স্বদেশ রায়ের একগুচ্ছ কবিতা

স্বদেশ রায়
Published : 20 Oct 2018, 08:56 AM
Updated : 20 Oct 2018, 08:56 AM


রূপান্তর

একটা গুটিপোকা প্রজাপতি হবে বলে গায়ে লালা ঝরিয়েছিলো
সেটা প্রজাপতি হয়েছিলো কিনা জানিনা। দেবী স্নানে যাবার আগে
নগ্ন হয়, তাকে সে নিজে ছাড়া কেউ দেখে কিনা জানিনা।
এমনিভাবে জানিনার হিসাব করলে তার সারি দীর্ঘ হবে –
যেমন দীর্ঘ এই শহরে প্রতারক ও প্রতারিতের সারি।
শহরের অন্ধ গলির সংখ্যা কত কেউ জানে না –
অথচ পুলিশের তাড়া খেয়ে ঠিকই অন্ধ গলিতে আটকে যায়
পকেটমার। এক সময়ের বিপ্লবী আবার এই শহরেরই সব থেকে
আপোষকামী এক মানুষ হয়- সেকি শহরের গুনে না তার নিজের জন্যে?
কোন কোন শহরের পাশে সাগর থাকে, শহর দুহাত বাড়ায় সাগরে
না সাগর দুহাত বাড়ায় শহরের দিকে জানে কি কেউ?
রাতভোর বৃষ্টিতে সাগর ও শহর স্নান করে অথচ কেউ হয় না নগ্ন।
আমি বা দেবী যেই স্নান ঘরে ঢুকি- নগ্ন হই জলের ধারায়।

ডাটাবেজ

গানের সুর বন্ধ হয়ে গেলেও বালি দ্বীপে রাত নামে না কেবলই অন্ধকার হয়।
মানুষেরা এখন আর নিজের মাথার কাছে প্রশ্নের উত্তর খোঁজে না
বালি দ্বীপে বসেও উত্তর খুঁজে ফেরে স্মার্ট ফোনে, এমনকি গভীর রাতে
তার ভিজে শরীরের ছবিটি আসে স্মার্ট ফোনে, একেবারে জলের ফোটা সহ।
তখনও সাগর ডেকে চলে, ডেকে চলে সেই সব নারীদের শরীরে
যাদের শরীর এখনও ছুঁয়ে দেখেনি কেউ, শরীরে যাদের এখনও ফোটেনি ভাষা।
ফীনল্যান্ডে এমন দারিদ্রে সুখী থাকে না কেউ, অনেক ভাতা পায় তারা
তবুও কোন অভাবে তারা ছুটে আসে বালি দ্বীপে, সাগরের জলে ভেজায় শরীর!
বিশ্বজয়ীকে যে কম্পিউটার প্রোগ্রাম হারিয়ে দিয়েছে দাবার ছকে
সেও কি দিতে পারবে উত্তর, কীসের অভাব তাদের- নাকি কেবলই তীব্র শীত থেকে উষ্ণতায় আসা?
মানুষ আসলে কখন উষ্ণ হয়, কত রাতে ফেরে উষ্ণ মানুষ আপন ঘরে।
শীতের বেড়ালরা আরো বেশি উষ্ণতা খোঁজে নরম বিছানায় –
সাইবেরিয়ার সিংহ উষ্ণতা খোঁজে কি কেবলই বরফে জড়িয়ে শরীর?
বালি দ্বীপে একাকি আমি শুয়ে আছি, আমাকে নাম ধরে ডেকো না কেউ-
আমার নামটা অন্তত বাদ থাকুক আজ রাতে কম্পিউটারের একক ডাটা বেজ থেকে।
কখনও কখনও একটি রাত মানুষের অনেক একক সম্পদ।

চাঁদ ভেসে যাবার পরে

গুগলে সার্চ দিলে কেবলই বর্তমান পাওয়া যায়, ভবিষ্যত নয়।
রেশমী নাম ওর, গার্মেন্টস গার্ল, হেটে যায় কাজে, জানেনা আমেরিকার কারখানায় রোবট তৈরি হচ্ছে।
রাজপথে ভবিষ্যতে দাবী উঠবে কি -'রোবট আমদানী নিষিদ্ধ করো'।
সে মিছিলের পাশে গাছে বসে কোন পেঁচা বলবে কি- বুড়ি চাঁদ গেছে বেনোজলে ভেসে-
এখন রেশমী ও রোবট হাত ধরে বন্ধু হয়ে যাক দুজনার ।
পেঁচার কথা শুনে রাজপথ থেকে মিছিল উঠে যাবে কি?
বন্দরে বন্দরে তখন ভীড়বে জাহাজ রোবটের কঙ্কাল নিয়ে –
সেই সব কঙ্কালে প্রান সঞ্চার হবে, কাজে নেমে যাবে তারা রেশমীর পাশে-
তাদের প্রাণ ওঠা নামা করবে কাজের ছন্দ ও তালে।
রেশমী বুকের মাঝে যে প্রেম আছে, শরীরে যে খেলা আছে
সে সব তখন অবিকল থাকবে কি চাঁদ ডুবে যাওয়া রাতে?

উচ্চারণ

এক
শাদা শার্টটিতে দাগ লাগালো।
লন্ড্রীতে পাঠিয়ে দেবার পরে
আবার শাদা হয়ে এলো।

দুই
আমার কথায় বিশ্বাস রাখো
আমি বিশ্বাস ভাঙ্গিনা।
বিশ্বাস ভাঙ্গলেও
জীবন ভাঙ্গেনা।

তিন
সতীচ্ছদ ছিড়েছে মেয়ে
চোখের জল ফেলো না।
সতীচ্ছদ ছিড়লেও
সতীত্ব যায় না।

চার
তোমার স্বামীকে বলো
আমি তোমার বন্ধু ছিলাম।
তোমার স্ত্রীকে বলো
আমিও তোমার বন্ধু ছিলাম।

পাঁচ
সূর্যোদয়ে ও সূর্যাস্তে
সূর্য লাল হয়।
শৈশব ও বার্ধক্যে
সরলতা বাস করে।

নীরব ঠোঁট

সব কিছু ছেড়েছি, এবার কেবল তোমার নীরব ঠোঁটে রাখব ঠোঁট।
সামনে সীমাহীন সমুদ্র, শাদা ঢেউয়ের মাথায় শাদা ফেনা-
দৃষ্টি স্থির হবে কোন এক সমুদ্র সফেনে।
স্থির দৃষ্টি দিগন্তরেখা এক, যে দেখে কিনা কেউ জানেনা-
তাকে দেখতে গেলে কেবলই এগুতে হয়, এগুতে হয়।
বালকই কেবল এগুতে পারে, সেই এগিয়ে যাক-
সমুদ্র চড়ায় হোক কেবল এ মধুর আলিঙ্গন, তারপর
সমুদ্র ফেনারা বন্ধু হোক, আত্মীয় হোক, হোক আরো অনেক কিছু
এক হয়ে যাক শরীর সমুদ্র সফেনের নরম শরীরের গভীরে।
তারপর কেবলই রাত নামুক, কালো রাত আর সমুদ্রের
ঢেউয়ের সঙ্গীত- অন্তত আকাশের নীচে, অনেক অনেক সমারোহ।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক