উমবের্তো একো’রদ্য নেইম অব দ্য রোজউপন্যাস যথা মহাকালিক আয়োজন

hossain_m
Published : 8 Nov 2007, 05:30 AM
Updated : 8 Nov 2007, 05:30 AM

[উমবের্তো একোর সেলিব্রেটেড উপন্যাস দ্য নেইম অব দ্য রোজ, উইলিয়াম উইভার এর ইংরেজী অনুবাদ বের হবার আগেই হই চই শুরু হয়ে যায়। অনেকে উপন্যাসটি পড়ার অসুবিধাগুলো তুলে ধরে। পাঠকদের সামাল দিতে উমবের্তো বইটির পৌস্টস্ক্রিপ্ট হিসেবে লেখেন অরেকটি চটি বই। বইটির ইংরেজী নাম রিফ্লেকশন অন দ্য নেইম অব দ্য রোজ। বইটিতে কীভাবে মূল উপন্যাসটি লেখা হয়েছে, বইটি কী ভাবে পড়তে হবে তার বয়ান ইত্যাদি দেয়া হয়েছে। ইংরেজী লেখাটি বাংলা ভাষায় পাঠ উপযোগী করা হয়েছে।]


আমি বোঝাতে চাই আপনি যখন গল্প বলবেন সবার আগে অবশ্যই একটা জগত তৈরি করবেন, যতটুকু সম্ভব সেটাকে সাজাবেন, একেবারে ন্যূনতম ডিটেইলস্ পর্যন্ত। যদি আমি একটা নদী তৈরি করি, আমার দরকার দু' ধার বা তীর, যদি আমি বাম ধারটায় একটা জেলে দাঁড় করিয়ে দেই, এবং সেই জেলের চরিত্রটা রাগী বানিয়ে দেই যার কি-না আবার নাম রয়েছে পুলিশের খাতায়, তারপর আমি লিখতে শুরু করতে পারি, শব্দে অনূদিত করতে পারি অপরিহার্য ভাবে যা ঘটতে চলেছে তার সবকিছু।

একজন জেলে কী করে? সে মাছ ধরে (সাথে আরও অনেক কাজ করে যা কমবেশী আবশ্যক করণীয়)। এবং তারপর কী ঘটে? মাছ হয়তো এসে আদার খায় কিম্বা খায় না। যদি খায় তাহলে জেলে মাছ ধরে আনন্দে বাড়ি ফিরে যায়। গল্প খতম। যদি কোনো মাছ না পাওয়া যায়, এবং সে যেহেতু রাগী প্রকৃতির লোক সম্ভবত সে খেপে উঠবে। হয়তো তার মাছ ধরার ছিপটা ভেঙে ফেলবে। এখানেই শেষ না, এখনও এটা স্কেচের পর্যায়ে রয়েছে। ইন্ডিয়ান একটা প্রবাদ আছে 'নদীর ধারে বসে থাকো এবং অপেক্ষা করো: দেখবে কিছু বাদে তোমার শক্রর লাশ ভেসে যাচ্ছে।' এবং যদি একটা লাশ স্রোতে ভেসে যায় – যেহেতু নদীর মতো একটা ইন্টারটেক্স্চুয়াল জায়গায় এর সম্ভাবনা স্বাভাবিক? আমাদের এটাও মনে রাখার দরকার আছে যে জেলেটির পুলিশের খাতায় নাম রয়েছে। সে কি ঝামেলার ঝুঁকি নেবে? সে করবেটা কী? সে কি পালাবে, ভান করবে যেন সে মড়াটারে দেখে নাই? সে কি নিজেকে অসহায় মনে করবে, কারণ সব সত্ত্বেও এটা সে ব্যক্তির লাশ যাকে সে ঘৃণা করে? রগচটা লোক সে, সে কি রেগে বারুদ হয়ে যাবে কারণ সে ব্যক্তিগত ভাবে তার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে পারছে না এই ভেবে?

আপনি দেখলেন যেইমাত্র আপনার জগতটা আবিষ্কার করে সামান্য সাজালেন ততক্ষণে গল্প শুরু হয়ে গেছে। স্টাইলও ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে, কারণ জেলে যে মাছ ধরছিলো সে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে ধীর, নদীজ বেগ (ফ্লুভিআল), তার অপেক্ষার ওঠানামা, সে হয়তো ধৈর্যশীল কিন্তু তার রাগী স্বভাবের জন্য অস্থিরও বটে। জগত তৈরিতে সমস্যা হলো: বলতে গেলে শব্দ তার নিজের মতো করেই আসে। Rem tene, verba sequentur: বিষয়টা কব্জা করুন, শব্দ তার পিছু নেবে। যা, আমার ধারণায় কবিতার বেলায় ঠিক তার উল্টোটা ঘটে, সে ক্ষেত্রে Verba tene, res sequentur: শব্দটা কব্জা করেন, বিষয় তার পিছু নেবে।


উমবের্তো একো

আমার উপন্যাস লেখার প্রথম বছরে কাজ হলো আমার জগত তৈরিতে মনোনিবেশ করা। মধ্যযুগীয় লাইব্রেরিতে যে সব বই পাওয়া যায় তার একটা দীর্ঘ রেজিস্টার তৈরি করা। বিভিন্ন চরিত্রের নাম, তাদের ব্যক্তিগত তথ্যাদি লিপিবদ্ধ করা, যাদের গল্প থেকে বাদ দেবো তাদেরও। অন্যভাবে বললে, সেই সব অবশিষ্ট মংকদের নাম আমি জানতে চাই যাদের পরে বইয়ের কোথাও আর দেখা যাবে না। পাঠকের জানার তেমন প্রয়োজন নেই, কিন্তু আমার জানার দরকার আছে।

কে জানি বলেছিলো উপন্যাস যেন শহরের ডিরেক্টরির সাথে পাল্লা দিতে পারে? তা যেন প্ল্যানিং বোর্ডের সাথেও পাল্লা দিতে পারে। তাই আমি ফোটোগ্রাফস নিয়ে পড়ি, ফ্লোর প্ল্যান এবং স্থাপত্যের উপর আর্কিটেকচারের এনসাইক্লোপেডিয়ায় লম্বা অনুসন্ধান করি, অ্যাবির ধরনটা কী হবে তা ঠিক করি, তার দূরত্ব, এমনকি ঘোরানো সিঁড়িতে কয়টা সিঁড়ি থাকবে তাও ঠিকঠাক করে রাখি। চিত্রপরিচালক মার্কো ফেরেরি আমাকে একবার বলেছিলো আমার সংলাপগুলো মুভির মতো কারণ তা ঠিক মাপা সময় পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তাই হতে হয়। যখন আমার দুটো চরিত্র খাবারঘর (রিফ্যাক্টরি) থেকে আশ্রমের আচ্ছাদিত উদ্যানপথ (ক্লয়ইজ্টার) দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলে, তখন আমার চোখের সামনে এমন একটা প্ল্যান থাকে এবং আমি এমন ভাবে লিখি যেন, তারা যখন তাদের গন্তব্যে পৌঁছে তখনই তাদের কথা বলা শেষ হয়ে যায়।

উদ্ভাবন যদি স্বচ্ছন্দে করতে হয় তাহলে সেক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা তৈরির দরকার আছে। কবিতায় সেই বাধাগুলো হতে পারে তার মাত্রা, পদ এবং অন্ত্যমিল, যার কারণে বলতে শোনা যায় 'কানের মতো করে পদ্য' (দেখুন চার্লস ওলসন, 'প্রোজেক্টিভ ভার্স' [Projective Verse (1950) by Charles Olson] পোয়েট্রি নিউ ইয়র্ক ৩ {১৯৫০])। উপন্যাসে, তার আশেপাশের জগতটা সেই বাধাটা তৈরি করে। এর সাথে রিয়ালিজমের কোনো কারবার নেই (যদিও এটাকেই রিয়ালিজম বলে ব্যাখ্যা দেয়া হয়)।

সম্পূর্ণ একটি অবাস্তব জগত বানানো যেতে পারে, যেখানে গাধা উড়ে যায় কিম্বা রাজকুমারীকে চুমো দিলে সে তার জীবন ফিরে পায়, কিন্তু সেই ভুবন, সম্পূর্ণভাবেই সম্ভব এবং অবাস্তবভাবে, অবশ্যই তার অবস্থান সম্ভব যদি শুরুতে বলা সংজ্ঞানুযায়ী তার গড়নটা বানানো যায় (আমাদের জানতে হবে এটা কি সেই জগত যেখানে একমাত্র রাজকুমার এসে চুমু দিলেই রাজকুমারী জীবন ফিরে পাবে, নাকি সেই ডাইনি দিলেও হবে, নাকি রাজকুমারীর চুম্বনে ব্যাঙ রূপান্তরিত হবে রাজকুমারে অথবা আরও, উদাহরণ হিসেবে, আর্মাডিলস)।

আমাদের জগতের একটা উপাদান হচ্ছে ইতিহাস, যার কারণে আমি মধ্যযুগের ক্রনিকালসগুলো পড়েছি এবং বার বার পড়েছি, আর আমি যখনই পড়েছি তখনই আমি বুঝতে পেরেছি যে কী কী আমার উপন্যাসে অন্তর্ভুক্ত হবে, প্রথমদিকে যা কিনা আমার মাথায় একবারও খেলেনি, যেমন ধরুন দারিদ্র নিয়ে বির্তকগুলো, এবং ফ্র্যাটিসিলিদের প্রতি গির্জাগুলোর গুণ্ডামি নিয়ে।


দ্য নেইম অব দ্য রোজ ছবির দৃশ্য

যেমন ধরুন: কেন আমার বইয়ে চৌদ্দ শতকের ফ্র্যাটিসিলি নিয়ে বলা হয়েছে? যদি আমি মধ্যযুগের গল্পই বলি তাহলে তো আমার বারো বা তেরো শতক বেছে নেয়াটা উচিত ছিলো কারণ সেটা আমি চৌদ্দশতকের চেয়ে ঢের ভালো জানি। কিন্তু আমি তো চাই একজন ইনভেস্টিগেটর, সম্ভব হলে একজন ইংরাজ (ইন্টারটেক্সচুয়াল কোটেশন), যার রয়েছে পর্যবেক্ষণের মহাবিদ্যাটুকু, এবং প্রমাণকে ব্যাখ্যা করার মতো বিশেষ স্পর্শকাতরতা। এই গুণাবলীগুলো কেবলমাত্র ফ্রান্সিস্কানদের মধ্যে পাওয়া যেতে পারে, এবং কেবল মাত্র রজার বেকনের পরে; কিংবা আরও পরে, আমরা সংকেতের পরিণত থিয়োরিগুলো পাই ওকামাইটসের মধ্যে, কিম্বা হতে পারে তার আগেও হয়তো তার অস্তিত্ব ছিল। কেবল বেকন এবং ওকামের এ দুজনের জানা ছিল মানুষ সংকেত ব্যবহার করে জ্ঞান আয়ত্ত করে। তাই আমাকে চৌদ্দ শতকেই আমার গল্পটা সাজাতে হয় – আমার বিরক্তির জন্য যথেষ্ট ছিলো কারণ আমি সেই পিরিয়াডে খুব সহজে বিচরণ করতে পারবো না। আরও পাঠের জের ধরে এটা আবিষ্কার করি যে চৌদ্দ শতকের ফ্রান্সিসকানরা, এমন কি ইংরেজম্যানরাও কোনোভাবেই দারিদ্রের বিতর্ককে এড়িয়ে যেতে পারে নাই, বিশেষ করে সে যদি ওকামের বন্ধু, উম্মত বা পরিচিত হয়ে থাকে। (আমার শুরুতেই যোগ করা উচিত ছিলো ইনভেস্টিগেটরটি ওকামের নিজেরই হওয়ার কথা ছিলো, কিন্তু সে আইডিয়াটা আমি বাদ দেই, কারণ সম্মানীয় ইনসেপ্‌ট্‌র, মানুষ হিসেবে তেমন খুব আকর্ষণীয় বলে মনে হয়নি)।

কিন্তু সবকিছু ১৩২৭-এর নভেম্বরের শেষে ঘটলো কেন? কারণ ডিসেম্বরের মধ্যে সেসিনার মিখাইল আভিগ্ননে চলে এসেছেন। (ঐতিহাসিক উপন্যাসের জগত সাজাতে আমি যা বোঝাতে চেয়েছিলাম: কিছু কিছু উপাদান, যেমন সিঁড়ির সংখ্যা, লেখক ঠিক করে রাখতে পারেন, অথবা অন্যরাও পারেন, কিন্তু যেমন মিখাইলের পদচারণা বাস্তব জগতের উপর নির্ভরশীল, যা কি-না এই ধরনের উপন্যাসে, গল্পের সম্ভাব্য জগতের সাথে মিলে যেতে পারে)।

তাই বলে নভেম্বর মাস অনেক আগে হয়ে যায় না। আবার আমাকে শূকর জবাইও দেখাতে হবে। কারণ? উত্তর খুবই সহজ: যাতে মড়াগুলো মাথা নত করে রক্তের জারে ঠেলে ঢুকিয়ে দেয়া যায়। এবং আমার এসবের দরকারটা কোনখানে? কারণ অ্যাপোকেলিপস্-এর দ্বিতীয় ঘোষণা বলছে… আমি অ্যাপোকেলিপস্ পাল্টাতে পারবো না, সর্বোপরি এটা জগতের একটা অংশ। এখন, শূকর (আমি এ নিয়েও অনুসন্ধান চালিয়েছি) জবাই করা হয় না যতক্ষণ না শীত শুরু হয়, সেক্ষেত্রে নভেম্বর খুবই তাড়াতাড়ি হয়ে যায়।–যদি না আমি অ্যাবিকে পর্বতের কাছে নিয়ে যাই যেখানে হয়তো তুষার পড়া শুরু করেছে। তা নাহলে আমার গল্পটা পম্পপোসা বা কঙ্কাসের সমতলভূমিতে নিয়ে যেতে হয়।

নির্মিত জগতটি এরপর আমাদের বলবে গল্প কীভাবে এগুবে। প্রত্যেকে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছে কেন আমার যর্জ-এর নাম বোর্হেসের কথা মনে আনে, এবং বোর্হেস কেন এত পাজি ধরনের, কিন্তু আমি তাদের বলতে পারি না। আমি চেয়েছিলাম একটা অন্ধ মানুষ যে লাইব্রেরি পাহারা দেবে (ভালো ন্যারেটিভ আইডিয়া বলে মনে হয়েছে আমার কাছে), এবং লাইব্রেরি প্লাস অন্ধ মানুষ কেবল মাত্র বোর্হেসের সমান হতে পারে, এছাড়া ঋণও তো পরিশোধ করতে হবে। সাথে স্প্যানিশ মতামত এবং ব্যাখ্যা থেকে আরও জানা যায় যে অ্যাপোকেলিপ্‌স পুরো মধ্যযুগের উপর প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু আমি যখন যর্জকে লাইব্রেরিতে আনি তখনও জানতাম না যে… সে নিজের মতো করেই কাজ করেছে, কথাও বলছে তেমন করে। এবং এটাকে খুব 'আইডিয়ালিস্টিক' অবস্থা বলে বিবেচনা করা উচিত না, যদিও আমি বলেছি চরিত্রের আছে স্বাধীন জীবন এবং লেখক, একটা মোহগ্রস্ত অবস্থায় তাদেরকে এমন ভাবে তৈরি করে যেন মনে হতে পারে চরিত্ররাই তাকে পরিচালিত করছে। এ ধরনে ছাগলের মতো কথা টার্ম পেপারে লেখা চলে। সত্যিটা হচ্ছে চরিত্ররা যে জগতে বেড়ে ওঠে সেখানকার নিয়মকানুনই মেনে চলে। অন্য ভাবে বললে ন্যারেটর তার নিজের জগতে বন্দি থাকে।

আরেকটা মজার গল্প হচ্ছে ল্যাবিরিন্থ নিয়ে। আমি যতগুলো ল্যাবেরিন্থ-এর কথা শুনেছি–হাতের কাছে সান্তারক্যানগেলীসের চমৎকার পাঠও রয়েছে–সবগুলো ল্যাবিরিন্থই আউটডোরের। সে সব হতে পারে খুবই চূড়ান্ত রকমের জটিল এবং প্যাচের। কিন্তু আমার দরকার ইনডোর ল্যাবিরিন্থ (আপনি কি কখনো উন্মুক্ত লাইব্রেরি দেখেছেন), এবং সেটা যদি মেলা রকমের জটিল, হাজারটা দরদালান, ভেতরকার রুম হয়, যেখানে যথেষ্ট বাতাস ঘুরপাক না খায়, অন্যদিকে আগুনের খাদ্যের জন্য বাতাসের ঘুরপাক খুবই জরুরী। (এটা সত্যি যে অ্যাডিসিয়াম শেষ পযর্ন্ত পোড়ানো হবে, আমার কাছে যথেষ্ট পরিষ্কার ছিলো, এমনকি মহজাগতিক-ঐতিহাসিক কারণেও: মধ্যযুগে ক্যাথিড্রাল এবং কনভেন্টগুলো অতিদাহ্য বস্তুর মতো পুড়েছে; মধ্যযুগীয় কোনো গল্পে আগুনের কারবার নেই এমনটি কল্পনা করা মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোনো চলচ্চিত্রে,প্যাসিফিকে গুলি খেয়ে জলন্ত যুদ্ধবিমানের নেমে আসার কোনো দৃশ্য নেই এমনটি কল্পনা করা।) তারপর মাস দুই-তিনেক ধরে একটা লাগসই ল্যাবিরিন্থ তৈরি করে, সাথে আরও বেশ কিছু ফাঁকফোকর রেখে, যাতে যথেষ্ট পরিমাণে বাতাসের চলাচল সম্পূর্ণ ভাবে নিশ্চিত করা যায় এভাবে উপন্যাস শেষ করি।
১১/৮/২০০৭
Mofazzal.Hossain@merivale.com

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক