সৃজনীসত্তা পেরিয়ে চলছে সময়নদীঃ ম্যান্ডেলস্ট্যামের ‘শিলায় লিখিত গীতিকবিতা’র একটি সম্ভাব্য পাঠ

তাপস গায়েন
Published : 3 August 2012, 06:29 AM
Updated : 3 August 2012, 06:29 AM

পূর্বকথাঃ

কবিতার যে কোনো পাঠক একটি কবিতাকে সেই কবিতার অস্তিত্বেই বুঝে নিতে চান । কিন্তু পরমাত্মাকেও যখন মহাবিশ্বের অপরাপর অস্তিত্বের সম্পর্কে আমাদেরকে বুঝে নিতে হয়, তখন কোনো একটি কবিতাকে শুধুমাত্র সেই কবিতার অস্তিত্বে কবিতাটির পাঠোদ্ধার এবং রসাস্বাদন সম্ভবপর নাও হয়ে উঠতে পারে, যদি বিভিন্ন কারণে কবিতাটি জটিল হয়ে থাকে । এই প্রেক্ষিতে সেই কবির প্রায় সকল কবিতা এবং কবি যে ভাষার কবি এবং পৃথিবীর যে জ্ঞানপ্রবাহে তিনি অবগাহন করেছেন সেই ধারাবাহিকতার একটি নূন্যতম পাঠ নেয়া কখনো কখনো জরুরি হয়ে পড়ে । (ইয়োশেপ = যোশেপ = ওসিপ ) ম্যান্ডেলস্ট্যাম (খ্রি ১৮৯১-১৯৩৮)-এর

'শিলায় লিখিত গীতিকবিতা' (খ্রি ১৯২৩) এরূপ একটি অনুধ্যান । ওমরি রনেন-এর সুবিখ্যাত, 'এ্যান এপ্রোচ টু ম্যান্ডেলস্ট্যাম' বইয়ের মাধ্যমে তিনি পাঠককে নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছেন এক দীর্ঘ পথ পরিক্রমায়, যেখানে আলোচ্য কবিতার পরম্পরা খুঁজতে তিনি আমাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন রুশ, প্রাচীন গ্রেকো-রোমান, এবং আধুনিক ইউরোপীয় সাহিত্যের প্রধান কবিদের সেইসব কবিতার সাথে যা ম্যান্ডেলস্ট্যামের এই কবিতাকে হয়তো প্রভাবিত করেছে, কিন্তু আমার এই আলোচনায় প্রায়শই অনুল্লেখিত থেকে যাবে তাঁদের (ভার্জিল, দান্তে, পের্ত্রাক, হাইনে, হোল্ডারলিন, ভার্লেন, পুশকিন, ক্লেবনিকভ, গুমিলেভ, এনানেস্কি, সেভেৎইয়েভা, পাস্তারনাক, ব্লক, আখমাতোভাসহ প্রমুখের) কাজ । এই কবিতাকে বুঝতে তিনি যুডো-ক্রিশ্চিয়ান সংস্কৃতির পৌরাণিক আখ্যান এবং আসমানি কিতাবের অনেক আয়াতের বাণী বন্দনায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন পাঠক সমাজকে । অধ্যাপক-সমালোচক ওমরি রনেনের দীর্ঘ সাধনার সুবিখ্যাত বই [১] এবং এম এল গ্যাস্পারভের অসামান্য প্রবন্ধ [২] পাঠের আলোকে আমি আলোচ্য কবিতার [৩] অনুবাদসহ একটি ছোট্ট পাঠ এখানে তুলে ধরতে চেষ্টা করছি, যা সম্ভাব্য বহুবিধ পাঠের একটি পাঠমাত্র ।

রুশ সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি গার্ভিলা দারযাভিন (খ্রি ১৭৪৩-১৮১৬) মৃত-শয্যায় শুয়ে আছেন, আর তাঁর প্রাণহীন দেহের পাশে পড়ে আছে স্লেটে (= শিলায়) লিখিত এক অসমাপ্ত কবিতা, 'সময়নদী নিয়ে যায় তীব্রবেগে / মানুষের সকল অর্জন/ ছুঁড়ে ফেলে রাজা, রাজ্যপাট, মানুষ/ বিস্মৃতির অতল গর্ভে / তবু যদি কিছু থেকে যায়/ তা হোল বীণার তার থেকে উদ্ভুত সঙ্গীত / কিন্তু মহাকালের গর্ভে / তারও ঘটবে একই পরিণতি ।' ম্যান্ডেলস্ট্যাম অনুভবে জানবেন দারযাভিনের শেষকবিতা হয়ে উঠবে তাঁর 'শিলায় লিখিত গীতিকবিতা'র প্রধান-অনুপ্রেরণা, কিন্তু দারযাভিনের কবিতায় নিহিত 'সময়ভাবনা'-য় তিনি আস্থাবান হয়ে উঠবেন না । কারণ, শিলায় লিখিত ভাষ্য যদিও অস্পষ্ট হয়ে আসে সময়ের সাথে, যা নির্দেশ করে ক্ষণস্থায়িত্বকে, তবু 'ক্ষয়িষ্ণু শতাব্দীর জীর্ণ ভাষা' 'সন্তর্পণে ঢুকে পড়ে ভবিষ্যতের চেতনায়' এবং পক্ষান্তরে শিলায় লিখিত কবিতার ভাষ্যকেই তা মর্মমূলে নাকচ করে ; এবং এখানেই ম্যান্ডেলস্ট্যামের প্রত্যয় । তাঁর এই অনুভব আরও প্রসারিত হয়ে উঠবে কবি মিখাইল লারমন্তভের (খ্রি ১৮১৪-১৮৪১) কবিতার অনুধ্যানে, 'আমি পথ চলছি একাকী/ কাঁচের এই পথ ভিজে ওঠে কুয়াশায়/ এই রাত শান্ত, বনাঞ্চল শুনছে ঈশ্বরকে/ আর কথা বলছে নক্ষত্র নক্ষত্রের সাথে ।' লারমন্তভের 'সময়ের কাব্যিক বিস্মৃতির' সাথে দারযাভিনের 'ঐতিহাসিক বিস্মৃতি' ম্যান্ডেলস্ট্যামের কবিতার প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠবে । এখানে স্মরণযোগ্য যে কবি লারমন্তভের জীবন ছিল 'কাঁচে আবৃত পথ' এবং তাঁর মৃত্যু ছিল 'বাতাসপূর্ণ গহ্বরে' এবং তারই আনাগোনা ম্যান্ডেলস্ট্যামের এই কবিতা জুড়ে । কিন্তু এসব ছাড়িয়ে রোমান কবি ওভিদ তাঁকে আরও গভীরভাবে বাঁধেন সময়ের সাথে, মানুষের সাথে এইভাবে, 'কী সেই ফ্লিন্ট, প্রিয়তমা, কী সেই লৌহ/ যা আমার দৃঢ়তার পাশে দাঁড়াতে পারে/ ………/ সময় ধ্বংস করে সবই, শুধু থেকে যাই আমি / মৃত্যু সেও হতভম্ব, থমকে থাকে হতাশ হয়ে আমার দৃঢ়তার পাশে ।' ওভিদের এই জীবনভাবনা হয়ে উঠবে ম্যান্ডেলস্ট্যামের জীবন এবং কাব্য আস্তিকতার অন্যতম বিষয়, এবং তাঁকে আমরা বলতে শুনব, 'যখন সময় হয়ে উঠে বৈরী, তখন মানুষকে হতে হয় পৃথিবীর বুকে সবচে দৃঢ় এবং কঠিন ; এবং পৃথিবীতে মানুষকে হয়ে উঠতে হবে তেমন, কাঁচপাত্রে শায়িত ডায়মন্ড যেমন ।'

ম্যান্ডেলস্ট্যাম 'শিলায় লিখিত গীতিকবিতা' প্রথমে ছয় স্তবকে লেখেন, এবং পরবর্তীতে (খ্রি ১৯২৩) তিনি নয় স্তবকে কবিতাটির শেষ লিখিত রূপ দান করেন । খ্রি ১৯২৩ ম্যান্ডেলস্ট্যামের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর, যখন তিনি একমেইজমে'র 'বিশ্বসংস্কৃতির অতীতচারিতা' থেকে 'প্রকৃতির মর্মমূলে' ঘুরে দাঁড়িয়েছেন । এই জটিল কবিতাটি সেই সাক্ষ্যই ফেরি করে ফিরছে । মানুষের সৃজনশীল প্রক্রিয়া অতিক্রম করে চলছে দারযাভিনের সময়নদী এবং লারমন্তভের কাঁচে আবৃত পথ, নক্ষত্র-গ্রন্থি ; পুরানো গান পেরিয়ে চলছে কোলাহলপূর্ণ অতি-বৈশ্বিক রাত ; আর জেগে উঠছে ত্রিকালজ্ঞ-ঋষির-স্বপ্ন, মেলবন্ধন চলছে বিশ্বসংস্কৃতির সাথে বিশ্বপ্রকৃতির ।


কবিতায় ব্যবহৃত মূল শব্দ এবং শব্দবন্ধঃ

কাঁচ (= Flint); অশ্বনাল (= Horseshoe); বৃত্ত (= Ring); শিলা (= Slate); খড়িমাটি (=Slate-pencil)

[১]
বিশাল এই নক্ষত্র-গ্রন্থি ।
কাঁচ এবং বাতাস থেকে উদ্ভুত
পুরানো গানের মধ্যে প্রবাহিত এই পথ কাঁচের ।
কাঁচ জলের সমীপে এবং অশ্বনাল বৃত্তের সন্নিকটে ;
মেঘের কোমল আস্তরণে
প্রস্তরের রেখাচিত্র অস্পষ্ট ধূসর-
যা এই পৃথিবীর শিক্ষানবিশির ছায়াচিত্র নয়, বরং
উৎকীর্ণ আছে চন্দ্রাক্রান্ত ভেড়াদের বিস্রস্ত স্বপ্ন ।

[২]
প্রশস্ত রাতের গভীরে আমরা ঘুমাই- মাথায়
ভেড়ার ত্বকে-নির্মিত ক্যাপের নীচে থাকি দণ্ডায়মান ।
সঘন গর্জনে জলস্রোত ফিরে যায় উৎসের দিকে–
যেন এক গানের পাখি, যেন কুণ্ডায়ন , যেন কথার পরম্পরা ।
অস্বচ্ছ, সীসার মতো ভারী হাত
এইখানে লিখে যায় সন্ত্রাস, লিখে যায় বিভাজন
প্রবহমান জলের পাঠসূত্রে, তার কাছে অধীত শিষ্যত্বে
আঁকা হয় সেই প্রথম খসড়া ।

[৩]
উর্ধ্বমুখী ঢাল বেয়ে জেগে আছে ছাগলদের নগরী
কাঁচে আবৃত এই পথ জটিল–
এই পাহাড়ের উপত্যকায়
সারিবদ্ধ গির্জা আর ভেড়াদের বসতি,
ঝুঁকে থাকা পাহাড়ের ফলকে লেখা হয়েছে আয়াত
জল এসে শেখায়, আর সময় তাদের করে তীক্ষ্ণ
এবং ঈষদ্বচ্ছ বাতাসের বন
এইসব নিয়ে, বহুদিন হোল, হয়ে আছে পূর্ণ ।

[৪]
মৌচাকের নীচে পড়ে থাকা ভোমড়া
যেন অবজ্ঞায় পরিত্যক্ত বহুবর্ণ দিন,
রাত, সে তো নারী-চিল, শিলায় লিখবে বলে
নিয়ে যায় জ্বলন্ত খড়িমাটি
বিচূর্ণিত শিলা থেকে প্রতিদিন
মুছে ফেলে দিনের সকল শিলালিপি
আর ঝেড়ে ফেলে ঈশদ্বচ্ছ অপচ্ছায়া
হাত থেকে যেভাবে উড়ে যায় পাখির ছানা ।

[৫]
পেকে ওঠে ফল, পরিপুষ্ট আঙ্গুর
বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে দিন,
জেগে ওঠে শিশুতোষ খেলা, মধ্যদুপুরের
দুরন্ত কুকুর, সকরুণ কান্না, যেন
পাহাড়ের হিম-চূড়া থেকে নেমে আসে পাথর
সবুজের উদ্দামতার সন্নিকটে জাগে
ক্ষুধার্ত জলের বেগ– পাক খায়, খেলা করে
যেন ক্ষুদ্র কোনো পশু ।

[৬]
এবং মাকড়সার মতো সে আমার সন্নিকটে আসে,
যখন চাঁদের আলো বিক্ষিপ্ত করে সকল গ্রন্থি
পাহাড়ের তীব্র ঢাল বেয়ে আমি শুনি
শিলায় উৎকীর্ণ চকখড়ির শব্দ ।
ও আমার স্মৃতি, এ কী তোমার উচ্চারণ,
বিচূর্ণিত রাতের গভীরে তুমিই কী ঋষি,
ছুঁড়ে দিয়ে শিলা জঙ্গলের গভীরে
রাতের ঠোঁট থেকে তুলে আনো চকখড়ি ?

[৭]
শুধু এই কণ্ঠস্বর থেকে জানি,
সেখানে ছিল খামচা-খামচি, ছিল দ্বন্দ্ব ;
তাই কণ্ঠস্বরের অভিঘাতে
একদিকে চকখড়ি টেনে নেই ।
ছিন্ন করি রাত, চূর্ণ করি চকখড়ি
সময়ের ভগ্নাংশের অস্তিত্বকে লিখে রাখি ।
গানের অভিমুখ দিয়ে বদল করি কোলাহল,
পাখনার বিক্ষিপ্তি থেকে তুলে ধরি বিন্যাস ।

[৮]
আমি কে ? আমি নই ভাস্কর্য শিল্পী,
নই জাহাজের কারিগর, নই রাজমিস্ত্রি
আমি আছি দুই কাজে, আছি দ্বৈত সত্তায়–
রাতের বন্ধু আর দিনের নিন্দুক ।
তিনি সৌভাগ্যবান, যার ঠোঁটে প্রথম উচ্চারিত:
কাঁচ–যে আছে প্রবহমান জলের শিষ্যত্বে
তিনি আশীর্ব্বাদপ্রাপ্ত যিনি আছেন স্থিত,
ফিতে দিয়ে বাঁধা পাহাড়ের পাদদেশে ।

[৯]
চকখড়ি-শিলায় উৎকীর্ণ গ্রীষ্মের দিনলিপি,
সেখানে নিজেকে নিবদ্ধ রেখেছি–
যে ভাষা কাঁচের, যে ভাষা বাতাসের,
যেখানে আলো-অন্ধকার করে মাখামাখি ।
পুরানো গানের মধ্যে কাঁচের এই পথে
আমি আমার আঙ্গুল রেখেছি ।
এখানেই আমি বাঁধি গিট, তৈরি করি গ্রন্থি
কাঁচ জলের সমীপে, অশ্বনাল বৃত্তের সন্নিকটে ।

রচনাকালঃ ১৯২৩

পরিশিষ্ট (অনুদিত কবিতার সম্ভাব্য একটি পাঠ):

প্রথম স্তবকঃ

প্রকৃতি বর্তমান সভ্যতা (অর্থাৎ স্লেইট-কালচার) থেকে শিখছে না কিছুই ; এবং আমরা যা করছি, তা-ও নয় এই পৃথিবীর শিক্ষানবিশী । তবু– কাঁচ এবং অশ্বনাল– যা এই সভ্যতার, তা ভিড়ছে জলের সমীপে, বৃত্তের কাছে– প্রকৃতির সান্নিধ্যে । আর এ-নক্ষত্রগ্রন্থি নিতান্তই নক্ষত্রের সম্মিলন নয়, বরং তা হয়ে উঠতে পারে আকাশ এবং পৃথিবীর এক গ্রন্থি ; একইসাথে ম্যান্ডেলস্ট্যামের কবিতার পাঠক জানেন যে তাঁর অন্যান্য কবিতায় নক্ষত্রগ্রন্থি কিংবা নক্ষত্রের আনাগোনা বিভিন্ন প্রতীকিতায় ব্যাপ্ত, যা নির্দেশ করে ব্যক্তি জীবনের অনিবার্যতা কিংবা ইতিহাসের অমোঘ পরিণতি; কিংবা কখনো তা হয়ে ওঠে সাহিত্যের ইতিহাস এবং সামাজিক ইতিহাসের এক গ্রন্থি ; কিংবা তা হতে পারে দুই শতাব্দীর কবিদের মধ্যকার সন্ধির জন্য উন্মুখতা ; কখনো তা নির্দেশ করে ধাতুবিদ্যা এবং মহাকাশবিদ্যার মধ্যে উৎকীর্ণ মহাকালের এক সাযুজ্যতা ; কিংবা তা দেখিয়ে দেয় মেঘের কোমল আস্তরণের বিপরীতে শিলার কাঠিন্যের এক গ্রন্থি, যেমন এই কবিতায় সুকঠিন বিশাল নক্ষত্রগ্রন্থির বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে আছে ভেড়াদের এলোমেলো স্বপ্ন কিংবা মেঘের কোমলে অস্পষ্ট-ধূসর চিত্র । পরিশেষে আছে, 'চন্দ্রাক্রান্ত ভেড়া'র উপমা যা বোধকরি দেখিয়ে দেয় 'সময়ের কোলাহলে আচ্ছন্ন সত্তা'কে, অর্থাৎ ঐশী গ্রন্থসমূহ সাধারণ মানুষকে দেখেছে যেভাবে– অর্থাৎ 'সমাচ্ছন্ন সত্তা' হিসেবে আমরা জেনেছি আমাদেরকে ।

দ্বিতীয় স্তবকঃ

প্রকৃতি এখনও শিখছে প্রকৃতির কাছ থেকে, তাই 'প্রবহমান জলের পাঠ-সূত্রে, তার কাছে অধীত শিষ্যত্বে আঁকা হয় প্রথম খসড়া ।' এবং 'ভেড়ার ত্বকে-নির্মিত ক্যাপের নীচে থাকি দণ্ডায়মান' সম্ভবত ম্যান্ডেলস্ট্যামকে স্মরণ করিয়ে দেয় গ্রট-সাহেব সম্পাদিত দারযাভিনের বইয়ের কভারে শিল্পী টন্চিকৃত দারযাভিনের প্রতিকৃতিকে, যেখানে দারযাভিন পড়েছেন ফারকোট এবং ফারহ্যাট এবং তিনি দাঁড়িয়ে আছেন সুউচ্চ এক পাহাড়ের পাদদেশে । একইসাথে, 'ভেড়ার-ত্বকে নির্মিত-ক্যাপ' নির্দেশ করছে দুটি বিষয়কেঃ (১) মেঘাচ্ছন্ন, তারাহীন রাত ; (২) উদ্ধত বুদ্ধিজীবিশ্রেণী, যাদের চিন্তাকাঠামো একটি ধাঁধা, যার সাথে ম্যান্ডেলস্ট্যামের কোনো সম্পর্ক নেই । 'জলস্রোত ফিরছে উৎসের দিকে,' যা বিভিন্নার্থে ব্যবহৃত হতে পারে । যেমন, স্মৃতি না হয়ে তা ব্যবহৃত হতে পারে বিস্মৃতির অর্থে ; এই কবিতায়, সম্ভবতঃ চেতনার গভীরে যে শব্দানুভূতি তাকেই খুঁজে ফেরার অভিপ্রায়, তারই উৎসারণের জন্য আকুতি ; কিংবা এ হোল বিংশ-শতাব্দীর রাশিয়ান কবিতার জরায়ুতে, তার উৎসভূমিতে ফিরে যাবার জন্য এক আকুতি । 'ভয়' আর 'সীসা'–এই দু'য়ের ভিতরে সম্পর্ক হোল প্রতীকী– শনিগ্রহের ধাতু সীসা, যার অন্বয় হোল ভয় এবং বিমর্ষতার সাথে, যা নির্দেশ করে মৃত্যু আর যুদ্ধকে । আর বিভাজনের প্রসঙ্গ যা উঠে এসেছে, তা হোল এক ঐতিহাসিক সংকট, যা মূর্ত হয়ে উঠছে মানসিক সন্ত্রাসের ভিতরে ।

তৃতীয় স্তবকঃ

এখানে প্রাক-সংস্কৃতিকাল হয়ে উঠছে আরও প্রাচীন, আরও আদিম, আরও কষ্টকর– সময় যখন প্রফেটদের । ম্যান্ডেলস্ট্যামের কবিতায় জমির বিন্যাস এবং আর্কিটেক্চার দেখিয়ে দেয় সমাজের ভিতরে স্তরীকরণকে ; যেমন 'উর্ধ্বমুখী ঢাল বেয়ে………..ছাগলদের নগরী'র বিপরীতে আছে 'পাহাড়ের উপত্যকায়………. ভেড়াদের বসতি,' যা একার্থে খ্রিষ্টীয় থিওলোজির 'রাষ্ট্র' বনাম 'চার্চ' কিংবা অন্যার্থে 'পৃথিবীর নগরী' বনাম 'বেহেশতি নগরী' এই দ্বন্দ্ব এবং অন্বয়কে দেখিয়ে দেয় । ভিন্ন এক কবিতায় ম্যান্ডেলস্ট্যাম 'প্রাচীন রোমান নগরী'কে 'ভেড়াদের নগরী' হিসাবে দেখেছেন । 'ঝুঁকে থাকা পাহাড়ের ফলক' (ইংরেজি শব্দবন্ধে যা 'প্লাম্ব-লাইন'), যা ম্যান্ডেলস্ট্যামের অন্য কবিতায় দু'বার ব্যবহৃত হয়েছে– একবার গথিক ক্যাথিড্রালের রূপক হিসাবে, অন্যবার জাহাজ-মাস্তুলের ক্ষণাত্মক শব্দ হিসাবে । এই 'প্লাম্ব-লাইন' হোল 'জেকবের মই' যা স্বর্গ এবং পৃথিবীর মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তুলে, যা ঈশ্বরের সম্মুখে আমাদের ঋজুতা এবং বিনয়কে দেখতে চায়, এবং পরিশেষে যা ধরে রাখে উর্ধ্বমুখী চিত্রকল্পগুলোকে । 'ঈষদ্বচ্ছ বাতাসের বন' হয়ে উঠে 'পত্রহীন জঙ্গলের অস্বচ্ছ কণ্ঠ' যা মৃতদের কণ্ঠস্বরকেই নির্দেশ করে । 'বাতাস' ম্যান্ডেলস্ট্যামের কাছে হয়ে উঠেছে মানব ইতিহাসের চিরকালীন কণ্ঠস্বর ; অন্যসূত্রে, এই চিত্রকল্প হতে চায় 'আকাশপূর্ণ গমক্ষেত' যা প্রকারান্তরে দাঁড়িয়ে যায় 'ক্ষুধার্ত সময়নদীর' বিরুদ্ধে ।

চতুর্থ স্তবকঃ

রাত, যে কি না নারী-চিল, স্লেটে লিখবে বলে, 'বয়ে নিয়ে চলে জ্বলন্ত চকখড়ি' (অর্থাৎ রাতই জ্ঞানের বাহক) –এই হোল চতুর্থ স্তবকের মূল চিন্তা । আর আছে বর্ণময়, উজ্জ্বল ভোমরা, যে কি না মধুচোর, স্বাভাবিক কারণেই মৌমাছির শত্রু, পড়ে আছে মৃত, যা অন্যার্থে দেখিয়ে দেয় বিশাল কর্মযজ্ঞের (যেমন নৌবহর-নির্মাণ, পিরামিড-নির্মাণ, ইত্যাদির) পাশে পড়ে থাকা প্রাণহীন দেহ । অন্যদিকে, রুশ-সাহিত্যের অনেক পৌরাণিক ধাঁধায়, উপকথায় পাখি হয়ে উঠেছে রাতের প্রতীক । এ-স্তবকে, 'রাত' যে কি না 'নারীচিল' লিখছে 'জ্বলন্ত চকখড়ি' দিয়ে, 'সীসার মতো ভারী হাত' দিয়ে নয়, যেমনটি পাঠক দেখেছেন দ্বিতীয় স্তবকে । 'চকখড়ি' এবং 'ভাবনার প্রতিমা ধ্বংসকারী লেখা' –এ-দু'য়ের মধ্যে ব্যঞ্জনাময় যে অন্বয় তা নির্দেশ করে সচেতন সৃজনীসত্তাকে, যা সরিয়ে দিচ্ছে যূথবদ্ধ সমাচ্ছন্ন চিন্তাকে; এ হোল সৃষ্টিশীলতার মৌল প্রসঙ্গ । এবং 'হাত থেকে উড়ে যায় পাখি' স্মরণে নিয়ে আসে এনানেস্কি'র নাটকে ভাগ্য-গণনাকারী পাখি–থাইমিরিসের মা– যিনি উদাসীন থেকে যান নিজ-ভাগ্যের ব্যাপারে, যা পক্ষান্তরে শর্ত তৈরি করে ট্রাজেডির । আর যে ভিজুয়্যাল ইমেজ তৈরী হয়– যেমন, 'ঈশদ্বচ্ছ অপচ্ছায়া' যার সমাঙ্গ ইমেজ, 'ঈশদ্বচ্ছ কুয়াশার জাল' কিংবা 'গভীর গোধূলির জাল' ম্যান্ডেলস্ট্যামের অন্য কবিতায় উঠে এসেছে, যা বাইবেলে বর্ণিত 'জাল'কে আভাসিত করে ; কিংবা নির্দেশ করে 'নারীদের মাথায় ব্যবহৃত জাল'কে, যা একইসাথে ভালোবাসা এবং নম্রতাকে তুলে ধরে ; কিংবা দেখিয়ে দেয় আচ্ছাদিত সূর্যকে, যা বিষণ্নতারই উদ্ভোধক । পরিশেষে, প্রাচুর্যতাপূর্ণ ইমেজগুলো প্রত্যাদেশের বাইরে গিয়ে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় এরিস্টোফেনের 'পাখি' এবং মোৎজার্টের 'ম্যাজিক ফ্লুট'কে ।

পঞ্চম স্তবকঃ

এই স্তবকে সেইসব ইমেজ সন্নিবেশিত হয়েছে, যা চতুর্থ স্তবকে মুছে গেছে । এই কবিতার আদিরূপে অবশ্য পঞ্চম স্তবকের প্রথমার্ধ চতুর্থ স্তবকের প্রথমার্ধের আগেই সন্নিবেশিত ছিল । 'পরিপক্ব আঙ্গুর' হয়ে উঠে অশুভের পূর্বাভাস, 'অশুভ নক্ষত্র' যেমন । অন্যার্থে বলা যায়– সময়, বৃদ্ধি, এবং ক্ষয়–এসবই সাক্ষ্য দেয় রূপান্তরিত সময়ের । 'দুরন্ত কুকুর' রূপকার্থে হতে পারে বাইবেলের 'সেইন্ট দি ব্যাপ্টিস্ট' যাঁর মধ্যে আছে কোমলতা এবং বন্যতার এক অসম্ভব সংমিশ্রণ ; অন্যদিকে, ভিন্ন ব্যাখ্যায় দাবি উঠেছে–এ হোল কবির বাল্যে হারিয়ে যাওয়া মৃত বন্ধুর এক প্রতিকৃতি, যা মনে করিয়ে উদ্দামতা এবং মৃত্যুকে । আবার, এ হোল খ্রিষ্টীয় সময়ের অবলুপ্তি এবং অত্যাসন্ন প্রলয়ের কাল । আর 'পাহাড় ….. থেকে নেমে আসে পাথর' এ-যেন ঈশ্বরের প্রত্যাদেশ। আর, হিমশীতল পাহাড়ের চূড়া থেকে অতীতের বরফ গলে জলের প্রবাহ হয়ে নেমে আসছে মানুষের এ-পৃথিবীতে, যা পাক খায়, এবং এ-ক্ষুধার্ত জলপ্রবাহ, যা আবারও নিয়ে আসে কবি দারযাভিনের সময়ের ধারণাকে, যা স্বীকার করে অনন্তকালকে । জলের সকাশে সবুজের উদ্দামতা, যা এক অর্থে মনে করিয়ে দেয় সেই পরিপক্ব আঙ্গুরকেই– সময়ের জীবিতপ্রবাহকেই, সময়ের ভিতরে পুনর্জন্মকে এবং তার ভিতরে নিহিত সৃজনশীলতাকে । নেতি- এবং ইতি-বাচকতার মধ্য দিয়ে কবিতা ক্রমাগত এগিয়ে চলে, যেন ক্ষুদ্র কোনো পশু ।

ষষ্ঠ স্তবকঃ

এই স্তবকে যা উৎসারিত তা হোল– স্মৃতির উদযাপনের সূত্রে জেগেছে রাতের বিচূর্ণি, আর তার বাস্তবায়নের জন্য রাতের মুখ থেকে চকখড়ি ছিনিয়ে নেয়া হয়ে পড়েছে জরুরি । 'জল' এবং 'মাকড়সা' এক দ্বিত্বতায় আচ্ছাদিত ; যা কখনো চিহ্নিত করে ভয়কে, কখনো নির্দেশ করে মহাকালকে, যদিও রনেন দাবি করেন-ম্যান্ডেলস্ট্যামের এই কবিতায় তা ইতিবাচকতাকেই নির্দেশ করছে, অন্যদিকে চাঁদের আলো আমাদেরকে নিয়ে যায় প্রথম স্তবকে-অর্থাৎ রাতের স্বপ্নে এবং তার মধ্যে নিহিত আচ্ছন্নতায় । 'নক্ষত্র-গ্রন্থি'–অনেক অন্বয়ের মধ্যে– সর্বপ্রথমে নির্দেশ করে 'কথা' এবং 'লেখা'–এই দুইয়ের মধ্যকার গ্রন্থিকে । প্রাচীন অনুষঙ্গ, 'নক্ষত্রের দিনলিপি' কিংবা 'নক্ষত্রের বই' ইত্যাদি সম্ভবত দেখার চেয়ে ভাষ্যকেই বেশী আভাসিত করে, এবং সেইসূত্রে 'প্রত্যাদেশ' শব্দটি এখানে অনেক প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে । কারণ, পাহাড়ের চূঁড়ায় (মাউন্ট সিনাই) প্রফেট মুসার প্রত্যাদেশ এবং কাব্যিক অনুপ্রেরণা–এসবই আমাদের জানা আখ্যান । 'একমেইজম' কাব্য আন্দোলনে অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ 'বিশ্বসংস্কৃতির' জন্য অতীতচারিতা এবং ব্যক্তির স্মৃতিচারণ– এই দুই অনুষঙ্গই সৃজনশীলতার সাথে সম্পৃক্ত, যেন তার নিমিত্তেই এক অনুধ্যান । এর-সাথে এটি জেনে রাখাও জরুরী যে ম্যান্ডেলস্ট্যামের – 'জানুয়ারি ১, ১৯২৪' ; 'যে পেয়েছে অশ্বনাল' ; 'শিলায় লিখিত গীতিকবিতা'– তিনটি দীর্ঘ কবিতায় 'স্মৃতি' হয়ে উঠেছে আরোগ্যময় এক শক্তি । আলোচ্য এই কবিতায় আছে বিচূর্ণিত রাত, যার সাথে মিশে আছে পাখির ইমেজ, পাখির অবতরণের প্রসঙ্গ, আর পাখির বিচূর্ণিত ঠোঁট । অন্যদিকে জঙ্গল মূলত ব্যক্তি'র কিংবা সমষ্টি'র অবচেতন সত্তা ; এবং সেইসূত্রে সৃজনশীল সত্তার পুনর্জন্ম জাগে এই রাতের অন্ধকারে, অবচেতনের অতলে, জঙ্গলের গভীরে ।

সপ্তম স্তবকঃ

রাতের সাথে যুদ্ধ শেষ হয়ে আসছে এখানে, এবং এই যুদ্ধে জয়ী হতে হলে চূর্ণ করতে হবে রাত, বিচূর্ণ করতে হবে চকখড়ি– এ হোল এই স্তবকের মূল ভাষ্য । কারণ, অবচেতন থেকে সচেতন-সৃজনশীলতার দিকে, আচ্ছন্নতা থেকে উপলব্ধির দিকে, এবং সাধারণ থেকে বিশেষের দিকে–অর্থাৎ আপন কণ্ঠস্বরের দিকে অভিমুখী হতে হবে কবিকে । দারযাভিনের কবিতায় সতর্ক উচ্চারণ 'শিলায় লিখিত অবিন্যস্ত শব্দরাশি' যা 'ট্রাম্পেটের শব্দকেই' নির্দেশ করে, এবং সূচনা করছে উনবিংশ-শতাব্দীর, আর সেই শতাব্দীর সমাপ্তি ঘটছে কবি ব্লকের অনিবার্য উচ্চারণের মধ্য দিয়ে । কমিসারযাভাস্কোজা'র সুরধ্বনি, যা ব্লকের জন্য জরুরি ও মধুর, তা ম্যান্ডেলস্ট্যামের কাছে অবোধ্য কিন্তু তা অনুসরণযোগ্য মনে হয়েছে । এ হচ্ছে রুশ-সাহিত্য-ইতিহাসের কথা, যা এই কবিতায় উহ্য আছে, কিন্তু এই তথ্যটি কবিতাটিকে বুঝে নিতে সহায়তা করে । কবি এবং দ্রষ্টা নিতান্তই 'অতীতকেই রক্ষা করেন না, তিনি ভবিষ্যতকেও উন্মোচন করেন,' যদিও এই বর্তমান পাঠককে হত্যায় উদ্যত ।' কারণ, এই চকখড়ি, এই কবিতাই হয়ে উঠবে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর অনিবার্য চেতনা । পরবর্তী ক্ষণেই আছে রাতের বিচূর্ণি, কারণ কবিতা এখন ভয় থেকে জাত কোনো খসড়া নয়, বরং সচেতনার এক স্বতঃস্ফূর্ত উৎসারণ, যা বর্তমানকে লিখে রাখে । পরিবর্তনের যে প্রসঙ্গ উঠে এসেছে, তা হোল অবোধ্য এবং আবেগহীন এক পৃথিবী থেকে বোধগম্য এবং অনুভবযোগ্য এই পৃথিবীর দিকে যাত্রা । 'গানের অভিমুখ,' যা কবি পিন্ডারের 'দ্বিতীয় অলিম্পিয়ান ঔড্' থেকে উদ্ভুত, যা একবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের ভাবনা 'সময়ের তীর' থেকে দূরবর্তী কোনো বিষয় নয় । 'পাখনার বিন্যাস'–এই অনুষঙ্গের যে অর্থই থাকুক, তার পুনঃ-পুনঃ ব্যবহার পুশকিনের কবিতায় 'ঈগলের পাখনার প্রতিসাম্য'–এই ইমেজের সাদৃশ্যকেই তুলে আনে ; আর সেইসাথে তা হয়ে ওঠে ম্যান্ডেলস্ট্যামের কবিতার অন্তর্গত বলিষ্ঠতা এবং সৌন্দর্য ।

অষ্টম স্তবকঃ

এই স্তবকের প্রধান ভাষ্য হোল তিনিই সৌভাগ্যবান যিনি এখনও প্রকৃতির শিক্ষানবিশী করছেন । তিনটি আলঙ্কারিক নেতিবাচকতার মধ্য দিয়ে, যেমন—'নই আমি প্রস্তর শিল্পী, নই আমি জাহাজের কারিগর, নই আমি রাজমিস্ত্রি'– ম্যান্ডেলস্ট্যাম তাঁর আত্মজীবনী লিখে চলছেন । একইসাথে তিনি স্থাপত্যের সাথে রাজনৈতিক বাস্তবতা, কবিতার ভুবন, এবং অকাল্টের (যাদুময়তার) যোগসূত্র স্থাপন করে চলছেন । 'একমেইজম' কাব্য-আন্দোলনের সাথে নির্মাণের প্রসঙ্গ, স্থাপত্যের বিষয়গুলো খুব ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, বিশেষ করে ম্যান্ডেলস্ট্যামের (হাজিয়া সোফিয়া, নটরডেম, ইত্যাদি) কবিতার জন্য তা দারুণভাবে সত্য ; 'কবিদের গিল্ড' আর রাশিয়ায় 'ফ্রি-ম্যাসন্রি' যেন একই সূত্রে বাঁধা । 'নৌ-নির্মাণ' আর 'নৌ-চলাচল'– এ দুটি প্রকল্প একার্থে নির্দেশ করে সেই যাদুময়তা আর দার্শনিক-ম্যাসন্রি, যাকে প্লেটো বহু আগে সনাক্ত করেছেন । দ্বিসত্তা–যা কিনা হতে পারে দিন ও রাতের দ্বিত্বতা–তা সামগ্রিক রুশ কবিতার প্রেক্ষাপটে নিতান্তই হয়ে ওঠে এক বিশেষ ধরনের রোমান্টিকতা । দিন এবং রাতের প্রসঙ্গে আমরা যারা তাঁর 'ত্রিস্তা' কবিতা পড়েছি, দেখেছি সময় পেয়ে যায় বিচিত্র রূপ—সামাজিক এবং রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক এবং আধিবিদ্যক । 'কাঁচ' উচ্চারণের মধ্য দিয়ে শিষ্যত্ব প্রদান আর ফিতে দিয়ে পাহাড় বাঁধা—এ-দুটি যেন একই কাজ ; সেইসূত্রে রাতের আস্তিকতায় কাঁচ আছে প্রবাহিত জলের শিষ্যত্বে । ম্যান্ডেলস্ট্যামের কবিতায় 'নামকরণ' আর 'বস্তুকে বেঁধে ফেলা'– এ দুয়ের মধ্যে আপাত কোন প্রভেদ নেই । দারযাভিনের 'সময়নদী'র সাথে রণে উত্তীর্ণ সেই– যে বিশ্বাসী, যে অনুসরণ করছে তার প্রভুকে সেক্ষেত্রে প্রভু শিষ্যের জুতোর ফিতে খুলে ফেলারও যোগ্য নন– জানিয়েছেন মহাপ্রভু যীশু ; এবং এসব সম্পর্ক এবং তাদের বিপ্রতীপ অবস্থান ম্যান্ডেলস্ট্যামের অনুধ্যানে, তাঁর কবিতায় পরম প্রত্যাদেশ এবং বৈশ্বিক ঐক্যে ব্যাপ্ত হয়ে বিরাজমান ।

নবম স্তবকঃ

এই স্তবকে, বিশ্বপ্রকৃতির সাথে বিশ্বসংস্কৃতির ঐক্য এখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে । সময়, বোধকরি, এখানে বিস্রস্ত নয়, বরং সময় হয়ে উঠেছে জিওলজিক্যাল এবং ঐতিহাসিক । বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে, এ-সময় যেমন শিলায় স্তরীভূত সময়, একইসাথে শিলায় লিখিত দারযাভিনের পঙক্তিমালা নির্দেশ করে উনবিংশ-শতাব্দীর উন্মেষ এবং তার উদভ্রান্তিকে । এইসাথে দারযাভিনের পঙক্তিমালাকে বুঝে নিতে হবে লারমন্তভের কবিতার মাধ্যমে, যার মৃত্যু সম্মুখ দ্বন্দ্বযুদ্ধে, কাঁচে আবৃত পথে, পিস্তলের গুলিতে । 'শিলায় লিখিত গ্রীষ্মকাল (১৮১৬)' এবং 'কাঁচে বিধৃত গ্রীষ্মকাল (১৮৪১)' তাই দুই কবিকে (দারযাভিন এবং লারমন্তভেক) বেঁধে রাখে একই গ্রন্থিতে । আলো-অন্ধকারের ক্রমিক পাশাপাশি অবস্থান প্রতিস্থাপিত করে চলছে প্রথম স্তবকে বর্ণিত অস্পষ্ট ধূসর রেখাচিত্রকে ; আর যে ভাষা কাঁচের, যে ভাষা শিলার, যে ভাষা বাতাসের, বোধকরি, সে ভাষা নক্ষত্রের, সে ভাষা বর্তমানের হয়েও উৎকীর্ণ মহাকালে । ইতিহাস–ম্যান্ডেলস্ট্যামের অনুধ্যানে– একদিকে যেমন পুনরাবৃত্তি, অন্যদিকে তা বিভিন্ন ঘটনার পাশাপাশি অবস্থান । সংস্কৃতি যা ইতিহাসের ভিতরে মানবের অতীতচারিতাকে নিয়ে আসে, একইভাবে কাঁচ, শিলা, এবং বাতাস– ইত্যাদি যেন সেই ভাষার কথাই বলে । আলো আর অন্ধকার যে দ্বৈতসত্তা নিয়ে হাজির, ইতিহাস এবং তার ভিতরে দ্বন্দ্বমূখর শক্তি সেই দ্বিত্বতাকে দেখিয়ে দেয় । লারমন্তভের কবিতা, 'আমি পথ চলছি একাকী…..' যেমন মৃত্যুকে অতিক্রম করে যায়, একইসাথে খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসে– মহাপ্রভু যীশু– যিনি মৃত্যুকে জয় করেছেন, তিনি আভাসিত হয়ে ওঠেন এই কবিতায় । কবিতার শেষ পঙক্তির আগের দুই পঙক্তি বাইবেলের প্রসঙ্গকে আর প্রচ্ছন্ন রাখে না: (১) এখানেই আমি বাঁধি গিট ; (২) আমি আমার আঙ্গুল রেখেছি <....> এই ক্ষতের উপরে, অর্থাৎ এই যেন আক্ষরিক অর্থে মৃত্যুকে অতিক্রম করে যাবার এক প্রমাণ । এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় 'বৃত্ত' আর 'জল' হোল প্রকৃতি ; 'কাঁচ' আর 'অশ্বনাল' হোল সংস্কৃতি । পরিশেষে, 'কাঁচ জলের সমীপে, অশ্বনাল বৃত্তের সন্নিকটে ।' ঠিক এই ঐক্যসূত্রে আমরা দেখি যাই 'বিশ্বপ্রকৃতির সাথে বিশ্বসংস্কৃতির' এক অচ্ছেদ্য মেলবন্ধন ।

কবি দারযাভিনকে আত্মসাৎ করে কবি ম্যান্ডেলস্ট্যাম যেমন নাকচ করেন দারযাভিনকে, একইভাবে প্রকৃতির মর্মমূলে কান পেতে তিনি বিশ্বপ্রকৃতির সাথে বিশ্বসংস্কৃতির সাথে আত্মীয়তা গড়ে তুলেন, এবং প্রকৃতিকে রূপায়িত করেন প্রকৃতিরই অন্তর্নিহিত সত্তায়, তাঁর আপন কাব্যে । 'শিলায় লিখিত গীতিকবিতা' কখনো সমাঙ্গ চিন্তায়, কখনো পরস্পরবিরোধী চিন্তায়, কখনো কূটাভাসে পূর্ণ । তাই এই কবিতার পাঠোদ্ধার এবং রসাস্বাদন একটি জটিল প্রক্রিয়া ।

তথ্যসূত্র:
[১] ওমরি রনেন, এ্যান এপ্রোচ টু ম্যান্ডেলস্ট্যাম, দি হিব্রু ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৩
[২] এম এল গ্যাস্পারভ, 'দি স্লেইট ঔড' দি হিস্টোরি অফ দি টেক্সস্ট এ্যান্ড দি হিস্টোরি অফ ইটস মিনিং (প্রবন্ধ)
[৩] ওসিপ ম্যান্ডেলস্ট্যামঃ পঞ্চাশটি কবিতা, বার্নাড মিয়ারস কর্তৃক অনুদিত, পারসিয়া বুক্স,১৯৭৭

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক