আর সে কৌতুহলী জনতার ছুড়ে দেয়া পাথরের তলায় জীবন্ত কবরে অদৃশ্য হচ্ছে ।
দিনের আলোয় ডুকরে ডুকরে তানিয়া নিজের অপমানের জন্য কাঁদলো।
তার মত নিরীহ কোমল মেয়ের কান্নাকাটির শোধ নিতে নিজামের দু'হাত বেঁধে উঠানের বিশাল আমগাছের ডালে ঝুলিয়ে দেয়া হলো। পুলিশের এস আই এর কোমর থেকে খুলে আনা বেল্ট ক্লান্ত করে বেদম পেটানো হলো তাকে। নিজাম চিৎকার করেনি, গুমরে গুমরে বোবা পশুর মত শব্দটা দ্বিগুণ তিনগুণ হয়ে গাছের ডালের ভেতর পাতার ফাঁকে ফাঁকে বাতাস বিদীর্ণ করেছিল। পাড়ার সবাই থম ধরে থাকা গরমের মধ্যে হাতপাখা নাড়তে ভুলে গিয়ে ঘুমাতে গিয়েছিল সেদিন।
পরদিন ভোররাতে ওই গাছের ডালেই ঝুলে ছিল নিজাম। একটু রক্তবমি ঠোঁটের কোনা দিয়ে বেরিয়ে আসা জিভ ছুঁয়ে গলায় প্যাঁচানো দড়িতে এসে শুকিয়েছিল।
নিজামকে হারিয়ে ফেলার কষ্টে সে সকালে আর কেউ কাঁদেনি। না তানিয়া, না হেলেনা।
পুলিশের বিরুদ্ধে আর থানা পুলিশ কি হবে? তেমন কিছু হয়নি।
তার পরপরই তানিয়ার বাবা বদলী নিয়ে তিন বছরের জন্য সিলেট চলে গেল। তানিয়া সেখানে মেডিকেলে ভর্তি হলো। সেখানেই লাগলো কতগুলো বছর!

****
হেলেনা এবার তানিয়ার পাশে পাশে হাঁটে। এই গ্রামে তার বিস্তর হাঁটাহাটির অভ্যাস। স্থানীয় এনজিওর ফিল্ডকর্মী, স্বাস্থ্য আপা বলে লোকে তাকে চেনে, আপন ভাবে।
আড়ালে তাকে নিয়ে কথাবার্তা আর পাত্তা দেয় না হেলেনা। গ্রামের মানুষের আগে এসব ঘটনা ভুলতে সময় লাগতো। সময় কাটাতে মুখরোচক ঘটনার দরকার পড়তো। এখন চারপাশে অগনন ঘটনার স্রোত। গ্রামের ছেলেবুড়ো সবার বিনোদনের জগত আছে। টিভি, মোবাইল, ফেসবুক, ইউটিউব। কেবল আঙ্গুলে স্ক্রল করে যাও। আঙ্গুলের তলায় তলিয়ে যাওয়ার মত নিজামও তলিয়ে গেছে। তার সঙ্গে জুড়ে থাকা হেলেনা তানিয়া'র কথাও মানুষ অন্যভাবে মনে রাখে।
এখন হেলেনা যেমন এনজিও'র আপা, তানিয়াও তেমন শহরে বড় পাশ দেয়া ডাক্তার।
দু'জনে পাশাপাশি ক্ষেতের আল পার হচ্ছে- এই দৃশ্য দেখতে গ্রামের দু'একজন দাঁড়িয়েও পড়ছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক