রওশন জামিলের অনুবাদে মারিস কন্দে’র আমি তিতুবা

আবদুল্লাহ আল ফাহাদ
Published : 9 Sept 2011, 06:22 AM
Updated : 18 April 2022, 07:05 AM


সতেরো মার্চের বই মেলা, আকাশে চড়া রোদ, তবে জোর হাওয়ায় গরমের বাড়তি কমই। সেই হাওয়ার তোড় নাকি নিয়তি আমাকে বাঙ্গালা গবেষণার স্টলে উড়িয়ে নিল কি না কে জানে? স্টলের সামনে পড়েই সবুজ আর কালোর মিশেলে প্রচ্ছদে একটা বই নজরে আসে- আমি তিতুবা, সেলেমের কালো ডাইনি। মারিস কন্দের কলমে জন্মানো এই উপন্যাস, তিনি ফরাসি-ক্যারিবিয় লেখক। ক্যারিবিয় লেখকদের নিয়ে আমার দূর্বলতার খবর সেদিনের হাওয়ার কানে কীভাবে উঠলো সে প্রশ্নে সময় নষ্ট হবে। মারিস কন্দের হাতে নোবেল তুলে দেবার একটা আলোচনাও জোরেশোরে হয়েছিল মাঝে। মেলার পথে পথে এই বই নিয়ে ফিসফাস আমার কানেও এসেছিল, স্টলের নম্বর ভুল করায় কয়েকবার মেলায় এসে ঝড়ো বাতাসে সাকরাইনের ঘুড়ির মতো গোঁত্তা খেয়ে ঘুরেফিরে বাড়ি ফিরে ফিরেছিলাম। তাই ২০২২ এর মেলার শেষের দিনে বাঙ্গালা গবেষণার স্টল খুঁজে পেয়ে বিড়ালের কপালে শিকে ছিঁড়েছিল বটে।

এইবেলা স্বীকার করে নেওয়া ভাল, মারিস কন্দের লেখনীর থেকেও বেশি লোভ লেগেছিল ভাষান্তরকারীর নামে- রওশন জামিল। এই নামটা একটা সময় আমার বুকশেলফের পেপারব্যাকের তাক ভারী করে ছিল। তাঁর লেখায় শৈশবের কল্পনায় রঙ চড়েছে, তারুণ্যের জীবনে দিকনির্দেশনা দিয়েছে, এমনকী যৌবনেও পাশে থেকেছে অবিরাম। বাস্তব জীবন খুব দুরূহ হয়ে উঠলে এখনো তাঁর লেখাতেই ডুব দিই। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের 'ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি' তাঁর অনুবাদেই পড়েছি। সেই স্বাদ এখনো জিহ্বার ডগা ছাড়তে নারাজ। রওশন জামিলের কলমের স্বাদের লোভ এড়ানো আমার পক্ষে দুস্কর।
সেলেম আর ডাইনি এই নিয়ে আলোচনা অনিঃশেষ। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন মিথ, মিথলজি কিংবা জাদুর ব্যাপারে ক্লাস নিই, তখন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে কেউ একজন বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়িয়ে সেলেমের উইচট্রায়াল নিয়ে কথা তুলবেনই। সেলেম নিয়ে ভারী ভারী ইতিহাসের আলোচনা, সেই সময়ের অনাচার সেসব নিয়ে এন্তার অ্যাকাডেমিক বোলচাল হয়েছে। তবে অ্যাকাডেমির যেটা খামতি, সেটা হলো উঁচু থেকে দেখা, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে সমাজ বাস্তবতার প্রভাব সেটার বেলায় অ্যাকাডেমিয়ার নৈবচ নৈবচ। সেখানেই আমি তিতুবার প্রবেশ।

উপন্যাসের ব্যাপারে আমি খুঁতখুঁতে- প্রথম লাইন, প্রথম প্যারাগ্রাফ আর প্রথম পৃষ্ঠা- এই তিন অপছন্দ হলেই ওটা তাকে ফেলে আমি উলটো দিকে হাঁটা ধরি। রওশন জামিল আর মারিস কন্দের নামও আমাকে সেই কাজে বিরত রাখতে পারেনি। প্রথম লাইন পড়ার পরেই আমি টোপ গিলেছি, আগ্রাসন থেকে মানুষের জন্ম হয় তার বাকি পরিক্রমা; আমি পড়বোই। দাম মিটিয়ে, বাঙ্গালা গবেষণার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে স্টলের সামনে থেকে নিষ্ক্রান্ত হলাম। ঘাড় গুঁজে রইলো আমি তিতুবায়।
পরের সাতদিন ঘাড় গুঁজেই রইল, বাড়ি থেকে ক্লাস, সেখান থেকে আড্ডা, ফেরার পথে বাসে- সবখানেই আমার সাথী আমি তিতুবা।

মারিস কন্দের লেখা আমি এই প্রথম পড়ছি, তাও অনুবাদে। একবারের জন্যও ভিনভাষার লেখার বাংলা রূপ পড়ছি মনেই হয়নি। সে মুনশিয়ানা অবশ্যই রওশন জামিলের। বইয়ের মলাট, বাঁধাই আর প্রুফ রিডিং একেবারে উঁচুদরের, ছাপাখানার ভূতকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা বেশ দুরূহ। ক্কচ্যিৎ সে মাথাচাড়া দিয়েছে বটে, সেটা একেবারেই নগণ্য। হালকা বাদামি রঙের কাগজ, পড়তে সুবিধা হয় দারুণ।

এই পুরো বইতে সংলাপের ব্যবহার দুর্দান্ত, অঞ্চলভেদে লোকের মুখে আঞ্চলিকতার অলংকারের ব্যবহার। এমনিতে বাংলা উপন্যাসের সংলাপে মাটির ভাষার অভাব প্রকট। যেন সব চরিত্র নিখুঁত ব্যকরণ আর উচ্চারণে কথা বলার বিষম প্রতীজ্ঞা করেছে। আমি তিতুবাতে এই ব্যতিক্রম দেখে আমার পঠন শান্তি হয়েছে। এমনকী, কৃষ্ণাঙ্গ দাসের মুখে ফর্সা মালিকদের 'শাদাইয়া' ডাকের ভেতরে আমি মাটির সোঁদা গন্ধ আর অবজ্ঞা পেয়েছি।


উপন্যাসের কাঠামো যদি বলি, তাহলে তিন অ্যাক্টের একটা হিরোজ জার্নি। কন্দের এই গল্পের হিরো বা নায়িকা তিতুবা। এক শ্বেতাঙ্গের আগ্রাসনে যার জন্ম। প্রতিটা শব্দে কন্দে যে গাথা বুনেছেন তাতে একটা কথাই মাথায় আসে বারংবার: জন্মই তিতুবার আজন্ম পাপ। তিতুবার মা আবেনা, আর তার পালকপিতার সম্পর্কে আমরা দেখতে পাই বন্দি মানুষের সমাজ বাস্তবতা। দাসত্বের জীবন আর আগ্রাসন কীভাবে একজন মায়ের কাছে তার সন্তানকেও ঘৃণার পাত্রে রূপান্তরিত করে সেটাও দেখিয়েছেন মারিস কন্দে। অলংকারের ছড়াছড়ি কম, তবুও এই নিরাভরণ শব্দে আশান্তি জনগোষ্ঠী, বারবেডোজের মাটি আর শ্বেতাঙ্গদের আগ্রাসনের বাস্তবতা ইতিহাসের চেয়েও বাঙ্ময় হয়ে আমাদের সামনে ধরা দেয়।

উপন্যাসের প্রথম অধ্যায় শেষ হয় তিতুবার দাস হয়ে সেলেম যাত্রার মধ্যে দিয়ে। তার আগে হিরোজ জার্নি অতিপ্রাকৃত জাদুটোনা আর তন্ত্রমন্ত্রের শিক্ষা হয় মামা ইয়াইয়ার হাতে। তারপরে চলতে থাকে তিতুবার অভিযাত্রা। মালিক পরিবারের কর্তা যাজককে অপছন্দ হলেও তার পরিবারের বাকি সদস্যদের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে তিতুবা। উপন্যাসের এই পর্যায়ে ধর্মান্ধতার ভয়াবহতা সরল ভাষায় তুলে ধরেন মারিস কন্দে। ধর্মান্ধ ব্যক্তি শুধু তার আশেপাশের না, নিজের জন্যও যে বড়রকমের ক্ষতির কারণ তা বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন ঘটনাবলীর মাধ্যমে আমাদের সামনে মেলে ধরেছেন কন্দে। ধর্মের অন্ধ অনুসরণের পেছনে রাজনীতি, ক্ষমতার লোভ আর অর্থলিপ্সার বিবরণ যেন না বলেও বলে গিয়েছেন লেখক। দ্বিতীয় অধ্যায়ের শেষে আমরা দেখতে পাই ধর্মান্ধতা তার অন্ধ অনুসারীদেরও সর্বনাশ করে ছাড়ে। তবে তার আগে বলি হতে হয় তিতুবার মতো নিরপরাধ আর পরোপকারী মানুষদের, নিষ্পাপ শিশুদের।

তৃতীয় অধ্যায়ের শুরু নানা ঝড়ঝাপ্টা সামলে তিতুবার নিজভূমে ফেরত আসার মধ্য দিয়ে। সেখানে এসেও তিতুবা জড়িয়ে পড়ে নানাবিধ মানবিক সম্পর্কের জালে। দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার সংগ্রামেও জড়িয়ে পড়ে সে, যদিও উপন্যাসের দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা দেখতে পাই তিতুবা শ্বেতাঙ্গের দাসত্বের শেকল থেকে মুক্তি পেয়েছে, কিন্তু বাকি সবাইকে বাদ রেখে, বারবেডোজকে বন্দুক আর 'শাদাইয়াদের' হাতে বন্দি রেখে মুক্তি অর্থহীন। তিতুবার এই সংগ্রামে অংশ নেবার পরিণতি হয় বেঈমানীতে। দাস থাকার ফলে দাসেদের ভেতরেও চিন্তার বদল দেখা যায়, তারাও হয়তো দাস হয়ে স্বাধীন থাকতে চায় তাদের শ্বেতাঙ্গ প্রভূদের নিচে।


পুরো গল্পে, লেখক অতিপ্রাকৃত ঘটনা দিয়ে উপন্যাসের বিভিন্ন ঘটনাবলীকে ফোরশ্যাডো করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে সেট আপ আর পে-অফ করার ক্ষেত্রেও অতিপ্রাকৃত ঘটনাবলীকে ব্যবহার করেছেন মারিস কন্দে। ক্যারিবিয় অঞ্চলের লেখক যেমন: মার্কেজ কিংবা আর্হেন্তিনার বোর্হেস অথবা হাল আমলের চিলির লেখক ইসাবেল আয়েন্দে; তাঁদের মতো বর্ণনা যেন সযত্নে এড়িয়েই গেছেন মারিস কন্দে।

উপন্যাস মারিস কন্দের লেখা- তাতে দাসপ্রথা, মানুষের লোভ আর শঠতা, ধর্মান্ধতা আর তার অপব্যবহার আর মুক্তির কামনা সবকিছু উঠে এসেছে তিতুবার গল্পে-জবানিতে। কিন্তু সেই গল্পকে বাংলায় প্রাণ দেবার পর্বতপ্রমাণ দায়ভার রওশন জামিল আর বাঙ্গালা গবেষণা ঘাড়ে নিয়েছেন। গল্পের ভেতরে ভেতরে শ্লোক, কবিতা, আশান্তি জনগোষ্ঠীর গান, দাসদের দ্রোহ সঙ্গিত- সবগুলোর বাংলা হয়েছে। তবে, পড়বার সময় ভাষান্তর পড়ছি এরকম মনে না হলেও, বারংবার মনে হয়েছে এই উপন্যাস বাংলায় লেখা উপন্যাস না। অবশ্য সেটি অনুবাদকের সিদ্ধান্তও হতে পারে, হয়তো তিনিই চাননি আমি তিতুবা পড়ে কারো মনে হোক এটি বাংলারই সাহিত্য। আমি বুভুক্ষের মতো গিলেছি তিতুবা, সেলেমের কালো ডাইনি। মারিস কন্দের লেখা আরো ঘাঁটাঘাঁটি করার শখ বেড়েছে, বাংলায় পেলে শান্তি পাবো।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক