দিলরুবা আহমেদ-এর উইপিং উইলো ও নিহা – দুই

দিলরুবা আহমেদ
Published : 14 May 2016, 11:21 AM
Updated : 18 Feb 2022, 05:36 AM


এত সকালে টপ টপ শব্দে নন্দিনীর পাঠানো স্কীন শটের ছবি নিহার ফোনে নামলো। ঘুম চোখে নিহা তা এক নজর দেখে ফোনটা রেখে দিল। সে একটু ঘুমাতে চায়। তার কেবলই মনে হচ্ছে কটা দিন আগের দুপুরের লাঞ্চটা তার জন্য একটা বিরাট ধকল এখনো। সে অসুস্থ বলে সেদিন তার অফিসমেটরা মায়া করে তাকে খাওয়াতে নিয়ে গেছিল। তখনই জানলো, সক্রেটিস তার যে বউ এর কথা বলে বলে এসেছে এতদিন, সে-ও একটি ছেলে, পুরুষ মানুষ। আমেরিকার জন্য হয়তোবা কিছুই নয় এটি, কিন্তু সে তো এদেশে বেড়ে ওঠেনি। কয়দিন আগের দুপুরের ঐ লাঞ্চটায় না গেলে হয়তো সে জানতেও পরতো না। শারলট মেলোডীও তাই। লে। তাকেও লেসবিয়ান ভেবে ওরা ডেকে নিয়েছিল। ওরা যা খুশী তাই হোক তাই বলে তাকেও তাই ভাবা হচ্ছে !! ওহ মা গো। ছেলেদের সাথে মেলামেশা কম বলে কি এমন ভেবে ফেলেছে তারা। বোকা নাকি! নিহা চুপচাপ তাই এখন ঘুমাতে চায়। আয় ঘুম আয়। ঠান্ডা মাথায় ভাবতে চায় খুব দ্রæত ঐ হিরো লইয়ার সাইদকে বিয়ে করে ফেলবে কিনা। নন্দিনী গত কিছু দিন ধরেই বলে যাচ্ছে তাকে, তার বিয়ের বয়স পিছনের দরজা দিয়ে পালাচ্ছে। সে বে- খবর। খবর নাই দিন দুনিয়া জগত সম্পকের্, সে বেহুশ। হুশিয়াররা তাকে হুশিয়ারী করছে। ৩৫ বছর খুবই বুড়া বয়স। এরপরে আর কানাও নাকি তার দিকে ফিরে চাইবে না।
তক্ষুণী সাইদের ফোন। একজন তাকিয়েছে। ধরলো।
সাইদ জানতে চাইছে, কেমন হেলথ কনডিশন এখন?
নিহা বললো, নো ফিভার।
সাইদ অবাক গলায় জানতে চাইলো, নো ফিভার ভাল, বাট গলা এমন কেন শুনাচ্ছে।
নিহা সাদাসাপটা আসল কথাই বলল,
শোন, করোনা ধরেনি। মন খারাপ তাই কেমন আজব শোনাচ্ছে গলা।
সাইদ সাথে সাথে হা হা করে হাহাকার করে উঠলো। বলল, বল কি ! আপসেট। ডিসট্রাবড। শোনা তাহলে একটা দারুন জোকস বলি।
নিহা কিটকিটিয়ে কট কট করে বললো, করোনা নিয়ে বলবা না কিছু। করোনা নিয়ে বললে এখুনি ফোন রেখে দেব।
সাইদ হেসে ফেললো, বলল, বুঝতে পারছি করোনা এখন তোমার কাছে করলা, বিটার, তিতা, কিন্তু এটাই একমাত্র আলোচ্য বিষয় বিশ্বময়। আজ এই মাত্র ২০২০ এর বিশে আনলাকি ১৩ তারিখেই মাচ মাসে সমগ্র আমেরিকায় ইমার্জেন্সী ঘোষণা করা হয়েছে। চীনের উহানে ১২/১২/১৯ এ ধরা পরার পর কি ঝট তাড়াতাড়ি ছডিয়েছে , দেখেছো! মনে আছে কি ওয়াশিংটন প্রথম রাজ্য ছিল যে ২৯শে ফেব্রুয়ারী ২০২০ সবার প্রথমে ইমারজেন্সী ঘোষণা করে। এখন দেখ অবস্থা কেমন দাঁড়ায়। আমার তো ভাল বোধ হচ্ছে না।
ওহ, নো, বল কি?
সাইদ বলল, ইয়েস ম্যাডাম, আছেন কোথায়। বিশ্ব কাপিয়ে দিচ্ছে এই ভাইরাস। তোমার সাথী পাওয়া গেল অবশেষে। তুমি কাপাচ্ছো আমাকে।
নিহা খমখম করেই বললো, অন্যকথা বল, আমার এই সব শুনতে ভাল লাগছে না। কেন ফোন করেছো।
সাইদ ঊৎসাহ নিয়ে বলল, যা শুনেছি তাই বলছিলাম, মশী ভাইয়ের গ্যাস স্টেশনে নাকি আজ চারজন মাস্ক পরা লোক ঢুকেছিল। তাই দেখে সবাই ছিটকে সরে গেল এদিকে ওদিকে। এক জন মাস্ক সরিয়ে তখন বলল, ভয় নেই আমরা ডাকাত। করোনাক্রান্ত নই।
নিহা হেসে দিল।
যাক এই দুঃসময়ে হাসাতে পারা গেলো।
জী জনাব, তো এটা নিশ্চয় মশী ভাইয়ের বানানো গল্প। নাকি তোমার। আমাকে হাসাতে বানিয়েছো।
উনি না বানালে আমিই বানাতাম তোমাকে হাসাতে। তবে যেই যাচ্ছে ওনার দোকানে মাস্ক ছাড়া তাকেই বলছেন, মাস্ক পরেননি ভাল হয়েছে, না হলে ভাবতাম ডাকাত এসেছে। তারপরে ঐ এক জোকস বলে বলে সবাইকে হাসাচ্ছে। কিন্তু সহসাই আমাদের সবাইকে সারা সময় মাস্ক পরতে হবে বলে রাখলাম।
নিহা বললো, তুমি করোনা বিদায় না হওয়া পর্যন্ত ওনার গ্যাস স্টেশনে যাবা না। আজগুবি গল্প বানায় উনি।
সাইদ বলল, শোন আমার অফিস যাওয়াও তুমি হয়তো বন্ধ করে দেবে, এবারের ঘটনা বললে।
কী সেটা।
আর বলো না, আজ অফিসে যাওয়ার পর ঐ যে বাংলাদেশী ছেলেটা, যাকে আমি কাজ দিয়েছিলাম, বেশির ভাগ সময় ঐ যে প্রথম প্রথম আমাদের প্রেমের সময় নিত্য নতুন কবিতা, বাংলার বিখ্যাত সব কবিতা, আমাকে লিখে দিত বাংলাটাই ইংরেজি অক্ষরে সেই আজ, ফেইসবুক থেকে পড়ে শোনাল।
নিহা আঁতকে ঊঠে যেন বললো, এই দাড়াও দাড়াও, কবে তোমার সাথে আমার প্রেম হলো। কই আমি তো এ ব্যাপারে কিছইু জানি না।
মানে ঐ আর কি, এক তরফা, এখনও এক তরফা। ঐ ছেলেকে বলে রেখেছি, আর এক মাসের মধ্যে কাজ না হলে তোমাকে সোজা ফায়ার করবো। সে বলেছে করোনার সময়টাতে করুনা করতে। করোনা পার হলে সে আরেকবার শেখাবে কি করতে হবে, কি না করতে হবে, টু হ্যাভ ইউ ইন মাই লাইফ।
নিহা সরাসরি মতামত দিলো, কালই ওকে ফায়ার করবে।
ওহ ম্যম,বল কি? আমার অফিস চলবে কিভাবে?
চলবে। চলবে। ও চলে গেলে দোড়াবে।
সাইদ হাসতে হাসতে বলল, তুমি ভেবেছো এভাবে পালাতে পারবে। যা আসবে সব কিছুকেই ফেইস করতে হবে।
নিহা বলল, পারবে মৃত্যুকে ঠেকাতে।
সাঈদ বীর দর্পে বলল, ফেইস করবো। যুদ্ধ করবো বাচার জন্য। না বাচতে পারলে মরে যাব। কিন্তু যুদ্ধ করে বাচবো। মরবো বীরের মতন কোন মহৎ কিছুর জন্য। এই কোথাকার কোন এক ভাইরাস এসে মেরে দিয়ে যাবে এটা মানা যাবে না।
তাহলে কি করবে?
আরে আমি প্রচুর ভিটামিন সি খাচ্ছি, লেবু খাচ্ছি। কালজিরা খাচ্ছি। এসব বলেছে খেতে নন্দিনী। আমার বিদেশিনী মা তো চেনেই না কালজিরা কি। বলেই যাচ্ছে এটা কি। হাউ টু ইট। নন্দিনী ভাবী বলেছেন কাল ওনার বাসা থেকে মিষ্টি কুমড়া দিয়ে রাধা কালোজিরা আর চিংড়ীর তরকারী উঠিয়ে আনতে, তোমাকেও ড্রপ করতে বলেছেন, এই সুযোগে উনি ভাবছেন উনি আমাকে তোমার কাছে আসার আরেকটু সুযোগ করে দিয়েছেন।
ওহ তাই বুঝি।
হ্যা তাই।
হুম।
জি হুম, মিস নিরবধি।
আমি বধির।
বলেই নিহা বুঝেছে, মানে বুঝবে না ওই ছেলে। শিখে এসেছে হয়তোবা ঐ ছেলে নজরুলের কাছ থেকে ঐ নিরবধি। হয়তোবা জানতে চেয়েছে ঐ ছেলের কাছে চিরকাল যে সাথে সাথে যাবে তাকে কি বলে? তারপর শুনেছে ঐ নিরবধি, এখন তাই ডাকছে। আগেও বহু আজব নামে ডেকেছে।
নজরুল তো বললো, নিরবধি, আমার সাথে বয়ে যাবে জীবনভর। বধির কি?
যাই বলো, যে শুনবে না, সেই বধির। কালা তো বুঝ। একই।
ওপাশ থেকে কেবল বললো , হার্টলেস লেডি।
নন্দিনী আজ আমাকেও ফোন করেছিল। কিন্তু বলেনি অবশ্য কালজিরা নিয়ে কিছু। বলেছে একটা বইয়ের কথা। জানতে চেয়েছে আমি এত বই পড়ি 'দি আইস অফ ডার্কনেস' বইটা পড়েছি কিনা। ডিয়ান ক্রনটজ এর লেখা। ওখানে নাকি ১৯৮১-তে আজকের এই ভাইরালের কথা চীনের উহান শহরের কথা বলা হয়েছে।
সাইদ বলল, এতটা হয়, খাপে খাপ, টু দ্যা পয়েন্ট, এক্কেবারে নাম উল্লেখ করে। আরে দেখ গে ক'টা পাতা নতুন করে জুড়ে দিয়েছে।
নিহা বলল, আমি কি আর বলবো, সবাইতো আজকাল ভবিষ্যত নিয়ে মন্তব্য করছে। মশী ভাইও। উনি নাকি স্বপ্ন দেখেছেন এই ২০২০ এ-ই আমার বিয়ে।
সাইদ লাফ মেরে উঠে বলল, কি বল বলেছে তা, আমাদের বিয়ে। আই লাভ ২০২০ এন্ড মশী ভাই।
তোমার কথা তো বলেন নি। বলেছেন আমার বিয়ে।
সাইদ প্রত্যয়ের সাথে জানতে চাইলো, তোমার বিয়ে আর কার সাথে হবে আমি ছাড়া।
নিহা বললো,উনি বলেছেন উনি দেখেছেন একজন আফ্রিকান লোকের সাথে আমার বিয়ে হচ্ছে খুবই ধুমধাড়াক্কা করে।
তুমি যে হাতুড়ী পিটায়ে আমার বুক ফাটায়ে দিচ্ছো সেটা বুঝতে পারছো না?
সে কি? বল কি সাইদ?
জি ম্যাডাম আমার মনে হচ্ছে আজই মশী ভাইয়ের শেষ দিন। আই জাস্ট কেন নট লাভ দিজ গাই এনিমোর। ঠিকই বলেছো আর যাব না ওনার চত্বরে।
নিহা হা হা করে হাসতে লাগলো।
বুঝতে পারছে তার ভার ভার লাগা, দুনিয়াদায়ী বিরক্ত লাগা অনুভ‚তিটা কমতে শুরু করেছে। অযথাই সবকিছু কেন যে এত ঘোলাটে বিরক্তিকর মনে হচ্ছিল। যত্তসব। উঠে পড়লো, শুয়ে থাকবে না আর। সাইদকে বাই বলতে গেল আর ওমনি সাইদ বলল,
চল না আজও তোমাকে কিছু খাওয়াতে নিয়ে যাই। আস আমার এ্যাপার্টমেন্টে। কখনো তো দেখলেই না আমি কোথায় থাকি। কেমন থাকি একা একদম একা একজন স্বজন হারা বাস্তুছাড়া একজন হয়ে।
নিহা মাঝে মাঝে খুব অবাক হয়, এত বছর হয় সেই ১০ কি ১২ বছর বয়স থেকে বিদেশে তারপরও কি সুন্দর করে বাংলা বলে যেতে চায়। ওর বিদেশী পালক বাবা মা ওকে নিয়ে যে চলে এসেছিল তারপর তো আর যায়নি কখনোই। তারপরও ভালই বাংলায়। বলে ঐ নজরুল, অফিসের ছেলেটা, সেই শেখায়, এক পাতানো খালা আছেন উনিও ধমক দিয়ে ঠিক করান তার বাংলা। আরো বলে,সারাক্ষণ ইউটিউবে বাংলা নাটক দেখে, এক্কেবারে গ্রামের নাটক, আবৃত্তি শোনে, মুভী দেখে, এতেই নাকি উন্নতি, হিন্দি মুভী দেখে দেখে যেমন সবাই হিন্দি শিখে ফেলে সে তেমনি ভাবে শিখেছে বাংলা।
বলল নিহা, তোমার বাংলা আমার ভাল লাগে।
সাইদ চট জলদি জানতে চাইলো, শুধু বাংলা?
নিহা বলল, হা ,এতটা ভাল হবার কিন্তু কথা ছিল না।
সাইদ জোরালো ভাবে জানালো, যে যা চায় তা পেতে চেষ্টা করে। চর্চা রাখে। আমি কেমন লাগাতার ভাবে তোমার পিছা করে যাচ্ছি, বাংলার পেছনেও আছি তেমনিভাবে। অবিরাম। ঐ নজরুল গতকালকে আমাকে ১২টা কঠিন বাগধারা শিখিয়েছে। শুনবে?
না।
না কেন?
আমার ইচ্ছে।
তুমি যে এত দূর ছাই কর আমাকে আর আমার ঐ নজরুলকে একদিন কিন্তু পস্তাবে।
কখন পস্তাবো?
এই ধর এই করোনায় যদি আমার আর নজরুলের এক সাথে মৃত্যু হয়।
তোমার সাথে নজরুলের কেন মৃত্যু হবে?
শুধু নজরুল না, আমি ও আমার পাঁচজন অধস্তন এক সাথে তাহলে।
তাহলে কি?
তাহলে তোমার খুব কষ্ট হবে।
হবে না।
যখন দেখবে ওদের বৌ বাচ্চারা কেও ওদের কাছে আসতে পারছে না, ওরা একা একা মারা যাচ্ছে, আইসোলেশনে,ভেনটিলেশনে, আমিও একা একা মারা যাচ্ছি মাগুর মাছের মতন তপরাতে তপরাতে।
নিহা এবার ভ্রæ কুচকে বলল, এটা কেমন সিকোয়েন্স তুমি তৈরি করেছো। এখানে তো তোমার কেও নেই, না বৌ না বাচ্চা, তাহলে ওদের বৌ বাচ্চাদের পাশে দাঁড়িয়ে তো আমার ওদের জন্য কষ্ট হবে, দেখবো ওরা কাদছে সবাই। তখন তোমার জন্য না, ওদের জন্য কাদতে মন চাইবে।
সাইদ, দাড়ি দাড়ি, থুক্কু থুক্কু বলে বলল, ওকে ভেবে কাল জানাবো এরপরে কোনদিকে কি রকম হবে।
নিহা দুই দিকে ঠোঁট এক সাথে বাড়িয়ে আবার ছোট করে বলল, ঐ নজরুল থেকে বাকিটুকু শিখে নিও।
সাইদ ফোনের ভিতরই নকল এক হুনকার দিয়ে বলে ঊঠলো, ও আমাকে কি শিখাবে। আজই তাকে ফায়ার করবো। ভাল মতন গল্পটার কল্পনাও সাজিয়ে দিল না। এ মাসের বেতনও দেব না। না খেয়ে মরুক।
নিহা আ-হা-রে করে ঊঠে বললো, তুমি সেটা চাইলেও হবে না। সরকার এই মাসের খরচ বাবদ ডলার পাঠাচ্ছেন। এই করনায় সবার লসেরই কিছুটা পূরনের জন্য সরকার পরিকল্পনা নিচ্ছেন।
সাইদ এবার তলিয়ে ভাবছে যেন লোকশানের খতিয়ান, বললো, আর আমার লাভটাভের পরিপূরক কিভাবে কি হবে?
নিহাও কম যায় না, সাথে সাথে বলে দিলো, ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করলে সাথে সাথে বলে দেবে তোমাকে, ওহে বালক সাইদ, আমি তোমার জন্য আরেকটা নিহা ক্লোন করে দেব। যদি চাও এইবারের নিহা হবে আমাদের মতন সাদা ফর্সা, বাদামী না।
সাইদ এবার সত্যিই হো হো করে হাসতে লাগলো। বলল, আমার বাদামী নিহাই লাগবে,বাদশাহী চালে সে আমাকে অবহেলা করবে।
নিহা চোখ নাচিয়ে বললো, তাও করে দেবেন বলে আশ্বাস দেবেন।
সাইদ মাথা দোলায়,বলে না, নিহা শুধু একটাই। ইউনিক।
বলছো?
হ্যাঁ নিহা। তাই বলছি। শপথ করে বলছি।
কি আছে আমার, এই নিহার ?
কি নেই তোমার? আমি আছি। আর কি চাই?
নিহা এক আকাশ হাসি দিয়ে বললো, আমার বয়স ৩৫।
আমারও ৩০। তুমিও ৩ আমিও ৩ দিয়ে শুরু। বয়সের দিক দিয়ে তোমার সঞ্চয় আমার থেকে পাঁচ বছর বেশি ভাবাটা ঠিক না আসলে। ভিলেজের ছেলের বয়সের হিসাবটা সব সময় ঠিক থাকে না। ওনারা এডাপ করে এনেছেন তখন কি বয়স বসিয়েছেন কে জানে। আমার ধারনা আমার মনের বয়স ১৩৫ বছর।
নিহা এবার বলল,ওকে,আমি সুন্দর নই।
নিজে চোখে কি তুমি নিজেকে দেখতে পাও! আয়না লাগে। অথবা অন্যের চোখ। আমি বলছি তুমি অপূর্ব। আর কি কোন কথা থাকতে পারে।
সাইদ তুমি আরো অনেক ভাল বিয়ে করতে পারবে।
আমার পি এইচ ডি করা বউ চাই।
এই শহরে দেশে যেন আর কোন পিএইচডি করা কেউ নেই।
আমার ভাষায় কথা বলে এমন কোন পিএইচডিকে আমি চিনি না। থাকলেও তাদের বিয়ে হয়ে গেছে। ওদের বরদের তো আর গিয়ে বলতে পারি না যে আপনার বউটাকে দিন, আমি বিয়ে করবো।
এতক্ষণ সাইদ কথা বলছিল খুব শান্ত গম্ভীর হয়ে। অন্যের বউ চাইতে গিয়ে বেশ আহালাদীতো হয়ে উঠলো তার বলার ভঙ্গী আর গলার স্বর।
নিহার হাসি পেয়ে গেল। এই ছেলে খুবই বদ। অনেক বদমাশ। দেখলে যেমন মনে হয় ভদ্র, আসলে মোটেও তা না।
হঠাৎ আবার আগের গভীরতায় ডুব দিয়ে সাইদ বলল, আমার জন্য শুধু একজনই আছে সেটি তুমি।
নিহা বলল,আমি এতিম। কোন শ্বশুর বাড়ি পাবে না।
সাইদ এক হাতের ঊপর আরেক হাত ক্রস করে বসিয়ে বললো, আমিও তাই। কাটাকুটি। আমার সাথে কাটাকুটি খেলায় পারবে না।
নিহা বলল,আমি কোন খেলাতেই নেই। খুব ক্লান্ত আমি। দীর্ঘ দিন একা একা পথ চলেছি।
আমিও তাই। আমি শুধু ক্লান্তই নই অভূক্তও।
নিহা বদ বলে ফোনটা রেখে দিতে গেল। সাইদ তাড়াতাড়ি বললো, শোন শোন ,আমি সহসাই ভেরী সুন আমাদের জন্য একটা ড্রীম হাউস কিনতে যাচ্ছি। বাগান বাড়ী। দেশে। ঐ এক ভিলেজে। ভরা থাকবে চারধারে উইপিং উইলো গাছে। বাড়ীর নামও রাখবো উইপিং উইলো বা বাংলায় ক্রন্দনসী দেবদারু অথবা কান্নাবতী দেবদারু। তোমাকে দেখলেই আমার মনে হয় তুমি বুঝি উইপিং উইলোর মত নদীতে ঝুকে কাদছো।
নদীতে ঝুকে কাদবো কেন? নদীতে ঝুকে তো পানিতে মুখ দেখবো।
সাইদ এবার বেশ গভীর আবেগ দিয়ে বলে, নদীতে পানিতে চোখের পানি একাকার করে তুমি লুকাতে চাও নিজেকে। আমার মনে হয় কি জানো জান ,আমাদের সবার মাঝে ক্রন্দনরত একজন আছে, অন্ততকাল ধরেই আছে। যে কাদতেই থাকে অনেক না পাওয়ার দুঃখে। আমাদের সবারই বুঝি জীবনে যেতে যেতে আরো অনেক পেতে পেতেও মন কাদতে থাকে অনেক কিছু না পাওয়া নিয়ে , তাই নয় কি? তুমিই বল।
নিহা এড়তে চেয়ে বলে, আমি দর্শন তত্ত¡ যে কম বুঝি।
সাইদ হাসে, বলে, তুমি আমার উইপিং উইলো। তোমাকে না পেলে আই উইল উইপ ফর এভার।
নিহা কপোট ধমকে বলে, কি বল এসব? নজরুল বিদায় দিবস যেন কালকেই হয়।
সাইদ হুড়মুড়িয়ে বলে, এটা আমার কথা, নজরুলের না, সে জানেও না আমি কি কি কতদূর ভাবছি তোমাকে নিয়ে। আরে চীনের মাও সেতুং- ই লিখেছেন আমাকে সাহসী করতে, তিনি লিখেছেন তুমি আমার উইপিং উইলো আর আমি তোমার প্রাউড পপলার। এটা অবশ্য নজরুল খুজে দিয়েছে, গুগুল করে না পেলে নজরুলের দোষ , আমার না। আমি নিজে এটা আর খুজে পাইনি । নজরুল বলেছে চীনা জিনিষের স্থায়িত্বে মতন এটিও বিলিন হয়ে গেছে গুগুল থেকে।
নিহা হাসতে হাসতে বললো,তুমি একটা অসীম পাগল ,তুমিও আপাতত বিলিন হও, বলে নিহা ফোন রেখে দিল।
পরের পলকেই মনে হলো তার বুঝি ভীষন কান্না পাচ্ছে। খুব কাদতে ইচ্ছে করচ্ছে। অযথাই। না অযথাই নয়। একজনের ভালবাসায় কাদতে ইচ্ছে করচ্ছে। ছুয়ে দিচ্ছে যেন সাইদ তার ভেতরের কাওকে। দূর দূর, এই দূরদেশে এই সব কান্না নিয়ে বিলাস খুবই অবান্তর। বাদ বাদ, যেতে দাও,যেতে দাও। নো ড্রামা। নো কান্নাকাটি।
চলবে

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক