পোর্ট্রেট অব অ্য পাবলিশার

আবদুস সেলিমআবদুস সেলিম
Published : 22 June 2022, 06:58 AM
Updated : 22 June 2022, 06:58 AM

এয়ার মার্শাল আসগর খানের জেনারেলস ইন পলিটিক্স ছেপেছে ইউপিএল। প্রকাশনাটি নিয়ে আগ্রহ যেমন সৃষ্টি হয়েছে, কোথাও কোথাও অস্বস্থিও কম সৃষ্টি হয়নি। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক ফজলে রাব্বির কক্ষে এই কথোপকথনের সময় আমিও ছিলাম। কর্মসূত্রে আমিও তখন এই প্রতিষ্ঠানটির সাথে যুক্ত। জেনারেলস ইন পলিটিক্স বইটির প্রকাশক মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, 'হিরো হবার একটি সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল।' বাংলাদেশের জেনারেলদের একজন শীর্ষ ব্যক্তি এইচ এম এরশাদ ক্ষমতায়, তার সহযোগীদের একজন অপর এক জেনারেল মহিউদ্দিন ভাইকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন জেনারেলস ইন পলিটিক্স বইটি বাংলাদেশের উপর কেমন প্রভাব বিস্তার করবে?
'ইংরেজি বই পড়ার মতো পাঠক ক'জন?' তিনি জবাব দিলেন।
জেনারেল আরও প্রশ্ন করার আগেই মহিউদ্দিন ভাই বললেন, 'তবে বইটি যদি আপনারা বাজেয়াপ্ত করে দেন তাহলে এর প্রভাব পড়বে আর প্রকাশক হিসেবে আমিও হিরো হয়ে যাব।'
বইটি বাজেয়াপ্ত হয়নি।
***
নিজেকে নিজের কাছে সম্মানিত করে তুলতে আমি নিজের মতো করে কয়েকটি 'গ্রন্থসূচক' ব্যবহার করি। সত্তরের দশকে সেই সূচক ছিল পেঙ্গুইন প্রকাশনীর বই। একদিন আমার পুরোনো বুকশেলফের দুটি তাক পেঙ্গুইনের বইতে ভরে গেল, বেশ বুঝতে পারলাম নিজের কাছে আমার মর্যাদা কিছুটা বেড়ে গেছে। পেঙ্গুইনের প্রথম কেনা বইটি রুডিয়ার্ড কিপলিং-এর কিম আর তখন পর্যন্ত কেনা পেঙ্গুইনের শেষ বইটি আলেকজান্ডার সোলজেনিৎসিনের ক্যান্সার ওয়ার্ড। এগুলোর আশি থেকে নব্বই ভাগই ফুটপাত থেকে কেনা। বিদেশি বই নতুন কেনার সামর্থ তখনও আমার ছিল না, এখনও নেই।
আশির দশকে এসে সূচক বদলে যায়। হিসেব করি আবু সয়ীদ আইয়ুবের সবগুলো বই আছে কিনা, বুদ্ধদেব বসুর রচনা সমগ্র কবে তার সব লেখা ধারণ করবে, আমার কাছে চিত্রকলার ক'টা বই আছে।
তখন থেকেই অনেকটা প্রয়োজনের তাগিদেই ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড প্রকাশিত ইংরেজি বই আমার নতুন বুকশেলফে জায়গা করে নিতে শুরু করল। আমার সূচকে যোগ হল ইউপিএল।
ইউনেস্কো কমিশনের একটি ঠিকে কাজে ১৯৮১ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের তখনকার পরিচালক ফজলে রাব্বি ভাই (তখন স্যার বলাটা রপ্ত করিনি) আমাকে নিয়োগ করলেন। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৩-র শেষ ভাগ পর্যন্ত বাংলাদেশ অবজার্ভারের নিয়মিত বুক রিভিউয়ার হওয়ায় অন্ততঃ যাদের বই নিয়ে লিখেছি তাদের কাছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকাশকের কাছে আমি কিঞ্চিত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলাম।
একাশিতেই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালকের কক্ষে যখন মহিউদ্দিন আহমেদের সাথে হাত মেলালাম, তিনি যা বললেন তার সারমর্ম: আমি তো তোমাকে খুঁজছি।
আমি তাকে অন্তত আরো আরও দু'বছর আগে থেকে চিনি। বায়তুল মোকাররমের একবারে গা ঘেঁষা স্কাউট বিল্ডিং-এর দোতলায় তখন ছিল জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, পরিচালক ছিলেন সরদার জয়েনউদ্দীন, সামনের এক চিলতে সবুজ লনে বইপত্রের প্রকাশনা উৎসব হতো। মহিউদ্দিন ভাই এমন কি অতিথি-দর্শক হিসেবে এলেও শেষ পর্যন্ত তাকে কিছু না কিছু বলতে হতো, আয়োজকরা জানতেন তিনি মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেই অনুষ্ঠানে একটি নতুন মাত্রা যোগ হবে। 'সবার জন্য বই' লাগবে এবং বইয়ের পাঠক না বাড়লে প্রকাশক বাঁচবেন না, প্রকাশক না বাঁচলে লেখক টিকবেন না, লেখক না টিকলে শিক্ষিত সমাজ তৈরি হবে না–এই দুষ্টচক্র থেকে বের হওয়া সম্ভব হবে না -এটা তার কথায় উঠে আসতোই। তিনি যখন কথা বলতেন প্রকাশকদের সনাতন ভাষায় বলতেন না; কিন্তু তাদের কথাই বলতেন তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে, এমনভাবে বলতেন যে তাকে উপেক্ষা করার সুযোগ থাকত না।

মহিউদ্দিন আহমদ ইউপিএল হিসেবে পরিচিত ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা এবং দীর্ঘকালীন কর্ণধার। তার পক্ষে সরকারের উধ্বতন কর্মকর্তা হওয়া, কিশ্বরিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করা থেকে শুরু করে বৃহৎ শিল্পপতি হওয়া- অনেক কিছুই সম্ভব ছিল। কিন্তু তার প্যাশন যে বইয়ের জগত, তিনি এখানেই নোঙ্গর করলেন। আমুত্যু এখানেই স্থির রইলেন।
একাশির শেষের দিকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের নতুন ভবনে (তখনও বায়তুল মোকাররম ঘেষা স্কাউট ভবনের দোতলা থেকে গ্রন্থকেন্দ্রের অফিস স্থানান্তরিত হয়নি) এশিয়ান কালচারাল সেন্টার ফর ইউনেস্কো, টোকিওর উদ্যোগে লেখক প্রকাশকদের একটি ক্লিনিক অনুষ্ঠিত হলো। মহিউদ্দিন ভাইয়ের উদ্বোধনী বক্তব্য বিদেশি অতিথিসহ আমাদের সকলকে মুগ্ধ করল। জাপান থেকে এসেছিলেন শিনজি তাজিমা এবং মাশায়শি ইতো (তিনি ইংরেজিও বুঝতেন না তার জন্য দোভাষী রাখতে হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের একজন শিক্ষককে), ভারত থেকে এসেছিলেন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী সি রামচন্দ্রন এবং শিশু সাহিত্যিক মনোরমা জাফা। প্রকাশনা নিয়ে যা বলার প্রায় সবই বলেছিলেন মহিউদ্দিন আহমেদ।

দেখতে দেখতে আমার নতুন বুক শেলফের এক তাক দুই তাক ইউপিএলের বইতে ভরে গেল। এর মধ্যে ইউপিএল-এর একেবারে প্রথম দিককার ইউনিভার্সাল প্রাইমারি এ্ডুকেশন (এলেন সাত্তার)ও ছিল। আশির দশকের শেষ দিকে ইউপিএল এর একটি ইংরেজি গ্রন্থের সহলেখক হিসেবে আমিও শেলফের একটি অংশ হয়ে উঠলাম। তিরাশি সালে নতুন চাকরি আমাকে ঢাকা ছাড়া করল। মহিউদ্দিন ভাই বললেন, এতে তোমার ক্ষতিই হবে বেশি। কিন্তু কী করা?

গড়পরতা দু'মাস পর পর যখন একবার ঢাকায় আসি আমার তীর্থ হয়ে ওঠে মতিঝিলে রেড ক্রেসেন্ট বিল্ডিং-এ ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড। প্রতিবার দু'একটি করে বই বাড়তে থাকে। পেঙ্গুইনের বই যেমন করে সাজিয়েছিলাম, সেভাবেই সজ্জিত ইউপিএলএর বই দুই তাক পূর্ণ হয়ে যখন তিন তাক পূর্ণ হতে যাচ্ছে আমার প্রধান গ্রন্থসূচক তখন ইউপিএল। বিভিন্ন বিষয়ের তিন তাকভর্তি বইয়ের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত এক আনন্দ পাই, নিজের কাছে নিজে আরো মর্যাদাবান হয়ে ওঠি।
গত শতকের একেবারে শেষের দিকে, তখনও কর্মক্ষেত্র ঢাকার বাইরে, আমার একটি বুক শেলফের ইউপিএল রাজত্বের ছবি তুলে প্রিন্ট করিয়ে হাজির হলাম রেড ক্রিসেন্ট ভবনে মহিউদ্দিন ভাইয়ের অফিসে। ছোট শিশুরা যেমন সদ্য শেখা গানের মুখরা শুনিয়ে বড়দের মুগ্ধ করতে চেষ্টা করে, আমিও সম্ভবত তাই করলাম। তাকে মুগ্ধ করার জন্য ছবিটা তার সামনে তুলে ধরলাম- এর মধ্যে কটা বই তার নিজেরই বেছে দেওয়া। তালুকদার মনিরুজ্জামানের মিলিটারি উইথড্রয়াল ফ্রম পলিটিক্স এমন একটি বই। শেরবাজ খান মাজারির এ জার্নি টু ডিজইল্যুশনমেন্ট দিয়ে বললেন, এতে ভুট্টো সম্পর্কে বেশ কিছু ইন্টারেস্টিং তথ্য আছে; ওয়াভেল: দ্য ভাইসরয়স জার্নাল হাতে নিয়ে বললেন এটা তার প্রিয় একটি বই। বেঙ্গল পলিটিক্স: ডকুমেন্টস অব দ্য রাজ সম্পর্কে বললেন, সব কটা খন্ড তোমার কাছে না থাকলে তোমার কালেকশনে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। নিয়ে আসি দ্য লোর অব ম্যান্ডারিনস, গ্লোবালাইজেশন অ্যান্ড জেন্ডার। কিন্তু কেনা হয়নি হিউ ব্র্যামার। আমি তাকে দেখেছি। এমন নিবেদিত প্রাণ আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান ভূতাত্বিক এবং মৃ্ত্তিকাবিজ্ঞানী একজন পণ্ডিতকে বাংলাদেশের জন্য সিঁকি শতাব্দি ধরে রাখার পেছনের মানুষটি তারই প্রকাশক ও বন্ধু মহিউদ্দিন আহমেদ। প্রায় শতাব্দির সমবয়সী ব্র্যামারের (১৯২৫-২০২১) মতো বাংলাদেশ-বান্ধব এবং বাংলাদেশ নিয়ে উচ্চাভিলাসী পÐিত আর একজনও মিলবে না। তাকে নিয়ে দুটি মনে রাখার মতো অবিচুয়ারি পড়েছি, একটি লিখেছেন স্টিভ জোন্স, লন্ডনের গার্ডিয়ানে, অন্যটি মাহরুখ মহিউদ্দিন লিখেছেন ডেইলি স্টার পত্রিকায়। স্টিভ জোন্সকে নিয়ে আশির দশকে আমি ফরিদপুর, মাদারিপুর ঘুরেছি, তিনি এসেছিলেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পরামর্শক হিসেবে। ব্রিটেনে তাকে আবার খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও পেয়েছি।

বিচিত্র বিষয় থেকে আগ্রহ গুটিয়ে আমার ফিকশনের দিকে ফেরা, পরিসর সঙ্কটের কারণে আমার সংগ্রহের অনেক বই বিতরণ করে দিলেও মহিউদ্দিন ভাই নিজে যে বইগুলো বেছে দিয়েছেন সেগুলো হাতছাড়া করিনি।
১৯৯৬ সালে একটি পিএইচডি কামিয়ে যখন বিলেত থেকে ফিরলাম তিনি বললেন, থিসিসটা তাড়াতাড়ি পাণ্ডুলিপি বানিয়ে দিয়ে যাও; তোমার যে বিষয়ে পড়াশোনা, আমাদের সে বিষয়ে বই কম, একটি বা দুটি। আমার অনেক ব্যর্থতার মধ্যে এটিও একটি; শেষ পর্যন্ত পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন করতে পারিনি। অথচ এখন কিছু কামাই রোজগারের জন্য অন্যের পিএইচডি থিসিস কাটছাট করে পাণ্ডুলিপি বানিয়ে দেই। নিজেরটা না করার প্রায়শ্চিত্ত।
১৯৯০ সালে একদিন তার অফিস সংলগ্ন শেলফগুলোতে যখন বই নিয়ে ঘাটাঘাটি করছি হঠাৎ রুম থেকে বেরিয়ে মহিউদ্দিন ভাই কবে এসেছি জিজ্ঞেস করেই একজন রাজনীতিবিদের নাম নিয়ে বললেন, আমার রুমে আছেন। সালাম দিয়ে এসো।
সালাম দিতেই রাজনীতিবিদ বই থেকে মাথা তুলে বললেন, তুমি কোথায় আছো? জানালাম। তিনি বললেন, থেকো, ওখানে থেকো, আমাদের কাজে লাগবে। আমার স্বভাবসুলভ তাৎক্ষনিক জবাব, আমি তো আপনাদের কাজে লাগতেই চাই। কিন্তু আপনি কাদের কাজে লাগছেন এটাই তো বুঝতে পারছি না।
আমার অপরিপক্ক কথা চাপা দিতে মহিউদ্দিন ভাই প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নিয়ে গেলেন, পরে আমাকে বাইরে নিয়ে এসে বললেন, বেশ বলেছো, তবে আমার সামনে না বললে ভালো হতো।


(২ ডিসেম্বর ১৯৪৪-২২ জুন ২০২১)
মহিউদ্দিন আহমেদ
ইউপিএল এ আমাকে সানন্দে চা খাওয়াবার মতো আরও একজন ছিলেন- বদিউদ্দিন নাজির। মহিউদ্দিন ভাই তখন হুইল চেয়ার-বাউন্ড হয়ে পড়েছেন। সুবর্ণ প্রকাশনীর জাহাঙ্গীর ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে। মহিউদ্দিন ভাই এসেছেন। সেদিন অনেকদিন পর তার সাথে একটু দীর্ঘ সময় কথা। বললেন, যদি একটি সঠিক রিডিং সোসাইটি গড়ে না উঠে, তোমার লেখা কিংবা আমার প্রকাশনা দুটোই গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে। সাবেক মন্ত্রী শামসুল ইসলামের প্রয়াত স্ত্রীর কুলখানিতে তিনি এলেন। এক ফাঁকে তিনি শামসুল ইসলামকে বললেন, আপনার আত্মকথার পান্ডুলিপি নিশ্চয়ই শেষ করেছেন, আমার হাতে আজই দিয়ে দিন। তিনি বললেন, এখনো ক'পাতা বাকি।
সেই জাহাঙ্গীর ভাই, মন্ত্রী শামসুল ইসলাম, মহিউদ্দিন ভাই- কেউ আর এই ইহলোকে নেই। ৭৭ বছর বয়সে মহিউদ্দিন ভাই প্রয়াত হলেন ২২ জুন ২০২১ মধ্যরাত পেরিয়ে।

আমাদের প্রকাশনা জগতে (তিনি প্রকাশনা জগতই বলতেন, একাধিকবার বলেছেন বাংলাদেশে এটা প্রকাশনা শিল্প হয়ে ওঠেনি। কেনো ওঠেনি সে ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি) তার সমকক্ষ কাউকে সনাক্ত করা মুশকিল।

১৯৯০-এর দশক তিন বছরের কিছু বেশি সময় পড়াশোনার জন্য বিলেতবাসের কারণে সেখানকার দক্ষিণ এশীয় বান্ধব একটি একাডেমিক বৃত্তের সাথে কিছুটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দেশে ফেরার পর টানা ক'বছর বিলেতের বাংলাদেশ গবেষকদের কেউ কেউ ঢাকায় এসে আমার খোঁজ করেছেন, তাদের বিষয়ে আমার পক্ষে যতটা সম্ভব ব্রিফ করে খ্যাতিমান অধ্যাপকদের কাছে না পাঠিয়ে ইউপিএল মহিউদ্দিন ভাইয়ের কাছে পাঠাতাম, তিনি তাদের সময় দিতেন, কথা বলতেন, গাইড করতেন। সেই গবেষকদের একজন এখন সম্ভবত বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ফেরার সময় আমার কাছে বলে গেলেন, মহিউদ্দিনের সাথে বসাটা ছিল তার জন্য সবচেয়ে রিওয়ার্ডিং আর তার ভাষায় 'হি ইজ মোর ফোকাসড অন ইস্যুজ', 'হি ইজ মোর অব অ্য প্রফেসর দ্যান অ্যা ট্র্যাডিশনাল পাবলিশার।' তিনি সম্ভবত জোসেফ ডিভাইন।

১৯৯৬ সালে লন্ডনে উর্মি রহমান এবং তার স্বামী সাগর চৌধুরী তাদের বাড়িতে ডাকলেন অধাপক আলী রীয়াজ (তখন বিবিসিতে কর্মরত) এবং আমাকে; দুজন ইউরোপিয় পণ্ডিত বাংলাদেশ সফরে যাচ্ছেন, তাদের বাংলাদেশ সম্পর্কে একটা ধারনা দিতে হবে। ডিনারের আগে এবং ডিনারের পর খুব চমৎকার একটা ব্রিফ দিলেন আলী রীয়াজ, এতো ভালো বলতে পারবো না বলে আমি বললাম, বাংলাদেশে গিয়ে ইউপিএল ভিজিট করলেই অনেক কিছুর জবাব পেয়ে যাবেন। আরো বিশেষ কিছু জানার থাকলে মহিউদ্দিন সাহেবের সাথে কথা বলতে পারেন।

আমার এতোটাই আস্থা ছিল মহিউদ্দিন ভাইয়ের উপর। তিনি রাগ বা অনুরাগের বশবর্তী না হয়ে কথা বলতেন
ইউরোপ আমেরিকায় 'মহিউদ্দিন' ধরনের ও মানের আরো প্রকাশক আছেন। কিন্তু বাংলাদেশে আমি তাকেই দেখেছি; তাকেই আমাদের প্রেক্ষাপটে মনে হয়েছে নন ট্র্যাডিশনাল। বয়সে তার চেয়ে বড় আরো দুজন মহিউদ্দিন ছিলেন, আমি দু'জনকেই চিনতাম একজন আহমদ পাবলিশিং-এর প্রতিষ্ঠাতা মহিউদ্দিন আহমদ, অন্যজন খোশরোজ কিতাব মহলের কর্ণধার মহিউদ্দিন আহমদ। প্রথমজন বন্ধুর বাবা হওয়ায় সভয়ে দূরত্ব বজায় রেখেছি, অপরজনের সঙ্গে আশির দশকের শুরুতে ঘনিষ্ঠতা, মূলত মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের ভর্তুকি দেওয়া কিছু অনুবাদ গ্রন্থ সস্তায় কেনার মধ্য দিয়ে (বইগুলোর মধ্যে ছিল গণদারিদ্রের প্রকৃতি, জাদুর কলস, সমুদ্রের স্বাদ, পৌষ-ফাগুনের পালা এবং আরও কিছু)। দু'জনই সফল প্রকাশক, দুজনেরই অবদান অনেক, তাদের বলা যায় ট্র্যাডিশনাল পাবলিশার।

বাংলা শিখতে এবং বাংলা সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী দু'জন বিদেশী কূটনীতিক- একজনের নামের প্রথমটা আলেক্সিয়েভিচ অন্য জনের ভ্লাদিমির, দু'জনকে আমি ছাত্র হিসেবে পেয়ে যাই। দু'জন ঢাকায় এসেই ইউপিএল-এর বই ব্রাদার জেমস-এর বেঙ্গলি ফর ফরেনার্স কিনে নিয়েছেন। আলেক্সি কয়েকজন প্রকাশকের সাথে এবং তাদের প্রকাশনার সাথে পরিচিত হতে চাইলে আমি তাকে নিয়ে প্রথমে গেলাম মুক্তধারায়। চিত্তরঞ্জন সাহা বেশ সমাদর করলেন, তাকে কয়েকটি বই উপহার দিয়ে বললেন, বাংলা ভালো না শিখলে এই বই পড়ার আনন্দ পাবেন না। অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের বইয়ের আমদানিকারক হিসেবে তখন হাক্কানি পাবলিশার্স পরিচিত হয়ে উঠেছে- আগ্রহের আরো একটি কারণ প্রথম দিককার একটি এয়ার কন্ডিশনড বইয়ের দোকান তিনি সাজিয়েছেন তোপখানা রোডের বিএমএ ভবনে, তিনি বেশ খাতির করে চা খাওয়ালেন। পরদিন ইউপিএল-এ মহিউদ্দিন ভাইও খাতির করলেন, ক্যাটালগ দিলেন, ঘুরে ঘুরে ইউপিএলের বই দেখতে বললেন। মিনিট দশেক পর মহিউদ্দিন ভাই অন্য কোনো কাজে বেরিয়ে যাবার সময় আস্তে করে আমাকে বললেন, বইপত্রের দিকে তার আসলে কোনো আগ্রহ নেই। পরের সপ্তাহেই পুলিশের বড় অফিসার (সম্ভবত তখন এডিশনাল ইন্সপেক্টর জেনারেল) এবং লেখক আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিনের কাছ থেকে একটি বার্তা পাই, এই বিদেশিদের কাছ থেকে দূরে থাকাটা আমার মঙ্গলজনক হবে। ক'মাস পর খবরের কাগজে ছবি দেখি: বাংলাদেশ থেকে ডিপোর্টেড হচ্ছেন এমন ক'জন কূটনীতিবিদের সাথে আমার সাবেক ছাত্র আলেক্সি ও ভ্লাদিমির রয়েছেন। আমি অবাক হই, মহিউদ্দিন ভাই তো আগেই বলেছেন, বইপত্রে তার আগ্রহ নেই।
তারপরও কোনো বিদেশি যদি অল্পসময়ে বাংলাদেশকে জানতে চান এখনও আমার একটিই প্রেসক্রিপশন: ইউপিএল ঘুরে আসুন। আর কোনো বাংলাদেশি যদি নিজের দেশটাকে তত্ত্ব, তথ্য ও বাস্তবতার মধ্য দিয়ে ভালো করে চিনতে চান তার জন্যও আমার একই প্রেসক্রিপশন: ইউপিএল এর ক্যাটালগটা একটু ভালো করে দেখুন।

আশির দশকের প্রথম ভাগে জাতীয় গ্রন্থের পরিচালক ফজলে রাব্বির উদ্যোগে নববর্ষে প্রিয়জনকে বই উপহার দিন ধরনের একটি কর্মসুচি চালু হলো। আমি এই কাজটির সাথে জড়িয়েছিলাম।
মহিউদ্দিন ভাই মজা করে বললেও সত্যটাই বলেছিল, নববর্ষে শিশুদের হাতে তাদের উপযোগী বই দাও, তারা পড়বে। বয়স্করা তেমন পড়ে না, বিনে পয়সার বই হলে আরো পড়বে না। তিনি নিজের অভিজ্ঞতার কথা বললেন, যাদের নিজের প্রকাশনার বই উপহার দিয়েছেন তাদের কেউ কেউ বইটার নামটুকু কেবল পড়েছেন।

মহিউদ্দিন ভাই রিডিং সোসাইটি তৈরির কথা বহুবার বলেছেন এবং লিখেছেন। 'ক্যাচ দেম ইয়ং'- বয়স কম থাকতে থাকতে হাতে বই ধরিয়ে দাও, একবার বইয়ের মজা পেলে আর ছাড়বে না। তারা বড় হলে তখন যে রিডিং সোসাইটি গড়ে উঠবে সেটা টেকসই হবে। তার একটি লেখা থেকেই উদ্ধৃত করছি:
'রিডিং সোসাইটি এমন একটি সমাজের চিত্র উপস্থিত করে যে সমাজ প্রকৃতপক্ষেই উৎপাদনশীল। সে সমাজের প্রত্যেক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চলার পথে তথ্য ও জ্ঞানের প্রয়োজন অফুরন্ত এবং সেই সামাজিক চাহিদা মেটাতে বইয়ের উৎপাদন বিতরণ ও উন্নয়ন সমাজের প্রত্যেক মানুষের কাছেই হবে আকাঙ্ক্ষিত। বই যে সমাজের উৎপাদনশীলতা বাড়ায় সে সম্পর্কে যুক্তির অবতারনা করার প্রয়োজন পড়ে না। যুক্তি দিয়ে বোঝানোর দরকার পড়ে না যে বই একটি অদক্ষ শ্রমশক্তিকে দক্ষ শ্রমশক্তিতে পরিণত করে।… যিনি পাঠ গ্রহণে সক্ষম তিনি তো বটেই, যিনি পাঠ শ্রবণের সুযোগ পান তিনিও এ সাহায্য লাভ করতে পারেন।' (বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প, ইউপিএল ১৯৯৩)

১৯৯১-এর শাহাবুদ্দিন আহমদ তত্তাবধায়ক সরকার ২৯টি টাস্ক ফোর্স গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাত নিয়ে চারখন্ডের টাস্ক ফোর্স প্রতিবেদন প্রকাশের আয়োজন করেছিল। নিজেদের গুদামের রদ্দিমাল সরকারকে গছিয়ে দেবার মতো প্রকাশকের অভাব না থাকলেও টাস্ক ফোর্সের গুরুত্বপূর্ণ চারখন্ড গ্রন্থ যত্ন নিয়ে প্রকাশ করার সক্ষমতা মহিউদ্দিন আহমেদ ছাড়া অন্য কারো ছিল না। এটি গত শতকের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা। নতুন সরকার অধিষ্ঠিত হলে অধ্যাপক রেহমান সোবহানের নেতৃত্বে টাস্ক ফোর্সের সদস্যরা একটি সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চারখন্ড গ্রন্থ সরকার প্রধানের হাতে তুলে দেন। কর্মসূত্রে আমি ছিলাম সেই অনুষ্ঠানের আয়োজকদের একজন। অনুষ্ঠান শেষে মহিউদ্দিন ভাই আমাকে বললেন, রাজনীতিবিদরা এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা কদাচিৎ বই পড়ে থাকেন- কিন্তু যারা সত্যিই বই পড়েন, কিছু বই কিনে অন্তত তাদের তো দান খয়রাত করতে পারেন।
যারা মহিউদ্দিন ভাইয়ের সান্নিধ্য পেয়েছেন তারা জানেন কেবল প্রকাশনা নয়, কেবল শিল্প-সাহিত্য নয়, কেবল ইতিহাস নয়, সমকালীন রাজনৈতিক বিষয়েও তিনি ছিলেন একটি চলমান বিশ্বকোষ। কেবল ইংরেজি বই নয়, বাংলা ভাষারও কিছু স্মরণীয় বই ছেপেছে ইউপিএল।

পাদটীকা-১
বিখ্যাত প্রকাশক আলফ্রেড নফ-এর দু'খন্ডের 'পোর্ট্রটে অব অ্যা পাবলিশার' দেখার সুযোগ হয়েছে (দাম বেশি, কিনতে পারিনি)। আজ মনে হচ্ছে মহিউদ্দিন আহমেদকে নিয়ে কি এমন একটি প্রকাশনা হতে পারে না? এটা তার প্রাপ্য। এমন আর একজন মহিউদ্দিন আহমেদ পাবার সম্ভাবনা খুবই কম।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক