মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর ও সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের প্রণয় ও তার পরিণতি-২

মোস্তাক শরীফ
Published : 10 Nov 2021, 12:15 PM
Updated : 10 Nov 2021, 12:15 PM


পাঁচ

শরাবের সঙ্গে আফিম মিশিয়ে খেলে এমন চমৎকার স্বাদ হয় সেলিমের জানা ছিল না।
পরীক্ষামূলকভাবে দু'একবার খাবার পর ব্যাপারটা নেশায় দাঁড়িয়ে গেল। অতিরিক্ত আফিমপ্রীতি মান বাইয়ের জন্য কতটা ভয়ঙ্কর হয়েছে ভালোভাবেই জানেন তিনি, তবু নেশাটা ছাড়তে পারলেন না। রাণী জগৎ গোসাই যথেষ্ট চেষ্টা করলেন, এমনকি শরীফ খান আর শেখ কবিরও আকারে ইঙ্গিতে বোঝাল, কিন্তু দিন দিন নেশার মাত্রা বেড়েই চলল। সেলিমের নিজেরও মনে হতে লাগল, এ যেন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া, যত ইচ্ছেই থাকুক, অবশ্যম্ভাবী এ পতনকে ঠেকানোর সাধ্য তারও নেই।
এরই মধ্যে একদিন তার তিন সভাসদ একসঙ্গে পালাল দাক্ষিণাত্যের উদ্দেশে।
খবরটা যখন পেলেন তখন নিরালায় বসে আফিম খাচ্ছিলেন সেলিম। 'তিনজনকে ধরে আনো,' কুতুবুদ্দিন কোকাকে বললেন তিনি। 'হতে পারে দানিয়ালের গুপ্তচর তারা, খবর পাচার করতে যাচ্ছে।'
দুর্বৃত্তদের পাকড়াও করতে দেরি হলো না। হাত পা শেকলে বেঁধে তিনজনকে হাজির করা হলো সেলিমের সামনে। একজন ওয়াকিয়ানবিস (নথি লেখক), একজন খান আজাদ (ভৃত্যের ঘরে জন্ম নেয়া রাজকর্মচারী) আর অন্যজন এক ভৃত্য। শরাবের পেয়ালা হাতে খুনে চোখে তিনজনকে জরিপ করলেন সেলিম।
উঁচু বেতন দিয়ে এত আরাম আয়েসে রাখার পরও এমন নেমকহারামি! মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল তার।
'নিয়ে যাও তিন কমবখতকে,' চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন তিনি, 'খান আজাদকে খোজা বানিয়ে দাও, নফরটাকে পিটিয়ে মারবে আর জ্যান্ত অবস্থায় চামড়া ছাড়াবে ঐ হারামজাদা ওয়াকিয়ানবিসের।'
সেলিমের হুকুম শুনে এমনকি কুতুবুদ্দিন আর আবদুল্লাহ খানের মতো কঠোরহৃদয় মানুষেরও চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। শরীফ খান বলার চেষ্টা করলেন, 'জাঁহাপনা…'
'চোপরাও!' গর্জে উঠলেন সেলিম, 'বাদশাহর মুখে মুখে কথা বলা কোন ধরনের বেত্তমিজি?'
তাঁর সামনেই শাস্তি কার্যকর করা হলো তিন অপরাধীর। শরাবের পেয়ালা হাতে নির্বিকার মুখে বসে বসে দেখলেন সেলিম।

বাতাসের বেগেই এ খবর পৌঁছে গেল আগ্রায়।
নকিব খানের মুখে এ খবর শুনে বজ্রাহতের মতো বসে রইলেন আকবর। চেহারাটা পাংশুটে হয়ে গেছে, কেবল ধকধক করে জ্বলছে চোখ দুটো। 'বেঁচে থাকতে এমন খবরও আমাকে শুনতে হবে কল্পনা করিনি,' বিড়বিড় করে বললেন তিনি। মির্জা আজিজের দিকে ফিরলেন তিনি। 'তলোয়ারের শক্তিতে গোটা দুনিয়া জয় করেছি আমরা, কিন্তু এমনকি একটা ভেড়াকে পর্যন্ত জ্যান্ত অবস্থায় চামড়া ছাড়াইনি। খান-ই-আজম!'
'হুকুম করুন জাঁহাপনা।'
'সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করুন। প্রচার করে দিন শাহেনশাহ শিকারে যাবেন।'
'আমরা কোথায় যাচ্ছি জাঁহাপনা?' উত্তরটা জানা, তবু জিজ্ঞেস করলেন মির্জা আজিজ।
'এলাহাবাদ। এই শেষবারের মতো সুযোগ দেব সেলিমকে। আমার পায়ে পড়ে ক্ষমা চাইবে সে এই নির্মমতার জন্য। যদি তা না করে তাহলে বুঝবে তার বর্বরতার চেয়েও কত ভয়ঙ্কর হতে পারে জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবরের ক্ষোভ।'
ভাদ্রমাসের এক রাতে, পঞ্জিকামতে এক শুভক্ষণে এলাহাবাদের উদ্দেশে পাল তুলল সম্রাটের নৌবহর। কিন্তু শুরুতেই ঝামেলাই। ডুবোচরে আটকে গেল নৌকা। বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো তারপর শুরু হলো অঝোর বৃষ্টি। তিনদিন একই জায়গায় আটকে রইল সম্রাটের নৌবহর। তারপর যখন ফের যাত্রাশুরুর উদ্যোগ নেয়া হলো তখনই আগ্রা থেকে ঊর্ধ্বশ্বাসে এসে পৌঁছাল এক সংবাদবাহক। মরিয়ম মাখানি গুরুতর অসুস্থ। চিকিৎসকরা আশা ছেড়ে দিয়েছেন।
দ্রুত আগ্রায় ফিরে এলেন সম্রাট। শয্যাশায়ী মায়ের দিকে একবার তাকিয়েই বুঝলেন, আশা নেই। মায়ের শয্যাপাশে বসে ব্যাকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তার মুখের দিকে, চোখ থেকে দরদর করে ঝরে পড়ছে অশ্রু। সম্রাটের মনে হলো সময় যেন থমকে গেছে, এবং স্তব্ধ হয়ে যাওয়া নিষ্প্রাণ এক পৃথিবীকে সামনে রেখে তিনি যেন মহাকালের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
হাকিম হুমাম এসে যখন যখন এদিক ওদিক মাথা নেড়ে জানালেন সব শেষ হয়ে গেছে তখনও বিন্দুমাত্র নড়লেন না সম্রাট। নড়বার শক্তিও যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে।
বহু বছর আগে মুরাদের নয় বছর বয়সী রুস্তমের মৃত্যু শোকে ভাসিয়েছিল সম্রাটকে। তিনি বুঝেছিলেন হৃদয় ভেঙেচুরে যাওয়া কাকে বলে। তারপর মুরাদের মৃত্যু, গুলবদন বেগমের চলে যাওয়া-এ সবই সম্রাটকে বিপর্যস্ত করেছিল। কিন্তু মায়ের মৃত্যু যেন তাঁকে স্তব্ধ করে দিল। পুরোপুরি গুটিয়ে নিলেন নিজেকে, দরবারের কর্মকাণ্ড থেমে গেল, মনে হলো সমগ্র শহরই বিষাদের ভারি এক আবরণে ঢাকা পড়েছে।
এলাহাবাদে যখন এ খবর পৌঁছাল, শোকে স্তব্ধ হয়ে গেলেন সেলিমও। কুতুবুদ্দিনসহ অন্যরা যখন সমবেদনা জানাতে এলেন, অশ্রু মুছে সেলিম জানালেন আগ্রা যাবেন তিনি।
'এটা মোটেই সুবিবেচনাপ্রসূত হবে না আলমপনাহ্,' কুতুবুদ্দিন বললেন। 'আপনার শত্রুদের জন্য এটা হবে মেঘ না চাইতেই জলের মতো। গোস্তাকি মাফ করবেন, কিন্তু প্রাণ নিয়ে আপনি আগ্রা থেকে ফিরতে পারবেন এ আমি বিশ্বাস করি না।'
সায় জানালেন আবদুল্লাহ খান, 'আমিও তাই মনে করি। আজিজ কোকা, মান সিং সবাই ওখানে। সারাদিন শাহজাদা খসরুর কানের কাছে ফুসুরফুসুর করছে। পরিস্থিতির ওপর শাহেনশাহ আকবরের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এ মুহূর্তে আগ্রায় যাওয়া হবে অত্যন্ত বিপজ্জনক।'
এমনকি শরীফ খানও একমত হলেন তাদের সঙ্গে।
কিন্তু তাদের কোনো কথাতেই মত বদলালেন না সেলিম। মরিয়ম মাখানির মৃত্যুর মাসদুয়েক পর আগ্রায় রওনা দিলেন। কুতুবুদ্দিন, আবদুল্লাহ, মহব্বত খান কেউই রাজি হলেন না সেলিমের সফরসঙ্গী হতে। নানা অজুহাতে কেটে পড়লেন শেষ মুহূর্তে।
কোনো কিছুতেই ভ্রুক্ষেপ করলেন না সেলিম। যেন নিয়তির অদৃশ্য ইঙ্গিতে পরিচালিত হচ্ছেন তিনি, প্রলয় নেমে এলেও থামানো যাবে না তাকে।
পথশ্রমে ক্লান্ত, মলিন চেহারা নিয়ে যখন আগ্রার দরবারে প্রবেশ করলেন, নির্বিকার দৃষ্টিতে পুত্রকে নিরীক্ষণ করলেন আকবর। এ ক'দিনে সম্রাটের নিজের বয়সও যেন বেড়ে গেছে কয়েক বছর। ভ্রু পেকে সাদা হয়ে গেছে, দৃষ্টি কুঞ্চিত করে কিছুক্ষণ সেলিমকে জরিপ করলেন তিনি। তারপর মসনদ থেকে নেমে পুত্রকে আলিঙ্গন করলেন। শোকে পর্যুদস্ত এবং ক্রোধে অগ্নিশর্মা আকবর দরবারে সবার সামনেই সেলিমের দফারফা করে ছাড়বেন বলে যেসব অমাত্য মনে মনে আশা করেছিল তারা মলিন মুখে দেখল দৃশ্যটা।
চেহারায় নির্বিকার ভাব বজায় রাখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন মির্জা আজিজ কোকা। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল তাঁর। নিস্ফল ক্ষোভে দাঁতে দাঁত ঘষলেন।
অবশ্য জেনানা মহলে গিয়ে একান্তে পুত্রের মুখোমুখি হওয়ার পরই চেহারা পাল্টে গেল সম্রাটের। সজোরে সেলিমের গালে চড় কষালেন তিনি।
'মুর্খ! অপদার্থ! নির্বোধ! লজ্জায় নিজের কাছেই আমার মাথা হেঁট হয়ে যায় তোমার মতো সন্তান জন্ম দিয়েছি বলে। কী দিইনি তোমাকে আমি? সম্মান, অর্থবিত্ত, ক্ষমতা, চাওয়ার আগেই পেয়েছ সব। অথচ কী করলে সেসব দিয়ে? আমার সম্মান ধুলোয় মিশিয়েছ তুমি। মদ্যপ, অকর্মণ্য, লম্পট!'
একটা শব্দও উচ্চারণ করলেন না সেলিম। মাথা নিচু করে আছেন, চোখ দিয়ে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ছে পানি।
'এখন তুমি বুঝবে জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবরের ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়ার ফল কী।'
সম্রাটের খোজা দেহরক্ষী ইতিমাদ খান ও খাওয়াস খানসহ কয়েকজন কক্ষের বাইরে অপেক্ষা করছিল। সম্রাটের নির্দেশে সেলিমকে নিয়ে একটা কক্ষে বন্দি করে রাখল তারা।
'তাকে যদি কেউ একবিন্দু শরাব দেয় নিজ হাতে তাকে চাবুকপেটা করব আমি,' ইতিমাদ খানকে বললেন আকবর।
ভেতরে বসে চুপচাপ বাবার নির্দেশ শুনলেন সেলিম। ঘটনার আকস্মিকতায় অনুভূতি যেন ভোঁতা হয়ে গেছে তার।
সম্রাটের রাগ কমতে সময় লাগল ঠিক দশ দিন। এর পুরো কৃতিত অবশ্য সেলিমা সুলতান বেগম, রুকাইয়া সুলতান বেগম আর সেলিমের বড় বোন শাকিরুন্নেসা বেগমের। তাদের তিনজনের অবিরাম অনুরোধ আর কাকুতি মিনতি উপেক্ষা করতে পারলেন না সম্রাট। আরেক প্রস্থ বকুনি দিয়ে মুক্ত করে দিলেন সেলিমকে। ফুফুদের পরামর্শে সেলিম নতমস্তকে জানালেন, পিতার কথার অবাধ্য হবে না আর, তাঁর সমস্ত নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলবেন।
সম্রাটকে দেখে মনে হলো না ছেলের একটা কথাও বিশ্বাস করেছেন। তবে এ নিয়ে কথাও বাড়ালেন না।
কয়েকদিন সব চুপচাপ। বাধ্য ছেলের মতো দরবারে হাজিরা দেন সেলিম, মির্জা আজিজ আর মান সিং খসরুকে নিয়ে নানারকম শলাপরামর্শে ব্যস্ত, সব খবরই কানে আসে তার। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখান না তিনি, ভাব করেন তাদের অস্তিত্ব সম্বন্ধেই সচেতন নন।
সবাই অপেক্ষা করে আছে সম্রাট এখন কী করেন তার জন্য।
এমন সময় দাক্ষিণাত্য থেকে এল দানিয়ালের মৃত্যু সংবাদ।

মাত্রই গত বছর এক পুত্রসন্তানের পিতা হয়েছে সে। কেবল তাই নয়, বিজাপুরের এক রাজকুমারীকে বিয়ে করে দাক্ষিণাত্যের রাজপরিবারের সঙ্গে মুঘলদের বন্ধনকে আরো দৃঢ় করেছে। তারপর যখন নওরোজ উপলক্ষ্যে সম্রাটের জন্য তিনটি হাতি পাঠাল, দ্রবীভূত হয়ে গিয়েছিল সম্রাটের মন। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন, খাদের কিনার থেকে ফিরে এসেছে তাঁর প্রিয়তম পুত্র।
সব আশা হয়তো এখনও শেষ হয়ে যায়নি।
কিন্তু শরাবের নেশা যে তাকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিয়েছে সেটা জানতেন কেবল তার শ্বশুর আব্দুর রহিম খান-ই-খানান, জামাতাকে দেখেশুনে রাখার জন্য দাক্ষিণাত্যে যিনি ঘাঁটি গেড়েছিলেন। মদের বোতল থেকে দানিয়ালকে কিছুতেই বিচ্ছিন্ন করতে না পেরে শেষ চেষ্টা হিসেবে তার কাছে মদের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দিলেন খান-ই-খানান। দানিয়ালের অবস্থা হলো খাঁচায় বন্দি ক্ষুধার্ত সিংহের মতো। মুর্শিদ কুলি নামে এক বিশ্বস্ত ভৃত্যকে হাত করল সে। বন্দুকের নলে ভরে দানিয়ালের জন্য মদ নিয়ে এল মুর্শিদ কুলি। বন্দুকের নলের ভেতরের মরিচা মদের সঙ্গে মিশে বিষাক্ত যে পানীয় তৈরি করল সেটিই কাল হলো দানিয়ালের।
মৃত্যুযন্ত্রণায় কদিন ছটফট করল দানিয়াল। শেষ মুহূর্তে তার মাথাটা কোলে তুলে নিলেন খান-ই-খানান। দানিয়ালের চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসবে, মুখ হা, জিহ্বা বেরিয়ে এসেছে।
'কিছু খেতে চান শাহজাদা?' জিজ্ঞেস করলেন খান-ই-খানান।
'শরাব,' ফিসফিসিয়ে বলল দানিয়াল। সেটিই ছিল তার শেষ কথা।

ছয়
ফের শোকের চাদরে ঢাকা পড়ল আগ্রা রাজদরবার।
সম্রাটকে দেখে মনে হলো একটা ঘোরের মধ্যে আছেন। আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক তিনি, তবে তাঁকে যারা ঘনিষ্ঠভাবে চেনে তাদের বুঝতে অসুবিধা হলো না, স্বাভাবিক অবস্থায় নেই সম্রাট। মাঝেমাঝেই চুপ করে যান, নিজে নিজে বিড়বিড় করেন। কখনো কখনো মনে হয় শরীরটাকে টেনে নিতেই কষ্ট হচ্ছে।
এরই মধ্যে একদিন অদ্ভুত এক ঘোষণা এল। সেলিমের প্রিয় হাতি গিরানবারের সঙ্গে লড়াই হবে খসরুর নিজস্ব হাতি অপূর্ব-র।
হাতির লড়াই মুঘলদের মধ্যে নতুন কিছু নয়। বাবুরের সময় থেকেই সম্রাট আর শাহজাদাদের প্রিয় শখ এটা। কিন্তু মসনদকে ঘিরে এই চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তে সেলিম আর খসরুর হাতির মধ্যে লড়াই বাঁধিয়ে দিয়ে সম্রাট ঠিক কী প্রমাণ করতে চাইছেন বুঝতে পারল না কেউ।
তার মানে কি এই হাতির লড়াই-ই ঠিক করে দেবে আকবর কার হাতে তুলে দেবেন সিংহাসন?
এটাও কি কখনো হয়?
লড়াইয়ের দিন যত এগিয়ে এল উত্তেজনার পারদ ততই চড়তে লাগল। সেলিম আর খসরুর সমর্থকদের মধ্যে কয়েক দফা হাতাহাতিও হয়ে গেল। সেলিম অবশ্য নির্বিকার। যেন এ লড়াইয়ে কিছুই এসে যায় না। কৌতূহল চাপতে না পেরে ঘনিষ্ঠ সহচর মীর জিয়াউদ্দিন কাজভিনি জিজ্ঞেসই করে ফেললেন, 'এত বড় একটা ঘটনা, আপনার মধ্যে কোনো চাঞ্চল্যই নেই? আমরা জানি না এমন কিছু কি আপনি জানেন?'
ব্যঙ্গের হাসি হাসলেন সেলিম। 'জানাজানির কী আছে? গিরানবারের সামনে দাঁড়াতে পারবে নাকি কোনো হাতি?'
খসরুর বিশাল হাতিটার ছবি চোখে ভেসে উঠতে অবশ্য সেলিমের কথায় অতটা ভরসা পেলেন না জিয়াউদ্দিন।
অবশেষে নির্দিষ্ট দিনে শুরু হলো গিরানবার আর অপূর্বর লড়াই। এবং দশ মিনিট কাটতে না কাটতেই জিয়াউদ্দিন বুঝে ফেললেন সেলিম কেন এত নির্ভার। আঘাতে আঘাতে অপূর্বকে দিশেহারা করে তুলল গিরানবার। মনে হলো দানব ভর করেছে তার ওপর। খসরুর সঙ্গীসাথীরা লম্ফঝম্ফ করল অনেক, কিছুতেই কিছু হল না। মারের চোটে পালিয়ে কুল পেল না অপূর্ব।
ভাবলেশহীন চেহারায় নাতির হাতিকে পুত্রের হাতির কাছে হার মানতে দেখলেন সম্রাট আকবর। বাবার সামনে গিয়ে তসলিম জানালেন সেলিম।
অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে তসলিম গ্রহণ করলেন আকবর। তাঁর ঘোলাটে চোখ আর নির্বিকার চেহারা দেখে বোঝার উপায় থাকল না মনের ভেতর ঠিক কোন ভাবনা খেলা করছে তাঁর।

যমুনার অন্য পারে নিজের লোকজনদের নিয়ে ঘাঁটি গেড়েছেন সেলিম। তার সঙ্গীসাথীদের মধ্যে যারা এতদিন আসেননি গত কয়েকদিনে তারাও এলাহাবাদ থেকে এসে যোগ দিয়েছেন। প্রতিদিনই বাড়ছে তাঁর শিবিরের আকার।
হাতির লড়াইয়ের দু'দিন পরের কথা। একা বসে আকাশপাতাল ভাবনায় ডুবে ছিলেন সেলিম, প্রহরী এসে কুর্নিশ করল।
জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন সেলিম।
'সাঈদ খান এসেছেন, আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।'
'এখানে নিয়ে এসো তাঁকে।'
খানিক পর কক্ষে এসে প্রবেশ করলেন বয়োবৃদ্ধ সাঈদ খান। মুঘল রাজদরবারে বারহা-র সাঈদদের প্রভাবের কথা কারো অজানা নেই। সম্রাট বাবুরের সময় থেকেই সাম্রাজ্যের অন্যতম শক্তি তারা। নিজে উঠে গিয়ে সাঈদ খানকে পাশে বসালেন সেলিম।
'আপনার চোখ কান আশা করি খোলাই আছে সুলতান সেলিম,' কোনো ভূমিকা না করে বললেন সাঈদ খান।
'সে বিষয়ে আপনি নিঃসন্দেহ থাকুন,' মৃদু হেসে বললেণ সেলিম। 'প্রয়োজনের সময় আপনাদের মদদ জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবুর যেমন পেয়েছেন, তেমনি পেয়েছেন আমার পিতামহ ও পিতা। আশা করি এখনও তার অন্যথা হবে না।'
'অবশ্যই না,' সাঈদ খানের কণ্ঠস্বরে দৃঢ়তা।
আরো কিছুক্ষণ আলাপচারিতার পর বিদায় নিলেন সাঈদ খান। আগের চেয়ে আরেকটু নির্ভার লাগল সেলিমের। বারহা-র সাঈদরা বিপদের সময় তাঁর পাশে দাঁড়াবে এ বিশ্বাস ছিল, সাঈদ খানের উপস্থিতি সে বিশ্বাসকে দৃঢ় করল আরো। শরাবের পেয়ালা টেনে নিলেন তিনি, নিরালায় বসে খোশমেজাজে উদযাপন করলেন শুভক্ষণটিকে। সন্দেহ নেই, ভালো ঘুম হবে আজ।
সে রাতেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন শাহেনশাহ আকবর।

দশদিন কেটে গেল, সম্রাটের সুস্থতার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না।
বয়োবৃদ্ধ হেকিম আলী জিলানি দিনরাত পরিশ্রম করলেন, লাভ হলো না কোনো। রক্ত আমাশয় শুরু হলো সম্রাটের, সাথে প্রস্রাবের কষ্ট। বারবার ঔষধ পরিবর্তন করলেন হেকিম, ফল ভালোর চেয়ে খারাপই হলো। সম্রাটের অসুস্থতা বাড়তেই লাগল।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা পিতামহের শয্যাপাশে বসে রইল খুররম। রুকাইয়া বা জগৎ গোসাইয়ের অনুরোধ বা নির্দেশ কিছুই টলাতে পারল না তাকে।
সম্রাটের অসুস্থতার একাদশ দিন মান সিংয়ের সঙ্গে একান্তে বসলেন খান-ই-আজম মির্জা আজিজ কোকা।
'শাহেনশাহর অবস্থা কেমন বুঝছেন?' চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন আজিজ কোকা।
মুখে কিছু না বলে এদিক ওদিক মাথা নাড়লেন মান সিং।
'আমাদের কিছু একটা করতে হবে। বসে থাকার সময় নেই আর।'
'কী করতে চাচ্ছেন?'
'মির্জা খসরুকে শাহেনশাহ ঘোষণা করে দিই?'
ভ্রু কোঁচকালেন মান সিং, 'পরিস্থিতি যেরকম উত্তপ্ত, হিতে বিপরীত হতে পারে তাতে। যমুনার ধারে ঘাঁটি গেড়ে বসে আছেন সুলতান সেলিম। তাঁর লোকজন যুদ্ধ করার জন্য মুখিয়ে আছে। তার চেয়ে বরং আমির উল উমারাদের সভা ডাকুন। দেখুন কে কী বলে।'
চুপ করে রইলেন আজিজ কোকা। মান সিংয়ের প্রস্তাবটি পছন্দ হচ্ছে না, আবার বিকল্প কিছুও মাথায় আসছে না। শেষে সভাই ডাকলেন ভেবেচিন্তে।
পরদিন সকাল থেকেই আসতে শুরু করলেন আমির আর অভিজাতবর্গ। তাঁদের লোকজনের ভিড়ে গমগম করে উঠল আগ্রা দুর্গ। সভার শুরুতেই উঠে দাঁড়ালেন আজিজ কোকা।
'এক কঠিন পরিস্থিতিতে এখানে মিলিত হয়েছি আমরা,' এক এক করে সবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় শুরু করলেন তিনি, 'শাহেনশাহ জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবর দুরারোগ্য অসুখে শয্যাশায়ী। হেকিমেরা চেষ্টার ত্রুটি করছেন না, তবে দিনদিন অবস্থা খারাপই হচ্ছে। খোদা না খাস্তা তাঁর যদি ভালোমন্দ কিছু একটা হয়ে যায় তখন কী করব আমরা? সেটি সাব্যস্ত করার জন্যই আপনাদের সবাইকে ডেকেছি।'
'আপনি ঠিক কী বলতে চান পরিষ্কার করে বলুন,' প্রভাবশালী অমাত্য নকিব খান বললেন। মির্জা আজিজ উদ্বিগ্ন চোখে নকিব খানের দিকে তাকালেন। নকিব খান কেবল প্রভাবশালীই নন, সম্রাটের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠদের একজন। মসনদের উত্তরাধিকারী নির্ধারণে তার মতামত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। মুশকিল হচ্ছে, সেলিম না খসরু কার দিকে নকিব খানের সমর্থন কেউ জানে না।
কেশে গলা পরিষ্কার করে নিলেন মির্জা আজিজ, 'আমরা সবাই জানি শাহেনশাহ আকবরের তিন পুত্রের মধ্যে মাত্র একজন জীবিত, শাহজাদা সেলিম। এ-ও জানি, তাঁর নানা কর্মকাণ্ডের কারণে শাহেনশাহ তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। শাহেনশাহর নির্দেশ উপেক্ষা করে এলাহাবাদে দরবার বসিয়েছিলেন তিনি যা সরাসরি বিদ্রোহের শামিল। এছাড়া অপরিমিত জীবনযাপন, জ্যান্ত মানুষের চামড়া ছাড়ানোর মতো নৃশংসতা-তাঁর অপকর্মের তালিকা দিতে গেলে শেষ হবে না। কাজেই এহেন জটিল পরিস্থিতিতে শাহজাদা সেলিমের হাতে সাম্রাজ্যের ভার ন্যস্ত করা সুবিবেচনাপ্রসূত হবে না।'
'আপনার প্রস্তাব কী?' চাঁচাছোলা গলায় শুধালেন নকিব খান।
'আমার প্রস্তাব হচ্ছে, শাহজাদা খসরু মির্জা হবেন শাহেনশাহ জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবরের উত্তরসুরি। বয়স কম হলেও ইতোমধ্যে সাম্রাজ্য পরিচালনায় যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করেছেন তিনি। তিনি সাহসী, ন্যায়বান এবং সৎ চরিত্রের অধিকারী। কেবল আমি নই, রাজা মান সিং-সহ আমির-উল-উমারাদের অনেকের অভিমতও এটাই।'
'আমি এ প্রস্তাব সর্বান্তকরণে সমর্থন করছি,' উঠে দাঁড়িয়ে ভাবগম্ভীর স্বরে বললেন মান সিং।
'আমি সমর্থন করি না,' গমগম করে উঠল সাঈদ খানের গলা। 'পিতা বেঁচে থাকতে পুত্রকে সম্রাট ঘোষণা করা আল্লাহর আইন বা জমিনের আইন কোনোটি অনুসারেই বিধিসম্মত নয়। মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি হচ্ছে, পিতার ইন্তেকালের পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হবেন সম্রাট। এ কারণেই উমর শেখ মির্জার ইন্তেকালের পর জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবুর, এবং তাঁর মৃত্যুর পর নাসিরুদ্দিন মুহম্মদ হুমায়ুন এবং তাঁর ইন্তেকালের পর জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবর হয়েছেন মসনদের অধিকারী। কাজেই শাহেনশাহ আকবরের অবর্তমানে কেবলমাত্র একজনই হতে পারেন মুঘল মসনদের উত্তরাধিকারী এবং তিনি হচ্ছেন শাহজাদা সেলিম।'
'কিন্তু শাহজাদা সেলিমের ভ্রষ্টাচার এবং পদে পদে শাহেনশাহর অবাধ্য হবার কথা সবারই জানা। তিনি শাহেনশাহ হলে সা¤্রাজ্যে বিপর্যয় নেমে আসবে।'
'একমাত্র আল্লাহই জানেন ভবিষ্যতের গর্ভে কী লুকিয়ে আছে। ঈমানদার বান্দা হিসেবে আমাদের সবার উচিত তাঁর ফয়সালার জন্যই অপেক্ষা করা। কারো ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য শত বছরের অলঙ্ঘনীয় নীতি আমরা বিসর্জন দিতে পারি না।'
'কিন্তু…'
'কোনো কিন্তু নয়!' উঠে দাঁড়ালেন সাঈদ খান, তাঁর দেখাদেখি বারহা-র সাঈদদের সবাই, এমনকি নকিব খানও উঠে দাঁড়িয়েছেন। 'কোনো অন্যায়ের অংশীদার হওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। শাহেনশাহ আকবরের অবর্তমানে মুঘল মসনদের একমাত্র দাবিদার হচ্ছেন শাহজাদা মুহম্মদ সেলিম। এবং এটিই হলো আমাদের শেষ কথা।' এই বলে সদলবলে বেরিয়ে গেলেন সাঈদ খান। তাঁর পিছু নিল সমবেত আমিরদের অর্ধেকেরও বেশি।
স্তম্ভিত চেহারা নিয়ে মান সিংয়ের দিকে তাকালেন মির্জা আজিজ। যেন যা ঘটে গেল তা এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না।
রাজা মান সিং মাথা নিচু করে বসে আছেন। তাঁর চেহারায় রাজ্যের হতাশা।
জয়ভেরি বাজাতে বাজাতে যমুনা পার হয়ে সেলিমের শিবিরে যোগ দিলেন সাঈদ খান, মুর্তজা খান, মালিক খায়েরসহ প্রভাবশালী অনেক অমাত্য। এ খবর ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগল না। বিকেল হতে না হতে একে একে আমিরেরা এসে আনুগত্য স্বীকার করতে লাগল সেলিমের।
খান-ই-আজমও বুঝতে পারলেন, উজানে নৌকা বেয়ে আর কোনো ফল হবে না। অবশ্যম্ভাবীকে মেনে নিয়ে দিনশেষে তিনিও এসে সুলতান সেলিমের বশ্যতা স্বীকার করলেন।
সেদিন রাতে সাঈদ খান বারহার নেতৃত্বে অভিজাতদের নিয়ে বসলেন সেলিম।
'সুলতান সেলিম,' সাঈদ খান বললেন, 'চাগতাই তুর্কিদের সহস্র বছরের নিয়মকে ভাঙতে দেইনি আমরা। পিতা বেঁচে থাকতে তাকে বাদ দিয়ে পুত্রের মসনদে বসা ঠেকিয়েছি। আপনি সহজেই বুঝতে পারেন, প্রভাবশালী অমাত্যদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেদের জীবনকে বিপন্ন করে এ কাজ করেছি আমরা। কাজেই আমাদের চাওয়া হচ্ছে, মসনদে বসার পর আপনিও মুঘল ঐতিহ্য এবং আইনকে সমুন্নত রাখবেন। অন্যায় ও অবিচারকে প্রশ্রয় দেবেন না।'
'আপনারা যা চান তাই হবে,' সেলিম বললেন।
'দুটো ব্যাপারে আপনার স্পষ্ট ওয়াদা চাই আমরা,' সাঈদ খান বললেন।
জিজ্ঞাসু চোখে তাঁর দিকে তাকালেন সেলিম।
'প্রথমত, শাহেনশাহ আকবর শরিয়তবিরুদ্ধ যেসব বিধিবিধান তৈরি করেছিলেন সেগুলোকে রদ করবেন আপনি। দ্বিতীয়ত, আপনার বিপক্ষে গিয়ে যারা শাহজাদা খসরুর পক্ষাবলম্বন করেছিলেন তাদের কোনো ধরনের শাস্তি দেয়া হবে না। ক্ষমা করে দেবেন তাদের।'
সাঈদ খানের বাড়িয়ে দেয়া হাতের ওপর হাত রাখলেন সেলিম। 'ওয়াদা করছি, শরিয়তবিরুদ্ধ বিধিবিধান রদ করা হবে এবং শাহজাদা খসরুর বিপথগামী সমর্থকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না।'
উপস্থিত আমির ও অভিজাতবর্গ একযোগে হর্ষধ্বনি করে উঠলেন।

চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন সম্রাট আকবর।
গোটা শরীর নিশ্চল, কেবল বুকের মৃদু ওঠানামা দেখে বোঝা যাচ্ছে, শরীরে এখনও প্রাণ আছে তাঁর। সেলিমা সুলতান বেগম ও রুকাইয়া সুলতান বেগম বসে আছেন শাহেনশাহর পায়ের কাছে। মাথার কাছে বসে আছে খুররম।
প্রায়ান্ধকার কক্ষটিতে যেন ছায়া ফেলে আছে মৃত্যু, প্রতি মুহূর্তে সে ছায়া ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে।
ধীর পায়ে কক্ষে প্রবেশ করলেন সেলিম, সম্রাটের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ করলেন।
তখনই চোখ মেলে তাকালেন সম্রাট। কতক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন পুত্রের দিকে। তাঁর ডান হাতটি নড়ে উঠল। দেয়ালে ঝোলানো সুদৃশ্য এক তরবারি আর ঝলমলে আলখেল্লার দিকে ইঙ্গিত করলেন। তরবারিটি সম্রাট হুমায়ুনের, পোশাকটিও তাঁর। আলখেল্লাটি গায়ে জড়ালেন সেলিম, তরবারি ঝোলালেন কোমরে।
সম্রাটের চেহারায় এক ধরনের প্রশান্তি নেমে এল। সেলিমকে হাতের ইশারায় বাইরে যাওয়ার জন্য ইঙ্গিত করলেন। আরেকবার কুর্নিশ করলেন সেলিম, তারপর ধীর পায়ে বেরিয়ে এলেন কক্ষ থেকে। বাদশাহী সাজে সজ্জিত সেলিমকে দেখে বাইরে অপেক্ষমান সঙ্গীদের মুখ দিয়ে আনন্দধ্বনি বেরিয়ে এল।
মধ্যরাতের কিছু সময় পর শেষবারের মতো চোখ বন্ধ করলেন জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবর।
এলাহাবাদে থাকতেই সেলিম ঠিক করে নিয়েছিলেন আগ্রার মসনদে বসার পর তাঁর বাদশাহী নাম কী হবে। পিতার মৃত্যুর ঠিক এক সপ্তাহ পর সে নামেই সিংহাসনে আসীন হলেন তিনি।
সেলিম-পর্ব শেষ। এখন থেকে তাঁর নাম নুরুদ্দিন মুহম্মদ জাহাঙ্গীর।


সাত
পিতার একটি পরামর্শ বরাবর মনপ্রাণ দিয়ে মেনে চলার চেষ্টা করেন মহব্বত খান, সেটি হলো-কোনো বিপদকেই ছোট করে দেখবে না এবং কোনো সুযোগকেই অবহেলা করবে না।
তার পিতা গাইয়ুর বেগের জন্ম পারস্যের সিরাজ শহরে এক শিয়া পরিবারে। ভাগ্যান্বেষণে যুবক বয়সেই কাবুল চলে আসেন তিনি, যোগ দেন সম্রাট আকবরের চাচা মির্জা মুহম্মদ হাকিমের দরবারে। মির্জা হাকিমের মৃত্যুর পর আগ্রায় চলে আসেন তিনি, সম্রাট আকবরের দরবারে চাকুরির ব্যবস্থা করতে পারলেও সেভাবে উন্নতি করতে পারেননি। বাবার প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও দারিদ্র্যকে ঘৃণা করতেন মহব্বত খান। যেভাবেই হোক সম্পদ ও প্রতিপত্তির বিচারে বড় বড় মুঘল আমিরকেও ছাড়িয়ে যাবে, এ স্বপ্ন দেখতেন তিনি।
এ কারণে এলাহাবাদে সুলতান সেলিমের দরবারে যোগ দেবার সুযোগ পেতেই লুফে নেন। খাঁটি সোনা চিনতে ভুল করেনি সেলিমও। সহচরদের মধ্যে যে কয়েকজনের মতামতকে সে সবচেয়ে গুরুত্ব দেন তাদের মধ্যে মহব্বত খান একজন ।
জাহাঙ্গীরের মসনদে আরোহণের মাসখানেক পরের কথা। দরবার থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়ির দিকে রওনা হবে এমন সময় পেছন থেকে ডাকল জিয়াউদ্দিন কাজভিনি। সদালাপী আর সচ্চরিত্রের জিয়াউদ্দিনকে পছন্দই করে মহব্বত। সে জানে, সম্রাট আকবরের মৃত্যুর আগের চরম অনিশ্চিত মুহূর্তগুলোতে সর্বক্ষণ পাশে থাকার জন্য জিয়াউদ্দিনের প্রতি কৃতজ্ঞ জাহাঙ্গীর।
'চলুন একটু নিরালায় কথা বলা যাক,' নিচুগলায় বললেন জিয়াউদ্দিন।
মহব্বত খানকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেল সে। দিওয়ান-খানায় (বৈঠকখানা) পুরু গালিচার ওপর পাতা পাশবালিশে হেলান দিয়ে পাশাপাশি বসলেন দুজন। খানিকক্ষণ খোশগল্পের পর শরবতের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে মহব্বত খান বললেন, 'শুনলাম রাজকীয় আস্তাবলের হিসাবরক্ষকের দায়িত্ব পেয়েছেন আপনি? সঙ্গে এক হাজারি মনসবদারি? আমি কিন্তু আরেকটু বেশি আশা করেছিলাম আপনার জন্য।'
মৃদু হাসলেন জিয়াউদ্দিন। 'আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। আপনাকে অভিনন্দন। কেবল দেড় হাজারি মনসবদারিই নয়, শুনলাম আরো বড় কিছু অপেক্ষা করছে আপনার জন্য?'
হাসলেন মহব্বত খানও। মসনদে বসার পর দু'হাতে সবাইকে পুরস্কৃত করছেন সম্রাট। শরীফ খান পেয়েছেন আমির-উল-উমারার পদ, শেখ ফরিদ বোখারি হয়েছেন মীর বখশি। শোনা যাচ্ছে কুতুবুদ্দিন কোকার জন্য নাকি কোনো একটা সুবেদারের পদ অপেক্ষা করছে। সে তুলনায় দেড় হাজারি মনসবদারি খুব বেশি কিছু না হলেও নিজের অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট মহব্বত খান। বিশ্বস্ততার সাথে কাজ করে গেলে ভবিষ্যতে যেকোনো কিছুই হতে পারে।
'তবে দিওয়ান পদে মির্জা গিয়াস বেগের নিযুক্তিতে খুশি নয় অনেকে,' জিয়াউদ্দিন বললেন। 'কারো কারো সন্দেহ তিনি দুর্নীতিপরায়ণ।'
এমন কথা মহব্বত খানের কানেও এসেছে, যদিও তা নিয়ে মাথা ঘামান না তিনি। একেবারে কপর্দকশূন্য অবস্থায় পারস্য থেকে আগ্রায় এসেছিলেন গিয়াস বেগ। সম্রাট আকবরের দরবারে ছোটখাট একটা কাজ জুটিয়ে নিয়েছিলেন, তারপর পরিশ্রম আর বুদ্ধিমত্তার বদৌলতে ক্রমশই উপরের দিকে উঠেছেন। নথিপত্র লেখায় তাঁর তুলনা মেলা ভার, হিসাবনিকাশেও অত্যন্ত পাকা। দিওয়ানের পদ আর দেড় হাজারি মনসবদারি পেয়েছেন তিনি। গিয়াস বেগের প্রতি বিরাগ নেই মহব্বত খানের, তবে তার অহংকারী পুত্র আবুল হাসানকে পছন্দ করেন না তিনি।
'আপনি নিশ্চয়ই মির্জা গিয়াস বেগের সৌভাগ্যের ব্যাপারে আলাপ করতে আমাকে বাড়িতে ডাকেননি?' মৃদু হেসে বললেন মহব্বত খান।
'তা নয়,' মাথা নাড়ল জিয়াউদ্দিন। 'আসলে দরবারে কয়েকদিন ধরে যে গুজবটা চালু আছে সে সম্বন্ধে আপনার মতামত জানার কৌতূহল আমার।'
'গুজব?' ডান ভ্রু উঁচু করলেন মহব্বত খান।
'হ্যাঁ। শাহজাদা খসরুকে নিয়ে গুজব। শোনা যাচ্ছে তিনি নাকি কোনো একটা অঘটন ঘটানোর পাঁয়তারা করছেন।'
হালকা করে মাথা ঝাঁকালেন মহব্বত খান। গুজবটা তার কানেও এসেছে। সিংহাসনে বসার পর পুত্রকে ক্ষমা করে দিয়েছেন জাহাঙ্গীর। কেবল তাই নয়, এক লক্ষ রুপি উপহার দিয়েছেন তার প্রাসাদকে সাজানোর জন্য। কিন্তু এত কিছুর পরও সম্রাট পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ আছে মহব্বত খানের। দাবার ছকে সামান্য এদিক-ওদিক হলেই জাহাঙ্গীর নয়, সে নিজেই হতো হিন্দুস্তানের সম্রাট, এটা ভুলতে পারার কথা নয় খসরুর। তাছাড়া অমাত্যদের মধ্যে তার সমর্থকের সংখ্যা এখনও নেহাত কম নয়।
'শুনেছি গুজবটা। এমনকি সম্রাটের কানেও নাকি গেছে, যদিও তিনি এটাকে কোনো গুরুত্ব দিতে নারাজ। মান সিং চলে গেছেন বাংলায়। খান আজমের পদ হারিয়ে আজিজ কোকাও আপাতত চুপচাপ আছেন। তা বলে শাহজাদা খসরুর পরামর্শদাতার অভাব হবে না। অতএব গুজবটাকে একেবারে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেয়াও ঠিক হবে না।'
খানিকক্ষণ চুপ করে থাকলেন জিয়াউদ্দিন, তারপর প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন, 'মসনদে পাঁচ মাস কাটল সম্রাটের। আপনার কী মনে হচ্ছে?'
পেটের কথা নিজের পেটে রাখাই নিরাপদ-মুঘল দরবারে এতগুলো বছর কাটিয়ে এ শিক্ষা অন্তত পেয়েছেন মহব্বত খান। স্থায়ী শত্রু বা স্থায়ী মিত্র বলে এখানে কেউ নেই। দুর্বোধ্য একটা হাসি ফুটল তার মুখে। 'সবার মন খুশি করার চেষ্টা করছেন শাহেনশাহ। দু-হাতে ইনাম আর উপহার বিলাচ্ছেন। আপাতত তো আশেপাশে অসন্তুষ্ট কাউকে দেখতে পাচ্ছি না।'
সিংহাসনে বসার পরপরই বারোটি রাজ-আদেশ প্রদান করেছেন জাহাঙ্গীর, যার মধ্যে বড় বড় শহরে হাসপাতাল এবং দুর্গম এলাকায় সরাইখানা নির্মাণ ও কূপ খনন, নাক ও কান কেটে দেয়ার মতো অমানবিক শাস্তিপ্রদান বন্ধ করা, সন্তানদের পিতার সম্পত্তি প্রাপ্তির ব্যাপারে আইন সহজ করা, অনুমতি ছাড়া বণিকদের মালপত্র তল্লাসি বন্ধ করা ছাড়াও মদ তৈরি ও বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। শেষের আদেশটি যে কট্টরপন্থী মোল্লাদের খুশি করার জন্য তা বুঝতে কারো সমস্যা হয়নি।
জাহাঙ্গীরের আরেকটি কাজ বিস্ময়ের এবং কারো কারো হাসির খোরাকও জুগিয়েছে। আগ্রা দুর্গ থেকে যমুনার তীর পর্যন্ত একটি সোনার শেকল স্থাপন করেছেন, যাতে ঝুলিয়ে দিয়েছেন ষাটটি ঘণ্টা। এটির নাম দেয়া হয়েছে 'বাস্তান-ই-জাঞ্জির-ই-আদিল'-ন্যায়বিচারের ঘণ্টা। এ ঘণ্টা বাজিয়ে বিচারপ্রার্থী যে কেউ শাহেনশাহর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবেন।
অবশ্য ঝোলানোর পর থেকে এখন অব্দি কেউ এটি বাজিয়েছেন কিনা মহব্বত খানের জানা নেই।
'শাহজাদা খসরুর ব্যাপারে যে কথাটি বললাম সেটা একটু মাথায় রাখবেন,' বেরিয়ে আসার আগে তাকে বললেন জিয়াউদ্দিন। মাথা নেড়ে বেরিয়ে এলেন মহব্বত খান। চিন্তায় ভ্রু কুঁচকে আছে তার। ভাবছে খসরুর কথা। এতটা দুঃসাহস কি সত্যিই হবে তার?
মাত্র একমাসের মধ্যেই প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেলেন মহব্বত খান।

সবে রাতের খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন মহব্বত খান এমন সময় ঊর্ধ্বশ্বাসে রাজদরবার থেকে এসে হাজির হলো এক দূত। সম্রাটের জরুরি এত্তেলা, এখনই যেতে হবে।
আকস্মিক এই জরুরি তলবের অস্বাভাবিকত্ব নিয়ে বেশি মাথা ঘামানোর সময় পেলেন না মহব্বত খান। দ্রুত হাজির হলেন দুর্গে। দিওয়ান-ই-খাসে ঢুকতেই শরীফ খানকে চোখে পড়ল, চেহারায় রাজ্যের দুশ্চিন্তা, সেই সঙ্গে কেমন একটা হতচকিত ভাব। উজির জান বেগ থেকে শুরু করে মির্জা গিয়াস বেগ, কুতুবুদ্দিন কোকা, আবদুল্লাহ খান সবাই হাজির। খানিক পরই এসে উপস্থিত হলেন সম্রাট। শরীফ খানের মতো তার চেহারায়ও উৎকণ্ঠার পাশাপাশি হতবিহ্বল একটা ভাব।
কিছুক্ষণের মধ্যেই জরুরি এ সভার কারণ জানা গেল।
বিদ্রোহ করেছে খসরু।
রাতের অন্ধকারে কয়েকশো সহচর নিয়ে আগ্রা থেকে সটকে পড়েছে সে। প্রথমে গেছে সিকান্দ্রার দিকে, ভাবখানা, বাদশাহ আকবরের কবর জিয়ারত করবে। কিন্তু সিকান্দ্রা থেকে দলবল নিয়ে উত্তরে পাঞ্জাবের দিকে রওনা দিয়েছে সে।
আহমেদ বেগ খান নামে এক আমিরকে হাজির করলেন শরীফ খান, সেকান্দ্রায় খসরুর দলবলের সঙ্গে দেখা হয়েছে যার। 'আমি আর দোস্ত মোহাম্মদ খান সেকান্দ্রা থেকে আগ্রায় ফিরছিলাম,' সম্রাটের উদ্দেশে কুর্নিশ করে বলল আহমেদ বেগ খান। 'শাহজাদাকে দেখলাম সেকান্দ্রা থেকে উত্তরে যেতে। অন্তত তিনশো অশ্বারোহী আছে তাঁর সঙ্গে। তাঁর এক সহচরের কাছে শুনলাম, পাঞ্জাবে যাওয়ার পরিকল্পনা শাহজাদার।'
শরীফ খানের দিকে তাকালেন জাহাঙ্গীর। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে এখনও সুস্থিরভাবে ভাবনাচিন্তার ক্ষমতা ফিরে পাননি। 'কী করা যায় বলতো?'
'পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাওয়ার আগেই শাহজাদাকে আগ্রায় ফিরিয়ে আনতে হবে,' এক মুহূর্তও চিন্তা না করে বললেন শরীফ খান।
'আমি নিজেই যাব,' গম্ভীর গলা জাহাঙ্গীরের, একটু যেন বিষাদও মাখা তাতে। 'তাকে বিশ্বাস করার ভুলটা যেহেতু আমি করেছি সেজন্য প্রায়শ্চিত্যও আমাকেই করতে হবে।'
'সেটি সুবিবেচনার কাজ হবে না জাঁহাপনা,' নিচু কিন্তু দৃঢ় গলায় বললেন শরীফ খান। 'আমির-উল-উমারা হিসেবে আমিই যাব।'
কয়েক মুহূর্ত ভাবলেন সম্রাট। তারপর সম্মতিসূচকভাবে মাথা ঝাঁকালেন।
সম্রাটকে কুর্নিশ করে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন শরীফ খান, হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। খানিক ইতস্তত করে বললেন, 'শাহজাদার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর আমার প্রস্তাব অনুসারে তিনি যদি আত্মসমর্পণ না করেন তাহলে আমার করণীয় কী হবে জাঁহাপনা?'
জবাব দিতে একমুহূর্তও দেরি করলেন না জাহাঙ্গীর, 'সাম্রাজ্যের অস্তিত্বের প্রশ্ন যেখানে, সেখানে সন্তান বা আত্মীয় পরিজনের প্রশ্ন অবান্তর। এক্ষেত্রে ধরে নিতে হবে শাহেনশাহর আত্মীয় বলে কিছু নেই।'
আরেকবার কুর্নিশ করে বেরিয়ে গেলেন শরীফ খান।
তার পিছু পিছু জাহাঙ্গীরও বেরিয়ে গেলেন। সম্রাটের চেহারা দেখে মহব্বত খানের কেন যেন মনে হল, এ সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত নয়। নতুন কিছু ঘটবে রাত পোহানোর আগে।
তার অনুমান ফলে যেতে দেরি হল না। যে কারণেই হোক, শরীফ খানকে ফিরিয়ে আনলেন জাহাঙ্গীর। তার বদলে খসরুর পশ্চাদ্ধাবনের দায়িত্ব দিলেন মুর্তজা খান আর কোতোয়াল এহতেমাম খানকে।
এবং পরদিন নিজেই এক বাহিনী নিয়ে রওনা হলেন পাঞ্জাবের পথে। যাত্রা শুরুর আগে মহব্বত খানকে তলব করলেন জাহাঙ্গীর। 'একদল সৈন্য নিয়ে লাহোরের দিকে রওনা দাও তুমি,' মহব্বত খানকে একান্তে নিয়ে বললেন সম্রাট। 'কোনো কারণে আমাদের হাত গলে পালাতে পারলেও খসরু যেন কিছুতেই যেন কাবুলের দিকে যেতে না পারে সেটি নিশ্চিত করবে।'
'আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন জাঁহাপনা,' কুর্নিশ করে বললেন মহব্বত খান।
'তোমার ওপর ভরসা করছি আমি। আল্লাহ তোমার সহায় হোন।'
আরেকবার কুর্নিশ করে রওনা দিলেন মহব্বত খান।

আগ্রা ছাড়লেন জাহাঙ্গীর। ভরা বৈশাখ। মাথার ওপর আগুন ঢালছে সূর্য। এর মধ্যেই একটানা ছুটে চললেন। সম্রাটকে দেখে মনে হচ্ছে একটা ঘোরের মধ্যে আছেন। খসরুকে পাকড়াও করা ছাড়া এ মুহূর্তে তার মাথায় আর কিছু নেই।
গুপ্তচর মারফত শোনা গেল, যেতে যেতে দল ভারি করছে খসরু। তার বাহিনী নির্বিচারে লুটপাট করছে, আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে গ্রামে গ্রামে। ওদিকে হাসান বেগ বাদাখশি আর আব্দুর রহিম নামে দুই আমির যোগ দিয়েছে খসরুর দলে। তাদেরকে সেনাধ্যক্ষ বানিয়েছে খসরু।
খবরটা শুনে ক্রুর হাসি ফুটল জাহাঙ্গীরের ঠোঁটে। চলার গতি আরো বাড়িয়ে দিলেন তিনি।
আগ্রা ছাড়ার পঞ্চম দিনের মাথায় দিল্লী পৌঁছাল সম্রাটের বাহিনী। শহরময় খসরুর বাহিনীর লুটপাট আর ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। সম্রাটের চেহারায় বিষাদের ছাপ। পিতামহ হুমায়ুনের মাজার জিয়ারত করলেন। তারপর ফের পথে নামলেন।
খবর এল, লাহোর শহর ঘিরে শহরের একটি ফটকে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে খসরুর বাহিনী। লাহোরের গভর্নর দিলওয়ার খান সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছে খসরুর বাহিনীকে।
ততক্ষণে মুর্তজা খানের অগ্রবর্তী বাহিনী পৌঁছে গেছে লাহোরের কাছাকাছি সুলতানপুরে। খসরুর বাহিনী তখন ফুলেফেঁপে প্রায় ত্রিশ হাজারে দাঁড়িয়েছে। মুর্তজা খানের নেতৃত্বে থাকা মুঘল বাহিনীকে আক্রমণ করে বসল সে। যুদ্ধটা হলো সংক্ষিপ্ত কিন্তু রক্তক্ষয়ী। পুরোপুরি পরাস্ত হয়ে পিছু হটল খসরু। ওদিকে স্বয়ং জাহাঙ্গীর তখন এসে পৌঁছেছেন সুলতানপুরে, কিন্তু ততক্ষণে যুদ্ধ শেষ।
সবাইকে নিয়ে বিজয় উদযাপন করলেন সম্রাট। যুদ্ধজয়ের উচ্ছ্বাস তাঁর চোখেমুখে। মাত্রই কয়েকদিন আগে যে বিষাদের ছাপ পড়েছিল তাঁর চেহারায় সেটি ধুয়েমুছে গেছে।
শাহপুর নামে ছোট্ট এক গ্রামে চেনাব নদী পেরিয়ে কাবুলের দিকে পালাতে গিয়ে হাসান বেগ আর আব্দুর রহিমসহ ধরা পড়ল খসরু। জাহাঙ্গীর তখন লাহোরে মির্জা কামরানের প্রাসাদে। খবর এল, খসরুসহ ধৃত বাকি সবাইকে লাহোরে নিয়ে যাওয়ার আদেশ হয়েছে।
সম্রাটই ঠিক করবেন বন্দিদের ভাগ্যে কী ঘটবে।

লাহোরের রাস্তায় মানুষের ঢল।
ষাঁড়ের কাঁচা চামড়ার মধ্যে ঢোকানো হয়েছে হাসান বেগ বাদাখশিকে, আর আব্দুর রহিমকে পরানো হয়েছে গাধার চামড়া। গাধার পিঠে উল্টো করে বসানো হলো তাদের, তারপর উৎসুক জনতার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে প্রদক্ষিণ করানো হলো শহরের রাস্তা।
কেউ কেউ হাততালি দিল, কেউ কেউ জয়ধ্বনি করে উঠল বাদশাহ জাহাঙ্গীরের নামে।
রোদের তেজ যতই বাড়ল চামড়াগুলো এঁটে বসতে লাগল বন্দিদের শরীরে, যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল তারা। জনতার হৈ হল্লায় সে চিৎকার চাপা পড়ে গেল।
শুকিয়ে যাওয়া ষাঁড়ের চামড়ার চাপে হাড়মজ্জা ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলো হাসান বেগের, বোঝাই গেল, এভাবে চললে বেশিক্ষণ টিকবে না সে। গাধার চামড়া ষাঁড়ের চামড়ার মতো এত দ্রুত শুকাল না, অতটা আঁটসাটও নয়। ফলে হাসান বেগের চেয়ে আব্দুর রহিমের যন্ত্রণার মাত্রা হলো কম।
'পানি, পানি!' কাঁতরে উঠল সে। জনতার মধ্যে হৃদয়বান কয়েকজন প্রহরীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পানি ছিটিয়ে দিল আব্দুর রহিমের শরীরে। আরো ঝুঁকি নিয়ে একজন পানি খাইয়েও দিল তাকে।
এরই মধ্যে মারা গেছে হাসান বেগ। ঘাড়টা একদিকে হেলে পড়েছে তার, দুই ঠোঁটের পাশ দিয়ে রক্তমিশ্রিত লালা গড়িয়ে পড়ছে। গাধার চামড়ার কারণেই এখনও মরেনি আব্দুর রহিম, তবে তার অবস্থাও ভালো নয়। বুকের ওপর নুয়ে পড়েছে মাথাটা, দু'চোখ বন্ধ।
গাধার পিঠ থেকে নামিয়ে আনা হলো দুজনকে। মৃতপ্রায় আব্দুর রহিমকে ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়া হলো শুশ্রুষার জন্য।
মির্জা কামরানের উদ্যান থেকে শহরকেন্দ্র পর্যন্ত রাস্তার দু'পাশে বসানো হয়েছে শূল। প্রখর সূর্যালোকে জ্বলজ্বল করছে সেগুলোর তীক্ষ্ম মাথা। এক এক করে খসরুর পরাজিত বাহিনীর শ-দুয়েক সৈন্যকে জ্যান্ত অবস্থায় চড়ানো হল শূলে। দর্শকদের হৈ হল্লা আর মরণাপন্ন মানুষগুলোর আর্ত চিৎকার লাহোরের আকাশকে ভারি করে তুলল। তখনই শহরের রাস্তা ধরে হেলেদুলে আসতে দেখা গেল এক হাতিকে। শেকলে বাঁধা অবস্থায় তার পিঠে বসে আছে শাহজাদা খসরু। উস্কোখুস্কো চুল, বিপর্যস্ত চেহারা। শূলে চড়ানো বন্দিদের মধ্য দিয়ে হাঁটিয়ে নেয়া হলো খসরুর হাতিকে। বিস্ফারিত চোখে মৃত ও মরণাপন্ন মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকল খসরু।
খসরুর হাতি যতই এগোলো জনতার কোলাহল ততই স্তিমিত হতে লাগল।
ধীরে ধীরে প্রগাঢ় এক নীরবতা নেমে এলো লাহোরের রাস্তায়।
সূর্য তখন মধ্যাকাশ ছাড়িয়ে ক্রমশ পশ্চিমে হেলে পড়তে শুরু করেছে।

আট
অমাত্যদের নিয়ে বসেছেন জাহাঙ্গীর।
আমির-উল-উমারা শরীফ খান থেকে শুরু করে কুতুবুদ্দিন খান, মহব্বত খান, আবদুল্লাহ খান সবাই আছে। আছে মির্জা গিয়াস বেগের পুত্র আবুল হাসানও। আজ সকালেই শাহজাদা পারভেজসহ এসে পৌঁছেছে সে।
গুরুতর কিছু নয়, ধর্ম, দর্শন, প্রকৃতি-এ সব নিয়ে হালকা আলাপচারিতা চলছে। সম্রাটকে দেখে বেশ নির্ভার মনে হচ্ছে। বেশিরভাগ কথা তিনিই বলছেন। বাকিরা শুনছেন।
খসরুর বিদ্রোহদমনের পর দু'মাস কেটে গেছে। সম্রাট যে লাহোর ছেড়ে সহসা অন্য কোথাও যাবেন সে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
সবার মনেই অনুচ্চারিত প্রশ্ন: আগ্রা ফেরা হবে কবে?
জাহাঙ্গীর নিজেই সে প্রশ্নের জবাব দিলেন। 'লাহোর বড় প্রিয় শহর আমার। আমার পিতার সঙ্গে যখন বেড়াতে আসতাম তখনও বড্ড ভালো লাগত শহরটাকে। এমন প্রশস্ত রাস্তা, নজরকাড়া উদ্যান, প্রকৃতির অপূর্ব শোভা হিন্দুস্তানের খুব বেশি জায়গায় নেই। ভাবছি আরো কিছুদিন এখানেই থেকে যাব।'
শুরু থেকেই একপাশে চুপচাপ বসে আছেন মহব্বত খান। খানিকটা অন্যমনস্ক, আলোচনায়ও খুব একটা মন নেই। খসরুকাণ্ডের পর ঘনিষ্ঠদের আরেক দফা পুরস্কৃত করেছেন সম্রাট। মহব্বত খানের মনসবদারিও দুই হাজারে উন্নীত হয়েছে। এ নিয়ে খুশি তিনি। তবে কেবল বিশ্রাম আর আনন্দ উল্লাসে সময় কাটানো তার পছন্দ নয়। এক ধরনের ঘরের টানও অনুভব করছেন আগ্রার জন্য, যদিও মুঘল সম্রাট যেখানে থাকেন সে জায়গাই রাজধানী-এ সত্যটিও ভালোভাবেই জানা আছে তার।
মাঝেমাঝেই চোখ চলে যাচ্ছে আবুল হাসানের দিকে। আর ভাবছেন মির্জা গিয়াস বেগের সৌভাগ্যের কথা। রাজকপাল বোধহয় একেই বলে। কপর্দকশূন্য অবস্থায় পারস্য থেকে এসে এখন সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি। নিজেই কেবল দিওয়ান হননি, সন্তানসন্ততি-আত্মীয়স্বজনকেও ভালো ভালো জায়গায় বসিয়েছেন। এক ছেলে আবুল হাসান সম্রাটের ঘনিষ্ঠদের একজন, আরেক ছেলে ইতিকাদ খানও বাগিয়ে নিয়েছে লোভনীয় মনসবদারি। শ্যালক ইব্রাহিম বেগ বিহারের গভর্নর। মেয়ে মনিজার স্বামী কাসিম খান জুভানি আর খাদিজার স্বামী হাকিম বেগও বঞ্চিত হয়নি মনবসদারি থেকে। ছোট মেয়ে মেহেরুন্নিসার স্বামী শের আফগান বর্ধমানের শাসনকর্তা। তার চেয়েও বড় কথা, সম্প্রতি আবুল হাসানের কন্যা আরজুমান্দ বানু বেগমের সঙ্গে বাগদান হয়েছে শাহজাদা খুররমের। সব মিলিয়ে গিয়াস বেগের বৃহস্পতি বলা যায় তুঙ্গে।
মহব্বত খানের অন্যমনস্ক ভাব চোখে পড়ল সম্রাটের। 'কী ব্যাপার, মহব্বত খানকে আজ বড় আনমনা মনে হচ্ছে? তবিয়ত ভালো তো?' হালকা চালে বললেন তিনি।
কুর্নিশ করার ভঙ্গিতে মাথা ঝোঁকালেন মহব্বত খান। 'তবিয়ত ভালোই আছে জাঁহাপনা।'
'হয়ত ভাবছ গালগল্প করার জন্য ডেকেছি তোমাদের। আসলে তা নয়। ডেকেছি একটা জরুরি কথা জানানোর জন্য।'
সবাই জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
কুতুবুদ্দিন খানের দিকে তাকালেন সম্রাট। 'অভিনন্দন কুতুবুদ্দিন খান। এখন থেকে তুমি বাংলার সুবেদার।'
এরকম কিছুর জন্য প্রস্তুত ছিলেন না কুতুবুদ্দিন খান। মুখ হা হয়ে গেছে তার। 'বাংলার সুবেদার! কিন্তু রাজা মান সিং…'
তাকে কথা শেষ করতে দিলেন না জাহাঙ্গীর। 'বুড়ো নেকড়েটাকে বহুবার সুযোগ দিয়েছি, আর নয়। তার এবং মির্জা আজিজের ডানা ছাঁটার সময় হয়ে গেছে। খসরুর এই আস্পর্ধার পেছনে কাদের হাত আছে তা না জানার মতো মুর্খ আমি নই।' কঠিন হয়ে গেছে সম্রাটের চেহারা।
উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ করলেন কুতুবুদ্দিন। 'শুকরিয়া জাঁহাপনা।'
বড় পুরস্কারই পেল কুতুবুদ্দিন, মনে মনে ভাবলেন মহব্বত। তার সৌভাগ্যে ঈর্ষাবোধ করলেন না অবশ্য। বাংলা মুলুক আগ্রা থেকে বহুদূর। রাজদরবারের কাছাকাছি থাকাই পছন্দ তার।

পরদিন শিকারে গেলেন জাহাঙ্গীর।
শরাব পান আর প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পর এটিই সবচেয়ে প্রিয় শখ তার।
গত দু'সপ্তাহ ধরে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে শিকার, মুঘলদের ভাষায় 'কামারগাহ'-এর।
লাহোরের কাছেই একটি অরণ্যকে বেছে নেয়া হয়েছে এজন্য। সকাল থেকেই শত শত সৈন্য প্রায় চার বর্গমাইল এলাকাকে ঘিরে ফেলল। ঢাক ঢোল বাজাতে বাজাতে চারপাশ থেকে এগিয়ে এল তারা, ক্রমশ সঙ্কুচিত করে আনল বৃত্তাকৃতি একটি জায়গাকে। তাদের সতর্ক পাহারা এড়িয়ে একটা খরগোশেরও বের হওয়ার উপায় থাকল না ওখান থেকে।
তারপর হাতির পিঠে চড়ে দৃশ্যপটে আবির্ভুত হলেন সম্রাট। সঙ্গে তাঁর পোষা চিতাবাঘ। হাওদা থেকে গুলি করতে শুরু করলেন তিনি। পাহাড়ি ভেড়া, ছাগল, নীলগাই, হরিণ-টপাটপ ঢলে পড়তে লাগল একের পর এক প্রাণী। মরণাপন্ন প্রাণীর আর্তনাদ, সেনাদের ঢাকের আওয়াজ, সম্রাটের সহচরদের হৈ হল্লা-সব মিলিয়ে নরক গুলজার অবস্থা বনের মধ্যে।
শিকারশেষে নিজের লাল তাঁবুতে বসে আরাম করে শরাবে চুমুক দিলেন সম্রাট।
হৈ হল্লা কমে ক্রমশ সুনসান হয়ে আসছে চারদিক। অপার্থিব কোনো নকশার মতো গাছপালার ফাঁক দিয়ে মাটিতে এসে পড়ছে নরম রোদ। ডালে ডালে উড়ে বেড়াচ্ছে নাম না জানা পাখি। রক্তলাল অসংখ্য পলাশ ফুল ফুটে আছে একটা গাছে।
নরম বালিশে গা এলিয়ে দিয়ে উদাস ভঙ্গিতে বসে রইলেন জাহাঙ্গীর। তাকে দেখে হিন্দুস্তানের বাদশা মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে প্রকৃতির ভুবনে নিজেকে হারিয়ে ফেলা সাধারণ এক মানুষ।

'কাবুল ডাকছে আমাকে,' লাহোরে মাস আটেক কাটানোর পর এক সকালবেলা অমাত্যদের বললেন জাহাঙ্গীর।
ভেতরে ভেতরে গুঙিয়ে উঠল অমাত্যরা; মহব্বত খান সবচেয়ে বেশি। আগ্রা ছাড়ার পর বছর ঘুরে আসতে চলল। সম্রাটের ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে না আদৌ রাজধানীতে ফেরার ইচ্ছে আছে তাঁর।
'জানো নিশ্চয়ই, আমার প্রপিতামহ জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবুরের হিন্দুস্তান জয় শুরু হয়েছিল কাবুলকে দিয়েই। তাঁর কবর জিয়ারতের বাসনা আমার বহুদিনের।'
স্ত্রী-পরিজন, অমাত্যবর্গ আর বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে লাহোর থেকে কাবুলমুখী যাত্রা শুরু হলো সম্রাটের। সঙ্গে আছে শেকলবন্দি খসরু। পুত্রের প্রতি সম্রাটের রাগ খানিকটা কমে এসেছে। মাঝে মাঝে শেকল খুলে দিয়ে আরাম করার সুযোগ দেয়া হয় তাকে। খসরুর হাবভাবে কোনো পরিবর্তন আসেনি অবশ্য। সবসময় মুখ গোমড়া করে থাকে, কারো সাথে কথা বলে না। ডাকলেও সাড়া দেয় না।
পাহাড়ে ঘেরা মনোরম শহর কাবুলের সৌন্দর্য এমনকি স্পর্শ করল মহব্বত খানের মনও। সাজানো গোছানো এক শহর, শহরভর্তি বাগান। জাহাঙ্গীরকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করল শাহরারা বাগ। বাগানের দীর্ঘকায় দুটো চিনার গাছের নাম দিলেন তিনি ফারাখবাশ আর সায়াবাখশ-আনন্দদাতা ও ছায়াদাতা। দুটো গাছের মাঝখানে সাদা পাথরের একটি ফলক স্থাপন করলেন সম্রাট, তাতে খোদাই করলেন আমির তৈমুর পর্যন্ত নিজের সকল পূর্বপুরুষের নাম।
সম্রাটকে দেখে মনে হলো বাকি জীবনটা কাবুলের বাগান থেকে বাগানে ঘুরে বেড়িয়ে কাটিয়ে দিতে পারলেই সবচেয়ে খুশি হবেন।
একদিনের কথা।
উচ্চপদস্থ অমাত্য খান জাহান লোদির সঙ্গে শহরপ্রান্তে এক সেনাছাউনি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন মহব্বত খান। হঠাৎ ঘোড়া ছুটিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে আসতে দেখলেন খাজা আকিল নামে এক অমাত্যকে।
'দুঃসংবাদ আছে,' ঘোড়া থামিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল খাজা আকিল, 'কুতুবুদ্দিন কোকাকে হত্যা করা হয়েছে।'
চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল খান জাহান লোদি আর মহব্বত খানের।
'হত্যা করা হয়েছে মানে? সেদিন না বাংলার সুবাদার হয়ে গেলেন তিনি?' বিস্মিত কণ্ঠে বললেন মহব্বত খান।
'হ্যাঁ। শের আফগানের হাতে মারা পড়েছেন। শের আফগান নিজেও মারা গেছে।'
খাজা আকিল একটু শান্ত হতে পুরো ঘটনা শোনা গেল তার কাছে। দিওয়ান মির্জা গিয়াস বেগের মেয়ে মেহেরুন্নিসার স্বামী বর্ধমানের ফৌজদার শের আফগানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল স্থানীয় আফগান বিদ্রোহীদের মদদ জোগাচ্ছেন তিনি। এ নিয়ে কথা বলার জন্যই শের আফগানকে ডেকেছিলেন সুবাদার কুতুবুদ্দিন। সুবাদারের দরবারে ঢুকেই শের আফগানের ধারণা হয়েছিল তাকে আটক করা হবে। এ কারণে ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে সুবাদারের ওপর। ছুরির আঘাতে মৃত্যু ঘটে কুতুবুদ্দিনের, ওদিকে সুবাদারের দেহরক্ষীরাও ততক্ষণে তরবারি হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে শের আফগানের ওপর। মুহূর্তের মধ্যেই মৃত্যু ঘটে তারও।
'শাহেনশাহর সঙ্গে বিরোধে শাহজাদা খসরুর পক্ষ নিয়েছিল শের আফগান। তারপরও তাকে বর্ধমানের শাসক বানিয়েছিলেন তিনি। এখন বোঝা গেল, নেমকহারামদের কখনও দ্বিতীয় সুযোগ দিতে নেই,' স্বরোষে বললেন মহব্বত খান।
'আমি ভাবছি শাহেনশাহর কথা,' চিন্তিত গলায় বললেন খান জাহান লোদি। 'ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছেন দুজন। কুতুবুদ্দিনের মৃত্যুতে ভেঙে পড়বেন একেবারে।'
বাস্তবিকই, রীতিমতো বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেন সম্রাট খবরটা শুনে। কুতুবুদ্দিন ওরফে খুবু কেবল তাঁর বন্ধুই ছিলেন না, কুতুবুদ্দিনের মা ছিলেন তার দুধ-মা।

মানুষের নিয়তি নদীর জোয়ার ভাটার মতোই, জানেন আবুল হাসান। জোয়ার হলে যেমন ভাটা হবেই, তেমনি মানুষের ক্ষেত্রেও বৃহস্পতি কেটে শনির দশা দেখা দেবে। তবে জোয়ার ভাটার যেমন নির্দিষ্ট সময় আছে, কপালে রাহুর ফের নেমে আসার সেরকম কোনো সময় নেই।
তিন শিশুসন্তানকে নিয়ে তার বাবা গিয়াস বেগ আর মা আসমাত বেগম যখন ইস্পাহান থেকে হিন্দুস্তানের পথে রওনা দিয়েছিলেন তখন সামনে কেবল ছিল অনিশ্চয়তা। তার ওপর আসমাত বেগম ছিলেন গর্ভবতী। কান্দাহারে পৌঁছে এক কন্যা সন্তানের জন্ম দিলেন তিনি। কিন্তু নতুন আরেকটি মুখকে খাওয়ানোর সাধ্য ছিল না। স্বামী-স্ত্রী পরামর্শ করলেন। শেষে নবজাতক কন্যাকে রাস্তার পাশে একটা গাছের নিচে ফেলে রেখেই এগিয়ে যেতে মনস্থ করলেন দুজন। খোদার যদি তাকে বাঁচিয়ে রাখার ইচ্ছে থাকে তাহলে কোনো না কোনোভাবে বাঁচবেই-এই ছিল তাঁদের বিশ্বাস। ফের পথে নামলেন তাঁরা, কিন্তু আসমাত বেগমের মনে হতে থাকে ভারি কোনো পাথর বুঝি বেঁধে দেয়া হয়েছে তাঁর পায়ের সঙ্গে। আর পারলেন না এক পর্যায়ে।
'আমার মেয়েকে নিয়ে এসো, ওকে ফেলে রেখে এক পা-ও এগোতে পারব না আমি,' চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন তিনি।'
এক মুহূর্ত দেরি করলেন না গিয়াস বেগ। হয়তো স্ত্রীর মতো একই আহাজারি ভাবনা গুমরে উঠছিল তাঁর মনেও। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গেলেন মেয়েকে যেখানে ফেলে এসেছেন সেখানে। ঠিক যেভাবে রেখে এসেছিলেন সেভাবেই শুয়ে আছে কাপড়ে জড়ানো শিশুটি, তবে কুচকুচে কালো একটা সাপ জড়িয়ে ধরে আছে তাকে। একটা লাঠি দিয়ে সাপটাকে তাড়ালেন গিয়াস বেগ, তারপর মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ফিরে এলেন স্ত্রী সন্তানের কাছে।
সেই মেয়েটিই মেহেরুন্নিসা।
প্রভাবশালী অমাত্য শের আফগানের কাছে মেয়ের বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন গিয়াস বেগ। মেহেরুন্নিসাও খুশি ছিল স্বামী ও কন্যাকে নিয়ে। কে ভেবেছিল কুতুবুদ্দিন কোকাকে মেরে আর নিজেও মরে তাদেরকে অকুল পাথারে ভাসাবে শের আফগান!
নিজের মেয়ে আরজুমান্দ বানু বেগমের সঙ্গে সম্রাটের পুত্র খুররমের বিয়ের কথা পাকা করে তৃপ্তির হাসি হেসেছিলেন আবুল হাসান। স্বয়ং সম্রাটকে বেয়াই বানানোর সৌভাগ্য ক'জনের হয়!
এখন গর্দভ শের আফগানের কারণে খুররম আর আরজুমান্দের বিয়ের ব্যাপারেও বেঁকে বসেন কিনা সম্রাট কে জানে!
কয়েকদিন সম্রাটের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকলেন আবুল হাসান। সম্রাটের আচার-আচরণে যদিও অস্বাভাবিকতার কোনো ছাপ দেখা গেল না। নিজের কপালকে শাপ শাপান্ত করতে লাগলেন আবুল হাসান, আর মনে মনে পিণ্ডি চটকাতে লাগলেন শের আফগানের।
(চলবে)

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক