শহীদুল জহির: আত্মার মানচিত্রনির্মাতা

ধ্রুব সাদিক
Published : 23 March 2022, 03:38 PM
Updated : 23 March 2022, 03:38 PM

প্রাণপ্রকৃতির অনন্তলোকবাস নেয়ার বিষয়টি ভাবনায় আসলে এক বোধের সম্মুখীন হতে হয়। ভাবনায় আসে, দেখতে-না-দেখতেই তো মানুষের জীবনের আয়ু ফুরিয়ে যায়, এই ব্যাপারে ভাবনা-চিন্তা করার ফুরসত কি মানুষের মেলে! মৃত্যুচিন্তা শহীদুল জহিরের মধ্যে ব্যাপকভাবে কাজ করতো। চীনা কবি সিমা ছিয়েনের মৃত্যুর উপলব্ধি তাঁর আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু গ্রন্থটিতে বিধৃত করা থেকে আমরা তা অনুধাবনও করি। সিমা ছিয়েন বলেছিলেন: মানুষের মৃত্যু অনিবার্য কিন্তু তার তাৎপর্য হবে থাই পাহাড়ের চেয়ে ভারী অথবা বেলে হাঁসের পালকের চেয়েও হালকা।

সাহিত্যের দুনিয়ায় বিরলদের একজন শহীদুল জহির। নক্ষত্রের মত পুড়ে ছাই হয়ে, ছাইগুলোকে জমিয়ে পাথর করে, নক্ষত্র-পোড়া ছাইয়ের পাথর থেকে তাঁর জন্ম হয় বারবার। তিনি বারবার জন্মলাভ করেন মানুষের হৃদয়ের গভীর তলদেশ ঘুরে ঘুরে সন্ধান করে স্বপ্নের পাখিটিকে ধরার নিমিত্তে। পাশাপাশি, তিনি মানুষের অনাবাদি, ঊষর, বন্ধ্যা হৃদয়-জমিনে সংবেদনশীলতা জাগিয়ে তোলার মহৎ কাজটিও করে থাকেন।

শহীদুল জহিরের সাহিত্যকর্মের সাথে পরিচিত পাঠকমাত্রই জ্ঞাত শহীদুল জহির তাঁর গল্প-উপন্যাসে জাদুবাস্তবতা ব্যাপারটি সচেতনভাবে প্রয়োগ করেছেন। আহমাদ মোস্তফা কামালের সাথে এক সাক্ষাৎকারে অকপটে বলেছেন, জাদুবাস্তবতার ব্যাপারটা তিনি মার্কেসের কাছ থেকে পেয়েছেন। প্রথমত, চিন্তার বা কল্পনার গ্রহণযোগ্যতার পরিধি অনেক বিস্তৃত হতে পারে এবং দ্বিতীয়ত, বর্ণনায় টাইমফ্রেমটাকে ভাঙতে চেয়েছেন বলে জাদুবস্তবতা গ্রহণ করলেও শহীদুল জহিরের কথাসাহিত্যে ইয়োরোপীয় বা লাতিন আমেরিকান জাদুবস্তবতার উপাদান পাওয়া যায়, ব্যাপারটা আসলে ঠিক এমত নয়৷ অতীত খুঁড়ে বর্তমানে নিয়ে এসে ভবিষ্যত চোখের সামনে জ্বাজ্জল্যমান রেখে তিনি দাঁড়িয়ে থাকতেন জাদুবাস্তবতা, পরাবাস্তবতা একাকার করে। বড় আর্টিস্টদের মধ্যে সংশয় থাকা একধরনের নিয়তিই হয়তো। শহীদুল জহিরের সাহিত্যে যার কারণে আমরা হামেশাই প্রচুর সংশয়বাচক শব্দ পেয়ে থাকি। তবে, নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত তিনি নিজে নিতেন না নাকি পাঠককে নিতে দিতে অপারগ, এই ব্যাপারটা ভাবনার দাবি রাখে৷

কল্পনালোকের সহায়তা নিয়ে গল্পলেখকরা গল্প রচনা করে থাকেন। কিন্তু শহীদুল জহির আমাদের আরও গভীর কিছু বিষয় ও বস্তুর সাথে পরিচিত করান। তাঁর গল্প পাঠ করে আমরা আপনা হতে অনুধাবন করতে পারি, গল্প নির্মাণের জন্য কৌশল এবং কল্পনার সহায়তা নেয়ার পাশাপাশি গল্পের উপাদান সংগ্রহের জন্য কতভাবে একজন লেখককে হেঁটে জীবন ফেরি করতে হয়, জীবন খুঁটিয়ে দেখতে হয়। আমাদের পারিপার্শ্বিক জগতকে এমন এক বাস্তবতার মাধ্যমে তিনি প্রতিবিম্বিত করেছেন যা পাঠ করে সেইসব দৃশ্যকল্প, চরিত্র চোখের সামনে ভেসে আসে৷

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপাদানে কত গভীর আনন্দ থাকতে পারে, এই ব্যাপারটি মানুষকে অনুধাবন করতে বলেছেন ম্যাক্সিম গোর্কি। দেখতে পারার মত মগজচোখ থাকলে কতো পথই দেখা হয়ে যায়! দেখতে না-চাওয়ার অনাগ্রহ মানুষকে আসলে আনন্দের সন্ধান দেয় না। সেই যে সন্ধ্যার কালে তুলসীতলায় বউদিদিদের প্রদীপ জ্বালানোর দৃশ্য দেখার অপার্থিব আনন্দ কিংবা অশীতিপর জীর্ণশীর্ণ মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে খোদার প্রতি সমর্পণের জন্য মুয়াজ্জিনের আহবান করার দৃশ্য– এইসব দৃশ্য দেখতে পাওয়ার মত আনন্দ মানুষ কি অনুভব করে! শহীদুল জহির আমাদের এইসব অনুভব বড় সুন্দর করে অনুভব করিয়ে দেন। জীবন সুন্দরভাবে যাপনের ব্যাপার, জীবনের কাছে কখনো কোনো প্রত্যাশা না-করে জীবন পার করতে হয়, শহীদুল জহির আমাদের সেটাই যেন বলেন। তিনি এও অনুভব করিয়ে দেন, যে, জয়ী তো যে-কেউ হতে পারে কিন্তু জয়ের ভীষণ সন্নিকটে পৌঁছে ক'জন পারেন পরাজিত হতে! ক'জনই বা পরাজিত হতে পারার সেই চরম জীবনবোধের সন্ধান পায়! আমার শহীদুল জহির পাঠ জানিয়ে দেয়, তিনি কখনই জয়ী হতে চাননি। তাঁর চরিত্রগুলো বড় ভালবাসে পরাজিত হতে। সন্তানকে আইসক্রিম কিনে দিয়ে রাতের বেলা স্মৃতি আওড়ানো ইব্রাহীম তো পরাজিত মানুষই। অগুনতি শান্তির দূত একসাথে ডানা ঝাপটিয়ে ওড়া শুরু করলে তাদের ডানা ঝাপটানোর শব্দটি বুকের গভীরে যেমন কেমন একধরনের আন্দোলন সৃষ্টি করে, ইব্রাহীমকেও আমরা তো অজান্তেই বুকের গভীরে ভালবেসে ফেলি। অথবা মমতা যখন সিরাজগঞ্জে ইব্রাহীমের শব নিয়ে যায়, আমাদের বুকের ভেতরে কি গগনবিদারী কান্নার রোল পড়ে না! পায়রাদের উড়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে একসাথে অগুনতি পায়রা ওড়ার মুহূর্তটির ধ্বনির প্রতিধ্বনি বুকের গভীরে শোনার চেষ্টা করলে মানুষ নিশ্চয়ই বুকের ভেতর পায়রা ওড়ার শব্দ শুনতে পারবে। সন্ধ্যা নামা-নামা গোধূলির দূর সিন্ধু পাড় না-দেখেও অনুভব করতে পারবে, সোনালী ডানার পাখিরা গান গেয়ে ফেরে। ইব্রাহীমের কথা ভাবনায় আসলে আমার মনে হয় ইব্রাহীম যেন মমতা বা হেলেন বা মমতা, হেলেন উভয়কেই বলে: বলো তুমি, আমার তুমিটা, তুমি কোনোদিন পর হবে না। মমতা ইব্রাহীম কিংবা ইব্রাহীম আর মমতার সম্পর্কটা যেন এমনই। কারো যদি আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু-র গভীর পাঠ থেকে থাকে আর তিনি যদি বেইলি রোড দিয়ে যান, আমার মনে হয় বেইলি রোডে চেয়ে থাকার সময় তার বুকের ভেতর পায়রা উড়তে থাকবে। বুকের ভেতর পায়রা ওড়ানোর এই কঠিন কিন্তু সুন্দর কাজটিই করেছেন আমাদের শহীদুল জহির।

চাঁদের উত্তাপ আছে কি নেই তা আমার জানা নেই। কিন্তু কিছু মানুষ থাকে, যারা দুঃখ পায়, চাঁদের আলোয় পুড়ে বাঁচে। কিছু সরল দুঃখ কত গভীর অনুভূতির জন্ম দিতে পারে, এরকম ব্যাপারগুলোর দারুণ প্রয়োগ করেছেন শহীদুল জহির। শুধু ইব্রাহীমই নয়, চানমিয়ার মতো বান্দরের দুধ খাওয়া পোলার স্রষ্টাও শহীদুল জহির। বড় আনন্দের শিহরণ আসে যখন ভাবি শহীদুল জহিরের মত প্রাণ একদিন পৃথিবীতে এসেছিলেন, পৃথিবীর আলো-আঁধার, বাতাস পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। নশ্বর পৃথিবীতে এসে তাঁর পদচ্ছাপও রেখে গেছেন। তবে দু'জন মানুষ– আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং শহীদুল জহির– এই দু'জন মানুষ ও শিল্পীর সাথে আমার মাঝেমধ্যে দেখা এবং কথা হয়।

অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম বলেছেন, মানুষের মৃত্যুদিন হচ্ছে তাঁর সত্যিকারের জন্মদিন। কারণ জন্ম থেকে শুরু হওয়া সার্কিটটা সম্পূর্ণ হয় মৃত্যুতে এসে। মৃত্যুর পর একজন মানুষের পুরো পোর্ট্রটেটা সামনে দৃশ্যমান হয়, তাই মৃত্যুই তাঁর আসল জন্মদিন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক