তসলিমা নাসরিনের পদ্মা মেঘনা

তসলিমা নাসরিন
Published : 12 April 2022, 03:32 PM
Updated : 12 April 2022, 03:32 PM


চিত্রকর্ম: পাবলো পিকাসো


কলেজে পড়ার সময় একদিন ঠিক হলো মৌমিতা পপিকে পদ্মা বলে ডাকবে, আর পপি মৌমিতাকে ডাকবে মেঘনা বলে। এই নামে ডাকার পর থেকেই তারা বিশ্বাস করতে শুরু করলো, তারা বইছে। তারা বইতে বইতে পরস্পরের মধ্যে মিশে যাচ্ছে, তাদের আর কোনও পৃথক অস্তিত্ব নেই। তারা এক এবং অভিন্ন । বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝবে না এই দুই বান্ধবীর রসায়ন মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। খুব গোপন ব্যাপারটি শুধু তারাই জানে। দুই বান্ধবী হোস্টেলে এক রুমে বাস করেছে, চাকরি করতে গিয়েও কর্মজীবী হোস্টেলেও এক রুমে, তারপর হোস্টেল জীবন থেকে বেরিয়ে এসে ঢাকার শান্তিবাগে ছোট একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করে দু'জন দিব্যি সংসার করছে। দুজনই উত্তরা ব্যাংকে একই শাখায় চাকরি করে। বাড়িতে, বন্ধু মহলে, অফিসে সকলেই জানে পপি আর মৌমিতা দু'জন প্রাণের বন্ধু। সবই তো চমৎকার ছিল, স্বচ্ছ জলে সুখ এবং শান্তির সাঁতার ছিল। গোল কোথায় বাঁধলো তাহলে? গোল এমনি এমনি বাঁধেনি, গোল বাঁধিয়েছেন পপির বাবা। ময়মনসিংহ থেকে দু'দিনের জন্য ঢাকায় এসেছিলেন তাঁর এক্সপোর্ট ইম্পোর্টের ব্যবসার কাজে। ছ' মাস অন্তর অন্তর তাঁকে আসতে হয় ঢাকায়। পপি আর মৌমিতার সংসারে অতিথিদের জন্য আলাদা ঘর আছে, আলাদা খাট পাতা আছে, সে খাটেই ওরা অতিথিদের শোবার ব্যবস্থা করে দেয়। পপির বাবা অতিথি হয়ে ও ঘরেই শুয়েছিলেন। কিন্তু মধ্যরাত্তিরে বাথরুমের পথ ভুল করে পপি আর মৌমিতার শোবার ঘরে ঢুকে পড়ে দৃশ্যটি দেখে ফেলেন, দু'জনই সম্পূর্ণ উলঙ্গ, পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছে। ঘরে উজ্জ্বল কোনও আলো না থাকলেও নরম আলো ছিল, নরম স্বরে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজছিল আর ঘরে ছড়িয়ে ছিল বেলি ফুলের সুগন্ধ। পপির বাবা দ্রুত বেরিয়ে যান ঘর থেকে। এরপর সেই নরম আলো নিভে গেল, গানও বন্ধ হয়ে গেল। ঘোর অন্ধকারে সটান শুয়ে রইলো তিনটে প্রাণী। এক ঘরে পপি আর মৌমিতা, অন্য ঘরে পপির বাবা গোলাম মোস্তফা।

মৌমিতা রাতে ফিসফিস করে বলেছিল পপিকে, যাহ, গিয়ে ক্ষমা চেয়ে আয়। পপি রাজি হয়নি, ক্ষমা চাইবে না সে। সকালে চা করতে গিয়ে দুজনই দেখে, ফ্ল্যাটের বাইরে যাওয়ার দরজাটি খোলা। গোলাম মোস্তফা কাউকে না বলে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেছেন। মৌমিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, তোকে বলেছিলাম ক্ষমা চাইতে। এখন তো কেলেঙ্কারি হবে একটা। পপি খাবার টেবিলের একটি চেয়ার টেনে নিয়ে জানালার কাছে গিয়ে বসলো, উদাস দৃষ্টি গাছপালা পেরিয়ে দূরের রাস্তার দিকে। জোরেই বললো, ক্ষমা চাইবো কেন, আমি তো কোনও অন্যায় করিনি। আমি প্রেম করছি, আমার সঙ্গী আমি বেছে নিয়েছি। তাতে তাঁর অসুবিধে হবে কেন? উনি এসেছেন, যথেষ্ট যত্ন করা হয়েছে তাঁকে। রাতে নিজের হাতে তাঁর পছন্দের খাবার রেঁধেছি, পাশে বসে খেয়েছি, গল্প করেছি।

মৌমিতা দুজনের জন্য দু'কাপ চা এনে এক কাপ পপির হাতে দিয়ে নিজে আরেক কাপ নিয়ে সোফায় বসলো। বললো, কিন্তু উনি দেখে ফেলেছেন তো আমাদের। কী অবস্থায় দেখেছেন একবার তার চোখ দিয়ে দেখ।

–এ আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাঁর তো আমার ঘরে ঢোকার কথা ছিল না, উনি ঢুকলেন কেন? সবারই প্রাইভেসি দরকার। আমি তাঁর অধীনে থাকি না। তাঁর খাই না পরি না। আমি কী করবো, কার সাথে শোবো না শোবো সে আমি বুঝবো। আমার জীবন তো আমার, তাঁর না। আর আমার বয়স তো আঠারো না, রীতিমত পঁচিশ। আমি প্রাপ্তবয়স্ক একটা মানুষ। নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি কার সাথে জীবন যাপন করবো।

মৌমিতা ম্লান স্বরে বললো, কেন যে বেডরুমের দরজা বন্ধ করতে দুজনই ভুলে গেছি। উনি দৃশ্য দেখে শকড। আমরা ঘনিষ্ঠ বান্ধবী সেটাই তো জানতেন, আমাদের এই সম্পর্কটা তো জানতেন না।

–না জানলে এখন জেনেছেন। বাড়িতে সবাইকে জানাবেন। জানালে ভালো তো। সবাই জানবে। আমরা তো জানতামই যে একদিন না একদিন জানাজানি হবে।

মৌমিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। পপি এবার চা শেষ করে সোফায় মৌমিতার পাশে বসে বলে, আমাদের এবার মনে হয় সবাইকে জানিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে।

– দরকার হলে জানাবো। খামোকা জানাবো কেন? আমরা তো আর সেলেব্রিটি না যে আমাদের পারসোনাল ব্যাপারে কারো ইন্টারেস্ট আছে! নিজে থেকে অচেনা লোকদের জানাবো কেন? আমরা তো গে মুভমেন্ট করছি না যে জানানোর দরকার আছে। আমরা অরডিনারি পিপল। অরডিনারি পিপলরা বিছানায় কার সঙ্গে কী করে তা ব্যক্তিগতই রাখে। বলে বেড়ায় না।

সেদিন অসুস্থতার কথা বলে ব্যাংক থেকে ছুটি নেয় পপি আর মৌমিতা। ডায়রিয়া, জ্বর, এগুলো বললে ম্যানেজার ছুটি দেয়, কিন্তু সত্যি কথা যদি বলতো যে মন ভালো নেই, ব্যাংকের কাজে মন বসবে না, সে কারণে ছুটি চাইছি। তাহলে ছুটি দেবে না। অন্যান্য অফিসের মতো তাদের অফিসও শরীরকে গুরুত্ব দেয়, মনকে নয়। বাড়িতে বসে সারাদিন আলোচনা করে তারা এই সিদ্ধান্তে আসে যে, তারা ফ্ল্যাট বদলাবে, কাউকে নতুন ঠিকানা জানাবে না। বাড়ির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রাখার কোনও দরকার নেই। গোলাম মোস্তফা যে আচরণ করলেন, তাতেই বোঝা যায়, তিনি এই সম্পর্ক মেনে নিতে রাজি নন। পপি আর মৌমিতা দুজনই একমত এই ব্যাপারে যে সম্পর্কটি যারা করছে তারা মানলেই যথেষ্ট, অন্যদের মানা না মানায় কিছু যায় আসে না। পপির আশঙ্কা, তার বাড়ির লোকেরা মৌমিতার বাড়িতেও জানিয়ে দেবে দুঃসংবাদটি। মৌমিতার মা আর পপির মা ফোনে দু'একবার কথা বলেছেন। তার মেয়ে শিক্ষিত বাড়ির মেয়ের সঙ্গে সই পাতিয়েছে এ নিশ্চিত হয়েছেন। মৌমিতার বাড়ি যশোহরে। যশোহর থেকে ঢাকায় ভ্রমণ করা তার পরিবারের খুব একটা হয় না। কেউ এলে পপির বাড়ি থেকেই আসে। তাছাড়া ঈদের ছুটিতে বছরে একবার যে যার বাড়ি বেড়াতে যায়। যাওয়া আসা কম হলেও মেয়ে ঢাকায় চাকরি করছে, মেয়ে স্বনির্ভর, এই খবরে পরিবারের সকলে স্বস্তি পায়। পপি বা মৌমিতা একা নয়, তারা একে অপরের দেখভাল করছে, আরও মেয়েও আছে তাদের বন্ধুমহলে, এও পরিবারের জন্য স্বস্তিকর। আজকাল হাতে হাতে ফোন হয়ে যাওয়ায়, যে কোনও সময় ভিডিও কল করার সুযোগ হাতে থাকায়, কেউ কাউকে খুব একটা মিস করে না। মেয়ে বড় হয়েছে, আজকালকার মেয়েরা নিজেরাই পছন্দের পাত্র খুঁজে নেয়। সুতরাং অভিভাবকেরা মেয়ের বিয়ে নিয়েও চিন্তিত নন।

পপিই দু'দিন বাদে ফোন করে মায়ের কাছে। জিজ্ঞেস করে তার বাবা কিছু বলেছে কিনা মাকে। আসমা আখতার বললেন, না তো। কেন, কী হইছে? কী বলবে?
–আমাকে না বলে ভোরবেলা বেরিয়ে গেছে। এই ব্যাপারে কিছু বলে নাই?
–আমারে কিছু বলে নাই।
–কিছু উল্টোপাল্টা বললে আমারে জানাইও। আর, শোনো আম্মা, আমি ছোট খুকি না। আমারে জ্ঞান দেয়ার চেষ্টা করলে কোনও লাভ হবে না বলে দিলাম।
–তোরে জ্ঞান কে দিতে চাইল? কী কথা বলস, বুঝি না।
পপি কথা বাড়ায়নি।
যেহেতু বাড়িতে গোলাম মোস্তফা জানাননি, অগত্যা নিশ্চিন্তে পদ্মা আর মেঘনা বইতে থাকে নিজের মতো করে। দুঃখে সুখে এক সঙ্গে। অফিসেও এক সঙ্গে, অফিসের বাইরেও এক সঙ্গে, নাওয়া খাওয়া একসঙ্গে, কখনও কখনও সিনেমা থিয়েটারে যাওয়া, নদীর ধারে ঘুরতে যাওয়া, সেও এক সঙ্গে। দুজনের আয়ে দুজনের সংসার দিব্যি চলে যায়। সচ্ছল পরিবারের মেয়ে তারা,পরিবারের কাউকে মাঝে মধ্যে উপহার ছাড়া আর কিছু দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। পরিচিতরা জানে ঢাকা শহরে একজনের বেতনে পোষায় না, দুজনে বা কয়েকজনে শেয়ার করলে তবে পোষায়। পদ্মা মেঘনা তা-ই করছে। একমাত্র গোলাম মোস্তফা ছাড়া আর কেউ জানে না তাদের সত্যিকার সম্পর্কটি। তিনি,পপি এবং মৌমিতা, দুজনই আশা করে, মেনে নেবেন সম্পর্কটি। শুধু ইউরোপ আমেরিকায় নয়, তৃতীয় বিশ্বের সমাজসংসারেও সমকামীদের সম্পর্ক অনেক সহনীয় হয়ে উঠেছে। তাছাড়া, গোলাম মোস্তফা কোনও কাঠমোল্লা বা মসজিদের ইমাম মৌলবী নন, তিনি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। জগতে কী হচ্ছে না হচ্ছে, তার খবর রাখেন।

পদ্মা আর মেঘনা দুজনের কেউ কোনওদিন পুরুষ স্পর্শ করেনি। তারা জানে না পুরুষের সঙ্গ কেমন, জানতেও চায় না। কিশোরী থাকাকালীন দুজনই ভেবেছিল, একদিন বিয়ে হবে, স্বামী সংসার হবে। পরিবার থেকে চাপিয়ে দেওয়া ভাবনাটির অণু পরমাণু জমাট বেঁধে কোনও স্বপ্ন তৈরি করার আগেই ঝাঁক ঝাঁক ধুলো এসে উড়িয়ে নিয়েছে, যেদিন পদ্মা আর মেঘনা ভালোবেসে পরস্পরকে স্পর্শ করেছে, যেদিন ক্লান্তিতে মেঘনার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে পদ্মা, যেদিন মেঘনার জ্বর হলে সারারাত না ঘুমিয়ে নিরলস সেবা করেছে পদ্মা, যেদিন শীৎকারে, শীর্ষসুখে দুজন তিরতির করে কেঁপেছে। এখন একজনের কোনও সমস্যা হলে আরেকজন দৌড়ে আসে। একজনের কাঁদার জন্য আরেকজনের কাঁধ আছে, একজনের প্রাণ খুলে হাসার জন্য আরেকজনের আলিঙ্গন আছে। পদ্মা বা মেঘনার কখনও মনে হয়নি তারা একা, তাদের জীবনে আরও কাউকে দরকার। তারাই একে অপরের ভরসা হয়ে উঠেছে, নিরাপত্তা হয়ে উঠেছে। বাকি জীবন, তারা চায়, এভাবেই কেটে যাক।

পদ্মা আর মেঘনা একে অপরের শরীরে মিশে যায়, হৃদয়ে মিশে যায়। তাদের বিচ্ছিন্ন করার সম্ভব নয়।

সবকিছুর শুরু চাঁদপুরে। বছর ছয় আগে কলেজের বেশ কয়েকজন ছাত্রীর সঙ্গে কলেজেরই এক বান্ধবীর বিয়েতে চাঁদপুরে গিয়েছিল পপি আর মৌমিতা। সেই চাঁদপুরেই নদীর ধারে হাঁটতে হাঁটতে তারা কথা বলেছিল, জীবনের অনেক কথা। সেই চাঁদপুরেই তো পদ্মা আর মেঘনা দুই নদী আক্ষরিক অর্থেই ছুঁয়েছে পরস্পরকে। চাঁদপুরেই হাতে হাত রেখে, চোখে চোখ রেখে, তারা মিশে গিয়েছিল একে অপরের হৃদয়ে। তখন সবে নতুন রুমমেট, পরিচয় ছিল, বন্ধুত্ব হয়নি। কিন্তু চাঁদপুরে বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি কিছু হলো। চাঁদপুরেই তারা সারারাত ছাদে বসে ভিজেছিল ভালোবাসায় আর জ্যোৎস্নায়। তারপর একের পর এক বছর পার হয়েছে, পদ্মার হৃদয় আরও গভীর করে স্পর্শ করেছে মেঘনার হৃদয়।

পদ্মা মেঘনার কী হলো তারপর? হঠাৎ এক রাত্তিরে পুলিশ দরজায় কড়া নাড়লো। দুজনকে হাতকড়া পরিয়ে থানায় নিয়ে গেল। পদ্মা আর মেঘনা বারবার জিজ্ঞেস করেও উত্তর পেলো না, কী তাদের অপরাধ। থানার দেখলো একটি চেয়ারে মাথা নিচু করে বসে আছেন গোলাম মোস্তফা। পদ্মা অস্ফুট স্বরে বললো— তুমি থানায় কেন? কী হইছে? এরা আমাদের কেন ধরে আনলো?

গোলাম মোস্তফা কোনও উত্তর না দিয়ে ভ্রু কুঞ্চণ করে একবার পদ্মা মেঘনার দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলেন।

প্রথমে কিছু বুঝতে না পারলেও পদ্মা মেঘনা দুজনের কাছেই পরিষ্কার হয় ব্যপারটি। গোলাম মোস্তফা পুলিশে অভিযোগ করেছেন, তার কন্যাকে মৌমিতা নামের এক মেয়ে ফাঁদে ফেলিয়ে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়েছে। পদ্মা মেঘনা অতঃপর পুলিশ এবং গোলাম মোস্তফার সামনেই বললো সব।

পুলিশ অফিসার আফতাব আহমেদ দুজনকে তাঁর সামনের দুটো চেয়ারে পাশাপাশি বসালেন। জিজ্ঞেস করলেন মৌমিতাকে, আপনি তো পপিকে ব্রেনওয়াশ করে অবৈধ সম্পর্ক করছেন।

পপি বললো, মৌমিতা আমার ব্রেন ওয়াশ করেনি, আমি ওকে ভালোবাসি।

এবারও মৌমিতাকে প্রশ্ন পুলিশের, আপনি ফ্ল্যাটভাড়া নিয়েছেন এই কাজ করতে?

এবারও উত্তর দিল পপি, ফ্ল্যাট আমরা দুজনই ভাড়া নিয়েছি। ও একা ভাড়া নেয়নি।

পুলিশঃ টাকা কোত্থেকে আসে? নারী পাচারের সাথে যুক্ত আপনি, ঠিক না বেঠিক?

পপিঃ আমরা দুজনই ব্যাংকে চাকরি করি। টাকা আসে আমাদের বেতন থেকে।

পুলিশঃ ব্যাংকে কী চাকরি?

পপিঃ আমি ক্যাশ ডিপোজিট আর উইথড্রল দেখি, ও করে ডেটা প্রসেসিংএর কাজ।

পুলিশঃ পড়াশোনা কোথায় করেছেন?

পপিঃ বদরুন্নেসা কলেজ।

পুলিশঃ কী পড়েছেন সেখানে?

মৌমিয়াঃ দুজনেই ম্যাথ নিয়ে পড়েছি।

পুলিশঃ আপনাদের সম্পর্ক কী?

এবার মৌমিতার উত্তরঃ আমরা বান্ধবী।

পুলিশঃ শুধুই বান্ধবী?

মৌমিতাঃ না, তারও চেয়ে বেশি।

পুলিশঃ তারও চেয়ে বেশি মানে কী? বুঝতে পারলাম না।

মৌমিতাঃ বুঝতে চেষ্টা করেন।

পুলিশঃ বুঝতে পারছি না। বোঝান।

মৌমিতাঃ আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসি।

পুলিশঃ কতদিন থেকে এই ভালবাসাবাসি?

মৌমিতাঃ ছয় বছর।

পুলিশঃ বন্ধু বান্ধবীরা তো একজন আরেকজনকে ভালোই বাসে। আপনাদের ভালোবাসা কী ধরণের ভালোবাসা, শুনি।

পপিঃ প্রেম বোঝেন? আমরা প্রেম করি।

পুলিশঃ মেয়ে মেয়েয় প্রেম হয়?

মৌমিতাঃ হয়।

পুলিশঃ কোনওদিন তো এমন আজব কথা শুনি নাই।

পপিঃ শোনেন নাই সেটা আপনার প্রব্লেম। আমাদের প্রব্লেম না।

মৌমিতাঃ প্রেম নারী পুরুষে হয়। পুরুষ পুরুষে হয়, নারী নারীতে হয়।

পুলিশঃ হাহাহাহা

মৌমিতাঃ নতুন শুনছেন মনে হচ্ছে?

পুলিশঃ হ্যাঁ নতুন শুনছি। আচ্ছা আপনারা কি বলতে চাইছেন আপনাদের মধ্যে সেক্সও হয়?

পপিঃ সেক্সও হয়।

পুলিশঃ কীভাবে হয়?

পপির আর মৌমিতার চোখ থেকে একরাশ ঘৃণা ছিটকে বের হয়। তারা এর উত্তর দেয় না।

পুলিশঃ মেয়ে মেয়ে প্রেম করা, সেক্স করা যে ক্রাইম এ দেশে, তা কি জানেন না? আপনারা ক্রাইম করছেন। আপনাদের জেলে ভরে রাখতে হবে। ক'দিন জেলে থাকলেই এইসব দুষ্ট বুদ্ধি মাথা থেকে পালাবে।

পপিঃ যদি আপনাদের মনে হয় ক্রাইম করেছি, তাহলে জেলে ভরে রাখেন আমাদের, জেলে গেলে একসাথে যাবো। বাঁচলে একসাথে বাঁচবো, মরলে একসাথে মরবো।

হাতকড়া খুলে নেওয়ার পর থেকে পপি আর মৌমিতা দুজনে শক্ত করে দুজনের হাত ধরে রেখেছে। পরস্পরের স্পর্শ তাদের দু'জনকেই সাহসী আর দুর্বিনীত করে তোলে। তারা অন্যায় করেনি, কারও পাকা ধানে মই দেয়নি, কাউকে অসম্মান করেনি, কাউকে হেনস্থা করেনি, কাউকে মারেনি, ধরেনি। কারও কোনও ক্ষতি করেনি, অনিষ্ট করেনি। হাতে ধরে থাকা হাতের উষ্ণতাই বলে দেয় তাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

গোলাম মোস্তফা দূরের চেয়ারে মাথা নিচু করে সব শুনছিলেন। এবার তিনি ঘরের বাইরে যান কোথাও এক গ্লাস পানি পাওয়া যায় কিনা দেখতে। পুলিশ অফিসার পপির চোয়াল শক্ত করে বলা কথাগুলো শুনে বেশ কিছুক্ষণ হাসলেন। হাসতে হাসতে বেশ কয়েকবারই উরুসন্ধিতে হাত বুলোলেন। বললেন, বাঁচা মরার কথা পরে হবে। আগে তো উত্তর দেন, প্রেম সেক্স তো নারী পুরুষে হয়। আপনারা তো দুজনই নারী। তাহলে কেমনে কী?

জিজ্ঞাসাবাদে প্রশ্ন আর উত্তর যা-ই হোক, পূর্বপরিকল্পিত কাজই করা হয়। মৌমিতাকে হাজতে রাখা হয়। আর ধরে বেঁধে পপিকে গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়। গাড়ি সোজা চলে যায় ময়মনসিংহে। ময়মনসিংহের বাড়িতে একটি ঘরে পপিকে ঢুকিয়ে দরজা বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘরের ভেতর পপির পায়ে এমন ভাবে শেকল বাঁধা হয় যেন ঘরের লাগোয়া বাথরুম পর্যন্ত যেতে পারে। পপি চিৎকার করে, কাঁদে, মুক্তি চায়, নিজের ফোনটি ফেরত পেতে চায়, বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চায়, বাবা মা'র কাছে আকুতি জানায়, পায়ে পড়ে, কিছুতে কোনও কাজ হয় না। বিছানায় নয়, মেঝেয় লুটিয়ে পপি বলতে থাকে, আমারে মৌমিতার কাছে যাইতে দাও, আমারে আমার মেঘনার কাছে যাইতে দাও, আমি মৌমিতাকে ছাড়া বাঁচবো না, আমাদের আলাদা কইরো না, তার চেয়ে মেরে ফেলো। বলতে থাকে প্রাইভেট ব্যাংকের চাকরি, আমার চাকরিটা চলে যাবে, এত সব্বনাশ কইরো না আমার। না, কিছুতেই কাজ হয় না। জানালার গ্রিলের ওপার থেকে আত্মীয় স্বজন দেখে যায় তাকে। যে চোখে আগে তাকে দেখত, সে চোখে দেখে না। এ চোখ ভিন্ন, এ চোখে কৌতূহল, এ চোখে ঘৃণা। যেন পপি আর পপি নেই। যেন পপি পাগল হয়ে গেছে। যেন পপি হঠাৎ চিড়িয়াখানার অদ্ভুত জীব হয়ে গেছে। যেন পপি আর আগের মতো মানুষ নেই। ঘরে দু'বেলা খাবার দিয়ে যান আসমা আখতার, খাবারে গোলাম মোস্তফার পরামর্শে মিশিয়ে দিতে হয় ঘুমের ওষুধ। যেন চিৎকার চেঁচামচি বন্ধ হয় পপির। তিন সপ্তাহ পর পায়ের শেকল খুলে দেওয়া হয়, শেকল খুলে দেওয়া হয় কারণ পায়ে ঘা হয়ে গিয়েছিল। সেই ঘা সারার পাউডার আসমা আখতার ঘরে রেখে যান। পপি নিস্তেজ হয় পড়ে থাকে দিনের পর দিন। না খেতে খেতে কঙ্কাল হতে থাকে, জল স্পর্শ না করতে করতে অচেতন।

মৌমিতাকে জেলে সাতদিন রেখে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। চাকরিতে ফের যোগ দিয়েছে মৌমিতা। মৌমিতা অপেক্ষা করে পপির ফিরে আসার। যোগাযোগের কোনও উপায় নেই।ফোন বন্ধ করে রাখা। ফোনটি যে পপির হাতে নেই,অনুমান করে মৌমিতা। ঠিকানায় চিঠি পাঠালেও চিঠি ফেরত আসে।

পপিকে দু'মাস পর এক অচেনা লোকের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। লোকটির অ্যালুমিনিয়ামের বাসনপত্রের ব্যবসা আছে গফরগাঁওয়ে। পাত্রের টাকা পয়সা আছে, কিন্তু বিদ্যে দেশিদূর নেই। ইস্কুল পাশ করার পর আর কলেজে পড়েনি। বিয়ে যে হচ্ছে পপি সেটিই বোঝেনি, কার সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে, সেটি বোঝার তো প্রশ্ন ওঠে না। কাজিও কবুল শব্দটি শোনেনি, কারণ পপি কবুল শব্দ উচ্চারণ করেনি। রেজিস্ট্রি খাতায় যেখানে সই করতে বলা হয়েছে, আসমা আখতার নিজেই সইয়ের জায়গায় পপির নাম লিখে দিয়েছেন। বিয়ের দিন শুধু বর আর বরের পাঁচজন আত্মীয় এসেছিল। ওদের হাতে হাতে মিষ্টির প্যাকেট ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পপির জ্ঞান পুরোমাত্রায় ফেরার আগে ব্যবস্থাটি শেষ হয়ে যাক, গোলাম মোস্তফা চাইছিলেন। তাই পপিকে তড়িঘড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হলো গফরগাঁওয়ে। শহর থেকে রাতের অন্ধকারে গাঁওয়ে নিয়ে যাওয়া হলো আচ্ছন্ন পপিকে।

দিন দুই পার হওয়ার পর, ধীরে ধীরে, পপি সমস্ত বুঝতে পেরেছে। বুঝতে পেরেছে তার জীবন নষ্ট করে দিয়েছে তার বাবা। এই নষ্ট হওয়া থেকে সে কী করে বাঁচবে ভাবে। তার ভাবনাগুলো গুলিয়ে যায় তারপরও সে চেষ্টা করে ভাবতে। তাকে রাতে রাতে ধর্ষণ করছে স্বামী নামক এক অচেনা লোক। এই ধর্ষণ থেকে, শারীরিক নির্যাতন থেকে সে প্রাণপণে বাঁচতে যায়। বাবাকে নয়, মা'কে নয়, আল্লাহ খোদা কাউকে নয়, দিন রাত সে মৌমিতা মৌমিতা বলে কাঁদে। সাতদিনের দিন পপি পালায় বাড়ি থেকে। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তার আর খোঁজ পায় না।

ওদিকে মৌমিতা পপির খোঁজ করতে ময়মনসিংহে যায়। ঠিকানা খুঁজে খুঁজে পপিদের বাড়িতে যায়। শোনে পপির বিয়ে হয়ে গিয়েছে, পপি স্বামীর সঙ্গে সুখের সংসার করছে। মৌমিতাকে কেউ ঘরে ঢুকতেও বলেনি। গেটের বাইরেই দাঁড় করিয়ে কথা বলেছে। মৌমিতা পপির শ্বশুরবাড়ির ঠিকানা চেয়েছে বার বার, কেউ দেয়নি ঠিকানা। অগত্যা শহরের পথে পথে ঘোরে মৌমিতা, যদি হঠাৎ দেখা পায় পপির। দেখা না পেয়ে মৌমিতা ভাবে তার আর ঢাকায় ফিরে গিয়ে, একা ফ্ল্যাটে ফিরে গিয়ে, কী লাভ! চাকরি করেই বা কী লাভ, কী লাভ যদি পপিই না থাকে জীবনে। এই জীবন মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে যায় মেঘনার, সে দু'চোখে পদ্মাকে খুঁজে বেড়ায়, হৃদয়ের কুঠুরিতে পদ্মাকে ভরে মনে মনে কথা বলে।

মৌমিতা উন্মাদের মতো পথে পথে ঘুরছে, অসাবধানে চুরি হয় যায় তার ব্যাগ, হাতছাড়া হয়ে যায় ব্যাগের টাকা পয়সা, ব্যাংকের কার্ড, ফোন। ব্যাংক, ফ্ল্যাট, চাকরি, সংসার সবকিছুকে বিদেয় জানিয়ে মৌমিতা যশোহর চলে যায়। নতুন ফোন কিনে হারিয়ে যাওয়া ফোনের নম্বরের সিম নিয়েছে। নিয়েছে এই জন্য যে একদিন পদ্মা এই নম্বরে ফোন করবে। যশোহরেই একটি এনজিওতে চাকরি নেয় মৌমিতা। বাপের বাড়িতেই থাকে। তার ঘরটিতেই। চুপচাপ। কোনও আমোদ আহ্লাদ নেই তার জীবনে। সে শুধু অপেক্ষা করে পদ্মার ফোনের। বা পদ্মার হঠাৎ এসে চমকে দেওয়ার। এক এক করে বছর যেতে থাকে। তার বাবা মা তার বিয়ে ঠিক করে। মৌমিতা বলে দেয়, সে সমপ্রেমী, সে কোনও পুরুষকে বিয়ে করবে না। বলে তার প্রেমিকার নাম পদ্মা।

একদিন তার মা জিজ্ঞেস করে, তোর সেই রুমমেট ফ্ল্যাট্মেট পপি এখন কোথায় আছে রে?

মৌমিতা বললো, জানিনা।

–জানিস না, এ কোনও কথা হলো, কোনও যোগাযোগ নেই?

–না।

–ও তোকে ফোন করে না?

–না।

–কী হলো, একসঙ্গেই তো ছিলি ঢাকায়।

–ওর বাবা এসে ওকে নিয়ে চলে গেছে। ওকে বিয়েও নাকি দিয়ে দিয়েছে।

–বিয়েতে তোকে বলেনি?

–না।

–কী কান্ড। আর এইযে পদ্মার কথা বললি ওকে নাকি ভালোবাসিস। ও কোথায়? যশোরেই?

–আছে কোথাও।

–তোদের দেখা হয়?

–হবে।

–তুই যাবি ওর কাছে নাকি ও আসবে তোর কাছে?

–ও আসবে আমার কাছে।

–দেখতে কেমন?

–সুন্দর।

–তোর চেয়েও?

–আমার চেয়েও।

–আর স্মার্ট? তোর মতো?

–আমার চেয়েও।

–ফটো দেখা না।

–ফোনে ছিল। আগের ফোন তো চুরি হয়ে গেছে।

–দেখতে ইচ্ছে করছে।

–এত তাড়া কিসের? এলেই দেখবে।

মৌমিতার আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না। সে পাশ ফিরে শোয়।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক