মায়া এঞ্জেলু : মানুষ-পরিবার ও অন্যান্য কবিতা

আনন্দময়ী মজুমদার
Published : 10 Sept 2011, 04:03 AM
Updated : 22 April 2022, 04:00 PM

মায়া এঞ্জেলু (১৯২৮-২০১৪) একজন আমেরিকান কবি, জীবনীকার ও সিভিল রাইটস আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। তাঁর সাতটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ আর সাতটি কাব্যগ্রন্থ আছে। এছাড়া প্রায় ৫০ বছর ধরে তিনি নানা নাটক, চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। তিনি নারীমুক্তি তথা সব মানুষের সার্বিক মুক্তির জন্য সারা জীবন লিখে গেছেন ও কাজ করেছেন। পুলিৎজার প্রাইজের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। এছাড়া তিনি তাঁর বক্তব্যমূলক ভিডিওর জন্য তিনটি গ্র্যামি পুরস্কার পেয়েছেন। দুইবার প্রেসিডেন্সিয়াল কমিটিতে ছিলেন। তিনি জাতীয় স্পিঙ্গান মেডেল (১৯৯৪), ন্যাশনাল মেডেল অফ আর্টস (২০০০) আর প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম (২০১১) পেয়েছেন; ৫০টির বেশি সম্মানজনক ডিগ্রি পেয়েছেন। এছাড়া তাঁর অবয়ব আমেরিকার ২৫ পয়সার ওপর আমেরিকান উইমেন কোয়ার্টার সিরিজে ২০২২ সালে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি একজন মহীয়সী লেখক হিসেবে শ্রদ্ধা পেয়েছেন দেশে-বিদেশে। বি.স.

যখন তুমি আমার কাছে আসো

যখন তুমি আমার কাছে আসো, এমনি,
সেই সব ফেলে-আসা ঘরে
আমাকে ডেকে নাও
যেখানে স্মরণ পড়ে আছে

শিশুদের যেমন
চিলেকোঠার ছোট ঘর দেয় কেউ
তেমনি করে দাও —
অল্প কিছু দিন
পশলা চুমু
ধার-করা প্রেমের বাক্স
আর ট্রাঙ্ক ভর্তি গোপন শব্দ

তখন
আমার কান্না পায়।

সেই শিক্ষা

আমি বারবার মরে যেতে থাকি।
শিরা স্তব্ধ হয়, যেন ঘুমোনো শিশুর মুঠি খুলে গেছে
পুরোনো সমাধির স্মৃতি
গলিত মাংস আর কৃমি
এইসব আপামর চ্যালেঞ্জ
আমাকে ভরসা দেয় না।
এইসব চ্যালেঞ্জ। বয়েস
আর শীতল ব্যর্থতা
আমার মুখে গভীর উল্কি রেখে যায়
আমার চাওয়াকে নিস্তেজ করে, অথচ
আমি মরে যেতে থাকি,
কারণ আমি বাঁচতে ভালোবাসি।

মানুষ

দেখি কতো হরেক রকম মানুষ
মানুষের এই বিশাল সমাহার
আমরা কেউ বেবাক গম্ভীর
কেউবা হালকা, মজার, চটকদার।

কেউ বা জানান, বাঁচা হয়ে গেছে
গভীর অর্থে বাঁচা যাকে বলে,
কেউ বা বলেন, তারাই জানেন মূলে
বাস্তবিকে বাঁচা কাকে বলে।

গায়ের রং তো আছে কতো হাজার
ধাঁধায় ফেলে, কিংবা আমোদ দেয়।
খয়রি, গোলাপ, কমলা, বেগনি, তামা,
নীল বা শাদা, যতো জাতের হয়।

সাতটি সাগর পার হয়েছি, দেখি,
সব দেশেরই মাটি ছুঁয়ে এলাম।
বিশ্বের সব চমক দেখে এসে
খুব সাধারণ কাউকে তো না পেলাম!

দশ হাজার নারীকে দেখেছি
কারো নাম লিলি, মারিয়ান
কিন্তু এমন দুই জন দেখিনি
যাদের আছে হুবহু এক ধ্যান।

যমজেরা দেখতে হয়তো এক
হতে পারে সুরত কাছাকাছি।
প্রেমিকেরা পাশাপাশি থাকে,
ভাবে তবু পৃথক ভাবনারাজি।

চীনে আমরা হেরে যেতে পারি।
ইংল্যান্ডে এসে আমরা কাঁদি।
নিউ গিনিতে অট্টহাস্য করি,
স্পেনে এসে ঘর দু'খানা বাঁধি।

ফিনল্যান্ডে আজ আমাদের জয়
মেইনে হয়তো মরি নয়তো বাঁচি
ছোটো ছোটো অমিল যতখানি
সমগ্রতায় ততোটা মিল, জানি

দেখছি, কতো হরেক মাপের মানুষ
নানা ধাঁচের, বাতিক কম বা বেশি,
বাইরে তবু অমিল যতোটুকু
তারচেয়ে বোধহয় মিলের অংশ বেশি।

বাইরে তবু অমিল যতোটুকু
তার চেয়ে বোধহয় মিলের অংশ বেশি।

আমাদের এই অমিল যতোটুকু
তার চে' বোধহয় মিলের অংশ বেশি।

একা

গতরাতে
শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম
এই আত্মাকে কোথায় থাকতে দিই?
যেখানে জল তৃষ্ণার্ত নয়?
রুটি নয় পাথর?
একটা কথা মনে হয়
কেউ কখনো
একা একা
পুরোপুরি বাঁচতে পারে না
কেউ না।

একা, বেবাক একা
কেউ বাঁচতে পারে না,
কেউ না।

কিছু কোটিপতি আছেন
তাদের টাকা কোনো কাজে আসে না
তাদের সহধর্মিনী তন্বীরা ঘোরেন
তাদের সন্তান দুঃখের গান গায়
তাদের আছে দামী ডাক্তার
তাদের পাথর-হৃদয় পরিচর্যা করবার
তবে একা, বেবাক একা
কেউ বাঁচতে পারে না
কেউ না।

একা, বেবাক একা
কেউ বাঁচতে পারে না
কেউ না।

তুমি যদি কাছ থেকে শোনো
যেটুকু আমি জানি
সেটুকু বলব তোমায়
ঝোড়ো মেঘ জমছে কোথাও
বাদল বইবে বড়ো
মানুষ কোথাও কষ্টে আছে
শোনা যায় সেই গভীর গুমরানি
কারণ একা, বেবাক একা
কেউ কখনো বাঁচতে পারে না

কেউ না।

মা
(আমাকে ধরে থাকে যে দোলনা)

এ কথা সত্যি
আমি তোমার ভিতরে সৃষ্টি হয়েছিলাম।
এ কথাও সত্য
তুমি আমার জন্য সৃষ্টি হয়েছিলে।
আমার আওয়াজ ঠিক তোমার মতো।
এমন ধাঁচ আর সুর ছিল সে আওয়াজে
যা আমাকে শান্ত করতে পারে।
তোমার ঘ্রাণ এমন সুবাতাস
আমি শ্বাস নিতে পেরেছিলাম।
মা, সেই প্রথম কয়টি প্রিয়তম প্রহর
বুঝতে পারিনি
তোমার অনেক চিন্তার মধ্যে
আমাকে নিয়ে তোমার বড়ো কোনো জীবনের চিন্তাও ছিল,
কারণ আমার একটি মাত্র জীবন জানা ছিল তখন,
যা তোমার।

সময় ধীরে ধীরে বয়ে আমাদের দু'জনকে ভাগ করে দেয়।
আমি চাইনি।
ভয় ছিল তোমাকে যেতে দিলে
তুমি চিরতরে চলে যাও কিনা।
তুমি আমার ভয় দেখে হেসেছিলে, বলে ছিলে,
চিরকাল তোমার কোলে আমি থাকতে পারি না
একদিন তোমাকে উঠে দাঁড়াতেই হবে

আর তখন আমার কী হবে?
তুমি হেসেছিলে।
আমি হাসিনি।

না জানিয়ে তুমি আমাকে রেখে চলে গেলে
কিন্তু ঝটতি ফিরে এলে আবার।
তুমি গেলে আর ফিরে এলে,
খুব জলদি, আমি জানি।
আমি তো আশ্বস্ত হতে পারিনি ।
তুমি গেলে, ফিরে এলে।
গেলে, ফিরে এলে।
যতোবার আমার দুনিয়ায় ফিরেছ
স্বস্তি নিয়ে এসেছ তুমি, মা।
ক্রমশ আমি আস্থা খুঁজে পাই।

তুমি ভেবেছিলে আমাকে তুমি চেনো,
আমি চিনি না তোমাকে,
তুমি ভেবেছিলে আমার দিকে সুনজর রাখছ,
অথচ আমিও নাগালে রেখেছি তোমাকে।
তোমার হাঁটাচলা স্মৃতিতে গেঁথেছি।
মুখস্থ করেছি তোমার সুখ, তোমার ক্লান্তি ।
তোমার অনুপস্থিতিতে
আমি তোমার মহড়া দিতাম।
যেভাবে তুমি আচমকা ঢেউ দিলে গুনগুন করে উঠতে
যে-সুরের শিকড়ে ছিল একটি কান্নার আওয়াজ।
তুমি যেভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে
আর অবয়বে খেলা করত রোদ্দুর।
তুমি যখন আমার হাতের মুঠোয় হাত রাখতে
আর বাহু ছুঁয়ে থাকতে আমার
মনে হতো স্বাস্থ্য, শক্তি, স্নেহের প্রসাদ
পাওয়া হয়ে গেছে।

তুমি আমার জন্য ছিলে বরাবর
আনন্দ-হৃদয়
ছলকে ওঠা সুখ
খোলা খুশির মিষ্টান্ন।

তোমাকে ভালোবেসেছি
যখন তুমি কিছু জানতে না
আর আমি, জানতাম সব। ভালবেসেছি
কিছুটা যেন মায়া করে, টিন-এজ প্রজ্ঞার উঁচু আসন থেকে।
তোমাকে হেনেছি তীব্রস্বর, প্রায়শ
তোমার বুঝি বুঝতে দেরি হতো।
আমার বয়েস বাড়ে আর অবাক হয়ে দেখি
কতোখানি জানাশোনা তুমি তুলে নিয়েছ ঝটপট।

মা, এখন বেশি জানি আমি
তাই জানি, আমি কিছুই শিখিনি।
যেদিন সবাই মায়েদের সম্মান জানায়, সেদিন
আমি কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই
আমার স্বার্থপরতা, অজ্ঞতা, বিদ্রূপ
দেখেও তুমি আমাকে ভাঙা পুতুলের মতো
দূর করে দাওনি ব'লে।
আমি কৃতজ্ঞ
তুমি এখনো আমার মধ্যে খুশি আর অবাক হবার মতো,
ভালোবাসার মতো
কিছু খুঁজে পাও ব'লে।
মা, তুমি আমার কৃতজ্ঞতা নাও।
ভালোবাসি তোমায়।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক