শামস আল মমীনের কবিতা: ভিন্ন স্বরের, ভিন্ন কাব্য-ভাষার ছবি

আবেদীন কাদের
Published : 15 April 2022, 06:59 AM
Updated : 15 April 2022, 06:59 AM


১ .
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের কবিতায় কিছু নতুন ঝোঁক এবং বাঁকবদল লক্ষ করা যায় যা পঞ্চাশ বা চল্লিশের কবিতা থেকে আলাদা। ষাটের দশকের কবিতা প্রথম এমন কিছু উপাদান এবং ভাষা কবিতায় নিয়ে আসেন যা পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম দিককার কবিতা থেকে আলাদা। এটা বিশেষভাবে শুরু হয়েছিল পঞ্চাশের মাঝামাঝি শামসুর রাহমান এবং আরও দুয়েকজনের হাতে। তাঁরা তিরিশের কবিদের কাব্যভাষা এবং কাব্য-আদর্শের কাছাকাছি ছিলেন। যে অপরিহরনীয় ভবিতব্য একান্তভাবে মানুষেরই, ইউরোপীয় শিল্প-বিপ্লবের পর ব্যক্তি তাকে অনাবৃত, নিরালঙ্কার তীব্রতায় অনুভব করছে আপন এক অনাবিষ্কৃত জগতে। নিঃসঙ্গতাই সেই অমোচনীয় নিয়তি। কিন্তু নিঃসঙ্গতার সঙ্গে আরও কিছু বিষয় কবিতার অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন ঋতুর দিক থেকে দুই বিশ্বযুদ্ধ মধ্যবর্তী, ভাবের দিক থেকে রবীন্দ্র-প্রভাবমুক্ত। নতুন সুর-সন্ধানী, নগরকেন্দ্রিক যান্ত্রিক অভিঘাত দ্বারা সমাচ্ছন্ন। ক্লান্তি ও নৈরাশ্যবোধে আক্রান্ত। আত্মবিরোধ, শঙ্কা এবং একাধিক সংস্কৃতি থেকে বিরামহীন গ্রহণ। ফ্রয়েড ও অন্যান্য ইউরোপীয় দর্শন, মনোবিজ্ঞান এবং পদার্থবিজ্ঞানের সর্বশেষ আবিষ্কারের তির্যক প্রভাব এবং বিজ্ঞানের চলমান বিতর্কে কবিতায় স্থান দেয়ার ঝোঁক। এছাড়া মার্কসীয় দর্শন কবিতাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। এসব গেল বিষয়ের দিক থেকে নতুন কিছু, কিন্তু শৈলী এবং প্রকরণের দিক থেকেও বড় রকমের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।

আধুনিক কবিতা পাঠকদের যেমন আকর্ষণ করে তেমনি দূরেও ঠেলে দেয়। এর দুরূহতা এবং দুর্বোধ্যতা নিয়ে প্রচুর অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু আধুনিক কবিতা দুরূহ হলেও দুর্বোধ্য নয়। এবিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবি কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছেন তার মধ্যে অন্যতম হল, পাঠককে কিছু পরিশ্রমী হতে হয়, কারণ আধুনিক বিজ্ঞান এবং মনস্তত্ত্বের অনেক অনুষঙ্গ আধুনিক কবিতায় এসেছে যে সম্পর্কে পাঠককে কবিতা সম্পূর্ণ বুঝতে আগে জেনে নিতে হয়। সেক্ষেত্রে পরিশ্রমটার প্রয়োজন। গত পঞ্চাশ বছরে আধুনিক কবিতায় আঙ্গিকের দ্রুত পরিবর্তনে এবং প্রকাশ ভঙ্গির নতুন নতুন রীতিতে অনেক পাঠক শঙ্কিত হন এবং কবিতা পাঠ করাতে কিছুটা অনীহা আসে। প্রত্যেক যুগেই মৌলিক সৃষ্টি বা সৃজনের নতুন ধারা সাধারণ পাঠকের কাছে কিছুটা অদ্ভুত মনে হতে পারে, আর শিল্পকলায় সেটা একটু বেশি হয়। আধুনিক জীবন এবং আধুনিক কবিতার মত একটি একেবারে জটিল বিষয়ের ক্ষেত্রে তা একটু বেশি হয়। অধিকাংশ উৎকৃষ্ট সৃষ্টি সহৃদয়হৃদয়সংবাদী পাঠক সৃষ্টিতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। লে হান্ট বিশিষ্ট ইংরেজ কবি উইলিয়াম ব্লেককে উন্মাদ আখ্যা দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর ধারনা ছিল তাঁকে পাগলা গারদে রাখা হয় না কারণ তিনি উদ্দাম নন। আদ্রে জিদ প্রুস্তের লেখা বাতিল করেছিলেন। বাঙালি কবিদের মধ্যে প্রথম দুর্বোধ্যতার অভিযোগ আসে মাইকেল ও রবীন্দ্রনাথের কবিতা বিষয়ে। তিরিশের এক প্রতিভাবান বাঙালি কবিকে আঁতুড় নুন খাইয়ে মারা উচিৎ ছিল বলে জানিয়েছিলেন এক ক্রুদ্ধ পাঠক। তবে ফরাসী কবি আরতুর রেবো তাঁর মাকে এক ক্রুদ্ধ প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন, যা মেধাবী তরুণ কবিদের জন্য শিক্ষণীয়। রেবোর মা তাঁর লেখা পড়ে লিখেছিলেন, 'এর মানে কী!' উত্তরে রেবো জানিয়েছিলেন, 'এর অর্থ ঠিক তাই যা এ বলেছে।' সব কাল বা যুগেই কিছু জটিল জীবনের অনুষঙ্গ দেখা যায় যা সেকালের কবিতা এড়াতে পারে না। তবে আধুনিক জীবন ভীষণ জটিল, আর সেই জটিলতা শিল্পে ছায়া ফেলে। তাই দুরূহতা কালেরই ছবি। আর তা কবিতায় বা অন্যান্য শিল্পে রয়েছেই।

কবিরা অন্তর্দৃষ্টি বা রহস্যের আশ্রয় নেন ভাষায় বা চিত্রকল্পে, তারও একাধিক কারণ রয়েছে। চারপাশের জগৎ বিষয়ে সৃষ্টিশীল মনের চৈতন্য ভাষায় প্রকাশের জন্য কেউ কেউ রহস্যের আশ্রয় নেন, কিন্তু সেই রহস্য কখনও কখনও সৃজনকারীর জন্য পলায়নপর প্রকৃতির ছবিও হতে পারে। যতই তাঁর অন্তর্গত চৈতন্য তীব্র হয়ে ওঠে, ততোই তিনি বেশি ধূসরতা বা ছায়াচ্ছন্নতার আশ্রয় নেন, তাঁর শৈলীতে প্রতীকের আধিক্য দেখা দেয়। তাই জোলা বা লাফরগের চেয়ে রেবো বেশি দুরূহ। এলিয়ট তাকেই আখ্যা দেন প্রথাগত মূল্যবোধ ত্যাগ করে ঐতিহ্যের সঙ্গে হারানো যোগ খুঁজে ফিরে পাওয়ার জন্য। সেখানেই আসে কালের বা যুগমানসের সঙ্গে ব্যক্তিমানসের এক অনিবার্য দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বই দীর্ণ করে সৃজনকারীকে ও তাঁর অন্তর্গত চেতনাকে। আর তখনই অধিকতর দুরূহ হয়ে ওঠে শিল্প!

শিল্পবিপ্লবের পর তার আগের কালের মূল্যবোধগুলো ভেঙ্গে গেল। শুধু ভেঙ্গেই গেল না, বরং একটা প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি হল। এটা প্রকটভাবে লক্ষ করা গিয়েছিল দুই বিশ্বযুদ্ধের অন্তর্বর্তী সময়ের ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কবিতায়। একজন বাঙালি কবি অমিয় চক্রবর্তী তাঁর অক্সফোর্ডের ডিফিল উপাধি নিতে যে অভিসন্দর্ভ লিখেছেন সেখানে বিষয়টি, দুই যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ের ইংরেজি কবিতার চারিত্র এবং ঝোঁক উল্লেখ করে বিশ্লেষণ করেছেন।

রবীন্দ্রনাথের কাব্যরীতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তিরিশের অন্য কবিরাও তাঁদের মূল্যবোধ ও ইতিহাসচেতনার আমূল বদলে ফেলেছিলেন। কিন্তু পূর্ববঙের কবিতায় সেটা এসেছিল একটু দেরীতে। পাকিস্তান আন্দোলন পূর্ববঙ্গের মুসলিম কবিদের চিন্তায় কিছুটা ঢেউ তুলেছিল, কিন্তু ষাটের কবিরা ফিরে গেলেন একেবারে ধর্ম চেতনার বাইরে, কিছুটা তিরিশ এবং ইউরোপীয় প্রতীকীবাদ বা আরেকটু এগোনো শিল্পচৈতন্য দ্বারা ঘোর-আশ্রিত হয়ে। তবে বলা হয় সেসময়ের রাজনীতি, ধর্মনিরপেক্ষ সমাজচিন্তা কবিদের ভাবিয়েছে। বিশেষ করে তিরিশ ও চল্লিশের কবিরা আমাদের ষাটের কবিদের অনেকখানি প্রভাবিত করেছিলেন, বিশেষ করে কাব্যশৈলী এবং কাব্যভাষার দিক থেকে। শামসুর রাহমান বা আরও দুয়েকজন শুরু করলেও ষাটের কবিরাই প্রথম জীবনের জটিল কিছু বিষয় নিয়ে আধুনিকতাবাদের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত কবিতা লেখা শুরু করেন। রোমান্টিক শিল্প আন্দোলনের পর শিল্পে আধুনিকতাবাদ' এক ধরণের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আসে। কবিতায় এর প্রতিফলন হয় শব্দ কীভাবে গুরুত্ব পালন করবে তা বলে দেয়। যেমন মালারমের সেই বিখ্যাত উক্তি, 'শব্দ দিয়েই কবিতা লেখা হয়, আইডিয়া বা ভাব দিয়ে নয়'। 'শব্দ' বলতে আধুনিকতাবাদ আন্দোলনের শিল্পীরা অক্ষর বোঝাননি, বুঝিয়েছেন শব্দের কিঙ্কন বা ঝঙ্কারকে। তাঁরা বলতে চেয়েছেন কবিরা শব্দের ভাস্কর্য নির্মাণ করবেন কবিতার, শব্দের অর্থ প্রচারকারী নন কবিরা। যেটা বাংলা কবিতায় প্রথম সফলভাবে করেন জীবনানন্দ দাশ। এতে কবিতার দুরূহতা কিছুটা বাড়ে, কিন্তু যে চিত্র আঁকেন কবি তা হয়ে ওঠে ভীষণ বর্ণকরোজ্জল ও রহস্যাবৃত এক ছবি। কবিতা রবীন্দ্রনাথের সময় বা তার আগেও গীতিময়তা ছিল, আজও আছে, কিন্তু কবিতায় শব্দ দিয়ে গল্প রচনাকে আধুনিকতাবাদীরা পরিহার করেছেন। যে কারণে কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত রবীন্দ্রনাথের 'ক্যামেলিয়া' বা 'হঠাৎ দেখা' কবিতাকে কবিতা হিশেবে খুব অনাধুনিক বা তরল কবিতা হিশেবে চিহ্নিত করেন। বাংলাদেশে ষাটের কবিদের মধ্যে নির্মলেন্দু গুণের 'হুলিয়া' সেই ধারার কবিতা, যেখানে কবিতার চেয়ে গল্পই প্রধান। কিন্তু শব্দ দিয়ে সফল ভাস্কর্যের উদাহরণ জীবনানন্দ দাশের 'বনলতা সেন' বা 'গোধূলিসন্ধির নৃত্য'। কিন্তু ষাটের পর সত্তর নিয়ে আসে কিছুটা রাজনীতি-চিন্তা দ্বারা সমাচ্ছন্নতা। সেকারণেই হয়তো সত্তরের খুব শক্তিশালী কবির সংখ্যা কম। স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং তার পরবর্তী টালমাটাল সময়টা বরং কবিতার জন্য উর্বর ঋতু ছিল, কিন্তু কবিতা বা কথাশিল্পে আশানুরূপ সৃষ্টি হয়নি। রাজনীতিকে বিষয় করে শক্তিশালী আধুনিক কবিতা রচনা ভীষণ কঠিন। সুভাস মুখোপাধ্যায় বা সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কিছু রাজনীতির বিষয় নিয়ে সফল কবিতা লিখলেও তার সংখ্যা বেশ কম। কিন্তু আশির গোড়া থেকে আমাদের কবিতার ভাষা বদলে যেতে থাকে। সেটা যেমন ভাষা তেমনি বিষয়ের ক্ষেত্রেও। আধার এবং আধেয়, দুটোতেই কিছু নতুন চিন্তা এসেছে। বিক্ষিপ্তভাবে বিশ্বায়নের কিছু অনুষঙ্গ যেমন কবিতায় দেখা যায়, তেমনি কবিতার ভাষায়ও একেবারে আটপৌরে ধরনের শব্দাবলি, আঞ্চলিক শব্দাবলির শিল্পিত ব্যবহার লক্ষ করা যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে নব্বই এবং শূন্য দশকের কবিরা একেবারে আলাদা কাব্য-ভাষা এবং কাব্য-উপাদান নিয়ে আসেন।

২ .
আমাদের আজকের আলোচনার কবি শামস আল মমীন নব্বই দশক থেকে লিখতে শুরু করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'চিতায় ঝুলন্ত জ্যোৎস্না' '৯৫ সালে প্রকাশিত হয়। এর আগে তিনি ঢাকা এবং নিউইয়র্কের সাহিত্য সাময়িকীগুলোতে লিখতে শুরু করেন। শুরু থেকেই এই কবির কণ্ঠস্বর আলাদা। এর একাধিক কারণ থাকতে পারে। কিন্তু তিনি যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার জন্য মার্কিন দেশে চলে আসেন এবং তাঁর প্রস্তুতিকাল কিছুটা বেশি, ভিন্ন ভূগোলে, ভিন্ন জলহাওয়ায়! আক্ষরিক অর্থেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম চার বছর মার্কিন দেশের ওহাইওতে কোন বাঙালি দেখেননি, বাংলা খাবার খান নি, কোন বাংলা কবিতা লেখেন নি বা পড়েননি, তাই জীবনের এই প্রথম প্রস্তুতিকাল বা ফর্মেটিভ সময়টা তাঁর অন্যান্য সমকালীন কবিদের থেকে একেবারে আলাদা। মার্কিন সমাজের জীবন বাস্তবতা এবং সেই সংস্কৃতি ও শিক্ষার বিষয়গুলো তাঁর মানসিক জগৎকে একটি ভিন্ন আদলে গড়ে তোলে। এছাড়া মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যেহেতু তিনি ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র, তাই সাহিত্যকে বোঝা বা সেই বোধ ও বীক্ষণের মাঝে এমন কিছু চিন্তার স্ফুলিঙ্গ গাঢ়তর হয়, যা তাঁর সমকালীন বাঙালি কবিদের থেকে আলাদা।

অনেক কাব্যবোদ্ধা সমালোচক দাবি করেন যে একমাত্র কবির হাতেই মহাকালের গভীরতর রহস্যের চাবি, যে চাবিতে জানা যায় অতীত-অনতীতকে, জানা যায় চিরচঞ্চল বর্তমান-অবর্তমানকে। কবিদের সেই অতীত বিশ্লেষণ বা খোঁড়াখুঁড়ির একাধিক স্তর থাকে। এক অধ্যায়ে অতীতের আলোয় বর্তমানের পাঠ, আরেক স্তরে বর্তমানের আলোতে অতীতকে চেনা। কবিই জানেন ত্রিকালের ছায়াচ্ছন্ন ধূসরতার অর্থ, অর্থের বিভিন্ন রহস্য! শামস আল মমীন এই কালত্রয়ের রহস্য উন্মোচন কীভাবে করেন, কীভাবে আঁকেন সমকাল ও অনতীত-অতীতের রহস্য! দ্বিতীয়ত কোন ভূগোল এই কবির কবিতায় বাঙময়, বাঙময় সেই ভূগোলের সংস্কৃতি ও জলহাওয়া নিয়ে! তৃতীয়ত, যেহেতু তিনি দ্বিভাষিক এবং দ্বিসংস্কৃতির মানুষ, তাঁর কবিতায় কীভাবে এই সংস্কৃতিদ্বয় বিশ্লিষ্ট এবং দুই ভাষার সুর এক ভিন্ন সঙ্গীতের জন্ম দেয়! চতুর্থত, কাব্য নির্মিতিতে বাংলা এবং পশ্চিমা ভাষা সমূহের কবিতা একেবারে আলাদা, কী করে এই বহুবিধ কাব্য নির্মিতি বা শৈলী তিনি ঘনবদ্ধ মিশ্রণ ঘটিয়ে নিজের কাব্যভাষার এবং কাব্য-নির্মিতির জন্ম দিয়েছেন।
পঞ্চমত, যেহেতু তিনি দুই ভাষায়ই কবিতা লেখেন, আর লেখেন বাঙালি পাঠক এবং মার্কিন পাঠক ও ভিন্ন দেশের মানুষের পাঠের জন্য, তাই কেমন করে তিনি কাব্য-উপাদান এবং শিল্পের অন্যান্য অনুষঙ্গগুলোকে শিল্পরূপ দেন। সম্ভবত মোটাদাগে আমরা এই বিষয়গুলোই একটু অন্বেষণের চেষ্টা করে দেখবো।

কবিতায় ইতিহাসের চলমান দীপশিখা বা আলোকে ব্যবহার দুরূহ। এই আলোরশ্মিকে ব্যবহার করতে প্রয়োজন শিল্পজ্ঞানের সঙ্গে বস্তুজ্ঞান এবং আলোকপরিমাণ বোধ। মাকে নিয়ে বাংলা ভাষায় অনেক কবিতা লেখা হয়েছে। হয়েছে অনেক কথাসাহিত্য। কিন্তু একজন বিদ্রোহী তরুণী, বলা যায় আত্মমর্যাদাবোধ বাঁচাতে ধর্ষিতা এক তরুণী ধর্ষককে হত্যা করে। তিনি এক ইরানী নারী। তাঁর ফাঁসির আগে তাঁর মাকে লেখা পত্রে তিনি কিছু কথা লেখেন, সে বিষয়টি স্মরণ করে শামস আল মমীন লিখেছেন 'মা' কবিতাটি।
কবিতাটির মাঝে একজন বীর কন্যার হৃদয়বেদনা যেমন আছে, তেমনি আছে ধর্ষকের প্রতি তার ঘৃণা। যারা তাকে ফাঁসি দিয়েছে তাদের প্রতি করুণা। এই পৃথিবীর মাটি তাঁকে ভালবেসেছিল, সেও। কিন্তু কোথায় যেন কবি আঁকতে চেয়েছেন মা মেয়ের আর্তি ছাড়াও এক গভীর অর্থে মানবের অসহায়ত্ব!

মা, পৃথিবী আমাকে উনিশ বছর ভালোবেসেছে। আমি
তার উষ্ণ ছোঁয়ায় মুগ্ধছিলাম। তোমার সুরে শাহনামা
আর গালিবের দরদী গজল শুনতে শুনতে কখন যে
ফুটে উঠেছি গুলবাগে;

রেহানে জাবারির নামক এই তরুণী মাকে যা লিখেছেন তা যে কোন তরুণীই ফাঁসিতে যাওয়ার আগে লিখতে পারেন অশ্রুভেজা শব্দে, কিন্তু এখানে সেই লেখার সাথে কবির মনের কবিতাপ্রেমের কিছু চিহ্ন রয়েছে, যা শিল্পিত। মায়ের কণ্ঠে বা সুরে 'শাহনামা বা গালিবের দরদী' গজল ভিন্ন এক আবহ সৃষ্টি করেছে। মেয়েটি লিখেছেন যদি তিনি প্রতিবাদ না করতেন, তাহলে

সেই কালো রাতে ওরা হয়তো
আমাকে কোথাও ছুঁড়ে
ফেলে দিত ….তারপর
তোমাকে নিয়ে যেত লাশ শনাক্ত করতে; তখন
এও জানতে পারতে আমি ধর্ষিতও হয়েছিলাম।

একেবারে সহজ ভাষায় নৈর্ব্যক্তিক এক স্বরে তীব্র বেদনার অভিঘাত আঁকলেন কবি! আপাতভাবে মনে হতে পারে একেবারে নিরাবেগ, কঠোর কোন প্রতিবেদনসুলভ সংবাদ, কিন্তু এর মধ্যে কবি নিজেও এক পরীক্ষার সামনে, এক ক্ষীণ সরু সূতার ওপর দিয়ে হেঁটে গেলেন। সামান্য অসতর্কতা কবিকে তাঁর ভাষা ও কাব্য- নির্মিতি থেকে দূরে সরিয়ে নিতে পারতো।

নব্বই দশক থেকে বাংলাদেশ এবং পশ্চিমা বিশ্বের সময়চেতনা এবং সমাজচেতনার সাযুজ্যে ভিন্ন এক কাব্যরূপ সৃষ্টি করেন তিনি। এছাড়া ছেলেবেলার বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের বহু স্মৃতি বার বার তাঁর কবিতায় ফিরে ফিরে আসে। স্মৃতির ঐশ্বর্য এবং কালের প্রহারের অনিবার্যতায় যে বৈপরীত্য তার সহাবস্থান ঘটিয়ে কবিতার শরীর হয়ে ওঠে ভিন্নরকম উজ্জ্বল যা আমাদের চেনা বাংলাদেশের কবিতায় আগে লক্ষ করা যায়নি, বা কারো কারো কবিতায় থাকলেও তা ছিল কিছুটা অদৃশ্য এবং ম্লান। কবিতার এই শব্দ-ভাস্কর্য দিয়ে কখনও কখনও কবির স্বগতোক্তির অবকাশ সৃষ্টি করা হয়েছে। সমস্ত মহিমোজ্জলতার চূড়ার নির্বাপণের প্রাঙমুহূর্তে যে মনোলৌল্য , যে মথিত স্মৃতির শিয়রে বর্তমানের অসহায়তা তা তাঁর বেশ কিছু কবিতার থীম। ইতিহাসের চলিষ্ণু দীপশিখার ব্যবহার কবিতায় খুব দুরূহ। কবি সুধীন্দ্রনাথ তাঁর '১৯৪৫' কবিতাটিসহ বেশ কয়েকটি কবিতায় উজ্জ্বলভাবে দেখিয়েছেন। কিন্তু শামস আল মমীন সেই কাব্যরীতিতে না গিয়ে নিজের মত করে ব্যবহার করেছেন। এটি হতে পারে তাঁর মনোজগৎ পশ্চিমা শিক্ষা এবং সেই সমাজে দীর্ঘদিন থাকা এবং সত্ত্বার একটি অর্ধাংশ বাংলাদেশের ভূমিতে উপ্ত ছিল। এই অন্তর্গত আলোকরশ্মিকে ব্যবহার করে তিনি নিজের শিল্পীমনের বস্তুজ্ঞান এবং আলোকপরিমাণ-বোধ দুইই বাঙময় করেছেন। এই দুইয়ের সমন্বয় শক্তিশালী কবির প্রতিভাসাপেক্ষ। তাঁর 'চিতায় ঝুলন্ত জ্যোৎস্না' কালের অধিকাংশ কবিতাগুলো কবি সময়ের এবং ইতিহাসের সেই লীলাময় রূপান্তরকে আরেক লগ্নে আবিষ্কার করেছেন। নব্বই দশকের শুরুটা তাঁর জন্য বাংলা কবিতায় কালান্তরের লোহিত লগ্ন, পঞ্চাশের দুজন বড় কবি এবং ষাটের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ কবিদের কবিতা থেকে নতুন কণ্ঠ বেরিয়ে আসা শুরু করেছে। সেই সময়কার তাঁর কাব্যভাষায় দ্বন্দ্বময় আর্তি তাঁর নিজের আধুনিক ও কবি হিশেবে প্রস্তুত মনের কল্পনার দান! সেই মনীষারই ইঙ্গিত ও শিল্পরূপ তাঁর পরবর্তী আরও দুটি কাব্য গ্রন্থ, এমনকি একেবারে 'কেউ হয়তো আমাকে থামতে বলবে' কাব্যগ্রন্থ পর্যন্ত। পাঠক ভাবতে পারে একি কবির যুগান্তর চেতনা, কিন্তু পরক্ষণেই 'সেই মোহই' সংশয়ের সৃষ্টি করেছে। প্রকৃতিতে প্রচণ্ড ভূমিকম্প যেমন গিরিচূড়ায় বৈকল্য সৃষ্টি করে আরও শক্তিমান এক প্রাকৃতিক সত্ত্বাকে স্বীকৃতিদানের উদ্দেশ্যে, তেমনি মমীনের এই সময়কালের কবিতা কালান্তরের নবপর্যায়ের আবির্ভাবের প্রকারান্তর Sublimity. আধুনিক কবি তো নিজের সময়কালের জটিল চ্যালেঞ্জকেই গ্রহণ করেন কবিতায় তাঁর সিগনেচার সুরকে প্রতিষ্ঠিত করতে। শামস আল মমীনও হয়তো তাই করতে চেয়েছেন। যেটাকে আমরা কবির নিজস্ব কাব্য-ভাষা বা সিগনেচার সুর বলি। আমাদের বাংলাদেশের অধিকাংশ কবির তা নেই, কারণ অধিকাংশ কবির কাব্যগ্রন্থের মলাট ছিঁড়ে ফেললে বোঝা মুশকিল কে লিখেছেন সেই কবিতা। অধিকাংশ কবির কবিতাকেই একই রকম মনে হয়। তাই সিগনেচার সুর বা নিজস্ব কাব্য- ভাষা সৃষ্টি এক দুরূহ কাজ। মমীন সেটা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। বিষাদের কবিতা সবাই বলেন কবিতায়, কিন্তু বিষাদের কথা মমীন বলেন একটু ভিন্ন সুরে

পরিত্যক্ত মাঠ থেকে ভেসে আসে বিষাদের
সুর, আমি কিছু না বুঝেই কণ্ঠ মেলাই ওদের
সাথে; মাঝে মাঝে ভেঙ্গে যাই, কিন্তু আমি জানি
নদীর একটি ঢেউ আমাকে ভাসিয়ে নিতে যথেষ্ট নয়।
…….

না হয় কিছু না হওয়ার আনন্দে হাসতে হাসতে
মরে যাব; শেষমেশ দেখি না কি হয়।

তীব্র বিদ্রুপ এবং নিজেকে চাবুক একসঙ্গেও মারা যায়, কিন্তু শব্দের অন্তঃস্রোতে এক গভীর হাহাকার মিশ্রিত বেদনার রূপ দেয়া এমন করে খুব সহজ নয়! কবি জানেন কুহকে খুব বেশি মজে না মন, সেই কুহক যতই সমগ্র আবহমণ্ডলকে অভিভূত করে দেয়ার শক্তি ধারণ করুক না কেন, এমন খাটি কবিতার পঙক্তিমালা কবির নিজস্ব অভিজ্ঞতার স্বোপার্জিত সম্পদে স্বয়ম্ভর হতে হয়। ঐতিহ্য অমান্য না করে ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন সম্বন্ধ সম্পাদ্যের ভেতর দিয়ে মমীন দেখান তাঁর কবি সত্তার অবৈকল্য কবিতার পর কবিতার মধ্যে জায়মান। এই ব্যাপারটিই একজন খাটি কবির অভিজ্ঞান। 'খাটি' শব্দটি ব্যবহার করে কবি বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন বড় কবি বা মাঝারি কবি এই প্রশ্ন নিরর্থক'- একজন কবির যাথার্থ্যের বিচার হবে তাঁর 'খাটিত্বে'।
খাটি কবিই লক্ষ্যভেদী গবেষক — শব্দের ঝঙ্কার, চারিত্র ও প্রকৃতি নিয়ে কবির গবেষণা মূলত প্রকৃতি এবং স্বরূপজ্ঞানের তাগিদে গড়ে ওঠা। আলোচ্য কবি শামস আল মমীনের কাব্যভাষা বা ব্যবহার করা শব্দাবলী, বিশেষ করে আঞ্চলিক শব্দের রূপময় এবং চিত্রবহুল ব্যবহারের আস্তিক্য তাঁকে পুছে দেয় জীবনের অমেয়তার বোধে।

রক্তসিথান। বইনের নতমুখ হুশিয়ার করে
এই মাটির খোয়াব শুভ নয়। কান
পাতি। শুনি পিতৃপুরুষের জোরধ্বনি
এই মাটি তোর, এই তো মা-মাতৃভূমি।

আঞ্চলিক দুয়েকটি শব্দের সঙ্গে তীব্র ভূমিপ্রেম একাত্ম হয়ে মিশে আছে। কিন্তু কয়েকটি পঙক্তি পরই 'পানছড়ি দীঘিনালা'র ছবি মনে করিয়ে দেয় 'এই মেঘখানা পাহাড় কর্ণফুলীর চকচকা মাছ'!

'অরা কয়, এই মাটি সবুজ পাহাড় দিয়াবহে হিংসার ঝরনাধারা। পুথি
লেখে, লেখে বদনাম। কয়, মোর চৌদ্দপুরুষ আদিম, দেখে নাই কিছু সভ্যের সমান,পড়ে চসার-হোমার , বোঝে নাই রাসেলের ভাবকথা।

'মনোলগ' কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতার ভাষা আটপৌরে, কিন্তু অন্তর্গূঢ়! আমাদের 'কল্পিত' উত্তর-আধুনিক জীবন গোলকায়নের যুগে গভীর অরণ্যের চেয়েও পুরনো অরণ্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে আমাদেরকে। আমরা ক্রমশই একে ওপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এই গ্রন্থের কবিতাগুলো অব্যর্থ প্রতীকে ধৃত আমাদের বাংলার, একেবারে নিভৃত গ্রামের জীবনের দুর্মোচনীয় সংকটের ঠিকানা আঁকা। কিন্তু কাব্যগ্রন্থটির প্রথম কবিতাটির বিষয় একেবারে আলাদা! একজন ভিয়েতনামের ছেলে 'লি শেন' এর জীবন নিয়ে লেখা। অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান এই বই নিয়ে লিখতে গিয়ে একটি মন্তব্যে বলেন কবি মমীন সম্পর্কে, 'তাঁর মনোভাব যেসব কবিতায় চমৎকার আকার পায় এই বইয়ের 'লি শেন' তার নির্দোষ উদাহরণ। এই ছেলের বাপ কোথায় জানা নেই, মা ভিয়েতনামে, পড়ছে আমেরিকার এক স্কুলে। মমীন সেখানে আমাদের সামনে বিরাট এক প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো দাঁড়িয়ে।'

সেপ্টেম্বর। সবার পেছনে বসা বারো বছরের
লি শেন রাতের পাড়াগাঁর মতো শান্ত।
মুঠিবাঁধা দুহাতে বানায় নিখুঁত ত্রিভুজ। পাখির ছানার
মতো আধফোটা চোখ, ধানিরং চুল
যেন ঝড়ের তাণ্ডবে নুয়েগেছে। তবু খাড়া
শির দাঁড়া, প্রতিবাদী ।
…………….
সে রচনা লেখে ভালো, প্রায়
শুদ্ধ উচ্চারণে ইংরেজি বলে। ইঁদুরের মতো
চুপচাপ রোজ ক্লাসে ঢোকে,
আটটা চল্লিশে।
…………
ক্লাস-পালানো মেরীর সাথে ফিসফাস করে।
আমি পাহাড়ের মতো তার সামনে দাঁড়াই, বলি,
পড়ায় তোমার মন নেই। আজ তোমার আব্বাকে
কল করা হবে । ওয়ানটন
সুপের মতোই তাকে বিষণ্ণ দেখায়।
আমি বলি, তিনি কি অফিসে?
তিনি নেই।
তবে তোমার মা?
সে আমার রক্তচোখে চোখ রেখে শান্ত শিশুর মতো বলে,
ভিয়েতনামে।
লি শেন কবিতাটি খুব দীর্ঘ নয়, কিন্তু এর মধ্যে শৈলীর দিক থেকে দুটি বিষয় লক্ষ করার মতো। একটি শব্দ-ধ্বনির হিল্লোল,
'যেন ঝড়ের তাণ্ডবে নুয়ে গেছে। তবু খাড়া
শিরদাঁড়া, প্রতিবাদী।

কবি শিরদাঁড়া না লিখে লিখেছেন 'শির দাঁড়া', যা খাড়া। অন্য বিষয়টি বাংলার গাঁ থেকে নেয়া দুটি চিত্রকল্প, 'লি শেন রাতের পাড়াগাঁর মতো শান্ত।' এই ছবির সঙ্গে ভিয়েতনামের লি শেন কানেকট করতে পারবে না, কিন্তু পরবাসী হলেও বাঙালি পাঠকরা পারবেন, জীবনের একটা নিভৃত নৈশকালীন কোলাহলহীন আঁধার ঘেরা ছবিকে মনে করিয়ে দেবে। দ্বিতীয় চিত্রকল্পটি হল লি শেন,
ইঁদুরের মতো রোজ চুপচাপ রোজ ক্লাসে ঢোকে,
আটটা চল্লিশে।

এটিও বাংলার গ্রামের নৈশকালীন হেমন্তের খড়ের স্তূপ বা মাঠের মাঝে পরিত্যক্ত ধান সংগ্রহে মগ্ন ইঁদুরের শান্ত চলাফেরার ছবি! কিন্তু পরক্ষণেই কবি একটি নাগরিক ভিয়েতনামের ছবি ব্যবহার করেন লি শেনের বিষণ্ণতা বোঝাতে,

আজ তোমার আব্বাকে করা হবে। ওয়ানটন/
সুপের মতোই তাকে বিষণ্ণ দেখায়।

এই ওয়ানটন সুপের রং যে ধুপছায়া বা ধূসর এক বিষণ্ণতার প্রতীক, তা একমাত্র ভিয়েতনাম বা চীনের মানুষরাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কিন্তু অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান কবিতাটি সম্পর্কে ঠিকই বলেছেন, কবি শামস আল মমীন 'সেখানে বিরাট এক প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো দাঁড়িয়ে।'
এই কাব্যগ্রন্থের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কবিতা 'হংকং হ্যান্ডওভার' । ১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের সমাপ্তি অনুষ্ঠানের ওপর লেখা কবিতাটি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শেষ উপনিবেশগুলোর একটি, একশত ছাপ্পান্ন বছরের এক ইতিহাসের সমাপ্তি। 'স্কট ব্যান্ডে বাজে রণসঙ্গীতের সুর।' কিন্তু কবির হৃদয় কোনদিকে, নিপীড়িত এই চৈনিক দ্বীপের মানুষগুলোর জন্য, নাকি দীর্ঘ কয়েক শতাব্দীর 'গ্লানি, অপমান, লজ্জা' পীড়িত শেষ ব্রিটিশ গভর্নর ক্রিস প্যাটেনের বিবর্ণ ছবির জন্য, তা সহজেই বোঝা যায় সামান্য কয়েকটি কথায়,

রাতের হংকংজলে মৃত চাঁদ, ব্রিটানিয়া …
যায় যুবরাজ রানীর মুকুট ভেসে যায়।

১৯৮৮ সালের ব্রিটেনের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ক্রিস প্যাটেন ঢাকার বন্যা পরিদর্শনে এলে ঢাকা টেলিভিশনের জন্য তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে বুঝেছিলাম সহস্র বছরের দাম্ভিক ইংরেজের রক্ত কেমন হতে পারে, কিন্তু তাও যে কখনও কখনও গ্লানিময় পরাভব মানতে বাধ্য হয়, নিয়তি নির্ধারিত পরিণতি দেখার সময়, যেমনটা দণ্ডায়মান তাঁর ছবি শিল্পিতভাবে এঁকেছেন কবি শামস আল মমীন!

এই বইয়ের আরেকটি দুরূহ কিন্তু বেশ উজ্জ্বল কবিতা 'আমরা দুজনে নিঃসঙ্গ ছিলাম'। যৌনতা বা শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে শক্তিশালী কবিতা লেখা বেশ কঠিন। ভিন্ন ধরনের পরিমিতিবোধ দাবী করে। যার সামান্য অন্যথা কবিতাকে শিল্প না হয়ে পর্ণগ্রাফিতে পরিণত করতে পারে। কবিতাটির বিষয় এক বন্ধুর প্রণয়িনীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক এবং যৌনক্রিয়ার বর্ণন।
'আমার আঙুলগুলো কোন নির্দেশ ছাড়াই ভরাট দুধের ছোঁয়ায় কাঁপতে থাকে …' বা
খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর আখের পাতার মতো আমার/খসখসে গাল ও জিব দিয়ে চাটতে থাকে,/ …।ওর পিঙ্ক ব্রেসিয়ার/ খুলে ফেলি।
………
আমি এর আগেও তোর প্রেমিকাদের ব্রা খুলেছি এবং তন্ময় হয়ে দেখেছি
নারীদেহে শিল্পকলা। তাই আমি ভাবলাম, লে হালুয়া…
আর একবার হয়ে যাক …………
………তোর শরীরের সাথে দাপাদাপি করে তাঁর শরীর জুড়ায় না।
সে সাত ঘাটের পিছলা পানি চেখে বুঝে
নিতে চায় তুই কতোটা পুরুষ।
………
তবে একে অপরকে জানার এও এক চমৎকার কৌশল।
আমি শুধু জ্ঞানের সাধক। জানার কী আর শেষ আছে!

মানব দেহের ক্ষুধা, আধুনিক জীবনের গ্লানি এবং বন্ধুত্বের মাঝে নিহিত অর্থহীনতা, সব মিলিয়ে এক শ্লেষ-মিশ্রিত ভাষায় সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছেন মমীন। কবিতার শেষ বাক্যটি কবি হয়তো মানবমনকে নিয়েই এক বিদ্রুপভরা তির্যক ব্যাঙ্গ ছুঁড়ে দিয়েছেন, 'আমি শুধু জ্ঞানের সাধক। জানার কি আর শেষ আছে।' প্রমিসকিউটির এক ভয়ার্ত কনফেশনকে বিদ্রুপ দিয়ে কীভাবে শিল্প করে তোলা যায়, যা কবি দেখিয়েছেন।

কৃষ্ণাঙ্গদের ক্রীতদাস জীবন থেকে আজকের সামাজিক অর্থনৈতিক বৈষম্য শামস আল মমীনের কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে ইংরেজি এবং বাংলায় তিনি বেশ কয়েকটি কবিতা লিখেছেন। এর মধ্যে 'ঈশ্বর, তোমার চোখে' কবিতাটি যে কারো মনকে বেদনার্ত করবে।
নীলক্ষেত আর নরম তুলার কোষে
আরও কালো হয়েছিল আফ্রিকার কালো হাত।
গাছে গাছে ওরা ঝুলে ছিল প্রাণহীন ।
ওরা সমবেত স্বজনের লাশ সনাক্তকরণে,
খ্রিস্টের বন্দনা শেষে ঘরে ফিরে গেছে নিষ্কলুষ।
ঈশ্বর তোমার চোখে ওরা অন্ধের বিশ্বাস রেখেছিল।

এই বিশ্বাসভরা পঙক্তিতে কিছুটা ক্ষোভ ঝরছে কবি হৃদয়ের, কিন্তু ক্রীতদাস কেনাবেচার বাজার বা এই তেজারতির অন্তরালে মানুষের দীর্ঘ যন্ত্রণাকাতর সমুদ্র ভ্রমণ বা ঘানাসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের বন্দর থেকে আটলান্টিক পাড়ি দেয়ার অমানবিক ইতিহাসের কিছু চিত্র কবিতায় ধরা আছে বিভিন্ন চিত্রকল্প বা উপমার ইঙ্গিতে।

কত শত তাগড়া জোয়ান আফ্রিকা আফ্রিকা বলে
কেঁদেছিল, আমি ভুলে গেছি …
আমি ভুলে গেছি চার্লসটন বন্দরে
কত ষোড়শী লোহার ঘুঙুরে নোঙর করেছিল।
…………
আমি ভুলে গেছি ভার্জিনিয়ার তামাক ক্ষেতে কত
নারী হাত লাল হাত লাল করেছিল।
……
আমি সত্য বলছি, আমার গায়ে চুরুটের ছ্যাঁকা
দাগ মুছে গ্যাছে।
……………
দ্যাখো, লোহার শেকলে আমার পা বাঁধা নেই, তবু
হাঁটতে পারি না,
গলাভর্তি গান আমি গাইতে পারি না
মিসিসিপির উথাল ঢেউয়ের মতো
পূর্বপুরুষের অবিরাম আর্তনাদ
আমার রক্তধারায়

পুরো কবিতাটিতে চিত্রিত মার্কিন দেশের এক কালো অধ্যায়ের ইতিহাস, যা আজও টিকে আছে এক রূপান্তরিত অভিজ্ঞতা নিয়ে। কবির নিজের মানবিক অবস্থানটিও কবিতাটিতে মূর্ত!
'মনোলগ' কাব্য গ্রন্থের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা 'প্রধান চরিত্র' । কবিতাটির বিষয় মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করে লেখা। উত্তর বঙ্গের একটি রণক্ষেত্র পরিদর্শনের অভিজ্ঞতায় লেখা। কবিতাটি দীর্ঘ নয়, কিন্তু তীব্র বেদনা এবং বুকের মধ্যে জমাটবাঁধা অশ্রুর ছবি।

'স্কুলের সামনে ছিল স্মৃতিফলক/ ভোরের হাওয়ায় জলছবি হয়ে উঠতো ওদের/ মুখ। ডুবে গেলো সব প্রতিমা বিসর্জনের মতো।' এই পঙক্তি গভীর দীর্ঘশ্বাসের, তিমির নিবিড় বেদনার!
গ্রামীণ জীবনের স্মৃতি-নির্ভর মমীনের অধিকাংশ কবিতাই বিষণ্ণ করে মনকে। এসব কবিতার অন্তস্রোতে কিছুটা বেদনা, কিছুটা হারানোর কষ্ট, আর কিছুটা হতাশা মিলে মিশে পাঠকের হৃদয়কে সিক্ত করে, কিন্তু কোথায় যেন একটা অচেনা দূরত্বও কবিকে ভারাক্রান্ত করেছে, যার ছবি পাঠককে স্পর্শ করে, পাঠককে বাংলার জীবনের হাজারটা বিবর্তনের ইতিহাস-চিত্রও প্রতীকের মাধ্যমে চেনায়। কোন কোন কবিতার দুয়েকটি চিত্রকল্প অতীত দিনে নিয়ে যায়, 'খলখল করে কলসিতে জিয়ল মাছের মতো।' যারা এখন থেকে পাঁচ বা সাত দশক আগেও গ্রামে বাস করতেন, তারা জানেন বাংলার মেয়েরা নিজেদের পুকুরের কই, মাগুর বা শিঙ মাছ পিতলের বা মাটির কলসিতে কীভাবে অনেকদিন পানির মধ্যে রেখে জীবন্ত রাখতেন। সামান্য শব্দ বা নাড়াচাড়ায় মাছগুলোর ভয়ার্ত শরীর কেমন 'খলখল' করে উঠতো। আজকের বাংলার গ্রামেও এ দৃশ্য প্রায় লুপ্ত।

শামস আল মমীনের আরেকটি স্মৃতি-আর্দ্র কবিতা 'ফেরা'। একেবারে নিভৃত গ্রামের এক তরুণ পশ্চিমে পাড়ি দিয়েছিলেন খুব কম বয়সে। পশ্চিমের অনেক কিছুই তাঁর জীবনের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু বদরগঞ্জের স্মৃতি তাঁর মনে অবিভাজ্য হয়ে মিশে আছে!
জেলা শহর রংপুর ছেড়ে বদরগঞ্জ স্টেশনে
নেমে পড়ি। দাদা বলেছিল, 'এতটা অচেনা পথ
কি করে আসবি?' 'জন্মভূমি। ঠিক চিনে নেবো'- বলে
অস্থির দাদীকে শান্ত করি।হাতের ব্যাগটা কাঁধে। আঙুলের
ফাঁকে মারলবোরো ।
ফ্লাস্কে দুধ ছাড়া কফি । নগরের
শেষ চিহ্ন বিদ্যুৎখুঁটিতে রাতজাগা ক্লান্ত
বাল্ব। চা স্টলে দাঁড়াই, আমার পিঠছোঁয়া চুল
কানে দুল। চোখে ওদের রাজ্যের কৌতূহল।

একজন গ্রামের তরুণের পশ্চিমা সংস্কৃতিতে রূপান্তর নিয়ে বিশ্বস্ত এবং শিল্পিত ছবি কবি এঁকেছেন মাত্র দুতিনটি শব্দে, 'দুধ ছাড়া কালো কফি', বা 'আঙুলের ফাঁকে মারলবোরো' বা 'কানে দুল' ইত্যাদি শব্দের ব্যবহারে।
শামস আল মমীনের উত্তরবঙ্গের বাল্যকালের স্মৃতি এবং পশ্চিমের সংস্কৃতি আত্মিকরণের সঙ্গে সঙ্গে কবিতার উপাদানে নতুন সংযোগ ঘটেছে ইতিহাস ও রাজনীতি চেতনার। বিশ্বের যে কোন স্থানে মানবিকতা লুণ্ঠিত হলে মমীন ভেতরে রক্তাক্ত হন। সেটা আইলান কুর্দি, বা জাবির চিঠি, ফিলিস্তিনি শিশুর দিকে তাক করা তিনটি রাইফেল দেখে 'এ সময় ও ঘুমিয়ে থাকে কবিতা, বা গাজায় ইসরাইলী আক্রমণ স্মরণ রেখে লেখা 'আমি খুব সহজভাবে বলবো' কবিতা, বা 'শিরোচ্ছেদের আগে ইসলামী স্টেটের হাতে বন্দী অবস্থায় বন্ধু ও স্বজনদের কাছে আমেরিকান সাংবাদিক জেমস ফলির লেখা চিঠি পড়ে' লেখা মমীনের 'চিঠি' শিরোনামের কবিতাটি পড়লে বোঝা যায় এসব ঘটনায় কবির অন্তর্গত রক্তক্ষরণের চিত্র। পাঠের সময় আমাদের অনেকের শামসুর রাহমানের কবিতার কথা মনে পড়তে পারে। ষাট থেকে নব্বইয়ের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিয়ে শামসুর রাহমান উৎকৃষ্ট কবিতা লিখেছেন অন্যান্য কবিদের চেয়ে অনেক বেশি। রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক প্রতিটি ঘটনাই শামসুর রাহমানের মনে 'রক্তাক্ত' ছাপ ফেলেছিল, যা তাঁকে ভাবিয়েছে, বেদনার্ত করেছে এবং তিনি তা শিল্পরূপ দিয়েছেন। তেমনি মধ্য নব্বই থেকে গত প্রায় আড়াই দশকে জগতের অনেক অমানবিক ইতিহাসের ঘটনা যেমন মমীনের হৃদয়কে রক্তাক্ত করেছে, তেমনি তিনি সেসব বিষয় নিয়ে ভীষণ সংবেদনশীল উচ্চারণে কাব্যরূপ দিয়েছেন। কবি বা শিল্পীদের হৃদয় এখানেই সাধারণ মানুষদের থেকে আলাদা, তাঁদের মনোজগতে মানবতার বিপক্ষের সকল উচ্চারণ এবং ঘটনা স্থায়ী ছাপ রেখে যায়! মমীন সত্যকে, জীবন এবং পরিপার্শ্বের সত্যকে সন্ধান করেন ইতিহাসচেতনার মধ্যে, সমাজচেতনার মধ্যে, ইন্দ্রিয়ঘন এক অতিলৌকিক ভাবনা, এমনকি মগ্নচৈতন্যের গভীরেও। কবির এই বৈশিষ্ট্য শক্তিমান শিল্পীর বৈশিষ্ট্য। 'চিতায় ঝুলন্ত জ্যোৎস্না ', 'মনোলগ' বা 'আমি বন্দী খোলা জানালার কাছে' থেকে একেবারে 'অনেক রাত জেগে থাকার পর' পর্যন্ত অধিকাংশ কাব্যগ্রন্থে অসংখ্য কবিতা রয়েছে যেগুলোর শিল্প-উপাদান বিশ্বরাজনীতি এবং মানবিকতার ওপরে অমানবিকতার আঘাতকে উপজীব্য করে। এতে কবি শুধু সমকালীন ঘটনার দ্বারা কতোটা আক্রান্ত হয়েছেন তার দীর্ণতার চিত্রই আঁকেননি, শিল্পীর মানবিকতার প্রতি বিশেষ এক দায়ও পালন করেছেন। এখানে বিশেষ কোন রাজনীতির প্রতি তাঁর পক্ষপাতকে দস্তাবেজ করা জরুরি নয়, বরং আক্রান্ত মানবের প্রতি দায় পালনই বড়। কিন্তু সেই সঙ্গে এই শিল্পায়নে কতোটা গভীর সৌন্দর্য সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছে সেটা বিচার্য। পাঠক মুগ্ধ হন তাঁর কবিতার সৌন্দর্যে। 'ঝুলন্ত চিতায় জ্যোৎস্না' গ্রন্থে যে অন্বেষণের আরম্ভ, কিছু কবিতায় একটু সুররিয়ালিস্ট বা পরাবাস্তব কবিতার আদলে, ঠিক 'অনেক রাত জেগে থাকার পর' গ্রন্থের একাধিক কবিতায় সেই অন্বেষণ অধিকতর গভীরতা নিয়ে চিত্রিত! তাঁর একেবারে হালের কিছু কবিতা যা 'অনেক রাত জেগে থাকার পর' কাব্যগ্রন্থে রয়েছে, বা অগ্রন্থিত এখনও যা আমাদের একটু পড়ার সুযোগ হয়েছে সেগুলোতে জীবনের অনেক স্বপ্ন অচরিতার্থতার ছবি আছে, সেই অচরিতার্থতার বেদনার অন্তরালে এক অনুভূতি বা বোধের জন্ম হচ্ছে, যা ভীষণ নৈর্ব্যক্তিক এবং ঘনবদ্ধ নির্মোহতার শিল্পরূপ! এই ধরনের কাব্যশৈলী বা ক্র্যাফট আমাদের কবিতায় কম দেখা যায়। সেদিক থেকে দেখেই অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানসহ আরও অন্যান্য সমালোচক তাঁর কবিতাকে শনাক্ত করেছেন ভিন্ন সুরের ভিন্ন স্বরের কবিতা হিশেবে। আসলেই তাঁর উচ্চারণে নতুন কিঙ্কন ও নিক্বণ ছড়ায়! মমীনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'চিতায় ঝুলন্ত জ্যোৎস্না' থেকে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'মনোলগ' একেবারে ভিন্ন ধরণের কবিতা পাওয়া যায়। কিন্তু যে অনুষঙ্গ প্রথম কাব্যগ্রন্থ জুড়ে রয়েছে এবং তাঁর শিল্পরূপ কিছুটা পরাবাস্তবতার ছোঁয়ায় নির্মিত, যার রূপ এবং শৈলী পরবর্তী কাব্যগ্রন্থগুলোতে অনেকটাই বদলে গেছে। কিন্তু তা শুধু রূপই বদলেছে, কিন্তু অন্তর্গত সৌন্দর্য প্রায় কিছুই বদলায়নি। সুররিয়ালিস্টদের অন্বিষ্ট অবচেতনার চিত্র আঁকা নয়, বা অবচেতনার বিভিন্ন উপাদান বা উপকরণ নিয়ে একটি ভিন্ন কল্পনার জগৎ সৃষ্টিও নয়, বরং তাঁদের অন্বিষ্ট হল চেতন অবচেতন, অন্তর ও বহির্জগৎকে চিহ্নিত করে যে বিভাজন রেখা তার দৈহিক ও মানসিক সকল প্রাচীর সম্পূর্ণ ভেঙ্গে দেয়া। মমীন তাঁর কবিতায় সে কাজটিই করার চেষ্টা করেছেন শিল্পিতভাবে প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকে। সেই কবিতাগুলো বিষয়ে লিখতে গিয়ে একেবারে প্রায়-অচেনা এই কবির কয়েকটি কবিতার সঙ্গে বোদলেয়ারের কাব্যরূপের তুলনা করেছিলেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান পঁচানব্বই সালের শেষদিকে!

প্রত্যেক কবির বিভিন্ন কবিতা তাঁর পাঠকদের কাছে বিভিন্ন আবেদন নিয়ে আসে। শামস আল মমীনের 'আয়লান কুর্দি' কবিতাটি আমার অন্যতম প্রিয় কবিতা। কবিতাটি লেখা হয়েছিল সিরিয়ার একটি রাজনৈতিক ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে আসার পর। 'চরমপন্থী সংগঠন ইসলামিক স্টেট' সিরিয়ার কোবানি শহর দখল নেয় কয়েক বছর আগে। 'সহিংসতা থেকে বাঁচতে পরিবারসহ তুরস্কে পালিয়ে আসেন আব্দুল্লাহ। পরে তুরস্ক থেকে গ্রিসের কোস দ্বীপের উদ্দেশে রওয়ানা হন। পথে নৌকা ডুবে গেলে তাঁর ছেলে আয়লানসহ পরিবারের সকলেই মারা যায়। ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে তুরস্কের বোদরাম উপকূলে ভেসে আসা আইলানের মৃতদেহের ছবি দেখে' কবি কবিতাটি লিখেছিলেন।

আয়লান রাষ্ট্রনীতি পড়ে নাই
দেশে দেশে কূটনীতি
সীমান্তের সীমারেখা জানা নেই তার।

আয়লান জানে না কার্ল মার্কস কি বলেছেন
লাকার না বোঝা তত্ত্বগুলো বুঝবার
বৃথা কসরত করে—- সাধ্য নেই তাও ।
আয়লান জানে না দামেস্কে আসাদের কি কাজ।
তিন বছরের অবুঝ বালক
আয়লান।
………………
ওর ভালো লাগে মার বুকে মাথা রেখে সবকিছু ভুলে যাওয়া
………………………
ভূমধ্য সাগর তীরে একা
শুয়ে আছে আয়লান
ছোট ছোট ঢেউ
জ্যোৎস্নাভরা রাত
খেলা করে তার সাথে
সাগর দেবতা নেপচুন, পসিডন …শোকে দুঃখে
মোছে
…………
…………
আজও কোন কোন ভোরে
একা শুয়ে থাকে আয়লান
ছোট ছোট ঢেউ
জ্যোৎস্নাভরা রাত
আর শোকের হাওয়ায় ভিজে যায় তার
লাল জামা
নীল প্যান্ট
কালো চুল ।
………………
আয়লান

খেলবে না আর
কোনদিন
কারও সাথে।

এমন তীব্র বেদনাসিক্ত কবিতা যা পাঠকের মনকে সহজেই দ্রবীভূত করে দেয়। মানবের সঙ্কট, রাজনীতির ক্রূরতা নিয়ে মমীনের এমন অনেক কবিতা, যার উৎস সমকালীন বিশ্বরাজনীতি। সমাজবিজ্ঞানীরা দেখেন ও অন্বেষণ করেন এর কারণ বা পরিণাম, কিন্তু শিল্পী আঁকেন এর বিভীষিকা!
'অনেক রাত জেগে থাকার পড়' কাব্যগ্রন্থ মমীনের শেষ প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। এই গ্রন্থের অনেকগুলো কবিতা পাঠককে ভাবাতে পারে এর বৈচিত্র্যের জন্য। শুধু বিষয়ের বৈচিত্র্য নয়, বরং শৈলী এবং ক্র্যাফটও বিভিন্ন ধরনের, চিত্রকল্পও বর্ণিল! 'একফোঁটা শিশিরও ফেলনা নয়' তেমন একটি ছোট আকারের কবিতা, কিন্তু গভীর অর্থ- ব্যঞ্জনা নিয়ে উপস্থিত।

দুঃখগুলো মাঝে মাঝে জোনাকির মতো নিবে জ্বলে
তবু মনে হয় কারও চোখে চোখ রেখে বলি,
জীবন আমার কাছে একটুও তুচ্ছ নয়। নদী
ও নারীর মায়া, উড়ে যাওয়া পাখিদের ছায়া, কুয়াশায়
……………
একটি গভীর রাত সকালের রোদ হাতে বসে আছে।
ইচ্ছা হয় বাষ্প হয়ে যাই, মেঘে মেঘে থাকি
ঢেউ তুলি ফের জলের গভীরে । আমি জানিদূর্বা
ঘাসে ঝুলে থাকা একফোঁটা শিশিরও ফেলনা নয়।

সামান্য বস্তুর মাঝে বিশালত্বকে দেখার প্রয়াস শিল্পীদের থাকে, আবার বিশাল চরাচরও কবি মনকে দোলায়। এই আপাত মূল্যহীনকে মূল্য দেন শিল্পী, একমাত্র শিল্পী, একেই অন্য অর্থে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন 'সভ্যতা'। গত শতাব্দীর সত্তর দশকের গোড়ায় একজন জার্মান অর্থনীতিবিদ ই. এফ শুমেখার একটি যুগান্তকারী গ্রন্থ লিখেছিলেন Small is Beautiful নামে। বইটি তিমির তীব্র শিল্পায়নের বিপরীতে গ্রামীণ শিল্পায়নকে মূল্য দিয়ে মানব সভ্যতার ভিন্ন এক চিত্র এঁকেছিলেন। আসলে শিল্পীরাও তন্নতন্ন করে অন্বেষণ করেন জগতের সকল কণা কণা সূক্ষ্ম সৌন্দর্যের উজ্জ্বল আলোরশ্মিকণিকা, যার মাঝে সৃষ্টি করেন ভিন্ন এক বেদনাঘন সৌন্দর্য! মমীনের ক্ষুদ্র এই 'দূর্বাঘাসে ঝুলে থাকা শিশিরকণাও তেমনি এক সুন্দরের কণাবিন্দু যা জীবনের ভিন্ন অর্থ সৃষ্টি করে। মমীনের এমন একাধিক কবিতা পড়ে আমার চকিতে মনে পড়ে এলিয়টের সেই বিখ্যাত উক্তি, 'Variety and complexity, playing upon a refined complexity'. ছোট ছোট পঙক্তির মাঝে জীবনের গভীর ও জটিল, কিন্তু প্রায়- অদৃশ্যমান কিছু অনুভূতির আশ্চর্য প্রকাশ !

৩.

এই প্রবন্ধের শুরুতে কবি শামস আল মমীনের কবিতার চারিত্রের কয়েকটি দিক শনাক্ত করে কিছু বিষয়ে অন্বেষণের কথা বলেছিলাম। সেসব দিক ছিল তাঁর কাব্যভাষা ও কাব্য-শৈলীসহ আরও কয়েকটি দিক। সংক্ষেপে সেগুলো আলোচনা এবং কিছুটা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এই কবির সঙ্গে কাব্য-অনুষঙ্গ এবং উপাদানের দিক থেকে আমার মনে হয়েছে কিছুটা সাদৃশ্য রয়েছে যে বিখ্যাত তিরিশের কবির, তিনি অমিয় চক্রবর্তী। তবে সেটি একটি দিকে, জগতের চারটি মহাদেশের জীবনের অনুষঙ্গ এসেছে সেসব জায়গায় চক্রবর্তী মহাশয়ের জীবনের বিভিন্ন সময় কাটানোর জন্য। কিন্তু মমীনের কবিতায় আমরা পাই দুটি মহাদেশের জীবনের প্রতিদিনের অনুষঙ্গ, এবং সেসবের ভিতর দিয়ে তিনি যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন তার রূপায়ন হয়েছে তাঁর কবিতায়। কিন্তু মেজাজের দিক থেকে এই দুই কবি একেবারের বিপ্রতীপ। অমিয় চক্রবর্তী রবীন্দ্রনাথের মিষ্টিক চেতনার ধারা বহন করেন, কিন্তু শামস আল মমীন সেদিক থেকে মিষ্টিক-শূন্য বাস্তব জগতের জটিল আধুনিক গোলোকায়িত অর্থব্যবস্থায় মানবের সংগ্রাম এবং প্রান্তিক সমাজের নিপীড়নের চিত্র আঁকিয়ে কবি। হোক সে প্রান্তিক সমাজ প্যালেস্টাইনের, সিরিয়ার, হংকংয়ের, বা বদরগঞ্জ বা চাটখালি বা মার্কিন শ্বেতাঙ্গদের দ্বারা নিষ্পেষিত কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড বা অসহায় ভিয়েতনামী লি শেন, ইরানের ধর্ষিতা তরুণী রেহানে জাবারির। মানব সে যেখানেরই হোক, যা কিছুই হোক তার নাম, তার বেদনার চিত্রই আঁকেন এই কবি। তবে শামস আল মমীনের সকল কবিতার অন্তঃস্রোতে একটি সুর খুব ধীর লয়ে বয় এবং বলে কবিতা কোন করুণ হতাশার কথা বলে না, তা মৃত্যুর কথা বলে না, যদি হতাশা বা মৃত্যুর কথা বলে তবে সেই মৃত্যু আসলে জীবনেরই এবং বাঁচারই প্রেরণা আঁকে! এই কবি বাংলাদেশের কবিতার সীমানাকে একটু প্রলম্বিত করেছেন ভিন্ন গোলার্ধে, নতুন স্বরে, কিছুটা নতুন শৈলী দিয়ে!

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক