জেমস জয়েসের ধারাবাহিক উপন্যাস: ইউলেসিস-৩

আবদুস সেলিম
Published : 28 July 2021, 12:35 PM
Updated : 28 July 2021, 12:35 PM

কাহিনীসূত্র
সমালোচক-গবেষকরা ইউলেসিস-এর দ্বিতীয় পরিচ্ছদের নামকরণ করেছেন মূল মহাকাব্যের গল্পসূত্রের সাথে তুলনামূলক সাযুজ্যে নেস্টর, যেমন প্রথম পরিচ্ছদের নাম ছিলো ইউলেসিস-পুত্রের নামানুসারে টেলেমেকাস। উপন্যাসের কেন্দ্রিও চরিত্র স্টিফেন ডেডোলাস আসলে মহাকাব্যে বর্ণিত টেলেমেকাস, যে কার্যত তার নিজ পিত্রালয় থেকে তার মায়ের পাণিপ্রার্থীদের দ্বারা অধিকারচ্যুত হয়ে হারিয়ে যাওয়া পিতার খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। ঠিক তেমনি স্টিফেন ডেডোলাস তথাকথিত বন্ধুদের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে তার অস্থায়ী বাসস্থান থেকে বেরিয়ে আসে আর সেখানে ফিরে না যাবার সংকল্পে। এই সংকল্পের ইঙ্গিত মেলে প্রথম পরিচ্ছদের শেষে স্টিফেনের এক চেতনাপ্রবাহ সংলাপে: আমি আজ রাতে এখানে ঘুমাবো না। বাড়িতেও আমি যেতে পারবো না।

হোমার মহাকাব্যে টেলেমেকাস তার হারিয়ে যাওয়া বাবার খবর নিতে যায় নেস্টরের কাছে যে তাকে ট্রয় অবরুদ্ধের ঘটনা বর্ণনা করে। উপন্যাসে স্কুলের প্রধানশিক্ষক মি. ডিজির সাথে স্টিফেনের ঐ সকালের সাক্ষাৎ টেলেমেকাসের সাথে নেস্টরের সাক্ষাতেরই প্রতীক যেখানে চার্চের ইতিহাস, ইউরোপের ইতিহাস, ইংল্যান্ডের ইতিহাস, এবং সর্বোপরি আয়ারল্যান্ডের ইতিহাস প্রধানত ঐ চেতনাপ্রবাহ এবং প্রান্তিকভাবে বিভিন্ন অর্থবহ সংলাপের মাধ্যমে বিধৃত হয়েছে। এসবের বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখানে দেয়া হয়নি, কারণ জয়েসের প্রতীকের ব্যাখ্যা যান্ত্রিকভাবে দেয়া সম্ভব নয়। জয়েস আসলে এক প্রতীক থেকে আরো অসংখ্য প্রতীকের জাল বুনেছেন যার যাত্রাপথ যেমন দুর্গম তেমনি পরোক্ষ-উল্লেখও জটিল। এজন্য একটি ভিন্ন ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা প্রয়োজন যেটি আমার অনুবাদ-উত্তর পরিকল্পনা।

আবারো উল্লেখ করছি, আমি পাঠকদের গঠনমূলক সমালচনা/পৃষ্ঠপোষকতা প্রার্থী, নেতিবাচক বা আপেক্ষিক নয় কারণ আরব্য উপন্যাসের ভিক্টরিও যুগের অনুবাদক রিচার্ড বার্টন (১৮২১-১৮৯০), যদিও তার পূর্বেও এ বিখ্যাত গ্রন্থ অন্যান্য ভাষাতে অনূদিত হয়ছে, যে অনুবাদের সমঞ্জসহীনতা (বৃত্তান্তিক এবং সাংস্কৃতিক, উভয়ই) দ্বারা বিড়ম্বিত হয়ে তিনি তার অনুবাদ সুখপাঠ্য করার ইচ্ছায় বাধাহীন স্বাধীনতা নিয়েছিলেন, এবং যে অনুবাদ ইংরেজি পাঠক সমাজে দীর্ঘদিন বেশ কৌতূহলী আকর্ষণ সৃষ্টি করেছিলো, সেটিকে আজও অনুবাদ ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়। এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ডের (১৮০৯-১৮৮৩) ওমর খৈয়াম রুবাইয়াত-অনুবাদও পরবর্তীতে বেশ সমালোচিত হয়েছে অনেকটা ঐ একই কারণে—ভাষান্তরে মাত্রাতিরিক্ত স্বাধীনতা নেয়া। ফলে অনুবাদতত্ত্বে অনুবাদকের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়ার পরও তার একটি সীমারেখা টানার প্রসঙ্গ আজ সাহিত্য অঙ্গনে বেশ আলোচিত হচ্ছে। একারণেই আমি মনে করি একটি স্বীকৃত সাহিত্যকর্মের একই ভাষাতে একাধিক অনুবাদ হওয়া উতিত বরং তার কোনো অনুবাদ না হওয়ার চাইতে—কারণ এতে পাঠকদের মনে মূল এবং অনুবাদ দুটোতেই আগ্রহ বাড়ে। তবে একথাও মানি, অনুবাদে অভিজ্ঞতা না থাকা কোনো ব্যাক্তির প্রথমেই ইউলেসিস-এর মতো সুকঠিন অনুবাদে হাত না দেয়াই উচিৎ। যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন উঠতে পারে আমার যোগ্যতা নিয়ে, যেটা আমার দু'একজন পাঠক ইতিমধ্যে উত্থাপন করেছেন। আমার যোগ্যতা মূলত আমার প্রায় চল্লিশোর্ধ অনুবাদ গ্রন্থের অভিজ্ঞতা। এটিই আমার পাথেয় এই অনুবাদকর্মে নিয়োজিত হবার। আপনাদের সহযোগিতা অবশ্যকাম্য।

বাংলা তর্জমা: আবদুস সেলিম

তুমি, ককরেন, কোন শহর তার সাহায্য চেয়েছিলো?
–টারেন্টাম, স্যার।
–খুব ভালো। তারপর?
ছেলেটার ফাঁকা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি শূন্য জানালার দিকে।
স্মৃতির আত্মজাদের প্রভাবে সময়গততা পায় উপকথাখ্যাতি। তবুও কোনো প্রকারে ব্যাপারটা এমন যদি না হয় যে স্মৃতিই সময়গততাকে উপকথাখ্যাতিতে পরিবর্তিত করে। বলা যায়, এ এক শব্দমালা, অসহিষ্ণুতার, ব্লেকের অসীম কল্প-ডানার শব্দময় ভূপতন। আমি শুনতে পাই সব মহাজাগতিক আধারের বিনাশ, কাচের চুরমার আর অট্রালিকার ধ্বংস, আর দেখি সময় পরিণত হচ্ছে এক ভয়ঙ্কর লেলিহান শিখায়। আমাদের আর বাকি থাকে কি তাহলে?
–জায়গাটার নাম আমি ভুলে গেছি, স্যার। সময়টা খ্রিস্টপূর্ব ২৭৯ সাল।
–অ্যাস্কুলম, স্টিফেন বলে, রক্তজমাট ইতিহাসে লেখা নাম এবং তারিখের দিকে তাকিয়ে।
–হ্যাঁ, স্যার। এবং তার সাথে যোগ করে: অমন আর একটা বিজয় মানে আমাদের সর্বনাশ।
এই শব্দমালা পৃথিবী মনে রেখেছে। যেন মনের এক ধূসর বিনোদন। পাহাড়চূড়ার উপরে শবাকীর্ণ প্রান্তর থেকে এক সেনাপ্রধান তার সেনাঅফিসারদের বলেছিলো, তার বর্শার উপর ভর দিয়ে। তারা কান পেতে শুনেছিলো।
–তুমি, আর্মস্ট্রং, স্টিফেন বলে। পিউরাসের শেষ পরিণতি কি হয়েছিলো?
–পিউরাসের শেষ পরিণতি, স্যার?
–আমি জানি, স্যার। আমাকে জিজ্ঞেস করেন, স্যার, কোমিন বলে।
–চুপ। তুমি, আর্মস্ট্রং। তুমি পিউরাস সম্মন্ধে কি জান?
এক ব্যাগ ডুমুরের রোল আর্মস্ট্রং-এর ঝোলার ভেতর পড়ে আছে গোপনে। সে মাঝেমাঝে সেগুলো তার দুই মুঠোতে ভরে নিঃশব্দে মুখে পুরে গেলে। গুড়োগুলো তার দুই ঠোঁটের পরতে আটকে থাকে। সুবোধ বালকের মিষ্টি শ্বাস। স্বচ্ছল মানুষেরা, গর্বিত তাদের বড় ছেলে নৌবাহিনীতে ছিলো। ভাইকো রোড, ডোলকি।
–পিউরাস, স্যার? পিউরাস, হলো সেতুস্তম্ভ স্যার।
সবাই হেসে উঠে। উল্লাসহীন উচ্চ নিনাদে বিদ্বেষাত্বক হাসি। আর্মস্ট্রং চারদিকে তাকিয়ে তার সহপাঠীদের দেখে, চোখেমুখে বোকাটে আভা। মুহূর্ত পরে ওরা সবাই আরো জোরে হেসে উঠবে, আমার অভাবী নিয়মহীন জীবন আর ওদের বাবাদের নিয়মিত স্কুল ফিস দেবার ক্ষমতার স্মরণে।
–এবার বলো, স্টিফেন বলে, ছেলেটার ঘাড়ে বইয়ের একটা খোঁচা দিয়ে, সেতুস্তম্ভটা কি জিনিস।
–সেতুস্তম্ভ হলো, স্যার, আর্মস্ট্রং বলে। পানির উপরে একটা জিনিস, স্যার। একধরনের সেতু, স্যার। যেমন কিংস্টন সেতু, স্যার।
আবার কিছু হাসি: উল্লাসহীন অথচ অর্থপূর্ণ। শেষ বেঞ্চে বসা দু'জন ফিসফিস করে। হ্যাঁ। ওরা জানে: ও কোনোদিন কিছু শেখেনি কিম্বা নিরপরাধও ছিলো না। সবাই। হিংসাকাতর দৃষ্টি নিয়ে সে সবার দিকে তাকায়। এডিথ, ইথেল, জার্ডি, লিলি। ওরা সবাই এক: ওদের শ্বাসপ্রশ্বাসে, চা আর জ্যামে মাখা মিষ্টি হাসিতে, সারাটাক্ষণ ওদের হাতের বালা
গুলোর মুর্খহাসিময় ঝগড়াঝাটিতে।
–কিংস্টন সেতুস্তম্ভ, স্টিফেন বলে। হ্যাঁ, এক আশাভঙ্গের সেতু।
শব্দগুলো ওদের সবার দৃষ্টিকে উদ্বিগ্ন করে।
–কিভাবে, স্যার? কোমিন জিজ্ঞেস করে। সেতু তো নদী পার হবার জন্যে হয়, স্যার।
হাইয়েন্সের খেরোখাতার জন্যে এখানে শোনার কেউ নেই। আজ রাতে মাতাল মদ্যপান আর আড্ডার আসরে চতুর আলাপ, তার মনের ভেতরের সব মার্জিত চিন্তাভাবনার তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণাত্বক প্রচার। তারপর কি? এক ভাঁড় তার প্রভুর রাজসভায়, প্রশ্রয়ী অথচ অশ্রদ্ধেয়, এক ক্ষমাশীল মুনিবের প্রশংসাশিক্ত। কেনো এইসবের আয়োজন তার? পুরোটা তো অনাবিল ভালোবাসার স্পর্শ নয়। তাদের কাছেও ইতিহাস এক প্রায়শ শোনা অপরাপর গল্পেরই মতো, তাদের জন্মভূমী এক বন্ধক রাখার দোকান।
যদি পিউরাস আরগসে ঐ ডাইনী বুড়ির ছুঁড়ে দেয়া টাইলের আঘাতে ধ্বসে না যেত কিম্বা ছুরির আঘাতে জুলিয়াস সিজারের মৃত্যু না হতো? তাদেরকে তো চিন্তার বাইরে রাখা সম্ভব নয়। সময় তাদের পরিচিতি দিয়েছে আর তারা আবদ্ধ হয়ে আছে অপার সম্ভাবনা-অতিক্রান্ত এক কক্ষে। কিন্তু ওদের কোনোই অস্তিত্ব যদি না থাকতো তবে ঐ সম্ভাবনার ইঙ্গিত কি আমরা পেতাম? কিম্বা সময় যা ঘটিয়েছে তাই কি শুধু ঘটার ছিলো? চিন্তার বুনন, শূন্য বাতাসে বুনে চলা।
–আমাদের একটা গল্প শোনান, স্যার।
–ঠিক, স্যার, শোনান স্যার, ভুতের গল্প।
–এটা কোত্থেকে শুরু হবে? স্টিফেন জিজ্ঞেস করে, আর একটা বই বের করে।
–Weep no more, কোমিন বলে।
–ওখান থেকে পড়া শুরু করো, টোলবেট।
–তাহলে ইতিহাসের কি হবে, স্যার?
–পরে হবে, স্টিফেন বলে। হ্যাঁ, শুরু করো, টোলবেট।
একটা শ্যামলা ছেলে বই খোলে তারপর তার ঝোলার পাশে ঠেকা দিয়ে সেটা দাঁড় করায়। ছাপা অক্ষরের দিকে অস্বাভাবিক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঝাকুনির সাথে কবিতা আবৃত্তি করে চলে:
–Weep no more, woful shepherd, weep no more
For Lycidas, your sorrow, is not dead,
Sunk though he be beneath the watery floor. . .
(আর কেঁদো না, হতভাগ্য মেষপালক, চোখের জল ফেলো না আর
কারণ লিসিডাস, যার স্মরণে এ অশ্রুজল, মৃত নয় সে,
যদিও গভীর সলিল সোপানে সমাহিত শয়ানে যে আজ. . .)
নিশ্চয়ই এ হলো চলমানতা, সম্ভাবনার সম্ভাবনাময় এক রূপ। ঐ আচ্ছন্ন কবিতার পঙক্তিগুলোতে অ্যারিস্টটলের শব্দমালার স্বেচ্ছা-সন্নিবেশ, যে শব্দমালা ভেসে বেড়িয়েছে জ্ঞান অন্বেষণের নিস্তব্ধতায় এবং সে এসবকিছু পড়েছে সেইন্ট জেনেভিভের পাঠাগারে, প্যারিসের উচ্চন্ড পাপময়তার প্রশ্রয়ে, রাতের পর রাত। তার কনুয়ের পাশে ঘণিষ্ঠ বসে এক সুকুমার সিয়ামি বেড়াল তাকে পাখিপড়া করেছে তাবৎ কুশলী দক্ষতা। জ্ঞান দিয়ে মাথা ভরেছি, ভরিয়েছি: গ্যাসবাতিগুলোর নিচে, মাথাগুঁজে, পাশেবসা কারো সাথে অলস আলোচনা করে: আর আমার মনের অন্ধকারে পাতালপুরির এক সরীসৃপ, অনীহ, সূর্যালোক-কাতর, ড্রাগনের মতো তার আঁশালো থাবা নিয়ে সদা-অস্থির। চিন্তা চিন্তারই চিন্তা। প্রশান্ত উজ্জলতা। সব বস্তুর গভীরে কোনো না কোনো প্রকারে বিন্যস্ত তার আত্মা: সকল বিন্যাসের বিন্যাস আত্মা। প্রশান্তি অপ্রত্যাশিত, বিস্তির্ণ, শুভ্রোজ্জল, বিন্যাসের বিন্যাস।
টোলবেট আবৃত্তি করে চলে:
–Through the dear might of Him that walked the waves,
Through the dear might . . .
(তার [যীশুর] প্রেমের টানে নিয়ন্ত্রণ হয়েছিলো তরঙ্গের চলাচল,
তার [যীশুর] প্রেমের টানে . . . )
–উল্টাও, স্টিফেন বলে শান্তভাবে। এখানে তেমন কিছু দেখছি না।
–কি বললেন, স্যার? টোলবেট সরলভাবে জিজ্ঞেস করে, সামনে ঝুঁকে।
হাত দিয়ে সে পাতা ওলটায়। সে ফিরে যায়, আবার ওলটায়, যেনো এইমাত্র মনে পড়লো। মনে পড়লো তার কথা যে নিয়ন্ত্রণ করেছিলো তরঙ্গের চলাচল। এখানেও এই ভীরু মনগুলোর উপর তার ছায়া পড়ে আছে, উপহাসকারীর মন এবং ঠোঁটগুলোর উপর এবং আমার উপরও। সে ছায়া পড়ে আছে তাদের সকল উৎসুক মুখের উপর যারা তাকে শ্রদ্ধাভরে একটা মুদ্রা দিয়েছে। সিজারকে সিজারের যা প্রাপ্য, ঈশ্বরকে ঈশ্বরের যা প্রাপ্য। গভীর চোখের দীর্ঘ দৃষ্টি, এক গীর্জার টাকুতে নিরবধি ধাঁধাঁর তাঁত বোনা। হ্যাঁ।
Riddle me, riddle me, randy ro.
My father gave me seeds to sow.
(ধাঁধাঁ বলো, ধাঁধাঁ বলো, ক্রুশে বেঁধা বকধার্মিক।
পিতা দিয়েছে বীজ, বুনতে হবে ঠিক-ঠিক।)
টোলবেট তার বন্ধ বইটা ঝোলার ভেতর সন্তর্পণে ঢুকিয়ে রাখে।
–সবটা পড়ে শুনিয়েছো? স্টিফেন জিজ্ঞেস করে।
–হ্যাঁ, স্যার। দশটায় হকি, স্যার।
–আজ আধা বেলা, স্যার। বৃহস্পতিবার।
–কে একটা ধাঁধাঁর উত্তর দিতে পারবে? স্টিফেন জিজ্ঞেস করে।
তারা বই গুছিয়ে রাখতে থাকে, পেন্সিলের খটখটানি, পাতা ওলটানোর শব্দ। সবাই একসাথে নিজেরনিজের ঝোলার ফিতে বাঁধে, বকলস লাগায়, সবার মুখে হাস্যময় ফিসফিসানি:
–ধাঁধাঁ, স্যার? আমকে জিজ্ঞেস করেন, স্যার।
–আমাকে, স্যার, আমাকে।
–বেশ কঠিন হওয়া চায়, স্যার।
–ধাঁধাঁটা হলো, স্টিফেন বলে।
The cock crew
The sky was blue:
The bells in the heaven
Were striking eleven.
Tis time for this poor soul
To go to heaven.

(মোরগটা ডেকেছিলো
আকাশটা নিল ছিলো:
স্বর্গের ঘন্টাগুলো বেজে উঠলো
ঠিক এগারোটার ঘোষণা দিলো।
সময় তো হয়েছে বেচারার
সোজা স্বর্গে চলে যাবার।)
–এর মানে কি?
–কোনটা, স্যার?
–আবার একবার, স্যার। আমরা শুনতে পাইনি।
আবার বলার সাথেসাথে তাদের চোখগুলো বড়বড় হয়ে উঠে। সবাই চুপ। কোকরেন বলে:
–আপনিই বলেন, স্যার। আমরা পারছি না।
স্টিফেন, তার গলা খুসখুস করতে-করতে উত্তর দেয়:
–এক শেয়াল তার দাদিকে ক্রিসমাস গাছের নিচে কবর দিচ্ছিলো।
সে উঠে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে এক আতপ্ত হাসি দেয় যা একরাশ বিষণ্ণ কান্নার প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে।
দরোজাতে একটা ছড়ির টোকা, সেইসাথে করিডোর থেকে কেউ বলে ওঠে:
–হকি!
সবাই চারদিকে ছিটকে পড়ে, বেঞ্চের পাশ ঠেলে বেরোয়, লাফাতে-লাফাতে। মুহূর্তে সবাই উধাও আর মালঘর থেকে শোনা যায় হকিস্টিক আর বুটজুতোর শব্দের সাথেসাথে তাদের চেঁচামেচি।
সার্জেন্ট, সবার পেছনে মন্থর এগিয়ে আসে, হাতে খোলা কপিবুক। আলুথালু চুল আর ঝুলে পড়া ঘাড় স্পস্ট করে তার বিব্রতাবস্থার কথা এবং ঘোলাটে চশমার ভেতর দিয়ে তার দুর্বল চোখজোড়ায় ফুটে ওঠে একরাশ অসহায়ত্ব। তার গালে—ফ্যাকাসে রক্তশূন্য—এক পরত হাল্কা কালির দাগ, ডাকঘরের তারিখের ছাপের মতো, জলজলে, চিটচিটে, যেনো এইমাত্র একটা শামুক তার শয্যা বানিয়েছিলো ওখানে।

সে তার কপিবুক তুলে ধরে। শিরোনামে যোগঅঙ্ক শব্দটা লেখা। তার নিচে ঢালবব্ধ সংখ্যামালা এবং সবশেষে আঁকাবাঁকা স্বাক্ষর বক্রাকারে এবং এক চূড়ান্ত ফোঁটায় যতি টানা। সাইরল সার্জেন্ট: তার নাম এবং সিলমোহর।
–মি. ডিজি আমাকে বলেছেন এগুলো সব আবার নতুন করে লিখতে, সে বলে, এবং আপনাকে দেখাতে, স্যার।
স্টিফেন বইটার ধারগুলোতে হাত বোলায়। খামখা।
–এখন বুঝতে পারছো তো কিভাবে করতে হয়? সে জিজ্ঞেস করে।
–এগারো থেকে পনেরো, সার্জেন্ট উত্তর দেয়। মি. ডিজি আমাকে ওগুলো বোর্ড থেকে টুকতে বলেছিলেন, স্যার।
–এখন নিজেনিজে করতে পারবে? স্টিফেন জিজ্ঞেস করে।
–না, স্যার।
জঘন্য এবং অর্থহীন। ঝুলে পড়া ঘাড় আর আলুথালু চুল আর কালির দাগ, শামুকের শয্যা। তবুও কেউ না কেউ এই ছেলেটাকে ভালবাসতো, তার দুহাতে, তার মনের গভীরে জড়িয়ে ধরতো। কিন্তু সম্ভবত পৃথিবীর চলমানতা সেই মহিলাকে বাধ্য করেছে তাকে পায়ে মাড়িয়ে চলে যেতে, এক পিষেফেলা অস্থিহীন শামুকের মতো। সেই মহিলা তার আপন রক্ত থেকে ছেলেটার জন্য নিস্তেজ জলো রক্ত বের করে দিয়েছে ভালবেসে। সেটাই কি তবে বাস্তবতা? জীবনের একমাত্র সত্য? তার মায়ের মাটিতে শোয়ানো শরীরের উপর দিয়ে হেঁটে চলে গেছে বীরবাহাদুর কোলম্বানেস অন্য এক জরুরি আহ্বানে। সে আর আগুনে পোড়ানো জ্বালানি ডালের মতো কম্পমান অস্থিসার মহিলা ছিলো না, ছিলো
গোলাপকাঠের সুঘ্রাণে মোড়া ভেজা ভস্ম। চিরবিদায় নিয়ে তাকে সে রক্ষা করেছে তার শরীর মাড়িয়ে চলে যাওয়া থেকে, প্রায় অস্তিত্বহীনভাবে। এক দুর্ভাগা আত্মা উপরে স্বর্গে পাড়ি দিয়েছে: আর নিচে মিটমিটে তারার আলোময় পতিত জমিতে এক শেয়াল, রক্তিম দুর্গন্ধ দস্যুর ঘন লোমে আবৃত হয়ে, ক্ষমাশূন্য জলজলে দৃষ্টিতে মাটি আঁচড়েছে, শুনেছে, মাটি আঁচড়েছে, শুনেছে, আঁচড়েছে, আঁচড়েছে।
ছেলেটার পাশে বসে স্টিফেন তার নিজের সমস্যার সমাধান করে ফেলে। অ্যালজেব্রা দিয়ে সে প্রমাণ করে সেক্সপিয়রের প্রেতাত্মা হ্যামলেটের পিতামহ। সার্জেন্ট তার চশমার ভেতর দিয়ে আড়চোখে উঁকি দেয়। মালঘর থেকে হকিস্টিকের শব্দ: বলের ফাঁকা ধুপধাপ এবং মাঠ থেকে কলরব।
সারা পৃষ্ঠা জুড়ে সংকেতগুলোর গুরুগম্ভীর ঘোরাফেরা, অক্ষরগুলোর নিজনিজ চারিত্র্যে, অদ্ভুত আকর্ষক চতুর্ভুজের এবং ঘণক্ষেত্রের আবরণে। হাত বাড়াও, এগোও, সাথীদের শ্রদ্ধা করো: অতএব: এ হলো মূরদের অলীক কল্পনাশ্রিত চাতুর্য। এই পৃথিবী থেকে বিদায় হয়েছে তারাও, আভারইস (ইবন রুশদ) আর মোজেস মাইমনেডিস, অস্বচ্ছ অন্ধকারাচ্ছন্ন সব মানুষ, আচারআচরণে এবং চলাফেরায়, তাদের হাস্যকর দর্পণে পৃথিবীর অস্পস্ট আত্মার প্রতিবিম্ব অবলোকন করেছে, যেনো এক তমসা দীপ্তময় হয়ে উঠেছে উজ্জলতায়, যে উজ্জলতা দুর্গম।
–এখন বুঝতে পারছো তো? পরেরটা নিজেনিজে করতে পারবে?
–হ্যাঁ, স্যার।
দীর্ঘ দুর্বোধ্য আঁচড়ে সার্জেন্ট সব তথ্যউপাত্ত টুকে নেয়। বিশ্বস্ততার সাথে টোকার সময় যতবারই তার হাত ঐ অস্থির সংকেতগুলোর উপর ফিরেফিরে আসে, প্রতিবারই সে দ্বিধাভরে অপেক্ষা করে সাহায্যের আশায়, তার নিষ্প্রভ ত্বকের আড়ালে এক বিব্রতকর আভা ছড়িয়ে। Amor matris: মাতৃ স্নেহ: আত্মমাত্রিক এবং বস্তুমাত্রিক। মা তার নির্জীব রক্ত এবং জোলো টকে যাওয়া দুধ তাকে দিয়েছে আর তার ময়লা মলমুত্রের কাপড় সবার চোখের আড়ালে সরিয়ে রেখেছে।
আমিও ওর মতোই ছিলাম, ঐ একই ঝুলন্ত ঘাড়, একই নিষ্প্রভতা। আমার ছেলেবেলা আমাকে এড়িয়ে গেছে। কোনোভাবেই তাকে আমি ধরতে পারিনি, আলতো ভাবেও না। আমারটা দূরে বহুদূরে, আর ওর গুপ্ত বিষয় আমাদের চোখে যতটুকু নজরে পড়ে ঠিক ততটুকুই। গুপ্ত বিষয়াদি, নিরব, জগদ্দলের মতো আবদ্ধ আমাদের দুজনের অন্তরের অন্ধকার প্রাসাদে: সেইসব গুপ্ত বিষয় যেগুলো তাদের স্বৈর-অত্যাচারে অবষণ্ণ: যে স্বৈরাচারীরা স্বেচ্ছায় ক্ষমতাচ্যুত হতে ইচ্ছুক।
অঙ্কগুলো কষা হয়ে গেছে।
–খুবই সহজ, স্টিফেন বলে, উঠতেউঠতে।
–হ্যাঁ, স্যার। ধন্যবাদ, সার্জেন্ট উত্তর দেয়।
সে হাল্কা ব্লটিং কাগজ দিয়ে পৃষ্ঠাতে লেখাগুলোর কালি শুষিয়ে নেয় তারপর খাতাটা তার ডেস্কে নিয়ে যেয়ে রাখে।
–তুমি বরং তোমার হকিস্টিক নিয়ে ওদের সাথে খেলতে যাও, ছেলেটার নিষ্প্রভ শরীরটাকে অনুসরণ করতেকরতে স্টিফেন বলে।
–জ্বি, স্যার।
করিডোরে তার নাম নাম শোনা যায়, কেউ একজন মাঠ থেকে ডাকছে।
–সার্জেন্ট!
–দৌড় দাও, স্টিফেন বলে। মি. ডিজি তোমাকে ডাকছে।
সে পোর্চে দাঁড়িয়ে দেখে উদ্যমহীন ছেলেটা দ্রুত বিশৃঙ্খল মাঠের দিকে দৌড়াচ্ছে যেখান থেকে কানে আসছে কর্কশ কন্ঠের বাদানুবাদ। ওদের সবাইকে দলে ভাগ করা হলে মি. ডিজি দৌড়ানোর ভঙ্গিতে ঘাসের চাপড়া মাড়িয়ে মাঠ থেকে বেরিয়ে আসে। স্কুলঘরের কাছে এলে শুনতে পায় তাকে আবার কারা যেনো বিরামহীন ডেকে চলেছে। সে তার বিক্ষুব্ধ গোঁফ নিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়।
–এখন আবার কি? সে চেঁচাতে থাকে কোনো কথায় কান না দিয়ে।
–কোকরেন আর হ্যালিডে একই দলে পড়েছে, স্যার, স্টিফেন চেঁচিয়ে বলে।
–তুমি আমার স্টাডিরুমে এক মিনিট অপেক্ষা করো, মি. ডিজি বলে, আমি এখানকার ঝামেলাটা মিটিয়ে আসছি।
তারপর বিরক্তির সাথে আবার মাঠে ফিরে যেতেযেতে তার বৃদ্ধ কঠস্বরের কঠোর ঘোষণা শোনায়:
–কি হয়েছে? এখন আবার কি সমস্যা?
সবার উচ্চকন্ঠের চেঁচামেচি তাকে চারদিক থেকে ডাকাডাকি শুরু করে: তাদের অনেকগুলো শরীর তাকে ঘিরে ধরে, সূর্যের তেজি কিরণের কারণে তার মাথা থেকে সস্তা কলপ গলেগলে পড়তে থাকে।
এক পোড়া সোঁদা গন্ধ চেয়ারের ম্যাটম্যাটে ঘষটানো চামড়ার গন্ধের সাথে একাকার হয়ে সারা স্টাডিময় ছড়িয়ে। এখানেই সেই প্রথম দিন সে আমার সাথে দর কষাকষি করেছিলো। যেমন ছিলো সেই শুরুতে, এখনো ঠিক তাইই আছে। সাইডবোর্ডে ট্রেতে রাজা স্টুয়ার্টের মুদ্রা, শৌচাগারের অবর ভান্ডার: এবং সবসময়ের জন্যে তার সেখানেই অবস্থান। বিবর্ণ লালাভ মখমল মোড়া বাক্সে বিন্যস্ত বারো জন খৃস্টধর্মের আদি গুরু যারা অ-ইহুদিদের ভেতর ধর্ম প্রচার করেছে: অবিনশ্বর বিশ্ব।
করিডোরে পোর্চের শানের উপর দ্রুত পদশব্দ। মি. ডেজি তার গোঁফে ফু দিতেদিতে টেবিলের কাছে হাজির।
–প্রথমে আমাদের টাকা পয়সার লেনদেনটা সারতে হবে, সে বলে।
সে তার কোটের পকেট থেকে চামড়ার ফিতে বাঁধা একটা পকেটখাতা বের করে। সেটা শব্দ করে খুলে তার ভেতর থেকে দুটো চিরকুট বের করে, চিরকুট দুটো একটার সাথে আর একটা আঁটা, তারপর সযত্নে টেবিলের উপর রাখে।
–দুটো, সে বলে, পকেট খাতাটা বেঁধে এক পাশে সরিয়ে রাখতেরাখতে।
আর এখন তার সামনে তার সোনার সিন্দুক। স্টিফেনের দ্বিধান্বিত হাত পাথরশীতল মালমসলার উপর জড়ো করে রাখা ঝিনুকের উপর ঘুরে ফেরে: শঙ্খ আর অর্থ, কড়ি আর চিতা ঝিনুক (চিতা খোল): যেনো আমিরি পাগড়ীর পেঁচালো ভাঁজ, আর এই এটা, সেইন্ট জেমসের কম্বু। এক বৃদ্ধ তির্থযাত্রীর অমুল্য সঞ্চয়, গুপ্তধন, শূন্যগর্ভ ঝিনুকের সমষ্টি।
এক পাউণ্ডের একটা স্বর্ণমুদ্রা পড়ে, ঝকঝকে আনকোরা নতুন, টেবিলক্লথের নরম স্তূপের উপর।
–তিন, মি. ডিজি বলে, তার ছোট্ট টাকা রাখার বাক্সটা হাতে নাড়াচাড়া করতেকরতে। হাতের কাছে এমন একটা জিনিস রাখা ভালো। এই দেখো। এটাতে বেশ টাকা পয়সাগুলো গুছিয়ে রাখা যায়। এটা শিলিং-এর জন্যে, এটা ছয় পেন্সের জন্যে, আর এটা আধা ক্রাউন। আর এখানে ক্রাউন। দেখো।
সে ওর ভেতর থেকে দুই ক্রাউন এবং দুই শিলিং বের করে।
–তিন বারো, সে বলে। আমার মনে হয় হিসাবটা ঠিকই আছে।
–আপনাকে ধন্যবাদ, স্যার, স্টিফেন বলে, টাকাগুলো লজ্জাবনত দ্রুততার সাথে গুছিয়ে নিয়ে সব তার প্যান্টের একটা পকেটে ভরতেভরতে।
–ধন্যবাদ দেবার কিছু নেই, মি. ডিজি বলে। এ তোমার রোজগারের ন্যায্য পাওনা।
স্টিফেনের হাত, আবার অবাধ, সেই শূন্যগর্ভ ঝিনুকের দিকে ফিরে যায়। একাধারে সুন্দর আর শক্তির প্রতীক। আমার পকেটের ভেতর এক দলা পাকিয়ে আছে। লালসা আর দুর্দশা নষ্ট করেছে সে প্রতীক।
–ওভাবে টাকা-পয়সা রেখো না, মি. ডিজি বলে। কোথাও পকেট থেকে হাত বের করতে গেলে পড়ে হারাবে। তুমি আমার মতো এরকম একটা বাক্স কিনে নাও। ভীষণ কাজে লাগবে।
একটা কিছু উত্তর দাও।
–আমার ওসব খালিই পড়ে থাকবে, স্টিফেন বলে।
সেই একই ঘর, একই সময়, সেই একই জ্ঞান দান: আর আমিও সেই আমি। এনিয়ে তিন তিন বার। এখানে তিন তিনটে ফাঁস আমার গলায়। ঠিক আছে। আমি ইচ্ছে করলেই এই মুহূর্তে সব ছিঁড়ে বেরিয়ে যেতে পারি।
–কারণ তুমি টাকা-পয়সা জমাতে পারো না, মি. ডিজি বলে, তার আঙ্গুল তুলে। তুমি এখনও বুঝতে শেখোনি টাকাকড়ি কী জিনিস। টাকা হলো ক্ষমতা, তোমার যখন আমার মতো বয়স হবে তখন বুঝবে। আমি বুঝি, আমি বুঝি। আমার বোঝাটা তুমি যদি এখন বুঝতে পারতে। শেক্সপিয়ার কি বলেছে মনে আছে? Put but money in thy purse. টাকা-কড়ি রাখবে যত্নে খুতিতে।
–ইয়াগো, স্টিফেন বিড়বিড় করে।
সে তার নজর নির্জীব ঝিনুক থেকে বৃদ্ধ মানুষটার দিকে তুলে ধরে।
–সে জানতো টাকা কী জিনিস, মি. ডিজি বলে। সে নিজেও টাকা বানিয়েছিলো অনেক। কবি, সে কথা ঠিক, কিন্তু একজন ইংরেজও বটে। ইংরেজদের গর্ববোধ সম্মন্ধে তোমার কোনো ধারণা আছে? একজন ইংরেজের মুখে সবচাইতে গর্বের কথা কী শোনা যায় তা কখনো ধারণা করতে পারো তুমি?
সাগরই হলো শাসক। তার সমুদ্রশীতল চোখগুলো শূন্য উপকুলের দিকে ফেরে: ইতিহাসই হলো সব নষ্টের মূল: দোষ আমার, আমার বক্তেব্যের, ঘৃণা না করার।
–সবচাইতে বড় গর্ব, স্টিফেন বলে, ওদের সাম্রাজ্যে সূর্য ডোবে না।
–বাহ! মি. ডিজি চেঁচিয়ে উঠে। ওটা ইংরেজের কথা নয়। ওকথা এক ফরাসি কেল্ট বলেছে। সে তার টাকা রাখার বাক্সে বুড়ো আঙ্গুলের নখ দিয়ে টোকা দেয়।
–আমি বলছি তোমাকে, সে গম্ভীর ভাবে বলে, ওদের সবচাইতে গর্বের কথা কোনটা। I paid my way. আমি আমার নিজের পয়সায় চলেছি ।
সৎ মানুষ, সৎ মানুষ।
–I paid my way. I never borrowed a shilling in my life. আমি আমার নিজের পয়সায় চলেছি, সারা জীবন কারো কাছে এক শিলিংও ধার করিনি। ধরতে পারো এর ভেতরের দর্পটা? I owe nothing. আমার কোনো পাওনাদার নেই। কী গর্ববোধ?
মুলিগান, নয় পাউন্ড, তিনজোড়া মোজা, এক জোড়া জুতো, কয়েকটা টাই। কারেন, দশ গিনি। মেকান, এক গিনি। ফ্রেড রাইয়ান, দুই শিলিং। টেম্পল, দুটো দুপুরের খাবার। রাসেল, এক গিনি, কাজিন্স, দশ শিলিং, বব রেনল্ডস, আধা গিনি, কোহলার, তিন গিনি, মিসেস ম্যাককারনান, পাঁচ সপ্তাহ থাকার ভাড়া। আমার পকেটের পাকানো দলাটা খামোখা।
–এই মুহূর্তে ঠিক বুঝতে পারছি না, স্টিফেন উত্তর দেয়।
মি. ডিজি মহানন্দে হেসে উঠে, তার টাকা রাখার বাক্সটা সেই সাথে যথাস্থানে রেখে দেয়।
–জানতাম পারবে না, সে বলে খুশির সাথে। কিন্তু একদিন ঠিক বুঝবে। আমরা বড় মনের মানুষ কিন্তু ন্যায়-অন্যায়টাও বুঝতে হবে।
–ওইসব বড়বড় কথায় আমি ভয় পাই, স্টিফেন বলে, ওসব কথা আমাদের ভীষণ অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মি. ডিজির কঠিণ দৃষ্টি অদূরে ম্যান্টলপিস ছাড়িয়ে চলে যায় যেখানে চেকচেক ঘাগরা পরা পারুষ্য স্থূলাকার একজন মানুষ: অ্যালবার্ট এডওয়ার্ডস, ওয়েলসের রাজপুত্র।
–তুমি আমাকে মান্ধাত্বা আমলের ঘাড়তেড়া বুড়ো হাবড়া টোরি বলে মনে করো, তার চিন্তিত কন্ঠস্বর বলে। আমি ও'কনেলের যুগ থেকে আরম্ভ করে তিন প্রজন্ম দেখা মানুষ। এখনও মনে আছে দুর্ভিক্ষের কথা। তুমি জানো ঐ অরেঞ্জ সোসাইটির সদস্যরা ও'কনেলেরও বিশ বছর আগে ইউনিয়ন বাতিলের আন্দোলনে নেমেছিলো? তোমার কি জানা আছে তোমাদের কমুনিওনের বড়বড় চাইরা তাকে গলাবাজ নেতা বলে খোলাখুলি বদনাম করার অনেক আগে থেকেই এসব আন্দোলন হয়েছে? তোমরা, এই ফিনিয়ানরা, অনেক কিছুই ভুলে যাও।
চমৎকার, সত্যনিষ্ঠ এবং অজর স্মৃতি। আমা-র ডাইমন্ডে ক্যাথলিকদের লাশ চমৎকার ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিলো। উচ্চকন্ঠ, মুখোশ আঁটা অস্ত্র হাতে, ইংরেজ জোতদারদের দালাল। ব্ল্যাক নর্থ (আইয়ারল্যান্ডের উত্তর অঞ্চল যেখানে প্রটেস্ট্যান্টদের আবাস) আর ট্রু ব্লু (রাজতন্ত্র বিরোধী স্কটল্যান্ড থেকে আগত অভিবাসী)। ক্রপিরা (অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংরেজ বিরোধী আইরিশ বিদ্রোহীরা) নিপাত যাক।
স্টিফেন ইশারার ভঙ্গী করে।
–আমার ভেতরও বিদ্রোহী রক্ত আছে, মি. ডিজি বলে। মায়ের দিক থেকে। কিন্তু আমার বংশগতি স্যার জন ব্ল্যাকয়েলের দিক থেকে, যে ইউনিয়নের পক্ষে ভোট দিয়েছিলো। আমরা সবাই আইরিশ, সবাই রাজার বংশ।
–কি দুর্ভাগ্য, স্টিফেন বলে।
–Per vias rectus. সহজ সরল পথ, মি. ডিজি বলে দৃঢ়তার সাথে, সেটাই ছিলো তার আদর্শ। সে ইউনিয়নের পক্ষে ভোট দিয়েছিলো সেই ডাউন প্রদেশের আর্ডজ থেকে লম্বা বুটজুতো পরে ঘোড়ায় চড়ে ডাবলিনে এসে।
Lal the ral the ra
The rocky road to Dublin.
(লা লা লা লালা
ডাবলিনের পাহাড়ি রাস্তা।)
এক গুরুগম্ভীর জমিদার, পায়ে লম্বা চকচকে বুট, চলেছে ঘোড়ায় চড়ে। মিষ্টি পরিচ্ছন্ন দিন, স্যার জন। পরিচ্ছন্ন দিন, মহামান্য . . . দিন দিন . . .। দুটো লম্বা বুট দুপাশে দুলকি চালে দোলে ডাবলিনের যাত্রাপথে। লা লা লা লালা, লা লা লা লা খানদান ইংরেজ।
–ভালো কথা মনে পড়েছে, মি. ডিজি বলে। তুমি আমার একটা উপকার করতে পারো, মি. ডেডোলাস, তোমার কয়েকজন সাহিত্যিক বন্ধুদের দিয়ে। খবরের কাগজে একটা চিঠি লিখছি আমি। এক মিনিট বসো। শেষটা একটু টুকতে হবে।
সে জানালার কাছে ডেস্কের পাশে যায়, দুবার তার চেয়ার টানে তার পর তার টাইপরাইটার মেশিনে আটকানো কাগজের দিকে তাকিয়ে কয়েকটা শব্দ পড়ে।
–বসো। কিছু মনে করোনা, সে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, সধারণ জ্ঞানের নির্দেশনা বলে। এক মিনিট।
ঝাকড়া ভ্রুর তল দিয়ে সে তার কনুয়ের পাশে রাখা লেখা কাগজটার দিকে চোখ নামিয়ে দেখে আর বিড়বিড় উচ্চারণ করে, সেইসাথে ধীরে কিবোর্ডের শক্ত বোতামগুলো খোঁচা দেয়, মাঝেমাঝে ভুল শোধরাবার জন্য টাইপরাইটারের ড্রামটা ওঠানোর সময় বিষম জোরে শব্দ করে।
স্টিফেন রাজন্যবর্গের উপস্থিতিতে নিঃশব্দে বসে থাকে। দেয়ালের চারদিকে ফ্রেমে আঁটা ঘোড়ার ছবির সব পাদবন্দনা, তাদের বিনম্র মাথাগুলো শূন্যে বিশেষ ভঙ্গিময়: লর্ড হেস্টিংসের রিপালস, ওয়েস্টমিনিস্টারের ডিউকের সটওভার, বুফর্টের ডিউকের সিলন, Prix de Paris (প্রি দ্যু পাগি), ১৮৬৬। এলফিন ঘোড়সওয়ারদের ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসে থাকা, সঙ্কেতের অপেক্ষায়। সে তাদের দৌড় দেখতে পায়, রাজরং পিঠে আঁটা, অদৃশ্য জনমানুষের চেঁচামেচির সাথে গলা মিলিয়ে তার চেঁচামেচি শোনে।

–ফুলস্টপ, মি. ডিজি টাইপরাইটারের চাবিকে আদেশ করে। কিন্তু এই গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্নের দ্রুত আলোচনা . . .
ক্র্যানলি আমাকে চটজলদি ধনী হবার জন্যে কোথায় না নিয়ে গেছে, সে কাদাপানি মাড়িয়ে খুঁজে বেড়িয়েছে তার বিজয়ী ঘোড়সওয়ারদের, রেসের মাঠে আর দুর্গন্ধ ধোঁয়াশে ক্যান্টিনে ঘুরতেঘুরতে শুনেছে বুকিদের ঘ্যানঘ্যানানি, পার হয়েছে গাদাগাদা প্যাঁক। ফেয়ার রেবেল ঘোড়ার উপর বাজি ধরেছে: রেসের মাঠে যার দশ ভাগের এক ভাগ জেতার সম্ভাবনা ছিলো। ঘোড়দৌড় শেষে আমরা জুয়াড়ি আর জোচ্চোরদের পাশ কাটিয়ে, টুপি আর কোট পরা মতলববাজদের পেরিয়ে, মাংসল ফোলামুখ মহিলার, সম্ভবত কসাইয়ের বৌ, গা ঘষটে যেতেযেতে তার লবঙ্গ মাখা কমলার গন্ধ তৃষ্ণার্তের মতো শুঁকেছি।
ছেলেদের খেলার মাঠ থেকে চিৎকার এবং উল্লাস ভেসে আসে সেই সাথে দীর্ঘ লয়ের বাঁশির শব্দ।
আবার: একটা গোল। আমি ওদেরই একজন, ওদের যুদ্ধংদেহী শরীরগুলোর ভেতরের এক মিথস্ক্রিয়া, এক জীবনসংগ্রাম। তুমি কি সেই পা-বাঁকানো মায়ের সুপ্রিয়ের কথা বলছো যার অন্তজ মনে হয় কমবেশি খোয়ারির ভেতরই থাকতো? জীবনসংগ্রাম। বিকম্পিত সময় প্রতিক্ষিপ্ত হয়, কম্পনে কম্পনে। জীবনসংগ্রাম, যুদ্ধের পঙ্কিলতা আর হুঙ্কার, হানিতের জমাট মরণোত্তর-রক্তক্ষরণ, রক্তাপ্লুত মানব-নাড়িভুঁড়ির টোপ-গাথা বর্শার কীলকের শীৎকার।
–ব্যাস, শেষ, মি. ডিজি বলে, চেয়ার থেকে উঠে।
সে টেবিলের কাছে আসে, তার কাগজগুলোতে পিন আঁটতেআঁটতে। স্টিফেন উঠে দাঁড়ায়।
–আমি বিষয়টা বেশ সংক্ষেপে তুলে ধরেছি, মি. ডিজি বলে। লেখাটা পা আর মুখের ঘা (foot and mouth disease) নিয়ে। একবার একটু চোখ বুলিয়ে দেখো। ব্যাপারটাতে কোনো দ্বিমত থাকার কারণ দেখছি না।
আমি কি আপনার অমুল্য অবস্থানে অনধিকার প্রবেশ করতে পারি। সেই laisseze faire-এর তত্ত্ব (ব্যাক্তিস্বাতন্ত্রবাদ) যার কথা বারংবার আমাদের ইতিহাসে উঠে এসেছে। আমাদের গবাদিপশু ব্যাবসা। আমাদের পুরনো সব শিল্পকারখানার পরিচালনা। লিভারপুল কুচক্রী মারপ্যাঁচে গোলওয়ে বন্দরের পরিকল্পনা ভাগিয়ে নেয়া। ইউরোপীয় অগ্নিকান্ড। সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে খাদ্যশস্য পরিবহন। কৃষি দপ্তরের অভেদ্য ধনিকতান্ত্রিক নির্বিকারিত্ব। এক চিরায়ত পরোক্ষ ইঙ্গিতের প্রতি ঔদাসিন্য। ক্যাসান্ড্রা। সেই নারীর ইঙ্গিত যে নিজেকে অতিক্রম করে যেতে পারেনি। বর্তমান বিষয়ে ফিরে আসা।
–আমার শব্দগুলো কি কাঠখোট্টা হয়ে গেছে, তোমার কি মনে হয়? স্টিফেনের পড়ার মাঝে মি. ডিজি জিজ্ঞেস করে।
পা-মুখের ঘা। কোখের ওষুধ বলে পরিচিত। রক্তাম্বু (সিরাম) আর সংক্রামণ (ভাইরাস)। ঘোড়ার লবনাক্ততার শতকরা হার। গোমড়ক (রাইন্ডারপেস্ট)। অষ্ট্রিয়ার নিম্নাঞ্চল মুযস্টেইক সম্রাটের ঘোড়ার দল। পশু শল্যবিদ। মি. হেনরি ব্ল্যাকউড প্রাইস। নিরপেক্ষ নিরীক্ষার সুশীল প্রস্তাব। সাধারণ জ্ঞানের নির্দেশনা। তাবৎ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রতিটি বক্তব্যকে যথার্থ গুরুত্ব দিয়ে এই সঙ্কট-সময়ে সঠিক কাজটি করা। আপনার কলামে আমাকে স্থান দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
–আমি চাই এটা ছাপা হোক আর মানুষ পড়ুক, মি. ডিজি বলে। আমি বলে রাখছি, এর পরের বার এই অসুখ শুরু হলে ওরা আইরিশ গরু-ছাগলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে দেবে। অথচ এ রোগ সারানো সম্ভব। আমার চাচাতো ভাই, ব্ল্যাকউড প্রাইস, আমাকে লিখেছে অষ্ট্রিয়াতে পশুডাক্তাররা নিয়মিত এ রোগের চিকিৎসা দিয়ে সবাইকে সুস্থ করে তুলছে। ওদের এখানেও আসতে আপত্তি নেই। আমাদের দফতরকে এব্যাপারে রাজি করাতে চেষ্টা চালাচ্ছি। সেই সাথে আমি এখন প্রচারের কাজেও নামতে চাই। চারদিকে আমার অনেক সমস্যা, যেমন…নানান ষড়যন্ত্র, যেমন…গোপন আঁতাত, আরো…
সে তার তর্জনী তুলে বাতাসে ঘনিষ্ঠভাবে নাড়ায় তার কন্ঠ থেকে কথা বের হবার আগে।
–আমার কথাগুলো খেয়াল করো, মি. ডেডোলাস, সে বলে। ইংল্যান্ড ইহুদিদের হাতে চলে গেছে। সবচাইতে বড়বড় জায়গাগুলো এখন ওদের দখলে: অর্থনীতি, সংবাদপত্র। আর একটা জাতির পতনের এগুলোই বড় লক্ষণ। ওরা যেখানেই একাট্টা হয় একটা জাতির প্রাণশক্তিকে শুষে খায়। গত কয়েক বছর ধরে আমি সেটাই স্পস্ট লক্ষ্য করছি। একথা যেমন সত্যি যে আমরা এখানে এখন যেমন দাঁড়িয়ে, ঠিক ততটাই সত্যি ওই ইহুদি ব্যাবসায়ীরা এর ভেতরই তাদের ধ্বংসের ষড়যন্ত্র শুরু করে দিয়েছে। বৃদ্ধ ইংল্যান্ড মরতে বসেছে।
সে তড়িৎ পায়ে সরে দাঁড়ায়, তার চোখের উপর বিস্তৃত এক সূর্যরশ্মি এসে পড়ে এবং চোখগুলো এক নীলাভ প্রাণ পায়।
–মরতে বসেছে, সে বলে, যদি ইতিমধ্যে মরেই গিয়ে না থাকে।
The harlot's cry from street to street
Shall weave old England's winding sheet.
(বেশ্যার কান্না অলিতে-গলিতে ঘুরে ফিরে
ইংল্যান্ডের কাফনের কাপড় তৈরি করে।)
সূর্যরশ্মির দিকে তার কঠিণ দৃষ্টি মেলে ধরে রাখার ফলে তার চোখগুলো বড়বড় হয়ে ওঠে।
–একজন ব্যাবসায়ী, স্টিফেন বলে, সস্তায় জিনিস কিনে আক্রায় বিক্রি করে, তা সে ইহুদিই হোক কিম্বা ভদ্রলোক, তাই না?
–ওরা যীশুর বয়ে আনা আলোর বিরোধিতা করে পাপ করেছে, মি. ডিজি বলে গম্ভীরভাবে। তুমি ওদের চোখের ভেতর অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পাবেনা। আর তাই ওরা আজ পর্যন্ত এই পৃথিবীতে যাযাবরের জীবন যাপন করছে।
প্যারিসের স্টক এক্সচেঞ্জের সিঁড়িতে সোনালি চামড়ার মানুষেরা তাদের রত্নশোভিত আঙ্গুলগুলো উঁচিয়ে দর কষাকষি করে। রাজহাঁসের দ্রুত চলাচল। ঝাঁকেঝাঁকে শব্দয়ামান প্রবেশ, স্থান-ঔদাসিন্যে চাষাড়ে আচরণ, কিম্ভূত সিল্কের টুপির আবরণের নিচে মাথায় রহস্যময় জটিল চিন্তার ভার। কিছুই তাদের একান্ত নয়: ঐ জামাকাপড়, ঐ কথাবার্তা, ঐ আচরণ। তাদের পরিপূর্ণ ক্ষীণ দৃষ্টি তাদের বক্তব্যের সাথে সর্বদা প্রতারণা করে, আচারআচরণে উৎসাহ এবং বিনয়ের অবতার অথচ ঠিকই জানে তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণার পরিমাণ পর্বত প্রমাণ এবং এও জানে তাদের এইসব বিনয়ী আচরণ আসলে অর্থহীন। অর্থহীন অর্থ সঞ্চয়, মজুতদারী। সময়ে সবই তছনছ হবে। রাস্তার ধারে মজুতদারী: লুণ্ঠণ এবং অভিপ্রয়াণ। ওদের চোখের দৃষ্টিতে বছরের পর বছর যাযাবর যাত্রার প্রতিচ্ছবি, ধৈর্যধারণ, অস্তিত্বের অবমাননা।
–কে করেনি? স্টিফেন বলে।
–কী বলতে চাচ্ছ তুমি? মি. ডিজি জিজ্ঞেস করে।
এক পা সামনে এগিয়ে সে টেবিলের পাশে দাঁড়ায়। তার নিচের চোয়ালদুটো দুপাশে অনিশ্চয়তায় ঝুলে পড়ে। এই কি প্রবীণ প্রজ্ঞা? আমার কথা শোনার জন্যে অপেক্ষা করে।
–ইতিহাস, স্টিফেন বলে, এক দুঃস্বপ্ন যা থেকে আমি জেগে উঠতে চাই।
খেলার মাঠ থেকে ছেলেরা চেঁচিয়ে ওঠে। লম্বা একটানা বাঁশি: যদি তোমাকে ঐ দুঃস্বপ্ন পশ্চাদাঘাত করে, তাহলে?
–স্রষ্টার উদ্দেশ্য বোঝা আমাদের কাজ নয়, মি. ডিজি বলে। সব ইতিহাসই এক গুপ্ত লক্ষ্যের দিকে এগোই, সেটাই ঈশ্বরের ইচ্ছার প্রকাশ।
স্টিফেন তার বৃদ্ধাঙ্গুল জানালার দিকে দ্রুত ইঙ্গিত করে বলে:
–ঐ হলো ঈশ্বর।
হুরররে! আই! হুররররহুইইই!
–মানে? মি. ডিজি জিজ্ঞেস করে।
–রাস্তার ঐ চিৎকার, স্টিফেন উত্তর দেয়, তার দুই কাঁধ ঝাঁকিয়ে।
মি. ডিজি নিচের দিকে তাকিয়ে তার নাকের দুই পাশ দুই আঙ্গুলের মাঝে ধরে ডলে। তারপর ডলা বন্ধ করে চোখ উপরে তোলে।
–তোমার চাইতে আমি অনেক সুখী, সে বলে। আমরা অনেক ভুল করেছি, অনেক পাপ করেছি। এক মেয়েমানুষ এই পৃথিবীতে পাপ এনেছে। কারণ সেই মেয়েমানুষের ভেতর কোনো ভালত্ব ছিলো না, হেলেন, মেনেলসের ভেগে যাওয়া স্ত্রী, গ্রীকরা দশ বছর যুদ্ধ করেছে ট্রয়ে। এক কূলটা স্ত্রীর কারণে আমাদের এই সমুদ্রের ধারে অচেনামানুষেরা প্রথম পা মাড়িয়েছিলো, ম্যাকমউরার স্ত্রী আর তার নাগর ও'রোরক, ব্রিফনির রাজকুমার। আর একজন মহিলাও পারনেলকে নিচে নামিয়েছিলো। অনেক ভুল হয়েছে, অনেক ব্যর্থতা রয়েছে, কিন্তু আমরা পাপ করিনি কোনো। আমার এই শেষ বয়সে আমি যদিও লড়ায়ে নেমেছি, কিন্তু ন্যায়ের জন্যে আমৃত্যু লড়াই করে যাব আমি।
For Ulster will fight
And Ulster will be right.
(কারণ আলস্টার তো লড়াই করবেই
এবং আলস্টার সঠিক কাজটি করবেই।)
স্টিফেন কাগজের পৃষ্ঠাগুলো হাতে তুলে নেয়।
–ঠিক আছে স্যার, সে শুরু করে।
–আমি স্পস্ট বুঝতে পারছি, মি. ডিজি বলে, তুমি এখানে এই কাজে বেশিদিন থাকবে না। শিক্ষক হবার জন্যে তোমার জন্ম হয়নি, আমি জানি। অবশ্য আমার ভুলও হতে পারে।
–বরং বলা যায় শিক্ষার্থী, স্টিফেন বলে।
এখানে আর বেশি কি শেখার আছে তোমার?
মি. ডিজি তার মাথা নাড়ে।
–কে বলতে পারে, বলো? সে বলে। শিখতে হলে বিনয়ী হওয়া জরুরি। কিন্তু তবুও জীবনই সবচাইতে বড় শিক্ষক।
স্টিফেন কাগজগুলো নিয়ে খসখস শব্দ করে।
–এগুলোর ব্যাপারে, সে শুরু করে।
–হ্যাঁ, মি. ডিজি বলে। ওখানে দুটো কপি আছে। তুমি যদি পারো তাড়াতাড়ি ওগুলো ছাপার ব্যাবস্থা করো।
টেলিগ্রাফ, আইরিশ হোমস্টিড।
–আমি চেষ্টা করবো, স্টিফেন বলে, কালকে আপনাকে সব জানাবো। দু'জন সম্পাদকের সাথে আমার সামান্য পরিচয় আছে।
–তাহলে তো হয়েই গেলো, মি. ডিজি দ্রুত বলে। গত রাতে আমি মি. ফিল্ড এম. পি.-কে লিখেছি। গবাদিপশু ব্যাবসায়ী সমিতির একটা মিটিং আছে সিটি আর্মস হোটেলে আজ। আমি তাকে বলেছি মিটিং-এর আগে চিঠিটা একবার পড়ে দেখতে। তুমি দেখো চিঠিটা দু'টো কাগজে ছাপাতে পারো কিনা। কোন-কোন কাগজের কথা ভাবছো?
–দ্য ইভিনিং টেলিগ্রাফ…
–ওতেই চলবে, মি. ডিজি বলে। সময় নষ্ট করার সময় হাতে একদম নেই। এখনি বসতে হবে আমার ওই চাচাতো ভাইয়ের চিঠির উত্তর লিখতে।
–শুভ সকাল, স্যার, স্টিফেন বলে, কাগজের পৃষ্ঠাগুলো পকেটে পুরতেপুরতে। ধন্যবাদ।
–মোটেও না, মি. ডিজি বলে তার ডেস্কের উপরে রাখা কাগজ হাতড়াতে-হাতড়াতে। তোমার সাথে আমার একটা বাহাস হওয়া দরকার, যদিও আমি বুড়ো হয়ে গেছি।
–শুভ সকাল, স্যার, স্টিফেন আবার বলে, তার ঘাড় নিচু করে।
সে খোলা পোর্চে বেরিয়ে আসে, গাছের নিচ দিয়ে কাঁকর বিছানো পথে হাঁটতে থাকে, খেলার মাঠ থেকে তার কানে ভেসে আসে উচ্চকন্ঠের চেঁচামেচি আর হকিস্টিকের খটখট শব্দ। থামাথামা পায়ের উপর শরীর রেখে মাথা উঁচু করে বসে থাকা সিংহসারি-রাস্তা হেঁটে সে গেট পার হয়; দাঁতহীন সন্ত্রাসীর দল। তবুও আমি তার লড়াইয়ে সাহায্য করবো। মুলিগান, যদিও জানি, আমাকে এক নতুন নামের খেতাব দেবে: বৃষবৎসল কবিয়াল।
–মি. ডেডোলাস!
আমার পেছনে দৌড়াচ্ছেই। আরো চিঠি নেই, আশা করি।
–শুধু এক মিনিট।
–হ্যাঁ, বলুন স্যার, স্টিফেন বলে, গেটের কাছে ঘুরে দাঁড়িয়ে।
মি. ডিজি দাঁড়িয়ে পড়ে, জোরে শ্বাস নেয় হাঁপাতে-হাঁপাতে।
–আমি শুধু বলতে চাচ্ছিলাম, সে বলে। আয়ারল্যান্ড, সবাই বলে, হলো একমাত্র সৌভাগ্যবান দেশ যে কখনোই ইহুদিদের উপর অত্যাচার করেনি। তুমি কি সেটা জানো? জানো না। আর তার কারণটা কি জানা আছে?
উজ্জ্বল আলোর নিচে সে প্রত্যাশী দৃষ্টিতে তার ভ্রু কোঁচকায়।
–কারণটা কী, স্যার? স্টিফেন জিজ্ঞেস করে মুখে হাসি ফুটিয়ে।
–কারণ আয়ারল্যান্ড এখানে কখনোই ওদের ঢুকতে দেয়নি, মি. ডিজি গম্ভীরভাবে বলে।
এক খুকখুক হাসি তার গলার ভেতর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসে তারপর শ্লেষ্মা জড়ানো দীর্ঘ ঘড়ঘড়ি দমক। সে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়, কাশে, হাসে, বাতাসে উদ্বাহু হয়ে।
–আয়ারল্যান্ড ওদের এখানে কখনোই ঢুকতে দেয়নি, হাসির দমকের ভেতর সে আবার উচ্চকন্ঠে উচ্চারণ করে তার হাঁটু থেকে পা পর্যন্ত পরা জুতো দিয়ে কাঁকর বিছানো পথের উপর সজোরে পদাঘাত করতেকরতে। সেটাই কারণে।
তার বিজ্ঞ কাঁধ পেরিয়ে গাছের ঝিলমিল পাতার ভেতর দিয়ে সূর্যটা চুমকি ছড়ায়, নৃত্যরত মুদ্রার মতো।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক