‘দ্য মিশন’: বিশ্বাসঘাতকতা ও সৌন্দর্য

কামালউদ্দিন নীলুকামালউদ্দিন নীলু
Published : 26 Feb 2022, 08:18 AM
Updated : 26 Feb 2022, 08:18 AM

ম্যুলার যদি আর্তোকে ভেবে থাকেন সৃজনীশক্তি হারিয়ে ফেলা ভার্জিলের কোনো একটি রূপ, যিনি তাকে তার নাট্যজীবনের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা অর্জনের যন্ত্রণাদায়ক পথটি প্রদর্শন করেছিলেন, তাহলে তার নাট্যভ্রমণটির কোনো মূল্যই নেই যেটার জন্য তিনি তার নিজের জীবনের পুরোটাই উৎসর্গ করেছিলেন। হ্যামলেটমেশিন নাটকটি সম্পর্কে উন্মত্ত ও অসমর্থ শিল্পীদের সমালোচনা শোনার পরেও এবং কলোন শসপিয়েল নাট্যশালার দর্শকরা নাটকটিকে প্রচন্ড হতাশায় প্রত্যাখ্যান করার পরেও তার নিজের আরেকটি অংশ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল তিনি নাটক রচনা করা চালিয়ে যাবেন। পৃথিবীকে ভালোবেসে ফেলা এই ম্যুলার, যিনি দেখেছেন থিয়েটারের অন্তর্নিহিত কৃত্রিমতা, প্রতারণা, যেখানে ভণ্ডামি হলো আদর্শ কর্ম, যেখানে আছে দর্শকদের জন্য সবচেয়ে ঘৃণ্য ফাঁদ, সেখানে তার প্রয়োজন ছিল কয়েকজন সহযোগী মিত্র এবং পথপ্রদর্শক। আর এই কয়েকজনের মধ্যে ছিলেন জ্যঁ জেনে- তার একমাত্র দ্বিতীয় সত্তা যিনি তাকে একটি কার্যকর এবং ইতিবাচক পথ (কিংবা একটি নিখুঁত আত্মরক্ষার পথ) দেখিয়েছিলেন তার অসাধারণ নাটকগুলোর জন্য, যেগুলো ভণ্ডামিকে উন্মোচন করে দিয়েছে।

ম্যুলার সবসময় অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গেই জ্যঁ জেনের কথা বলতেন, যেমনটি বলতেন ক্লেইস্টের কথা, এটি কেবল সমাজচ্যুতদের প্রতি তার প্রচন্ড অনুরাগের কারণেই নয়। ম্যুলার একজন পোশাদার চোর, সমকামী, পতিতা, কিংবা অপরাধী ছিলেন না, তবুও তিনি অনুভব করেছিলেন যে তিনি এবং জ্যঁ জেনে একই কারণে শিল্প রচনা করেছেন। তারা আনন্দের সঙ্গেই উদযাপন করেছেন তাদের "বিপর্যয়ের ভেতরের আনন্দকে" এবং তারা বিকর্ষণকে আকর্ষণে রূপান্তর করে নির্মাণ করেছেন নেতিবাচক নান্দনিকতা। তারা দুজনেই আলঙ্কারিক ভাষার জন্য (এটি আঁতোয়া আর্তোর বিশোধক প্রভাবের বিপরীত) আলিঙ্গন করেছেন প্রকৃত প্রলোভনের শক্তিকে। একটি অস্বাস্থ্যকর বিশ্বে "শিল্প হয়তো একটি অসুস্থতা… কিন্তু এই অসুস্থতার ভেতরেই আমরা বাস করছি", ম্যুলার জ্যঁ জেনেকে স্মরণ করে ১৯৮০ সালে বলেছিলেন: "এই অসুস্থতাকে সাথে নিয়েই আমাদেরকে জীবনযাপন করতে হবে, আর স্বীকার করতেই হবে আমরা এই পৃথিবীর পরজীবি প্রাণী এবং আমরা এটাকে শোষণ করছি"।

সার্ত্র লিখেছিলেন, জ্যঁ জেনে ছিলেন একজন "স্বপ্নদর্শী", যিনি তার স্বপ্নের মাধ্যমে অন্যদেরকে "আক্রান্ত" করতে চেয়েছিলেন, "ওদেরকে এটার ওপরে হুমড়ি খেয়ে পড়তে দাও" যাতে এটা ওদের ওপরে "ভাইরাসের মতো কাজ করে", আর ঠিক এটিই ১৯৭০ এবং ১৯৮০'র দশকে ছিল থিয়েটারের প্রতি ম্যুলারের আচরণ- কাজ করতে হবে নিঃশব্দে, অন্তত পাশ্চাত্যে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৮৩ সালে একজন তার সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে প্রশ্ন করেছিল, তার ডেসপয়েল্ড শোর মিদিয়া-ম্যাটেরিয়াল ল্যান্ডস্কেপ উইথ আর্গোনটস-এর প্রথম অংশটি কি লেখা হয়েছে যৌনতা-নির্ভর কোনো নাট্যপ্রদর্শনীর জন্য? (পশ্চিম জার্মানিতে যৌনতা-নির্ভর কোনো নাট্যপ্রদর্শনী ছিল না), ম্যুলার তখন উত্তর দিয়েছিলেন যে এটি আসলে লেখা হয়েছে পশ্চিম জার্মানির মানুষরা যাতে "পর্যটন" সংক্রান্ত এবং "যৌনতা" সংক্রান্ত আচরণগুলোকে কাটিয়ে উঠতে পারে সেই দৃষ্টিকোণ থেকে, এটা "সুরক্ষিত প্রাচুর্য থেকে পৃথিবীর দুর্দশার দিকে একটু দৃষ্টি ক্ষেপণ", ওই নাটকটির কারণে "আমার সাম্প্রতিক নাটকগুলোকে মানুষ গ্রহণ করেছে একটি অগভীর দৃষ্টিকোণ থেকে"। এই নিঃশব্দ-কৌশলের আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নিষিদ্ধ সামাজিক রীতিগুলোকে স্বেচ্ছায় লঙ্ঘন করা। ম্যুলারের মতো একজন মানুষ যিনি নির্দ্বিধায় হিটলার এবং স্তালিনকে বলেছিলেন তারা প্রতিভাবান এবং এমন দুটো নাটক রচনা করেছিলেন (জার্মানিয়া ডেথ ইন বার্লিন এবং জার্মানিয়া ৩) যেগুলোতে হিটলারকে উপস্থাপন করেছিলেন উদ্ভট কল্পনার একটি বস্তু হিসেবে, সেই তিনিই আকৃষ্ট হয়েছিলেন ফরাসি নাট্যকার জ্যঁ জেনের প্রতি, যিনি হিটলারকে তার পম্পস ফিউনারেল রাইটস নাটকে ব্যবহার করেছিলেন যৌন কল্পনার একটি বস্তু হিসেবে, এবং এর ফলে এমন কিছু মানুষের ভণ্ডামিপূর্ণ ধিক্কারের মুখোমুখি তিনি হয়েছিলেন যারা নিজেদেরকে তার পক্ষের মানুষ বলে দাবি করতো।

ম্যুলার এবং জ্যঁ জেনে উভয়েই জানতেন, প্রতীক যদি সত্যের ওপরে নির্মাণ করা হয়, তাহলে সেই প্রতীক শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু হিটলারের ক্ষেত্রে তারা ঐতিহাসিক তথ্যের ওপরে নির্ভর করার কোনো দায়ই অনুভব করেননি। এরপরও, তাদের দুজনের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপারটি হলো তারা একাধিক বা বিভক্ত আত্ম'র ধারণা এবং নিজেদের কিছু অংশকে অন্য বা অন্যদের মতো করে গড়ে তোলার প্রতি এতোটাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন যে তারা কখনোই সামঞ্জস্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার চেষ্টা করেননি বা তারা তাদের সর্বদা অসমতল, টোনাল বা স্টাইলিস্টিক তীব্রতা সম্পন্ন টেক্সটগুলোকে মসৃণ করার চেষ্টা করেননি। আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপারটি হলো, এই আপাত-প্রতীয়মান স্বাভাবিকতা এবং স্ববিরোধীতা স্বীকার করার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকার এই অবস্থাটিই তাদের লেখাগুলোকে ঘিরে থাকা অ-স্বতঃস্ফূর্ততাকে নিরীক্ষণের একটি সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। বিভিন্ন কারণে, তারা দুজনেই তাদের নাটকগুলোর মধ্যে কপটতার ব্যাপারটিকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, ফলে এটার মাধ্যমেই তাদের নাটকগুলোর মূল বিষয়বস্তুর মধ্যে থাকা বিশ্বাসঘাতকতা ও মৃত্যুর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়। স্বেচ্ছাকৃত কপটতার এই শিল্পটি বিশ্বাসঘাতকতাকে জীবনের একটি চরিত্র করে তোলে, যেটার কারণে জীবন আর মৃত্যু একসাথে মিশে যায়।

"তোমার বিশ্বাসঘাতকতার জন্য ধন্যবাদ, এটা আমার দৃষ্টিশক্তি খুলে দিয়েছে", এই কথাটি মিদিয়া-ম্যাটেরিয়াল নাটকে ম্যুলারের মিদিয়া বলছে ঘৃণ্য ব্যবসায়ী জেসনকে, "আমি একজন ভাইয়ের বিনিময়ে তোমাকে দুটো সন্তান দিয়েছি"। দ্য মিশন নাটকে দেবসিঁও বলছে, "আজকে তুমি যদি এটার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা না করো, তাহলে কালকে এটাই তোমাকে হত্যা করবে", দেবসিঁও একটি "বিপ্লবের থিয়েটার"-এ একজন ক্ষমতাহীন বুর্জোয়া বিপ্লবী। একটি "প্রাগৈতিহাসিক" বিশ্বে বিশ্বাসঘাতকতা ও মৃত্যু অনিবার্য, কারণ সেখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রথাগুলো মানুষকে নীতিগতভাবেই মৃত বানিয়ে রাখে। আত্ম এখানে অন্য'র সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে বাধ্য হয়, কিন্তু ম্যুলার এবং জ্যঁ জেনের নাটকে আত্মই হয়ে যায় অন্য, ফলে বিশ্বাসঘাতকতারও একটি দ্বৈত রূপ তৈরি হয়: এটি হয়ে পড়ে নাটকীয় মুখোশের একটি চক্রাকার খেলা, এটি দর্শককে প্রভাবিত করে না, কিন্তু এটি দর্শককে সংক্রমিত করে এটির কপটতা এবং নৈতিক সুবিধাবাদের প্রলোভনের মাধ্যমে। লক্ষ্যটি: "জ্যঁ জেনে খুব সূ²ভাবে এবং সঠিকভাবে তৈরি করেছিলেন; একটি শিল্পকর্ম শুধুমাত্র আরেকটি বিশ্ব-পরিস্থিতির আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত করতে পারে। আর আকাঙ্ক্ষাটি বৈপ্লবিক"।

আঁতোয়া আর্তো বা পরাবাস্তববাদী এই মানুষটির চেয়ে জ্যঁ জেনে ছিলেন মু্যুলারের কাছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, কারণ ছদ্মবেশের ওপরে ভিত্তি করে সহজেই প্রয়োগযোগ্য নাট্যকৌশলগুলোর ক্ষেত্রে তার বিন্যাসটি দুর্দান্ত ছিল। জ্যঁ জেনের ভ‚মিকাটি বারবার বদলে যায়, মিথ্যাচারের মাধ্যমে সত্য প্রকাশের প্রতি তার জোরাজুরি (যেমন- দাসী হিসেবে তরুণ ছেলেরা, বিপ্লবী আরবরা জ্বলন্ত কার্টুনে ফুঁ দিচ্ছে), জীবিত মানুষদের ভেতরে মৃতরা হেঁটে বেড়াচ্ছে এই সময়গুলোকে তিনি একসাথে মিলিয়ে দেন, তার সমাজচ্যুত চরিত্রগুলো- যাদের নাট্যাভিনয় বা কল্পনার জগতের বাইরে কোনো স্বাভাবিক বা "নির্ধারিত" অস্তিত্ব নেই, এই সমস্তকিছুই ম্যুলারের নীরিক্ষামূলক আধুনিক নাটকের জন্য প্রচুর সতেজ ভাবনা সঞ্চারিত করেছিল। তার পরবর্তী প্রতিটি নাটক (অর্থাৎ ১৯৭১ সালের পর থেকে) আমার কাছে জ্যঁ জেনের অর্জনগুলোর চেতনায় অনুপ্রাণিত বলে মনে হয়েছে- গান্ডলিংস লাইফ নাটকে নারীদের চরিত্রে পুরুষরা এবং পুরুষদের চরিত্রে নারীদের অভিনয়ের কথা ভাবুন… কিংবা হ্যামলেটমেশিন নাটকটির কথাই ভাবুন না কেন, সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হলো দ্য মিশন এবং কোয়ার্টেট।

আন্দ্রেজ ওয়ার্থ দ্য মিশন নাটকটিকে বলেছিলেন "একটি অসম্ভব কোলাজ, যেটি লিখে একমাত্র হাইনার ম্যুলারই সফল হয়েছে", তিনি উল্লেখ করেছিলেন এটির মধ্যে ব্রেখট, বুচনার, কাফকা, বেকেট, মার্কিউজ, রাইখ, আর্তো এবং জ্যঁ জেনেকে ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও নাটকটি অত্যন্ত জটিল- কিন্তু এই নামগুলো এটির কয়েকটি উদাহরণ মাত্র- কোলাজটির ভিত্তিই ছিল একটি পর্যায় পর্যন্ত কৃষ্ণাঙ্গদের একটি সোজাসুজি অনুকরণ। ম্যুলারের মেমোরি অব রেভোল্যুশন নাটকটি জ্যঁ জেনের নাটকগুলোর মতোই দর্শকদেরকে একটি ভিন্ন থিয়েটারের দিকে নিয়ে যায়- একটি বিকল্প পথে- আর সেটি হলো বিপ্লবের থিয়েটার, এবং এটির মধ্যে আরো আছে বিপ্লবের বিশ্বাসঘাতকতার থিয়েটার। এটির মূল নাট্যক্রিয়ার মধ্যে আছে পুনরাভিনয়- অসম্পূর্ণ স্মৃতির মধ্য দিয়ে বিদ্রোহসংক্রান্ত কিছু ঘটনার স্মৃতিচারণ, যেটি বিষণ্নতায় আক্রান্ত একটি ভাঁড়ামি (জ্যঁ জেনের মতে), আর এই স্মৃতিচারণটি চলে অত্যাচারী শাসকের মুখোশ পরা বিদ্রোহীদের সামনে (জ্যঁ জেনের মতে কৃষ্ণাঙ্গরা)- এবং এই সমান্তরাল দৃশ্যটি চলতে থাকে দ্বিতীয় দৃশ্য আসা পর্যন্ত ।


নাটক: দ্য মিশন। রচনা: হাইনার ম্যুলার। অনুবাদ: সাইদুস সাকলায়েন। নির্দেশনা: কামালউদ্দিন নীলু।
প্রযোজনা: সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার।

দ্য মিশন-এর মূল ঘটনাটি নেয়া হয়েছিল আনা সেঘার-এর গল্প "দ্য লাইট অন দ্য গ্যালোজ" থেকে, আর ঘটনাটি হলো- বিপ্লবী ফ্রান্সের জাতীয় কনভেনশন থেকে কয়েকজন বিপ্লবীকে ঔপনিবেশিক জ্যামাইকাতে পাঠানো হয় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ক্রীতদাসদের ভেতরে বিপ্লব গড়ে তোলার জন্য। দ্য মেজার টেকেন-এর বিপ্লবীদের মতোই ম্যুলারের চরিত্রগুলোও তাদের বিপ্লবে সফল হয়নি বা ব্যর্থও হয়নি, এমনকি চুক্তির ব্যাপারে রাজনৈতিক দলের মতো তারা কেনো প্রশ্নের মুখোমুখিও হয়নি, যেমনটি মউজার-এ দেখা যায়। কিন্তু তাদের মিশনটি- যেটি নাটকটিরও নাম- "আফট্র্যাগ", এটির অর্থ অর্পিত কর্মভার, কর্তব্য, আদেশ পালন, এগুলোর প্রতি ম্যুলার দীর্ঘকাল ধরেই অনুরক্ত ছিলেন, অনেকটা "শ্রম" এবং "উৎপাদন"-এর মতোই- যেগুলো ফরাসি প্রজাতন্ত্রের দ্বিতীয় মাস ব্রæমায়ার-এর ১৮ তারিখে ঘটে যাওয়া ঘটনাটির কারণে বাতিল হয়ে গিয়েছিল, আর এই ঘটনাটিই নেপোলিয়নকে ফরাসি সরকারের ক্ষমতায় বসিয়েছিল। আলজেরিয়ার যুদ্ধকে কেন্দ্র করে লেখা জ্যঁ জেনের দ্য স্ক্রীনস-এর মতোই এই নাটকটির মধ্যেও ফরাসি বিপ্লব এবং বিপ্লব পরবর্তী ফলাফলের প্রভাব রয়েছে: এই নাটকের ঘটনাটি ফ্রান্সের বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে চালিত ব্যক্তি পর্যায়ের বিশ্বাসঘাতকতাকে ঘিরে আবর্তিত হয়। কিন্তু মনস্তাত্তি¡ক ভ‚দৃশ্যটি অবশ্যই ফ্রানৎজ ফ্যানো'র, যেখানে ঔপনিবেশিক শাসনকে দেখা হয়েছে স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বেচ্ছাচারিতার জবরদস্তি হিসেবে এবং ফরাসি বিপ্লবকে দেখা হয়েছে পরবর্তী কালের সবগুলো বিপ্লবের ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে, কম-বেশি উপলব্ধি করার মতো একটি মডেল হিসেবে। নাটকটি শুরু হয় একটি চিঠির মাধ্যমে, চিঠিটি কে পড়ছে সেটির উল্লেখ নেই, তবে যে মানুষটির মাধ্যমে বিপ্লবীরা বিপ্লব গড়ে তোলার জন্য গিয়েছিল তাকে চিঠিটা লিখেছে বিপ্লবীদেরই একজন।

"গ্যালুদে লিখেছে আন্তনকে। চিঠিটা লিখছি আমার মৃত্যুশয্যা থেকে। লিখছি আমার এবং নাগরিক সাসপোর্তার পক্ষ থেকে, যাকে পোর্ট রয়্যালে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমি তোমাকে জানাচ্ছি, সম্মেলনে তোমার যে মানুষটির মাধ্যমে আমাদেরকে বিপ্লব গড়ে তোলার দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছিল সেই দায়িত্বটা তোমাকে ফিরিয়ে দিতে চাই, কারণ আমরা ওটা অর্জন করতে পারিনি… দেবসিঁওর কাছ থেকে তুমি কোনো খবর পাবে না, ও ভালো আছে… দেখে মনে হয় বিশ্বাসঘাতকরাই ভালোভাবে টিকে আছে যখন সাধারণ মানুষ রক্তের ভেতরে ডুবে আছে"।

এই চিঠির মাধ্যমেই গ্যালুদে, সাসপোর্তা এবং দেবসিঁওর পরিণতি জানা যায়, এবং পরবর্তী একটি দৃশ্যের মাধ্যমে বোঝা যায় যে চিঠিটি একজন নাবিক পৌঁছে দিয়েছিল। সে কিউবার একটি হাসপাতালে মৃতপ্রায় গ্যালুদের পাশের শয্যায় অসুস্থ অবস্থায় শুয়ে ছিল। ওদিকে বুর্জোয়া আন্তন গ্রেফতার এবং শাস্তির ভয়ে লুকিয়ে ছিল, সে প্রথমে নাবিকের কাছে তার পরিচয়টি দিতে চায় না, আর এভাবেই সে তার মৃত সহকর্মীদের সাথে আবারো বিশ্বাসঘাতকতা করে। জিনিয়া শুল্জ-এর মতে, নাবিকটি চিঠিটা পৌঁছে দেয়ার জন্য সাংঘাতিক বিপদ মাথায় করে এসেছে, তাকেতো সাধারণ মানুষ বলা যাবে না। অন্যদিকে আন্তন হলো ভঁদে-এর রাজতন্ত্রবাদী কৃষক হত্যার একজন প্রত্যক্ষদর্শী, এবং বুচনারের ভাষায় সে হলো দান্তনের প্রতিনিধি। দৃশ্যটির শেষে তার নারী সঙ্গীনী তাকে বলে "বিছানায় এসো", উদাহরণস্বরূপ, দান্তন'স ডেথ নাটকে এই একই কথা বিধ্বস্ত দান্তন প্রস্থান করতে করতে জুলিকে যৌনতার আহবান জানিয়ে বলে।

যাইহোক, এই সবকিছুই ছিল ভাঁড়ামির মূল আকর্ষণের একটি ভ‚মিকা। জ্যঁ জেনের ছায়া এখানে আবিভর্‚ত হয় হতাশার দেবদূত হিসেবে, যে আন্তনের সাথে সঙ্গম করতে করতে নারীকণ্ঠের মাধ্যমে বলে: "আমিই সেই ছুরি, যেই ছুরি দিয়ে মৃত মানুষ তার কফিন খোলে"। এই নাট্যক্রিয়ার পরেই একটি ফ্লাশব্যাক দেখা যায়, যেখানে একটি কণ্ঠস্বর- যে হয়তো মৃত, সে গুরুগম্ভীরভাবে একটি স্মৃতিকে বর্ণনা করতে শুরু করে- "আমরা জ্যামাইকায় এসে পৌঁছলাম…" এবং সে পুরো নাটকটির মধ্যে একটি সমবেত প্রার্থনার বা স্মৃতিচারণের পরিবেশ সৃষ্টি করে। মুখোশ পরা অবস্থায় তিনজন বিপ্লবী প্রবেশ করে তাদের বিপ্লবের নাটকে অভিনয় করার জন্য। (এই একইভাবে জ্যঁ জেনের কৃষ্ণাঙ্গরাও মুখোশ পরা অবস্থায় প্রবেশ করে একজন শ্বেতাঙ্গ নারীকে হত্যা করার পবিত্র দৃশ্যটি আবারো করার জন্য)। দেবসিঁও এখানে জ্যঁ জেনের চরিত্র আর্চিবল্ডের মতোই একজন কড়া নির্দেশক হিসেবে দুটো দায়িত্ব পালন করে এবং তার সঙ্গীরা যখন অশান্ত হয়ে ওঠে তখন সে সংশোধন করে দেয়: "তুমি তোমার চরিত্রের বাইরে দুইবার অভিনয় করেছ, গ্যালুদে"। আর্চিবল্ড: "সাবধান, গ্রামবাসীরা, তোমরা তোমাদের বাস্তব জীবনটার কথা বলতে শুরু কোরো না"। জ্যঁ জেনের নাটকটির মতোই, ম্যুলারের চরিত্রগুলোও তাদের অভিনীত চরিত্রগুলোর বাইরেও চলে যেতে চায়, শুধু দেবসিঁও কম-বেশি নিজের চরিত্রের মধ্যেই থাকে। সে একজন ডাক্তার এবং ঔপনিবেশিক জমিদারের ছেলে। রক্তাক্ত বিপ্লবের প্রতি তার বিতৃষ্ণা জন্মে যায় এবং সে বাড়ি ফিরে আসে। কিন্তু গ্যালুদে অভিনয় করে ব্রিটানির একজন কৃষক-দাসের চরিত্রে এবং কৃষ্ণাঙ্গ সাসপোর্তা অভিনয় করে দাসের চরিত্রে- আপাতদৃষ্টিতে সে হলো হাইতির সফল দাস-বিপ্লবের একজন উদ্বাস্তু।

গ্যালুদে: আমি জানি তুমি সবচেয়ে কঠিন চরিত্রে অভিনয় করছো। এটা তোমার শরীরে লেখা আছে।
সাসপোর্তা: চাবুকের আঘাতে আঘাতে আমরাও অন্যদের শরীরে তৈরি করবো নতুন বর্ণমালা।

এই নাটকে বিপ্লবী অভিনেতাদেরকে ব্যবহারের ক্ষেত্রে জ্যঁ জেনের তুলনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি হলো- বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণি থেকে তাদেরকে নেয়া হয়েছে। সবাই কৃষ্ণাঙ্গ না, বরং একজন কৃষ্ণাঙ্গ এবং বাকি দুজন তার আদর্শিক সহযোগী- একজন স্থায়ী (গ্যালুদে), একজন অত্যন্ত অস্থায়ী (দেবসিঁও)। দ্য বø্যাকস নাটকে দর্শকরা কৃষ্ণাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ বিশ্বাসঘাতকতার সাক্ষী হয়েছেন মঞ্চের বাইরে থাকা বিচার এবং মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে, কিন্তু দ্য মিশন নাটকে দর্শকরা প্রজাতান্ত্রিক-প্রজাতান্ত্রিক বিশ্বাসঘাতকতার সাক্ষী হয়েছেন মঞ্চের ভেতরেই ঘটে যাওয়া বিধ্বংসী দৃশ্যকল্পের মাধ্যমে, সেখানে ছিল সাসপোর্তার ফ্যাননেস্কিয় কৃষ্ণাঙ্গ ক্রোধ- সেটি ক্রমশ বেড়েই চলছিল একটি অ-অর্জনযোগ্য ইউটোপিয়ান তাড়নার মতো। দ্য মিশন নাটকে অন্যান্য অ-বাস্তবানুগ কিছু চরিত্রও আছে, যেমন- দেবসিঁওর বাবা ও মা এবং প্রথম ভালোবাসা নামের একটি পৌরাণিক ক্রুদ্ধ নারী। তারা সবাই দেবসিঁওর সাথে অভিনয় করে "অমিতব্যয়ী পুত্রের প্রত্যাবর্তন" নামের একটি দৃশ্যে এবং তারা জ্যঁ জেনের রাজসভার মতো (রানি, গভর্নর, ধর্মপ্রচারক, বিচারক ও ভৃত্য) এবং পিটার ভেইজের উদ্বাস্তু নির্দেশক কুলমিয়ের ও তার মারাত সাদ-এর চরিত্রগুলোর মতোই একটি ভিন্ন শ্রেণির পর্যবেক্ষক তৈরি করে।


নাটক: দ্য মিশন। রচনা: হাইনার ম্যুলার। অনুবাদ: সাইদুস সাকলায়েন। নির্দেশনা: কামালউদ্দিন নীলু।
প্রযোজনা: সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার।

বিপ্লবীদের দৃশ্যটি "বিপ্লবের থিয়েটার"-এ পরিবর্তিত হওয়ার সাথে সাথে তাদের নামগুলো হয়ে যায় "সাসপোর্তা-রোবেসপিয়েরে" এবং "গ্যালুদে-দান্তন"। তারা একে অপরকে অপমান করতে থাকে এবং ব্রেখটের ব্যাডেনার লেস্ট্রাকের মতো তারা তাদের নকল মাথা নিয়ে ভাঁড়ের মতো খেলতে থাকে। ফলে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে পর্যবেক্ষক এবং পর্যবেক্ষণকে খুব সহজেই পৃথক করা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, নাটকটির একটি উপকরণ- সিংহাসন, ক্রমাগতভাবে অধিকার করতে থাকে প্রথম ভালোবাসা, দেবসিঁও এবং সাসপোর্তা। সিংহাসনটি সাসপোর্তা অধিকার করার পরে শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসের ভয়াবহতাকে কেন্দ্র করে সে ভয়ঙ্কর একটি ঘোষণা দেয়: "আমরা তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছি, ভিক্টর দেবসিঁও। সাপ ভক্ষণ করবে তোমার বিষ্ঠা, কুমির ভক্ষণ করবে তোমার গুহ্যদ্বার, পিরানহা ভক্ষণ করবে তোমার অণ্ডকোষ"। দ্য ব্লাকস-এর আর্চিবল্ডের মতো আপনারা নিজেরাই তাদের চোখের সামনে হয়ে উঠবেন ভ‚তের মতো এবং তাদেরকে ক্রমাগত তাড়া করতে থাকবেন, আর ম্যুলারের দ্য মিশন নাটকের ক্ষেত্রে আপনারা হয়ে উঠবেন নামহীন কোনো মানুষ, যারা স্মরণ করছে "বিপ্লব মৃত্যুর মুখোশ, মৃত্যু বিপ্লবের মুখোশ"। সাসপোর্তা মৃত্যুর কথা বলতে থাকে বিপ্লবের পবিত্র আহবানকারীর মতো। ম্যুলারের দর্শকরা মুগ্ধ হয় এবং আনন্দ লাভ করে বামপন্থীদের অমানবিক রক্তাক্ত বিপ্লবের জীর্ণ প্রতিচ্ছবি দেখে। যেমনটি জ্যঁ জেনের শ্বেতাঙ্গ রাজসভা ও শ্বেতাঙ্গ দর্শকরা মুগ্ধ হয় এবং আনন্দ লাভ করে কৃষ্ণাঙ্গদের বাঁধাধরা অনৈতিকতা, কাপুরুষতা এবং নির্বুদ্ধিতার প্রদর্শনী দেখে।

এই জায়গাটিতে তাদের দুজনের নাটকই পর্নোগ্রাফির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল- অর্থাৎ, দর্শকরা যখন ভাবতে শুরু করেছে যে তারা এখনই দেখতে পাবে দেবসিঁওর মৃত্যু কিংবা শ্বেতাঙ্গ নারীটির সম্ভ্রমহানী ও মৃত্যু- তখন উভয় নাট্যকারই একই বিস্ময়কর কৌশল ব্যবহার করেছেন, আর সেটা হলো তারা একটি দীর্ঘ স্বগতোক্তির আকারে একটি অদ্ভুত ক্লাইম্যাক্স সৃষ্টি করেছেন, যেটি তাদের দুজনের নাটকেরই ভূরাজনৈতিক অবস্থাটি প্রকাশ করে এবং সাময়িকভাবে স্মৃতিচিহ্ন এবং পুনরাবৃত্তিকে প্রতিস্থাপন করে একটি সরল ব্যাখ্যার মাধ্যমে। জ্যঁ জেনের নাটকটিতে ক্লাইম্যাক্সটি আছে ডাহোমের প্রতি ফেলিসিটির একটি দীর্ঘ বিজয়গাথার মধ্যে- "আমাকে উদ্ধার করার জন্য, নিগ্রোরা, এসো!" যা পুরো আফ্রিকা মহাদেশে একটি অনুপ্রেরণামূলক, উদ্দীপনামূলক ভাষার মাধ্যমে একটি বিপ্লবের ডাক দেয়, আর সেটাকে তখন আগের অন্য সবকিছুর চেয়েও অনেক বেশি হৃদয়গ্রাহী বলে মনে হয়। ম্যুলারের নাটকে এটা হলো "এলিভেটরের মধ্যে মানুষ", যেটা লেখা হয়েছে ২২০০ শব্দের সমন্বয়ে এবং এটার ধরনটি অতুলনীয় (বিশেষ করে এটার মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ)। এটার মূল বিষয়টি হলো, একজন মানুষ তার "বড়কর্তার" সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে, কিন্তু সে আটকা পড়েছে বা হারিয়ে গেছে একটি পরাবাস্তববাদী এলিভেটরের মধ্যে, যেটাতে "সময়ের কোনো গণ্ডগোল হয়েছে"। সে ধরে নেয় তার বড়কর্তা আত্মহত্যা করেছে এবং এলিভেটরটি তাকে পেরুর একটি গ্রামের রাস্তায় নামিয়ে দেয়। সেখানে সে ভীতিজনক যান্ত্রিক মানুষদের মুখোমুখি হয়, তারা তাকে এড়িয়ে যায় ("আমি কি একটা ছুরি বা শক্তিশালী ধাতব হাতের মতোও যোগ্য নই?")। একজন নারী তাকে ডাকে, কিন্তু সে তার কাছে যায় না, কারণ একটি কণ্ঠস্বর তাকে বলে- সে "একজন পুরুষের স্ত্রী"। দৃশ্যটির ভেতরে আরো অনেক কিছু থাকলেও সে অনুভব করে যে তার নির্দিষ্ট কোনো কাজ নেই।

এই দৃশ্যে বাস্তব-জগতের খুঁটিনাটি থাকা সত্ত্বেও, এটা হলো আপাত-বেকেটিয়ান আধুনিক মানুষের একটি প্রতিচ্ছবি, যার সুনির্দিষ্ট কোনো মিশন নেই। এটার অর্থ হলো, এলিভেটরের ভেতরে আটকে পড়া মানুষটির জন্য বা দেবসিঁওর জন্য বিপ্লব আসলে নিছক সময় পার করা ছাড়া আর কিছুই নয়, সেটা একটি "ল্যান্ডস্কেপের যুদ্ধ" কিংবা আলস্যে সময় কাটানো। বিপ্লব থেকে তাদের অর্জন করার কিছু নেই। কিন্তু অ্যানাটমি অব টাইটাস-এর মতোই (যেটার সাথে দ্য বযাকস-এরও মিল আছে)- ম্যুলার এই দৃশ্যটির মাধ্যমে একটি তৃতীয় জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, যেটা হয়তো জ্যঁ জেনেকে একটু অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলে দিতে পারে। নেপোলিয়ন ক্ষমতায় বসার পরে দেবসিঁও বিশ্বাস করতে থাকে "পৃথিবীটা যেমন ছিল তেমনই থাকবে, প্রভু আর ক্রীতদাসের বাসস্থান"। সে একটি পূর্বলক্ষণমূল স্বপ্নের কথা বলে যেখানে এশিয়া এবং আফ্রিকা রঙিন সাপের মতো ছুটে বেড়াচ্ছে ভগ্ন নিউইয়র্কের রাস্তায়। ব্রেখট ওয়েটিং ফর গডো নাটকটিকে রূপান্তর করার জন্য পরিশ্রান্ত ডিডি এবং গোগোর পেছনে তৃতীয় বিশ্বের বিপ্লবী আন্দোলনকে প্রদর্শনের যে পরিকল্পনাটি করেছিলেন সেটার মতোই এই স্বপ্নটি একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রদর্শন করে, একটি নীতিমালার বিবৃতিকে তুলে ধরে, অনিশ্চয়তাকে দক্ষতার সাথে দেখিয়ে দেয় এবং খোলাখুলিভাবে প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি করে। জ্যঁ জেনে সবসময়ই জানতেন এবং ম্যুলার এই ব্যাপারটি মাঝেমাঝে ভুলে গেলেও এই ধরনের অবস্থান এবং বক্তব্যের সাথে সংস্পর্শ থাকা উচিত দাসত্বের ধারণা থেকে মুক্ত মানুষদের। দাসত্বে বিশ্বাসী মানুষদের নয়, যাদের সাথে "ঘৃণ্য" শ্বেতাঙ্গদের যোগাযোগ আছে এবং যাদের আচরণটি নাটুকেপনায় ভরা ও যারা অমার্জিত ভাষা ব্যবহার করে।

অন্য দৃষ্টিকোণ থেকেও দ্য মিশন সম্পর্কে আরো কিছু বলা যেতে পারে, এবং এই চমৎকার ও বহু প্রতীক সম্বলিত নাটকটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে আমি মোটেও ক্লান্ত হবো না। কিন্তু জ্যঁ জেনের দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে এটিকে পর্যবেক্ষণ করতে যেয়ে যে ব্যাপারটি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে সেটি হলো, এই নাটকটি ম্যুলারের নিজের ওপরেই একজন নিগার-এর ছায়া ফেলেছে। দ্য মিশন নাটকটি তরুণদের বিচ্ছিন্নতা এবং দারিদ্র সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ রিমাইন্ডার। ম্যুলার সমাজতান্ত্রিক নীতিগুলো তার বাবা-মার কাছ থেকেই জেনেছিলেন, আর তরুণ বয়স থেকেই তিনি মানসম্মত জার্মান ভাষায় লিখতেন। তরুণ জ্যঁ জেনের মতো সাহিত্য রচনাকে থামিয়ে দেয়ার মতো বিচ্ছিন্নতা এবং অবক্ষয়ের মুখোমুখি তিনি কখনোই হননি। তিনি বাস্তবিক অর্থেই সাহিত্য রচনা করেছেন বিভিন্ন বর্ণের সমাজচ্যুত মানুষ ও পরিত্যক্ত মানুষদের জন্য। (জ্যঁ জেনে: কৃষ্ণাঙ্গ আসলে কী? আগে বলো, রংটা আসলে কী?)

দ্য ব্লাকস এবং দ্য মিশন নাটকের সমাপ্তি দৃশ্যের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা ও সৌন্দর্যের সম্পর্ক আছে, এগুলো এই নাটকদুটোর বিষয়বস্তুকে ব্যাখ্যা করে। জ্যঁ জেনে তার নাটকটির শেষ দৃশ্যে তার চরিত্র ভার্চু এবং ভিলেজকে ভালোবাসায় আবদ্ধ হতে দেয় এবং নিজেদের সৌন্দর্যকে আবিষ্কার করতে দেয়। যদিও তিনি তার নাটকটিতে সৌন্দর্য এবং ভালোবাসাকে নিখুঁত কৃষ্ণাঙ্গতার ক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবেই দেখেছেন, কারণ শেষ দৃশ্যটি প্রথম দিকে প্রতীয়মান নীতিগুলোর তুলনায় বিশ্বাসঘাতকতাকেই ধারণ করে: শুধুমাত্র একটি চরম ক্ষতিকর আদর্শের ক্ষেত্রেই দৃঢ়তার মূল্য তার কাছে অপরিসীম বলে প্রতীয়মান হয়। ম্যুলার, তার নাটকটির শেষ দৃশ্যে, বিশ্বাসঘাতকের মন থেকে স্মৃতি মুছে ফেলার জন্য মৃদু বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি সৃষ্টি করেছেন, যেটা প্রচণ্ড ক্লান্তিতে নিজেকে সমর্পণের মতো একটি ব্যাপার এবং ম্যুলার নির্দ্বিধায় দেবসিঁওর জন্য ছায়া-মর্ষকামী ভাষা ব্যবহার করেছেন: "বিশ্বাসঘাতকতার সৌন্দর্য দেবসিঁওকে কুঠারের মতো আঘাত করলো… তারপর বিশ্বাসঘাতকতা তাকে আলিঙ্গন করলো আকাশের মতো করে এবং তাকে একটা পরম যৌন সুখ উপহার দিলো"।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক