ইংরেজি কেন কিনতে হবে?

আবদুস সেলিমআবদুস সেলিম
Published : 20 Feb 2022, 06:33 PM
Updated : 20 Feb 2022, 06:33 PM


ভাষা, সে যে-কোন ভাষাই হোক, মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ পাওয়া। একথা বর্তমান যুগে আরও প্রতিষ্ঠিত সত্য। এযুগের যা-কিছু জ্ঞানচর্চা, তা ভাষার মাধ্যমেই—লিখিত কিম্বা মৌখিক। ফলে বিজ্ঞানের যতই বিকাশ ঘটুক ভাষাকে এড়িয়ে কিছু করা সম্ভব নয়—যেমন বর্তমানের বৈদ্যুতিন মাধ্যম সম্পূর্ণরূপে ভাষানির্ভর, তা সে কমপিউটার এবং তার অভ্যন্তরে নিবেশিত তথ্য, উপাত্তের সংকেতবদ্ধ ক্রিয়া প্রক্রিয়াই হোক অথবা ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইমেইল, টুইটার বা ব্লগ। ফলে ভাষা নিয়ে নিরন্তর গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে।

ঔপনিবেশিক যুগ থেকে প্রধানত অপরাপর মানব গোষ্ঠীর ভাষা-সংস্কৃতির উপর ঔপনিবেশিক ভাষা-সংস্কৃতির প্রভাবিকরণের শুরু। তার সবচাইতে বড় উদাহরণ এই উপমহাদেশে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দান-গ্রহণের সূত্রপাত। ইংরেজরা তাদের ঔপনিবেশিক আধিপত্যের মাধ্যমে তাদের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির সাথে আমাদেরকে মুখোমুখি করে এটা প্রমাণ করতে চেয়েছিল তারা আমাদের চাইতে কতটা সংস্কৃতিবান এবং সভ্য। ফলে তাদের এক শ' বারো বছরের (ভারতবর্ষে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাদানের প্রবর্তন হয়েছিল ১৮৩৫ সালে এবং ভারতবর্ষ থেকে ইংরেজদের তিরোধান ১৯৪৭ সালে) উপনিবেশকালীন শিক্ষামাধ্যম ইংরেজিভাষা তার অমোঘ ঐতিহাসিক বাস্তবতায় এবং সময়ের স্থায়িত্বে আমাদের জীবণযাপন এবং সাহিত্য-সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে প্রবলভাবে। এছাড়াও, আমরা মানি কিম্বা না মানি, পরবর্তী প্রায় আট দশকে সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক এবং সামরিক আধিপত্যের কারণে ইংরেজি ভাষাভাষী দেশগুলো ইংরেজিকে বিশ্বের এক অনন্য বিশেষাধিকারের স্থানে স্থাপন করেছে। ফলে সত্য হলো, বিশ্বে এমন কোন দেশ নেই যেখানে কমবেশি ইংরেজিভাষায় শিক্ষাদান ও গ্রহণ হয় না। আমরা উদাহরণ দিয়ে যতই প্রমাণ করার চেষ্টা করি অমুক-অমুক দেশে ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক নয় যার মধ্যে চিন এবং জাপানের নাম প্রায়শই উচ্চারিত হয়। এই দুই দেশের ইংরেজি শিক্ষক সমিতির সদস্যদের সাথে একাধিকবার মিলিত হবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সেই সাথে চিনের একাধিক ছাত্রীকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াতে হয়েছে তাদের নিজ দেশে ইংরেজি শিক্ষকতার জন্য। এসব দেশে তাদের মাতৃভাষাতেই শিক্ষা দান করা হয় সেকথা যেমন সত্য তেমনি বিদেশি ভাষা হিসেবে ইংরেজিও বাধ্যতামূলক। তবে সেই শিক্ষা মানসম্পন্ন কিনা তা বিচারযোগ্য।

ইংরেজি ভাষার বিশ্বজুড়ে আধিপত্যের আর একটি অন্যতম কারণ এই ভাষার ভাষাবিদরা এবং বৈয়াকরণিকরা ভাষাটিকে বানান, উচ্চারণ, শব্দভান্ডার এবং ব্যাকারণগতভাবে বিভিন্ন যুগে উদারপন্থি মনোভাব নিয়ে আধুনিক করার চেষ্টা চালিয়েছে। ফলে প্রতিটি ইংরেজি ভাষাভাষী দেশ তাদের মাতৃভাষাকে—অর্থাৎ ইংরেজি ভাষাকে—নিজেদের মতো মান প্রমিতকরণের মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য করে নিয়েছে যা নিজনিজ দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতও বটে। ফলে দেখা যায় ইংরেজদের বানানবিধি, উচ্চারণ-প্রক্রিয়া এবং এমনকি শব্দভান্ডার, শব্দার্থ এবং ব্যাকারণবিধি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড অপেক্ষা ভিন্নতর। বলা হয়ে থাকে ইংরেজি বিশ্বের সবচাইতে উদার ভাষা যার ব্যাকারণবিধি সবচাইতে সহজ এবং ফলে এইভাষা শেখাও সহজ।

এমন একটি ভাষা, যে ভাষা শেখা এত সহজই শুধু নয়, এই ভাষা শেখার পরম্পরাগত ইতিহাস সবচাইতে পুরাতন এই ভুখন্ডে, অর্থাৎ বাংলায়। ইংরেজরা প্রথম তাদের বীজয়যুদ্ধ করেছিল এই ভূখণ্ডেই এবং এই উপনিবেশে তাদের রাজধানী সবচাইতে দীর্ঘ সময় ছিল। এই নৈকট্য সত্ত্বেও ইংরেজি ভাষা শিখতে আমাদের এত কঠিন কেন মনে হয়? এর একাধিক কারণের অন্যতম হল আমাদের বিদেশিভাষা—অর্থাৎ ইংরেজি ভাষাশিক্ষা দানের ভেতর এক বিরাট ঘাটতি বা গলদ রয়েছে। আমরা এখনও পর্যন্ত বাংলা বর্ণাক্ষর শেখার সাথেসাথেই ইংরেজি বর্ণাক্ষর রপ্ত করি, তারপর দীর্ঘ বারো বছর বিদ্যালয় এবং মহাবিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়ি, অথচ ভাষাটি আয়ত্ত করতে পারিনা। ভাষাবিদরা বলেন একটি ভাষা বাচনিকভাবে আয়ত্ত করতে চার থেকে ছয় মাসের সময়কালই যথেষ্ট। লেখার দক্ষতা অর্জনে আরও কিছুটা সময় হয়তো প্রয়োজন, কিন্তু কোনক্রমেই দীর্ঘ বারো বছর নয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ করি, ইংরেজি ঔপন্যাসিক জোসেফ কনর‍্যাড-এর মাতৃভাষা ইংরেজি ছিল না, ছিল পোলিশ, এবং তিনি ইংরেজি ভাষা তার যৌবন বয়স পর্যন্ত মোটেও ভালো জানতেন না। যৌবনকালে তিনি ইংরেজিভাষা শিখে ইংল্যান্ডের স্থায়ী বাসিন্দা হন এবং ইংরেজি ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে একজন অন্যতম ইংরেজি ঔপন্যাসিক হয়ে ওঠেন। অর্থাৎ যেকোন ভাষা আয়ত্ত করা যেকোন বয়সেই সম্ভব।

অবশ্য এর অর্থ এও নয় যে আমরা আমাদের মাতৃভাষা বাংলা সঠিকভাবে শিখছি। আমি অনেকবারই ইংরেজি সাহিত্য পড়াতে গিয়ে বাংলাতে অনেককিছু লিখতে দিয়েছি আমার ছাত্রদের। তাদের ভেতর শতকরা পঞ্চাশ জনই গুছিয়ে কিছু লিখতে পারেনি। বানানের কথা তো বাদ, কারণ বাংলা বানানের কোন স্বীকৃত রূপ এখনও প্রস্তুত হয়নি বাংলাদেশে যার ফলে আমি নিজেও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যাই কোন শব্দের সঠিক বানানের ব্যাপারে। কিন্তু বাংলাতে কোনকিছু গুছিয়ে সংগঠিতভাবে লেখা অধিকাংশ শিক্ষার্থীই পারে না। এটা কোনক্রমেই ইংরেজিশিক্ষার প্রভাব নয়—এটা ব্যবহারিক এবং বর্ণনাত্মক শিক্ষা দানের ঘাটতি। যারা এজন্য ইংরেজিকে দোষ দেন তারা আসলে সত্যকে চিহ্নিত না করে স্পর্শকাতর সংস্কারে আচ্ছন্ন থাকেন, অনেকটা মিখাইল বাখতিন ব্যাখ্যাত ইঙ্গিতময় (সেমিওটিক) আবেগাশ্রিত ব্যাঙ্গাত্মক মতামতের (কার্নিভালেস্ক) প্রভাব।

দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পঞ্চাশ বছর পরও আমরা আমাদের নিজস্ব ব্যাবহার উপযোগী কোন বাংলা ব্যাকরণ, শব্দভান্ডার, শব্দোচ্চারণ, এবং বানানরীতিকে প্রমিতকরণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেইনি। বাংলা একাডেমি একটি বানানরীতির অভিধান এবং একটি উচ্চারণ অভিধান মুদ্রণ করেছে কিন্তু যেহেতু তাদের কোন আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই, তাই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং প্রকাশনা সংস্থা তাদের নিজস্ব ধ্যানধারণাকৃত নীতিমালা মেনে চলে। ফলে এসব ক্ষেত্রে একটা বিশৃঙ্খলা স্থায়ীভাবে বিরাজমান। আমি একাধিকবার আমার একাধিক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছি এ বিষয়ে মাতৃভাষা ইন্সটিট্যুটের একটা ভূমিকা থাকা বাঞ্ছনীয়।

আর একটি বিষয় হলো, আমাদের কোন ভাষানীতি নেই। বাংলা আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাষা এবং সর্বোপরি মাতৃভাষা। অথচ ইংরেজি ভাষার স্থান সাংবিধানিকভাবে তেমন স্পষ্ট নয়—ফলে আমাদের শিক্ষা ব্যাবস্থায় প্রায়োগিকভাবে ভাষাটির সঠিক স্থান নির্দেশিত হয়নি এবং তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার জালে আবদ্ধ হয়ে আছে। ইংরেজি কি আমাদের দ্বিতীয় ভাষা না বিদেশি ভাষা? এই সিদ্ধান্তটি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হেঁয়ালিভাবে নেয়ায় তার স্পষ্ট প্রতিফলন শিক্ষাব্যাবস্থাতে নেই। ফলে বাংলা মাধ্যমের পাশাপাশি একাধারে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাব্যাবস্থা প্রচলিত থাকায় সুবিধাবাদী শ্রেণী গত পঞ্চাশ বছরে অস্বাভাবিকভাবে প্রণোদিত হয়েছে। আরও মজার ব্যাপার হলো তথাকথিত বাংলাভাষার ধ্বজাধারী, দরদী, রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের সন্তানেরা অধিকাংশই ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করে বিদেশে বসবাসরত কিংবা সেখানে বসবাসের জন্য উন্মুখ। সম্ভবত এই বিদেশ পাড়ির বিকল্পটি উন্মুক্ত রাখার জন্যই ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা ব্যবস্থাকে জিইয়ে রাখা হয়েছে।

আমি ইংরেজি শিক্ষার বিরুদ্ধে নই—ইংরেজি কেন শেখা উচিৎ সেকথা আগেই বলেছি। কিন্তু এই ভাষাটি শেখার জন্য আমি দৃঢ়কন্ঠে বলতে চাই ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা নেবার কোনই প্রয়োজন হতো না যদি বাংলামাধ্যমের শিক্ষানীতি এবং ব্যাবস্থাটি সঠিকভাবে পরিচালনা করা যেত এবং ইংরেজি শিক্ষা দানের বিষয়টি সকল বাংলা-মাধ্যম শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে মানসম্পন্ন হতো। ফলে উচ্চমূল্যে ইংরেজি কেনার প্রয়োজনই পড়তো না।

আমরা যারা গত শতাব্দীর পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে শিক্ষা গ্রহণ করেছি তাদের শতকরা ছিয়ানব্বুই বা তারও বেশি ওই বাংলামাধ্যমেই ইংরেজি শিখেছি। সেই ভাষাজ্ঞান দিয়েই দেশে এবং বিদেশে (ইংরেজি ভাষাভাষী দেশে) অনায়াসে সফলভাবে শিক্ষা গ্রহণ করেছি। সেই সময়ে ঢাকা শহরে গোটা কয়েক ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষায়তন ছিল যেখানে হাতেগোনা কয়েকটি বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত পরিবারের সন্তানরা বিদ্যার্জন করতো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মফস্বলের ছাত্রদেরই প্রাধান্য ছিল মূলত, যারা বিদ্যালয় পর্যন্ত বাংলা মাধ্যমেই শিক্ষা সমাপন করে (অবশ্য ইংরেজিও তাদেরকে একটি অন্যতম ভাষা হিসাবে শেখান হতো) মহাবিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশুনা করেছে। অথচ এখন আলাদাভাবে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাদানের প্রচলন কেন? সেই বাংলা মাধ্যমের শিক্ষা ব্যবস্থা কোথায় উধাও হয়ে গেল? কেন ইংরেজি কিনতে হবে? আমি একজন ভাষাশিক্ষক হিসাবে মানি যে সারা বিশ্বে ভাষাশিক্ষা দানের আধুনিক পদ্ধতি ভাষাশিক্ষাকে সহজতর করেছে, যে প্রচেষ্টা বাংলাদেশেও দীর্ঘ সময় ধরে চলছে কিন্তু তার সুফল আমরা কেন পাচ্ছি না? এর পেছনে শিক্ষানীতি এবং শিক্ষাদান পদ্ধতিতে রাজনৈতিক এবং আমলাতান্ত্রিক ভুল সিদ্ধান্ত বারংবার কাজ করেছে। ফলে, ইংরেজিকে বাংলার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে, অথচ আমাদের ভাষা অন্দোলন কোনক্রমেই ইংরেজির বিরুদ্ধে ছিলনা।

আমি আমার ইংরেজি শিক্ষকতার একটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে চাই। দীর্ঘ তেইশ বছরেরও বেশি একটি প্রথম শ্রেণীর বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতায় আমি লক্ষ্য করেছি যারা ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় এবং মহাবিদ্যালয় থেকে অর্ডিনারি এবং অ্যাডভান্সড লেভেল পড়াশুনা করে এসেছে তাদের অধিকাংশেরই ইংরেজি বাচনিক দক্ষতা বেশ ভাল হলেও লেখার দক্ষতা তেমন মানসম্মত নয়। অথচ এর বিপরীতে বাংলা মাধ্যমের অনেক শিক্ষার্থী ইংরেজি বাচনিক দক্ষতায় দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও লেখায় আনুপাতিকভাবে ভাল। অর্থাৎ ইংরেজি শিখতে চাইলে এবং সঠিক পরিবেশ এবং পদ্ধতি থাকলে ইংরেজি ভাষা শেখা মোটেও কঠিন নয়। এছাড়া আমার একটি স্নাতকোত্তর পর্যায়ের বিষয় ট্রানস্লেশন থিওরিজ-এ অনেক ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার্থীকে আমি বাংলা শিখিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর ছোট গল্প অনুবাদ করিয়েছি মাত্র চার মাসে। বলতে দ্বিধা নেই, সেইসব অনুবাদের অধিকাংশই শ্রেণীকক্ষের শিক্ষানবিশি মানের হওয়া সত্ত্বেও বেশ কিছু ভাল অনুবাদও হয়েছে যা পরবর্তীকালে আমার ব্যাক্তিগত উদ্যোগে ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিতও হয়ছে। সঠিক ভাবে প্রাণিত করতে পারলে–আমি যেমন আগেই উল্লেখ করেছি–যেকোনো ভাষা শিখতে ছয় মাসের বেশি সময় লাগে না, বিশেষ করে শিক্ষার্থী যদি পূর্ণবয়স্ক এবং পূর্ণবিকশিত হয়।


পৃথিবীর প্রতিটি ভাষার নিজস্বতা এবং মূল্যমান সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ—এমনকি নৃগোষ্ঠীদের ভাষাও। কোন ভাষা অন্য কোন ভাষা থেকে এগিয়ে নয়। একথা পশ্চিমা ভাষাতাত্ত্বিকরা সেই উনবিংশ শতাব্দীতেই উল্লেখ করে গেছে। বিস্ময়কর হলেও সত্য বিশ্বের প্রথম বর্ণনাত্মক ভাষাতাত্ত্বিক এবং যাকে বিশ্বব্যাপী ভাষাতত্ত্বের জনক বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়, সেই পানিনি-র জন্ম খ্রীষ্টপুর্ব ছয় শতাব্দীতে এই ভারতবর্ষেরই গান্ধারাতে। তারই রচিত বর্ণনাত্মক ভাষাতত্ত্ব এবং ব্যাকরণের (ডেসক্রিপটিভ লিংগুইস্টিক্স অ্যান্ড গ্রামার) আলোকে ড্যানিয়েল জোন্স ১৯১৭ সালে প্রথম ইংরেজি উচ্চারণ-সরণি প্রস্তুত করে একটি বিজ্ঞানসম্মত ইংরেজি উচ্চারণ অভিধান রচনা করে। কিন্তু সেই মহান বৈয়াকরণিক পানিনি-র উত্তরসুরী (আমরা তো জানি বাংলা এবং ইংরেজি বিশ্ব ভাষাবৃক্ষের একই শাখা অ্যাঙ্গলো-ইন্ডিয়ান বা অ্যাঙ্গলো-ইরানিয়ান ধারার ভাষা) হয়েও আমরা একটা বর্ণনাভিত্তিক আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ এবং উচ্চারণ অভিধান রচনা করতে সক্ষম হইনি। এ দায় এই বাংলাদেশের শিক্ষাবিদ এবং বুদ্ধিজীবীদের উপরই বর্তায়। ব্যাকরণ যেমন ভাষাকে বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করে, তেমনি তারই ব্যাবহারিক বর্ণনা ভাষাকে দেয় প্রায়োগিক স্বাধীনতা যা প্রমাণিত সত্য ইংরেজি ভাষার ক্ষেত্রে। ইংরেজি ভাষা, নির্দেশক ব্যাকরণ (prescriptive grammar) থেকে বর্ণনাত্মক ব্যাকারণে (descriptive grammar) বা ব্যাবহারিক ব্যাকরণে (functional grammar) উত্তরিত হয়েছে শত বছর আগে যার অন্যতম উদাহরণ আইরিশ/ইংরেজ সাহিত্যিক জেমস জয়েস, মার্কিন লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে-র উপন্যাসসমূহ এবং ইংরেজ/মার্কিন কবি টি. এস. এলিয়ট, মার্কিন কবি কার্ল স্যান্ডবার্গ বা ই. ই. কামিংস-এর কবিতাবলী। এমন আরও অনেক অনেক উদাহরণ অপরাপর ভাষাতেও রয়েছে। অথচ আমরা দেশ স্বাধীন হবার অর্ধ-শতাব্দী পরেও সে কাজ সম্পন্ন করতে পারিনি আমাদের জাগতিক উন্ননের ব্যস্ততার চাপে। বাংলা ব্যাকারণ, শব্দকোষ (যা বর্তমানযুগে অন্যান্য বহু ভাষার প্রভাব ও সংমিশ্রণে ঋণশব্দ-ঋদ্ধ), বানান এবং উচ্চারণের আধুনিকীকরণ বাংলাভাষার জন্য আশু প্রয়োজনীয়। প্রসঙ্গত আঞ্চলিকভাষার গুরুত্বও যেন ক্ষুণ্ণ না হয় সেদিকেও দৃষ্টি রাখা অত্যাবশ্যক। এ ব্যাপারে বাংলা একাডেমি কর্তৃক আঞ্চলিক ভাষার অভিধান প্রকাশ একটি প্রশংসনীয় কাজ ছিল, যদিও এই অভিধানের আর কোন সংস্করণ আজ পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি।

আমি মনে করি এদেশের ভাষা আন্দোলন প্রাথমিকভাবে বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্থাপন করার যেমন একটি রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল, তেমনিভাবে তার ভেতর মাতৃভাষার প্রতি আবেগ এবং ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশও ছিল, তা না হলে ওই সময়কালে রচিত গণসংগীতে এ কথা আসতো না: "ওরা আমার মুখের ভাষা/কাইড়া নিতে চায়" (আব্দুল লতিফ); কিম্বা কবিতার চরণ হত না "অপমানে তুমি জ্বলে উঠেছিলে/সেদিন বর্ণমালা/সেই থেকে শুরু দিনবদলের পালা" (আবু হেনা মুস্তফা কামাল); অথবা ফসলের মাঠে, মেঘ্নার তীরে/ধু ধু বালুচরে, পাখিদের নীড়ে/তুমি আমি লিখি প্রাণের বর্ণমালা" (শামসুর রাহমান); অথবা বয়াতিরা গাইতো না "বাংলা আমার মায়ের ভাষা এমন ভাষা আর যে নাই/এ ভাষাতে মা-কে ডাকি ডেকেছে মোর সালাম ভাই" (মোহাম্মদ মাতু মিয়া)। এটি ঐতিহাসিক সত্য যা আমরা যারা পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে ঐ আন্দোলনে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলাম– তারা সবাই জানি। আসলে ঐ আন্দোলনের একটি অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল মাতৃভাষার প্রতি ভালবাসা এবং আবেগ যার সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিল দৃঢ় রাজনৈতিক প্রত্যয়। কিন্তু একথাও ঠিক মাতৃভাষার প্রতি আবেগ আমাদের স্বাধীনতা-উত্তর কালে ভাষা শিক্ষার ব্যাপারে কিছু ভুল সিদ্ধ্বান্ত নিতে তাড়িত করেছে এবং ইংরেজি ভাষার স্থান নির্ধারণে একধরনের রাজনৈতিক এবং আমলাতান্ত্রিক প্রবঞ্চনাকে উৎসাহিত করেছে। তাই আজ তথাকথিত বাংলা মিডিয়াম এবং ইংরেজি মিডিয়াম নামে পরস্পরবৈরী ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ইংরেজি কেনার ক্ষমতার কথা উঠছে।

ভাল লাগুক এর নাই লাগুক, একথা মানতেই হবে বাংলা সাহিত্যের বেশ কিছু দুর্বলতা আছে। যে সাহিত্যের বিরাম চিহ্ন থেকে শুরু করে নাটক, মহাকাব্য, সনেট, উপন্যাস, ছোটগল্প এবং এমন অনেক সাহিত্য শাখাকে ইউরোপীয় আদল থেকে অনুকরণ করতে হয়েছে যা মূলত উনবিংশ শতাব্দীর ফসল, সে ভাষাকে বিশ্ব চরাচরে প্রতিযোগিতায় নামতে হলে অনেক দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে আর সে পথ অতিক্রম করতে হবে আমাদেরকেই, বাংলাদেশের বাঙালিদের। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা এই একবিংশ শতাব্দীতে যে-কবিতা রচনা করি তার অধিকাংশেরই সারা শরীর জুড়ে যে উপমা, রূপকালংকার, চিত্রকল্প এবং বিষয়বস্তু বিধৃত হয়, সেসব কোন না কোনভাবে অতিআবেগ-তাড়িত বিশেষ্য, বিশেষণে পরিপূর্ণ; আমাদের গল্প-উপন্যাস ইউরোপীয় সাহিত্যতত্ত্বের অক্ষম অনুশীলন; আমাদের প্রবন্ধ সবচাইতে দুর্বলতম সাহিত্যশাখা। বাংলা ভাষাতে আমি এপর্যন্ত নির্দিষ্টভাবে কোন প্রবন্ধ পড়িনি যা মৌলিকভাবে আমাদের নিজস্ব সাহিত্যতত্ত্ব ধারণার উপর রচিত। এ কাজটি রবীন্দ্রানাথ-এর মতো মানুষও সঠিকভাবে করেননি, যদিও তার বেশকিছু প্রবন্ধে তিনি সাহিত্য বিষয়ে তার মতামত লিপিবদ্ধ করেছেন—পূর্ণাঙ্গ কিছু বলেন নি। আমরা সাহিত্যতত্ত্ব নিয়ে যেসব প্রবন্ধ রচনা করি সেগুলোও সেই আবেগ, বিশেষণ এবং বিশেষ্যে পরিপুর্ণ, অথচ আর্জেন্টিনিও সাহিত্যিক হোর্হে লুইস বোর্হস-এর মাত্র দেড় বা দুই পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধ কত জ্ঞানগর্ভ হতে পারে তার উদাহরণ আমাদের জানা। আসলে কবিতা রচনা এবং প্রবন্ধ রচনা যে দুটি দুই বিপরীত মেরুর রীতি ও অনুশীলন তা আমরা এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। অন্যদিকে আমাদের নাটকের একটি বিশাল অংশ জুড়ে অনুবাদ এবং রূপান্তরের ছড়াছড়ি। একাধিক নাটকের অনুবাদক হিসেবে আমি বলতে পারি এদেশের নাট্যমঞ্চকে শতকরা চল্লিশ ভাগই নির্ভর করতে হয় অনুবাদ এবং রূপান্তর নাটকের উপর।

ইউরোপের বিভিন্ন ভাষা সাহিত্যে আমরা লক্ষ্য করি যুগেযুগে বিভিন্ন সাহিত্যতত্ত্ব আলোড়ন সৃষ্টি করেছে যার ঢেউ বাংলা সাহিত্যকেও আলোড়িত করেছে, যেমন মাইকেলকে, বঙ্কিমচন্দ্রকে, রবীন্দ্রনাথকে, জীবনানন্দকে, বুদ্ধদেবকে, ওয়ালিউল্লাহকে, শামসুর রাহমানকে, সৈয়দ শামসুল হক-কে। বাংলাদেশে আমরা পঞ্চাশ, ষাট এবং সত্তুর দশকে পেয়েছি খ্যাতিমান কবিদের—কিন্তু এই কবিকুলরা কেউই কোন নির্ধারিত বা মৌলিক কাব্যতত্বের বিশ্লেষণাত্মক প্রবক্তা হতে পারেন নি। ধান ভানতে শিবের গীতের মতো শোনালেও, বলতে বাধ্য হচ্ছি একবিংশ শতাব্দীতে আমরা দেখতে পাচ্ছি আকস্মিক এবং খন্ডকালীন কবি-সাহিত্যিকদের দৌরাত্ম, অর্থাৎ পূর্ণকালীন সরকারি বা বেসরকারি উচ্চকর্মকর্তা বা লেখকে রূপান্তরিত হয়েছেন (metamorphosed অর্থে)। আমরা জানি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর রায়, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ-র মতো সাহিত্যিকরাও আমলা ছিলেন, তবে তারা কেউই আকস্মিক বা খন্ডকালীন লেখক ছিলেন না বা চাকুরি থেকে অবসর নেবার পর কবি-সাহিত্যিক রূপে রূপান্তরিতও হন নি। কারণ তারা প্রথমত এবং প্রধানত লেখক ছিলেন চাকুরিতে প্রবেশের আগেই। চাকরিরত কালে পদবীর ক্ষমতার দৌড়ে খন্ডকালীন, অবসরে পূর্ণকালীন লেখক হিসেবে রূপান্তর, এবং অবসর-পূর্ববর্তী পদবীর সুবাদে বাংলা ভাষাসাহিত্যের মহারথি হন নি তারা কেউই। ঐ আকস্মিক রূপান্তরিত সাহিত্যিকদের পক্ষে মৌলিক সাহিত্য ও তত্ত্ব সৃষ্টি করা এবং ভাষাকে সমৃদ্ধ করা কতদূর সম্ভব জানি না, তবে সাহিত্যচর্চায় এর প্রতিফলন যে অতি সাদামাটা এবং গতানুগতিক হবে সেটা নিশ্চয় করে বলতে পারি।

আমি মনে করি যতদিন সবজান্তা আমলারা এদেশের ভাষাশিক্ষা দান এবং সাহিত্যকে শাসন করবে ততদিন ভাষাশিক্ষা সহ বাংলা ভাষাসাহিত্য কখনই বিশ্ব-দরবারে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। বরং আমরা দুই ভিন্ন প্রজাতিতে বিভক্ত হয়ে থাকব অনন্তকাল—একদিকে ইংরেজি অন্যদিকে বাংলা মাধ্যম, একদিকে সমাজের ঘি আহার করা এক প্রজাতি যে প্রজাতি ইংরেজি কিনতে পারে, অন্যদিকে ডালভাত গলাধঃকরণ করা অন্য এক প্রজাতি যে প্রজাতির ইংরেজি কেনার সঙ্গতি নেই। অথচ আমাদের কারোই ইংরেজি কেনার প্রয়োজন ছিল না। সবাই সমানভাবেই বাংলা এবং ইংরেজি শিখতে পারতাম এবং সমানভাবে তার সুবিধাও ভোগ করতে পারতাম।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক