অমর্ত্য সেনের মর্ত্য-ভাবনা: অর্থনীতি, ইতিহাস ও সমাজ-রাজনীতি

ফয়জুল ইসলাম
Published : 5 Jan 2022, 05:40 PM
Updated : 5 Jan 2022, 05:40 PM


অমর্ত্য সেনের মর্ত্য-ভাবনা: অর্থনীতি, ইতিহাস ও সমাজ-রাজনীতি
সনৎকুমার সাহা
কথাপ্রকাশ, ঢাকা
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২১
পৃষ্ঠা: ১১৮
মূল্য: টাকা-২০০

'অমর্ত্য সেনের মর্ত্য-ভাবনা: অর্থনীতি, ইতিহাস ও সমাজ-রাজনীতি' নামের বইটিতে বিশ্ববরেণ্য অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের সাতটি বই (যার ভেতরে দু'টো বইয়ের সহলেখক আরেক স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ জাঁ দ্রেজ)-এর ওপরে আলোচনা করেছেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, প্রাবন্ধিক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের 'বঙ্গবন্ধু-চেয়ার' অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা। মোটা দাগে বলতে গেলে, এই বইগুলোর বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে অমর্ত্য সেনের উন্নয়ন-দর্শণ বিষয়ক মৌলিক চিন্তাভাবনা। সনৎকুমার সাহা তাঁর বইতে অমর্ত্য সেনের উন্নয়ন-দর্শণের নির্যাসটুকু তুলে ধরেই ক্ষান্ত হননি, তিনি কোথাও কোথাও অমর্ত্য সেনের সাথে একমত হয়েছেন, আবার কোথাও কোথাও দ্ব্যর্থহীনভাবে তুলে ধরেছেন তাঁর দ্বিমতের দিকগুলোকে।

পয়লাতে বলে নেই, অমর্ত্য সেনের কল্যাণ-ভাবনার মূল সুর পূর্বাপর চিন্তাবিদদের থেকে খানিকটা আলাদা। তিনি দেখিয়েছেন, ব্যক্তির আয় বা সম্পদ মুখ্য নয়, দ্রব্যসামগ্রী ভোগ থেকে সে যে উপযোগ লাভ করছে সেটিও জরুরি নয়Ñ দেখার বিষয় হলো যে সেই ব্যক্তি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কতটুকু মূল্য সংযোজন করতে পারছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যক্তির মূল্য সংযোজন করতে পারাটিকে তিনি 'সক্ষমতা' (ক্যাপাবিলিটি) নাম দিয়েছেন। ব্যক্তির সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে সে তথাকথিত প্রতিযোগিতামূলক বাজারে দ্রব্যসামগ্রী ও সেবা উৎপাদন করতে পারবে; বিনিময়ে বন্টন-ব্যবস্থার মাধ্যমে সে পেয়ে যাবে তার অবদানের ন্যায্য হিস্যা। এ ধরনটির সুবিধে হলো যে এই ব্যক্তির সক্ষমতাকে গাণিতিকভাবে পরিমাপ করা যাচ্ছে, যেমন, তার অর্জিত আয়ের পরিমাণ কতটুকু, তার শরীর-স্বাস্থ্য কেমন, তার অর্জিত শিক্ষার পর্যায়টি কেমন, সে কেমন বাসস্থানে থাকছে ইত্যাদি। তিনি বলছেন, মানুষের সক্ষমতার মান কম থাকবার অর্থ দারদ্র্যিরেখার নিচে সেই ব্যক্তির পড়ে থাকবার সম্ভাবনা রয়েছে। মানুষের এসব সক্ষমতা বৃদ্ধিই হলো গিয়ে অর্থনেতিক উন্নয়ন। আমরা জানি, নিওক্ল্যাসিকাল অর্থনীতিবিদেরা প্রচলিত বাজার-ব্যবস্থার অগ্রগণ্যতা প্রমাণ করবার জন্য যথেষ্ট বৌদ্ধিক ব্যায়াম করেছেন। অন্য দিকে, বাজার-ব্যবস্থার বিরোধী না হলেও বাজার-ব্যবস্থার ব্যর্থতার বিষয়ে অমর্ত্য সেন সজাগ। বাজার-ব্যবস্থা যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ন্যায়সঙ্গত সামাজিক বন্টন নিশ্চিত করতে পারবেই– এ বিষয়ে তাঁর কোনও রোমান্টিসিজম নেই। তাই তাঁর কাছে কেবল প্রবৃদ্ধি অর্জনই মুখ্য নয়, প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সতর্কভাবে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেয়াটাও জরুরি, অবশ্য তা বাজার-ব্যবস্থার খাপের ভেতর থেকেই। অমর্ত্য সেনের সামাজিক ন্যায় ও বঞ্চিত মানুষদের জন্য অগ্রাধিকার নির্ধারণ সংক্রান্ত চিন্তাভাবনার শুরু এখান থেকেই। তাঁর সাথে সুর মিলিয়ে সনৎকুমার সাহা বলছেন, সামাজিক ন্যায় তবে বিমূর্ত কোনও ধারণা হিসেবে থাকছে না– তা নৈর্ব্যক্তিকভাবে বিচার করা যায়, সেখানে নানান বিকল্প খুঁজে নেয়া যায়, বিকল্প পন্থা থেকে লক্ষ্যভিক্তিক বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচি নির্ধারণ করাও সম্ভব বলে। অমর্ত্য সেন আমাদেরকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সামাজিক ন্যায়কে বাস্তবে রূপ দেবার জন্য মুক্ত আলোচনা ও যৌক্তিক বাদানুবাদের পরিবেশ থাকা চাই এবং সে কারণেই গণতন্ত্রের বিকাশের প্রয়োজন রয়েছে। এমত শর্তকে সমর্থন দিচ্ছেন সনৎকুমার সাহা, আবার জায়গায় জায়গায় দ্বিমতও প্রকাশ করছেন তিনি।

সনৎকুমার সাহা মন্তব্য করছেন, মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিবেচনা এক অর্থে সংকীর্ণ কেননা এখানে অমর্ত্য সেন ব্যক্তির উপযোগ এবং পছন্দ-অপছন্দকে আমলে নেননি। ব্যক্তি হয়ত কেবল অনাহার, অপুষ্টি, অশিক্ষা ইত্যাদি প্রতিবন্ধকতগুলোর নিরসনেই সন্তুষ্ট থাকে না, আরও অনেক চাহিদা থাকতেই পারে তার, যেমন, ধরা যাক, বাজার-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য তার একটি মোবাইল ফোনের প্রয়োজন পড়ল। কিন্তু সীমিত সংস্থানের প্রেক্ষিতে তার এমন বিবিধ চাহিদা হয়ত অপূরণীয়ই রয়ে যাচ্ছে! দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো: ধরা যাক, তার অনাহার, অপুষ্টি, অশিক্ষা ইত্যাদি অভাব নিরসনের জন্য কর্মসূচী নেয়া গেল। তারপর প্রশ্ন উঠতে পারে, কোন পর্যায় পর্যন্ত তার সক্ষমতা বৃদ্ধির এসব উন্নয়ন-কর্মকাণ্ড চালু থাকবে! আজীবন? নিশ্চয় তা হতে পারে না কেননা একটা পর্যায়ে এসে তাকে দারিদ্র্যের রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি পেতেই হবে। তবে আমরা লক্ষ করি, এই জগতে দরিদ্র্য ও বঞ্চিত মানুষের সংখ্যা যদি হ্রাস না পায় সেক্ষেত্রে অমর্ত্য সেনের প্রস্তাবমতো মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির অভিযান অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে থাকাটা বিচিত্র নয়। অনেকেরই লাভ তা'তে করেÑ উন্নয়ন-সহযোগীদের আমলাদের লাভ, রাজনীতিবিদদের লাভ, দেশীয় আমলাদের লাভ– তারা সকলেই বিভিন্ন অনুপাতে উদ্বৃত্ত মূল্যের ভাগিদার হয়ে যাচ্ছেন!

এখন ধরে নেয়া যাক যে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া 'ন্যায়'-কে অনুসরণ করবে। অমর্ত্য সেন যাকে 'ন্যায়' বলছেন, সনৎকুমার সাহা তাকে বরং বলছেন 'সঙ্গত' পর্যায় (যুক্তিনির্ভর)। 'ন্যায়'-এর মানদণ্ড তৈরি করে থাকে সমাজ যা অযৌক্তিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে নানান কারণেই। সনৎকুমার সাহা প্রশ্ন তুলছেন যে এই ন্যায়ের মানদণ্ড তবে কীভাবে তৈরি হবে, তা'তে নিরপক্ষেতা থাকবে কতটুকু। অমর্ত্য সেন বলছেন, বহুস্বর থেকেই বিবর্তিত হয় জনমত যা কিনা ন্যায়ের মানদণ্ডের যুক্তি তৈরি করে দেয়। সনৎকুমার সাহা লক্ষ করছেন যে বাস্তবে কোনও স্বয়ংক্রিয় ভাবনার ওপরে ভিত্তি করে জনমত গড়ে ওঠে না– 'প্রত্যেকটি প্রতিনিধির পেছনে কাজ করে তার হয়ে ওঠার পরিমণ্ডল, তার স্বার্থবাহী বৃত্তের হালচাল; নিজস্ব তরক্কির ফন্দিফিকির– ফিচলেমিও ঢুকে যায় তাদের সঙ্গে।' আবার আমরা দেখছি, ব্যক্তির অবস্থার পরিবর্তনেও ন্যায়ের মান বদলে যেতে পারে। এভাবেই ন্যায়ের মানদণ্ড তখন আর নিরপেক্ষ কিম্বা স্থির থাকছে না। অর্থাৎ, সমাজের বহুস্বরের ভাবনা মানুষের জন্য সঙ্গত অধিকারকে নিশ্চিত না-ও করতে পারে। সনৎকুমার সাহা তাই বলছেন, 'অসংখ্য বন্ধন ও ইচ্ছার মুক্তির সমন্বয়ে উত্তম কোনো ন্যায়ের পথ এই বইতে আমরা সুনির্দিষ্ট হতে দেখি না। শেষপর্যন্ত তা মহৎ আপ্তবাক্যেই পরিসমাপ্ত হয়।'

অমর্ত্য সেন মনে করেছেন, মানুষের সক্ষমতা-উন্নয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবার প্রয়োজন রয়েছে। সেই প্রক্রিয়াতে গণতান্ত্রিক পরিবেশে সমাজের সকলেই নিরপেক্ষ দর্শক হিসেবে একই কায়দাতে চিন্তাভাবনা করবে। কিন্তু সনৎকুমার সাহা এমন একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশের খাপে বিপদই দেখেছেন। যদি সমাজের মানুষের বুঝবার, জানবার সীমায় বিভিন্নতা দেখা দেয়, তখনই একটি সমস্যা উদ্ভ‚ত হতে পারে: সমাজের বেশির ভাগ মানুষের চিন্তাভাবনা যদি উন্নয়নের সহায়ক না হয়, যদি তাদেরকে আচ্ছন্ন করে থাকে অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কার তবে তারা নিজেদের অবস্থান থেকে যতই নিরপেক্ষভাবে সক্ষমতা বৃদ্ধির পন্থা নিয়ে ভাবুক না কেন, তাদের মিলিত ভাবনায় ভুল হতে পারে, 'অন্যায় ন্যায়ের টুঁটি চেপে ধরতে পারে'। সনৎকুমার সাহা স্বভাবতই মেনে নিয়েছেন যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ছাড়া বহুমত, বহুপথের সম্মিলন সম্ভব নয়। তবে তিনি মন্তব্য করেছেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ কখনও কখনও বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণা (যেমন, কোনও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা বা নীতিলুন্ঠনের কারণে)-কে অনুমোদন দিয়ে ফেলতে পারে বা বিবিধ ভ্রান্ত ধারণার সাথে আপোষও করতে পারে।

সনৎকুমার সাহা ভাবছেন, মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনও ন্যায়সঙ্গত কর্মসূচী নেবার আগের পর্যায়ে কেউ না কেউ অর্থনৈতিক বৈষম্যজনিত সুযোগের অসমতার কারণে উন্নয়নের অভিযাত্রা থেকে বাদ পড়ে গিয়ে থাকতে পারে। কাজেই সক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচী গ্রহণ করবার পরেও তারা সুযোগপ্রাপ্তির দিক থেকে এগিয়ে থাকা মানুষদের প্রতিতুলনায় পিছিয়েই থাকছে। আমরা মনে করি, এমন একটি পরিস্থিতিকে নিশ্চয় ন্যায়োচিত পদঃক্ষেপ বলা যাবে না! তবে সনৎকুমার সাহা মন্তব্য করছেন, এ-ও ঠিক, কোনও পরিবর্তনের জন্য কাউকে না কাউকে মূল্য দিতেই হয়! তবে 'বর্তমানের কষ্ট দিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্নপূরণ'-কে যথার্থ বলে মনে করেন না তিনি। এমন একটি সমস্যা থেকে উত্তরণের পথটি নিয়ে আলোচনা করেননি অমর্ত্য সেন।

মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনও ন্যায়সঙ্গত কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য বাজার-ব্যবস্থার প্রচলিত ইনিস্টিটউিশনগুলোর ওপরেই আস্থা রেখেছেন অমর্ত্য সেন। এই ভাবনার সমালোচনা করে সনৎকুমার সাহা বলছেন যে এ ক্ষেত্রে ইনিস্টিটউিশনের চেহারা কেমন হবে, তা কতটুকু সৃজনশীল হতে পারবে সেটিও ভেবে দেখা দরকার কেননা ইনিস্টিটউিশনই উৎপাদন ও বন্টনের ব্যবস্থা করে থাকে। তাই তিনি মন্তব্য করছেন, 'অমর্ত্য সেনের প্রদর্শিত পথে কিছু সুফল আশা করা অযৌক্তিক নয়। কিন্তু পায়ের তলায় সোশাল কন্ট্রাক্টের শক্ত জমি না থাকলে তা অনিশ্চিতই থেকে যাবে। সেটা কোনো শ্রেয় সমাধানের আশা উজ্জ্বলতর করে না।' সনৎকুমার সাহার মতো করে আমরাও মনে করি, দরিদ্র্য মানুষদের উন্নয়নের জন্য অভিযাত্রায় সামজের অপরাপরদেরকে সম্মিলিতভাবে মাঠে নামতে হয়, প্রয়োজনে বিসর্জন দিতে হয় ব্যক্তিস্বাধীনতাÑ কেবল সক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচীর বাস্তবায়নই সেখানে যথেষ্ট থাকছে না।

এতক্ষণ আমরা যে আলোচনা করলাম তা'তে অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানুষের সক্ষমতা বা সামর্থ্যরে একটি ফাংশন– মানুষের সক্ষমতা বা সামর্থ্যরে বাড়া-কমার সাথে সাথে পরিবর্তিত হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পর্যায়। সনৎকুমার সাহা বলেছেন, মানুষের সামর্থ্যকে গতিময় একটি চলরাশি হিসেবেও দেখবার প্রয়োজন রয়েছে। আজ সামর্থ্য উন্নয়নের জন্য যে মানকে আমরা নির্ধারণ করে নিচ্ছি তা আগামী কালকে পরিবর্তিত হয়ে যাওয়াটা বিচিত্র কিছু নয়! সেখানে সামর্থ্য নিজেই একটি ফলাফল যার অনেক নিয়ামক থাকতে পারে, যেমন, উৎপাদন কুশলতার মাত্রা, শিক্ষার পর্যায়, প্রযুক্তির উন্নয়ন ইত্যাদি। প্রযুক্তির উন্নয়ন ওপরে তিনি জোর দিয়েছেন বেশি করে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন বৈপ্লবিক উদ্ভাবনের ফলে প্রত্যন্ত গ্রামে বসেও সারা বিশ্বকে হাতের মুঠোয় পাওয়া যাচ্ছে এবং খানিকটা হলেও দূর হচ্ছে অপ্রতিসম তথ্য (আসিমেট্রিক ইনফরমেশন)-এর সমস্যা, উচ্চফলনশীল শস্য মানুষের ক্ষুধা আর অপুষ্টির বিধান দিচ্ছে এবং পেনিসিলিনের আবিষ্কার বাড়িয়ে দিচ্ছে মানুষের গড় আয়ু। তিনি আবারও বলছেন, মানুষের সামর্র্র্থ্য যদি গতিময় চলরাশি হয়ে থাকে তবে তার উন্নয়নের সাথে তাল মেলাবার মতো গতিময় ইনিস্টিটউিশনও চাই। এ কথা আমরা জানি, সময়ের সাথে সাথে ইনিস্টিটউিশনের রূপও বিবর্তিত হওয়া প্রয়োজন– স্বয়ংক্রিয়ভাবে না হলেও, নির্দেশিত পথে। অমর্ত্য সেন আমাদেরকে এমন কোনও সমাধান দিচ্ছেন না; প্রতিযোগিতামূলক বাজার-ব্যবস্থার উৎপাদন ও বন্টনের প্রথাগত অঙ্গের ওপরে কিছুটা হলেও আস্থা রেখেই বসে আছেন তিনি। এখানেই চলে আসছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অপুষ্টি ইত্যাদি নিরসনে পরিকল্পিত উদ্যোগের প্রশ্ন। বাজার-ব্যবস্থার ওপরে আস্থাশীল আর সব নিওক্লাসিকাল অর্থনীতিবিদদের মতো করেই অমর্ত্য সেন অবশ্য চাননা যে রাষ্ট্রের নাকটি খুব বেশি লম্বা হোক!

অমর্ত্য সেনের মতে, ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দকে মুখ্য না ধরে আবালবৃদ্ধবনিতা সকলেরই সক্ষমতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করবার প্রয়োজন রয়েছে। এই প্রত্যাশা থেকেই অমর্ত্য সেন যুক্তি দেন যে প্রতিটি মানুষের অধিকারহীনতা, যেমন, অনাহার, অপুষ্টি, অশিক্ষা ইত্যাদি প্রতিবন্ধকতা নিরসনের জন্য গণোদ্যোগ গ্রহণ করতে হয়। প্রচলিত বাজার-ব্যবস্থা স্বভাবগতভাবে স্বংয়ক্রিয় নয় বলেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিটি মানুষের অধিকারহীনতার মীমাংসা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। সক্ষমতা ও অধিকারের উন্নয়নে গণোদ্যোগের পাশাপাশি এখানে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ও তাদের অংশীদারিত্ব তাঁর কাছে গুরুত্ব বহন করে।

অমর্ত্য সেন যাকে 'ফ্রিডম' বা 'স্বাধীনতা' বলছেন সনৎকুমার সাহার কাছে তার দ্যোতনা আরও অনেক বেশি; তিনি মনে করেন, ফ্রিডমের ধারণা আসলে মানুষের অধিকারের সাথে সম্পর্কিত। এবাদে তিনি ফ্রিডমের ব্যবহারকে, যদি তা যথেচ্ছ হয়, নিয়মতান্ত্রিক করবার পক্ষেও যুক্তি দিয়েছেন। এর কারণও আছে: আপাতদৃষ্টে যেসব দেশগুলোতে প্রথাগত গণতন্ত্রের সব বৈশিষ্ট্য বিরাজ করছে সেখানেও আমরা সাম্প্রদায়িক শক্তির মতো অপশক্তির জোরদার উত্থানই দেখতে পাই। সিংহভাগ এজেন্টদের কুশ্রী পছন্দ প্রকাশের বা অনুশীলনের এই স্বাধীনতাকে নিশ্চয় নৈতিকভাবে অনুমোদন দেয়া যায় না! অমর্ত্য সেন যেমন বলছেন যে সকলের অধিকার পূরণই উন্নয়ন, এক্ষেত্রে নিশ্চয় সিংহভাগ জনগোষ্ঠীর পছন্দ একটি দেশের ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন-কর্মকাণ্ডকে পা ধরে অন্ধকারে টেনে নিয়ে যেতে পারে! সনৎকুমার সাহাও বলছেন, ব্যক্তির বিবিধ অধিকার বাস্তবে চিত্রিত করবার জন্য কর্মতৎপরতার প্রয়োজন রয়েছে এবং সেখানে বঞ্চিত গোষ্ঠী হিসেবে নারী রয়েছে, শিশু রয়েছে, শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি রয়েছে। তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য যে সাংগঠনিক কাঠামোর প্রয়োজন রয়েছে তা'তে জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক সংগঠনের ভূমিকাও ফেলনা নয়। তবে কোন ধরনের গণসংগঠন মানুষের সক্ষমতার উন্নয়নে সহায়ক হবে? সনৎকুমার সাহা মনে করেন, এনজিওদের মাধ্যমে বিদেশি পুঁজি যেভাবে গ্রামীন উৎপাদনের কাঠামোতে ঢুকে পড়ছে তা নিয়ে ভাববার অবসর রয়েছে বৈকি! এর চাইতে নিশ্চয় ট্যাক্সপেয়ারদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলার অবদান দিয়ে মানুষের সক্ষমতার উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগই শ্রেয়! সনৎকুমার সাহার এই প্রতীতী আমাদেরকে পরিকল্পিত উন্নয়নের দিকে ফের দৃষ্টি ফেরাতে পরামর্শ দেয়– বাজারের কোনও অদৃশ্য হাত নেই, আর তা নেই বলেই বাজারকে কাজ করবার জন্য সহায়তামূলক হাতিয়ারের প্রয়োজন পড়ে এবং এ কারণেই সেখানে গণপ্রশাসনের মানবিক দায়িত্ব অস্বীকার করা যায় না। পক্ষান্তরে অমর্ত্য সেন চাইছেন, সরকার যেন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে খুব একটা বেশি নাক না গলায়। বাজারের অদৃশ্য হাতের ওপরে মিল্টন ফ্রিডম্যানের মতো প্রথাগত সব অর্থনীতিবিদরা বরাবরই যুক্তি দিয়ে আসছেন– এ কথা আমাদের অজানা নয়। তবে তাদের চাইতে অবশ্য বাজার-ব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয়তার মিথের ওপরে অমর্ত্য সেনের আস্থা অনেক কম! সে কারণে তাঁকে শ্রদ্ধার জয়াগাতেই রেখেছেন সনৎকুমার সাহা। তবু বলতেই হয়, বাজারে চাহিদা এবং জোগানের ভেতরে যে ফারাক সৃষ্ট হয় (তথ্যপ্রাপ্তির অসমতা, একচেটিয়া কারবার বা ফ্রি দুর্নীতি যার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে) তা দূর করবার জন্য সুচিন্তিতভাবে বাজারের অংগগুলোকে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে। পরিকল্পিত উন্নয়ন থেকে তৃতীয় বিশ্বের যেসব দেশ দূরে চলে গেছে তাদের পরম ও আপেক্ষিক দারিদ্র্য-পরিস্থিতির কতটুকু উন্নতি ঘটেছে তা বস্তুনিষ্ঠভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে বলে আমরা মনে করি।

বাজার-ব্যবস্থায় ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বিবিধ সামাজিক অন্যায় নিরসনে গণসংগঠনের ভ‚মিকার ব্যাপারে দ্রেজ এবং সেন দ্ব্যর্থহীনভাবে আলোকপাত করেছেন। গণোদ্যোগ বলতে তাঁরা কেবল রাষ্ট্রীয় উদ্যোগকেই বোঝাননি, সেই সাথে জনগণের অংশীদারিত্বে গড়ে তোলা সংগঠনের ওপরেও তাঁরা গুরুত্বারোপ করেছেন। গণপ্রশাসনের ভ‚মিকা প্রসঙ্গে তাঁরা বলছেন যে ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের পেছনে মূলত দায়ী ছিল খাদ্য-সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যর্থতা। সনৎকুমার সাহা লক্ষ করছেন, তখন বাংলার দরিদ্র্য ও অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এমনিতেই সীমিত ছিল। সেই পরিস্থিতির ওপরে খাঁড়ার ঘা হয়ে নেমেছিল খাদ্য-সরবরাহ ব্যবস্থার বিবিধ সমস্যা যা প্রায় তিরিশ লক্ষ অসহায় মানুষকে তখন ঠেলে দেয় মৃত্যুর দিকে। বার্মা থেকে খাদ্যশস্যের আমদানি করা যেত বৈকি! কিন্তু তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকদের নির্মম নীতির কারণে তা বন্ধ হয়ে ছিল। অর্থাৎ ঘুরেফিরে ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের পেছনে গণপ্রশাসনের জাড্যতাকেই দায়ী করা যায়। সেটা করেছেনও অমর্ত্য সেন। গণপ্রশাসনের কার্যকর ও সময়োচিত উদ্যোগ তাই ক্ষুধা, অপুষ্টি ও দারিদ্র্য নিরসন এবং বৈষম্যহীন ও সমান সুযোগের একটি পরিবেশ তৈরিতে জরুরি হয়ে পড়ে। তাঁরা এ-ও বলছেন, গণপ্রশাসন এবং গণসংগঠনের স্বরূপটি কেমন হবে তা নির্ভর করে গণসচেতনতার মানের ওপরেই যেখানে গণসচেতনতা গড়ে ওঠবার পেছনে কাজ করে থাকে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার সন্নিবেশ। সনৎকুমার সাহাও বলছেন, গণপ্রশাসন এবং গণসংগঠন ক্ষুধা, অপুষ্টি আর দারিদ্য নিরসনে মানুষের সক্ষমতার ফ্রন্টেয়ার বা পরিসর বিস্তৃত করতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তা ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুইই হতে পারে যা কিনা শেষবিচারে নির্ভর করে গিয়ে গণসচেতনতার ওপরেই। তিনি মন্তব্য করছেন, 'যা কল্যাণকর, তা আপনা থেকে সবার অনুমোদন পাবে– এ ধারণা ভ্রান্ত।' অমর্ত্য সেনের মতো করেই তিনি মনে করেন, শিক্ষা, বিশেষত, প্রাথমিক শিক্ষার মানই গণসচেতনতার মূল নিয়ামক।

ক্ষুধা, অপুষ্টি, দারিদ্র্য– ইত্যাকার অধীকারহীনতা মেরামতের জন্য সমাধান দিতে গিয়ে তাঁরা অবশ্য প্রচলিত বাজার-ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করেননি। তাঁরা মনে করছেন, ক্ষুধা, অপুষ্টি, দারিদ্র্য ইত্যাদি অধিকারহীনতা নিরসন করতে প্রচলিত বাজার-ব্যবস্থার ওপরে নির্ভর করাটা যেতেই পারে। বাজার-ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় নয় বলে, তা আয়বন্টনের ন্যায্যতা বিধানের জন্য সবসময় যথেষ্ট নয় বলেই সেখান থেকে গণপ্রশাসনের ইতিবাচক ভ‚মিকার পাশাপশি সূচিত হয় গণসংগঠনের ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার। গণসংগঠনের ভ‚মিকা প্রসঙ্গে অমর্ত্য সেন মনে করছেন যে ভারতে গণমানুষের জন্য সমান সুযোগের সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে বিভিন্ন সরকারের ব্যর্থতা প্রকটভাবে চোখে পড়ে। তিনি বরাবারই বলে আসছেন, এই ব্যর্থতার মূলে কাজ করেছে অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ। এ জায়গাতে সনৎকুমার সাহা পাল্টা যুক্তি দিয়েছেন যে ভারতে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ এবং বড় আকারের বিনিয়োগে যে সব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা নিশ্চয় দারিদ্র্য নিরসনে ইতিবাচক ভ‚মিকা রেখেছে। কাজেই ভারতের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগকে খাটো করে দেখবার কোনও সুযোগ নেই। আমরা মনে করি, ভারতের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারেই, কিন্তু তাদের পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ দারিদ্র্য-বান্ধবই ছিল। কেনিসিয় ধারণা অনুযায়ী বিশাল বিনিয়োগের ছিঁটেফোঁটা শেষতক প্রান্তিক মানুষের হাতে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। সমস্যাটি ছিল ইনিস্টিটিউশন নিয়ে– কলকারখানা জাতীয়করণ করা হলেও প্রচলিত ইনিস্টিটিউশন সেই যুগান্তকারী পদক্ষেপের সাথে তাল মিলিয়ে বিবর্তিত হতে পারেনি।

আমরা জানি, গত শতাব্দীর শেষভাগে ভারতে হিন্দুত্ববাদের উত্থান ঘটেছে যেখানে যুক্তির কোনও বালাই নেই, সংলাপেরও কোনও পরিবেশ নেই। তার কারণ হিসেবে অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন যে সুস্থ সংলাপের পরিবেশ বিনষ্ট হয়ে যাওয়াটাই এর কারণ। অথচ ইতিহাস বলছে, ভারতে বিভিন্ন মতের আদান-প্রদান ও জনগোষ্ঠীর সহাবস্থানের ঐতিহ্যই চালু রয়েছে আদি কাল থেকেই ('বাদ-প্রতিবাদ, সংলাপ, সহনশীলতা ও সমন্বয়ের ধারা')। ভারতে একনায়কতান্ত্রিক শাসনের কালগুলো বাদ দিলে বহুমত ও বহুপথের সংস্কৃতির ভিত্তিতেই এখানে নীতি নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে সনৎকুমার সাহা মন্তব্য করছেন, মুক্তচিন্তার মাধ্যমেই মৌলবাদ এবং একনায়কতন্ত্রের হুমকিকে রুখে দেয়া সম্ভব (মুক্তচিন্তা প্রকাশের জন্য ব্যক্তিকে অনেক মূল্য দিতে হয় নিশ্চয়!)। অমর্ত্য সেনের মতো করেই তিনি বলছেন, সমাজের সকলেই যদি স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে এবং সেই ভিত্তিতে যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জনমত গড়ে ওঠে তবে বিশেষ কোনও ব্যক্তি বা ব্যাক্তিগোষ্ঠীর নিষ্পেষণ আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবার সম্ভাবনাই বেশি। অবশ্য এটিও আমরা এখানে উল্লেখ করতে চাই, ব্যক্তি যদি স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে চায় তার জন্য গণতান্ত্রিক পরিবেশের প্রয়োজন। কোনও সরকার যদি মৌলবাদকে পরিতোষণ করে (সনৎকুমার সাহা 'রাষ্ট্রীয় আইনে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের নির্দেশনা বিধিবদ্ধ' করবার প্রবণতার কথা বলতে ভোলেনি) বা নীরব দর্শক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকে তখন ব্যক্তি তার স্বাধীন মতামত প্রকাশ করলে তার ওপরে নানান দিক থেকে নানান রকমের দমন-নিপীড়ন নেমে আসতেই পারে, প্রাণণাশ পর্যন্ত বিচিত্র নয়। এসব ঝুঁকির কথা আমাদের অজানা নয়। অমর্ত্য সেনের ধারণার প্রেক্ষিতে সনৎকুমার সাহা মৌলবাদের বিরুদ্ধে বলছেন যে, '… হিন্দুত্ববাদীরা রামকে যতই দেবতা বানাক, খোদ রামায়ণে তাঁর আচরণে কোথাও অতিমানবিকতার ছিঁটেফোঁটাও চোখে পড়ে না।' পরমতসহিষ্ণুতার অভাব ভারতে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত হয়ে পড়ছে যাকে কোনও মতেই ন্যায় বা সঙ্গত পরিণাম বলা চলে না। সনৎকুমার সাহা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, কবি শামসুর রাহমান আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের যাঁতাকলে পড়ে গিয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে ষাটের দশকের শেষপাদে লিখেছিলেন– 'আমি কথা বলতে চাই'। নির্ভয়ে মত প্রকাশ করতে পারার এই স্বাধীনতার অভাবও উন্নয়নের অন্তরায় বলে সনৎকুমার সাহা যুক্তি দিচ্ছেন।

অমর্ত্য সেনের পর্যবেক্ষণ মতে এই ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষদের আত্মপরিচয়ে বহুত্বের সমাবেশ রয়েছে। পরিচয়ের বিভিন্নতার কারণে মানুষের পছন্দ-অপছন্দের বেলাতে বিভাজন দেখা দিতে পারে, যে কারণে, উন্নয়ণের স্বার্থে, বিবিধ পছন্দ-অপছন্দের ভেতরে সমন্বয় সাধন করতে হয়। প্রক্রিয়াটি এমন: বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভেতরে চিন্তাভাবনার দেয়া-নেয়া চলে এবং আশা-আকাক্সক্ষা শেষতক একটি ভারসাম্যবিন্দুতে গিয়ে পৌঁছুবে বলে আশা করা হয়। সমন্বয়হীনতার বিপরীতে রয়েছে বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থের হানাহানি যা কিনা মানুষের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধা হয়েই দাঁড়াতে পারে। মোদ্দা কথা: কোনও একটি ভূখণ্ডের অধিবাসীদেরকে তাদের আত্মপরিচয় খুঁজে নিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উন্নয়নবিষয়ক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে হয়।

এ প্রসঙ্গে অমর্ত্য সেনের সাথে সুর মিলিয়েছেন সনৎকুমার সাহা। তবে তিনি বলছেন, একটি ভ‚খÐের মানুষের আত্মপরিচয়ে যে বিভিন্নতা থাকে তা সব সময় নঞ-অর্থক নয় কেননা সকলের চিন্তাভাবনার মেলবন্ধন শেষপর্যন্ত বৈচিত্র্যেরই সূচনা করে থাকে। এর উল্টো পিঠে ঝুঁকিটি এই যে সেই ভূখণ্ডে গোষ্ঠীগত অসহিষ্ণুতাও বিরাজ করা অসম্ভব কিছু নয়। অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন, ভারতীয় উপমহাদেশ আসলে জাতিগত বৈচিত্র্যেরই প্রমাণ বহন করে যেখানে হাজার পাঁচেক বছর ধরে দ্রাবিড়, অস্ট্রিক ও ভোট-চেনিদেন পাশাপাশি বাস করে আসছে আর্যরা এবং আজ থেকে প্রায় তেরশ বছর আগে এখানে এসেছে আরও অনেকেই– তুর্কি, ইরানি, গ্রিক, উজবেক প্রভৃতি। তবে দুঃখজনক ঘটনা এই যে ভারতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উদাহরণ ছাড়াও গোষ্ঠীগত হিংসা-বিদ্বেষের উদাহরণও কিন্তু কম নয়! এমনকি এখানে পশ্চিম-বিরোধী মানসিকতাও প্রবল (যেখানে প্রাচ্য এবং প্রতীচ্যের জীবন-দর্শণ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়)। আমরা মনে করি, নিঃসন্দেহে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের ঐক্যের বেলাতে সংখ্যাগরিষ্ঠের হাতে তৈরি করা এমনতরো সব বিভাজন বিভিন্ন ক্ষেত্রে অধিকার বাস্তবায়নে, সুযোগ-সুবিধার সমবন্টনের বিস্তারে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, দাঁড়াচ্ছেও! সংখ্যাগরিষ্ঠের কায়েমী স্বার্থসিদ্ধির লালসার কারণে সংখ্যালঘিষ্টরা বলিদান দিচ্ছে সেই দেশবিভাগের সময় থেকেই। সনৎকুমার সাহা মন্তব্য করছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের এই জয়যাত্রাকে নিশ্চয় কোনও অর্থেই ন্যায় অথবা সঙ্গত নয়, নিশ্চয় তাকে নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্র হিসেবে অভিধা দেয়া যায় না! আমরাও এমনটাই মনে করি। এমন একটি পরিস্থিতিকে 'আত্মপরিচয়ের বিকার' বলেই মনে করেন সনৎকুমার সাহা যা কিনা 'হেলাফেলার নয়' কেননা 'আত্মপরিচয়ের বিকার' বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর ভেতরে 'আত্মপরতা' ও 'আত্মবিচ্ছিন্নতা'-কেই প্রবল করে তুলতে পারে। তিনি মনে করেন, বস্তুতপক্ষে, মানুষে-মানুষে পরিচয়ের বিভিন্নতার পিছনে মৌলিক কোনও ফারাক নেইÑ সকলেই একটি দেশের নাগরিক। 'সবার সাথে, সবার হয়ে' ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থের ওপরে উঠতে পারাটাই এর একটি সমাধান হতে পারে বলে পথ বাতলান সনৎকুমার সাহা। এবাদে, উৎপাদন ও বাণিজ্য-ব্যবস্থার বিশ্বায়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশ সাম্প্রদায়িকতার মতো ক্ষুদ্র মানসিকতাকে কিছুটা হলেও সীমিত করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

অমর্ত্য সেনের বইয়ের ওপরে আলোচনা করতে গিয়ে যশস্বী অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক সনৎকুমার সাহা তাঁর মৌলিক উন্নয়ন-ভাবনাকে মূর্ত করেছেন। অর্থনীতি, ইতিহাস, সমাজ এবং রাজনীতি সংক্রান্ত সনৎকুমার সাহার মৌলিক এসব আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে গণ্য হবার দাবি রাখে। উপরন্তু, মানুষের বিবিধ অধিকার পূরণ এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাঁর যুক্তি-কাঠামো আর সূত্রগুলো কার্যকর অবদান রাখতে পারে বলে আমরা মনে করি। এখানে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে চাই যে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সময় তিনি মুজিবনগর সরকারের অর্থমন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিকল্পনা কমিশনে অর্থনীতিবিদ হিসেবে কাজ করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের নীতি-নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছেন এই মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর কাছ থেকে আমাদের আরও অন্তর্দৃষ্টি পাবার আছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক