জেমস জয়েসের ধারাবাহিক উপন্যাস: ইউলেসিস-২

আবদুস সেলিম
Published : 18 July 2021, 07:19 AM
Updated : 18 July 2021, 07:19 AM

ইংরেজি মূল: জেমস জয়েস
বাংলা ভাষান্তর: আবদুস সেলিম

ভূমিকা
বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ দশটি উপন্যাসের তালিকায় অনিবার্যভাবে জেমস জয়েসের (১৮৮২-১৯৪১) ইউলেসিস অন্তর্ভুক্ত হয়ে আসছে আজ প্রায় একশত বছর ধরে—অর্থাৎ ১৯২২ সালে উপন্যাসটি প্রকাশ হবার পর থেকেই। কিন্তু একথাও সত্য এই উপন্যাসটি বিশ্বের দুর্বোধ্যতম উপন্যাস বলেই গণ্য হয়েছে শুধু অন্যান্য ভাষাভাষী পাঠকদের কাছেই নয়, স্বয়ং যে-ভাষাতে এ উপন্যাসটি রচিত সেই ইংরেজি ভাষাভাষীদের প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ পাঠকের কাছেও। এটি সর্বস্বীকৃতভাবে একটি অগম্য উপন্যাস। এমনকি লেখকের সমসাময়িক এবং স্বদেশী, বিখ্যাত কবি, উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসও (১৮৬৫-১৯৩৯)—দু'জনই আইরিশ—এই উপন্যাসটি পড়ে শেষ করতে পারেননি বলে কথিত আছে এর ভাষা, জটিল রচনাশৈলী, পরোক্ষ উল্লেখের (allusion) বাধাহীন পর্যাপ্ততা এবং সর্বোপরি লেখকের গল্প রচনার কৌশলী পদ্ধতি—যা সাহিত্য জগতে জয়সের এক অনন্য চারিত্র—যাকে আমরা চেতনা প্রবাহ বা stream of consciousness বলে জানি, এসব কিছুর কারণে। তবুও কেনো এ উপন্যাস এতো গুরুত্বপূর্ণ?

এর অন্যতম কারণ এই অসাধারণ উপন্যাসে একাধারে সংমিশ্রিত হয়েছে পুরাণ, প্রতীক, দর্শন, সামাজিক বাস্তবতা এবং সর্বোপরি মনুষ্যধর্ম। ফলে উপন্যাসটি সর্বঅর্থে আধুনিকতার প্রাজননিক সাহিত্যকর্ম, এটি বিশ্বসাহিত্যের সকল সীমারেখাকে অতিক্রম করে এক নতুন জানরার বা শিল্পরীতির জন্ম দিয়েছে। অনেক সাহিত্যামোদীই এই উপন্যাসকে চিহ্নিত করেছেন 'অননুকরণীয়, এবং অপ্রকৃতিস্থ' শিল্পকর্ম রূপে। প্রসঙ্গত সমসাময়িক আর এক কবি—যিনি জয়েসের মতোই পরোক্ষ উল্লেখের (allusion) প্রতি প্রায় অপ্রকৃতিস্থভাবে আকর্ষণ বোধ করতেন তাঁর কবিতা রচনাতে—সেই টমাস স্টার্ন এলিয়টের (১৮৮৮-১৯৬৫) ইউলেসিস সম্মন্ধে একটি বক্তব্য ছিলো এমন: আমি এই গ্রন্থটিকে বর্তমান সময়ের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অভিব্যাক্তি বলে গণ্য করি: এটি এমন একটি উপন্যাস যার প্রতি আমরা সবাই আকর্ণ ঋণী, যার প্রভাব থেকে আমাদের পরিত্রাণের কোনোই উপায় নেই।
সহজেই অনুমেয় এমন একটি উপন্যাসের অনুবাদ একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ—সে যে ভাষাতেই হোক। আমার জানা মতে ইউলেসিস বাংলাভাষাতে এপর্যন্ত অনূদিত হয়নি—আমি হলফ করে বলতে পারছিনা যদিও। এটি অনুবাদের যে প্রধান প্রতিকূলতা/প্রতিবন্ধকতা তার আভাস আমি ইতিমধ্যে দিয়েছি—জটিল রচনাশৈলী, পরোক্ষ উল্লেখের (allusion) বাধাহীন পর্যাপ্ততা এবং সর্বোপরি লেখকের গল্প রচনার নতুন পদ্ধতি—যা সাহিত্য জগতে জয়সের প্রায় একান্ত—যাকে আমরা চেতনা প্রবাহ বা stream of consciousness বলে জানি। যদিও আমার মনে পড়ে কমলকুমার মজুমদার (১৯৪১-১৯৭৯) চেতনা প্রবাহ নিরীক্ষায় তাঁর অন্তর্জলী যাত্রা উপন্যাস রচনাতে সচেষ্ট হয়েছিলেন, কারো কারো মতে ধুর্ঝটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও, কিন্তু সেই জানরা বাংলা সাহিত্যে কখনোই তেমন সচল হয়নি এবং এই রীতিতে ইউলেসিস-এর মতো সফল কোনো উপন্যাস বাংলাতে রচিতও হয় নি। উপন্যাসে যদিও ডরোথি রিচার্ডসন (১৮৭৩-১৯৫৭) প্রথম চেতনা-প্রবাহের ব্যাবহার করেন, কিন্তু জেমস জয়েসই এই ধারাটির অর্থপূর্ণ ব্যাবহার করেছেন তাঁর অধিকাংশ উপন্যাসে, বিশেষ করে আ পোর্ট্রেট অফ দ্যা আর্টিস্ট অ্যাজ এ ইয়াংম্যান এবং ইউলেসিস-এ।


ইউলেসিস অনুবাদের সংকটটা শুধুমাত্র চেতনা প্রবাহের ভেতরই সীমাবদ্ধ নয়—এর নানাবিধ সমস্যার মধ্যে অন্যতম, পরোক্ষ উল্লেখের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার যার ভেতর রয়েছে, রোমান ক্যাথোলিক এবং অ্যাপোস্টলিক চার্চের বাড়াবাড়ির সঙ্কট এবং বিভিন্ন খ্রিস্টিয় আচারআচরণের পারস্পরিক সংঘাত যা জয়েসের সময়ে বর্তমান ছিলো, এবং সর্বোপরি ইংল্যান্ড ও আইরিশ রাজনীতির জটিল অবিশ্বাস। এ বিষয়গুলোর সাথে আমি অনুবাদকালে আমাদের পাকিস্তান সময়কালের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমানের ধর্মীয় চিন্তাভাবনার ক্রমপরিবর্তণশীলতার অভাবনীয় সাযুজ্য দেখতে পেয়েছি। এটিই আসলে সেই উপরে বর্ণিত মনুষ্যধর্মের সাথে প্রচারিত ধর্মের সংঘাত।

উপন্যাসটি তিনটি মূল ভাগে ভাগ করা এবং সব মিলিয়ে মোট উনিশটি পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত—প্রথম ভাগে তিনটি, দ্বিতীয় ভাগে তেরোটি এবং তৃতীয় ভাগে তিনটি পরিচ্ছেদ রয়েছে। কিন্তু সবচাইতে উল্লেখ্য বিষয়টি হলো উপন্যাসের বিন্যাস হোমারের দ্যা ওডেসি মহাকাব্যের অনুকরণে। উনিশটি পরিচ্ছেদের বিষয়বস্তু হুবহু একই, যদিও উত্তরআধুনিকতাতে রূপান্তরিত। জেমস জয়েস একাধিক ভাষা জানতেন—লাতিন, ইতালিও, ফরাসি, জর্মন, এবং নরওয়েজিও। ফলে এই উপন্যাসে প্রতুল পরিমাণে বাইবেল, মূল ওডেসি, ইতালিও, লাতিন, এবং জর্মন উদ্ধৃতি রয়েছে যার অনুবাদ পরিপ্রেক্ষিত বিচারে সহজ নয়। শুধু তাই নয়, এই উদ্ধৃতিগুলোর সাথে ধর্মীয়, রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, দার্শনিক এবং গল্পের আনুক্রমিক সমঞ্জস অনুধাবন করে ভাষান্তর করা এবং ঐ ভাষার পাঠকের কাছে বোধগম্য করা সুকঠিন। বিশেষ, এটি এমন উপন্যাস যা খোদ ইংরেজি ভাষাভাষীর কাছেও সহজবোধ্য নয়। বাস্তবতা হলো, এই উপন্যাসের বিভিন্ন বিস্তৃত টিকাটিপ্পনি রয়েছে একাধিক খ্যাতিমান সাহিত্যানুরাগী এবং সমালোচকদের। আমার নিজের কাছেই এমন টিকাটিপ্পনির মুদ্রিত তিনশো পৃষ্ঠার গ্রন্থ আছে যা আমি অনুবাদে ব্যাবহার করছি। এরই সাথে আমাকে প্রতিটি লাইনের বিভিন্ন ভাষার উদ্ধৃতির ব্যাখ্যার জন্য ওয়েবপেজে যেতে হচ্ছে বারংবার।

আমি আশা করিনা আমার এই অনুবাদের পাঠকরা এইভাবে উপন্যাসটি পাঠ করবেন, অর্থাৎ টিকাটিপ্পনি এবং ওয়েবপেজ সংযোগে উপন্যাসটি বোঝার চেষ্টা করবেন। আমি যে পরিচ্ছেদটি বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম-এর আর্টস বিভাগে প্রকাশের জন্য দিয়েছি তার শিরোনাম টেলেমেকাস—যদিও জয়েস তাঁর মূল উপন্যাসে পরিচ্ছেদের কোনোটির নামকরণ করেন নি। আসলে তাঁর আখ্যানচারিত্র্য সহজেই ইঙ্গিত করে হোমারের ওডেসির আখ্যানরীতি ও নামকরণের দিকে। আমার এই অনুবাদ আর্টস বিভাগে প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য হলো এই সুকঠিন বিশাল মহাকাব্যিক উপন্যাসের (মুদ্রিত ৮০০ পৃষ্ঠা) অনুবাদ পাঠ-প্রতিক্রিয়া অনুধাবন করা এবং সেই সাথে বিদগ্ধ পাঠকদের কাছ থেকে মূল্যবান পরামর্শ গ্রহণ করা যা এই অনুবাদ গ্রন্থাকারে প্রকাশে (যদি অনুবাদ আমার জীবদ্দশাতে সম্পন্ন করতে পারি) সহায়ক হবে।
সবশেষে বলতে চাই, এই উপন্যাস জেমস জয়েস লেখার পরিকল্পনা করেছিলেন প্যারিসে ১৯০৬ সালে, ১৯১৯ সালে প্রথম পাঁচটি কিস্তি ধারাবাহিক ছাপা হয় 'ইগোইস্ট' পত্রিকাতে। পরবর্তীকালে ১৯২০ সালে এজরা পাউন্ড তাঁর 'লিটল রিভিউ' পত্রিকাতে তেরোটি পরিচ্ছেদ মুদ্রণ করেন। কিন্তু এ সময়ে ন্যু ইয়র্কের সোসাইটি অব প্রিভেনশন অব ভাইস যৌন অশ্লীলতার উপাদান থাকার অভিযোগে উপন্যাসটির মুদ্রণ নিষিদ্ধ করে। ফলে জয়েসকে বেশ হেনস্তার শিকার হতে হয়। ইউলেসিস পরিপূর্ণ উপন্যাসাকারে মুদ্রিত হয় সেই প্যারিসেই ১৯২২ সালে। আমার অনুবাদ চলমান, এবং এই অনূদিত উপন্যাসের কিস্তি রূপে প্রকাশিত হতে থাকবে যদিও ধারাবাহিক রূপে নয়—অংশবিশেষ, তবে প্রতিটি কিস্তির স্বয়ংসম্পূর্ণ আদল ও অর্থসহ।
আশা করি বিদ্যান পাঠককূল তাদের বিজ্ঞ প্রতিক্রিয়া দিয়ে আমাকে এই অনুবাদে সাহায্য করবেন, কারণ আমি মনে করি এই অনুবাদ আমাদের বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকদের রচনাশৈলীকে সমৃদ্ধ করতে সহায়ক হতে পারে। উল্লেখ্য, উপন্যাসের মূল আখ্যানশৈলী (narrative style) যতটা সম্ভব অপরিবর্তিত রাখার চেষ্টা করেছি বাংলাভাষার সার্বিক বোধগম্যতা ও গ্রহণক্ষমতাকে ব্যবহার করে। যে-কোনো পরামর্শ থাকলে এই লেখার নিচে মন্তব্যের ঘরে অথবা অনুবাদককে সরাসরি ইমেইলেও জানাতে পারেন: selimminubd@gmail.com

দরজাতে একটা অবয়বের প্রবেশ-ছায়া পড়ে।
–দুধ, স্যার।
–ভেতরে চলে আসুন, মুলিগান বলে। কিঞ্চ, জগটা আনো।
একজন বয়স্কা মহিলা এগিয়ে এসে স্টিফেনের কনুই বরাবর দাঁড়ায়।
–সকালটা কিন্তু চমৎকার, স্যার, মহিলা বলে। সবই ঈশ্বরের করুণা।
–করুণাটা কার জন্যে? মুলিগান বলে, মহিলার দিকে তাকিয়ে। মানে, নিশ্চিন্ত হতে চাচ্ছিলাম।
স্টিফেন পেছনে যেয়ে লকার থেকে একটা দুধের জগ নেবে।
–এই দ্বীপের মানুষরা, মুলিগান হাইয়েন্সকে বলে, প্রায়ই খৎনার কথা আলোচনা করে।
–কতটা দেবো, স্যার? জিজ্ঞেস করে বয়স্কা মহিলা।
–এক কোয়ার্ট, স্টিফেন বলে।
সে মহিলার মাপপাত্র দিয়ে দুধ মাপা এবং সেই বিশুদ্ধ সাদা দুধ জগে ঢালা লক্ষ্য করতে থাকে, যে দুধ ওই মহিলার নয়। বয়সের ভারে শুকনো স্তনের বোঁটা। মহিলা সঠিক মাপে ফাউসহ আবার ঢালে। অতীতে এবং গোপনে ওই মহিলা অবতীর্ণ হয়েছিলো কোনো এক প্রদোষ-পৃথিবী থেকে, যেন চিরন্তন বাণীবাহক। মহিলা তার দুধের গুণাগুণ বর্ণনা করে, দুধ ঢালতে ঢালতে। শ্যামল প্রান্তরে কিভাবে দিনশুরুতে সুশীল গাভীর পাশে ঘাড় গুঁজে, ডাইনীর মতো ব্যাঙের ছাতার টুলে বসে, তার জীর্ণ আঙ্গুল দিয়ে টেনেটেনে দ্রুত চুষে বের করে তরল। গাভিগুলো ওদের চেনা ঐ মহিলার চারপাশে হাম্বাহাম্বা করে, যেন তুষাররেশমি গৃহপালিত পশু সব। বেচারি সাদাসিধে গৃহপালিত বৃদ্ধা মহিলা, সেই আদিকাল থেকে এনামেই তার পরিচয়। এক বিগতযৌবনা যাযাবর, বিজেতা আর বিশ্বাসঘাতকদের আজ্ঞাবহ নিম্নমানের প্রাণী, তাদের পরিচিত লম্পট স্বামীর স্ত্রী, সঙ্গোপন প্রভাতের আবির্ভাব। সেবা করা না শাসন করা, কোনটা ঠিক, তার জানা নেই: কিন্তু মহিলার করুণা ভিক্ষায় তার রয়েছে তাচ্ছিল্য:
–একদম খাঁটি কথা বলেছেন, বাখ মুলিগান বলে, তাদের কাপে দুধ ঢালতেঢালতে।
–খেয়ে দেখেন, স্যার, মহিলা বলে।
তার কথা মতো সে চুমুক দেয়।
–এমন পুষ্টিকর খাবার খেয়ে যদি জীবনটা কাটাতে পারতাম, সে তাকে কিছুটা জোর দিয়ে বলে, তাহলে দেশ ভর্তি পোকা খাওয়া দাঁত আর বদহজম থেকে বাঁচতাম। থাকি খানাখন্দে, খাই সস্তা খাবার, রাস্তাঘাট ধুলায় ভরা, চারদিকে ঘোড়ার নাদ আর যক্ষ্মার কাশ-থুতু।
–আপনি কি ডাক্তারি পড়েন, স্যার? বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করে।
–ঠিক ধরেছেন, বাখ মুলিগান উত্তর দেয়।
স্টিফেন নিঃশব্দে বিরক্তির সাথে কথাগুলো শোনে। মহিলা, তাকে বলা ঐ উচ্চমার্গের কন্ঠস্বরের কাছে বয়স্ক মাথাটা নোয়ায়, হাজার হলেও তার হাড়ের চিকিৎসক, তার যাদুকরী রোগ নিরাময়ক; আমাকে সে পদবাচ্যই মনে করেনা। এই কন্ঠস্বর তার সকল দেহমন নিয়ে কবরের স্বীকারোক্তিতে আর শুদ্ধিময় প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে কেবলমাত্র রমণীর অশৌচ কটিদ্বয় ছাড়া, পুরুষের রক্তমাংস থেকে যে অংশ ঈশ্বরের অপছন্দের সৃষ্টি, যে অংশ আসলে কালকেউটের শিকার। এরই মাঝে আর এক উচ্চকন্ঠের স্বর, বর্তমানে তাকে বিরত করে বাক্যালাপে, তার চোখেমুখে দেখা দেয় বিস্ময়।
–আপনি বুঝতে পারছেন উনি আপনাকে কি বলছেন? স্টিফেন মহিলাকে জিজ্ঞেস করে।
–আপনি কি ফরাসি ভাষাতে কথা বলছেন, স্যার? বৃদ্ধা হাইয়েন্সকে জিজ্ঞেস করে।
হাইয়েন্স আবার তার উদ্দেশ্যে এক দীর্ঘ বাক্যবাণ নিক্ষেপ করে, আত্মবিশ্বাসের সাথে।
–আইরিশ, বাখ মুলিগান বলে। আপনি গেইলিক ভাষা বোঝেন?
–আমিও ভাবছিলাম আইরিশ, মহিলা বলে, মানে শব্দে তাই মনে হচ্ছিলো বটে। আপনার বাড়ি কি পশ্চিমে, স্যার?
–আমি ইংরেজ, হাইয়েন্স উত্তর দেয়।
–উনি ইংরেজ, বাখ মুলিগান বলে, উনি ভাবেন আইয়ারল্যান্ডে আমাদের সবারই আইরিশে কথা বলা উচিৎ।
–অবশ্যই বলা উচিৎ, বৃদ্ধা বলে, আমি নিজে বলতে পারিনা দেখে আমার ভীষণ লজ্জা লাগছে। যারা জানে তারা সবাই বলে ভাষাটা ভীষণ দামী।
–দামী বল্লে ঠিক হয় না, বলে বাখ মুলিগান। আগাপাছতলা অপুর্ব। অরও একটু চা ঢালো, কিঞ্চ। আপনি এক কাপ চা খাবেন?
–না, ধন্যবাদ, স্যার, বৃদ্ধা মহিলা বলে, দুধের পাত্রের গলুইটা সে তার বগলের নিচে চালান করে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়।
হাইয়েন্স তাকে বলে:
–আপনার পাওনা মেটানো হয়েছে? আমরা ওর পাওনাটা বরং দিয়ে দিই, মুলিগান, কি বলো?
স্টিফেন আবার তিনটে কাপেই চা ঢালে।
–পাওনা, স্যার? মহিলা ফিরে দাঁড়িয়ে বলে। হিসাবটা, সাত সকাল এক পাইট করে, দুই পেন্স প্রতি পাইট হলে হয় এক শিলিং দুই পেন্স, যেটা আগের বাকি। আর এই তিন সকাল এক কোয়ার্ট করে, চার পেন্স প্রতি কোয়ার্ট, তাতে হয় এক শিলিং, তাহলে সব মিলিয়ে দাঁড়ায় দুই শিলিং দুই পেন্স, স্যার।
বাখ মুলিগান এক লম্বা শ্বাস নেয়, তার মুখে তখন দুধারে পুরু করে মাখন মাখা মচমচে পাউরুটির টুকরো। সে তার দু'পা সামনে সোজা করে মেলে ধরে তার প্যান্টের পকেট হাতড়াতে থাকে।
–পাওনা শোধ করে ভার মুক্ত হও, হাইয়েন্স মৃদু হেসে তাকে বলে।
স্টিফেন তৃতীয় কাপ চা ঢালে, একটা চামুচে চা তুলে দেখে দুধের ঘন ননীর সাথে মিশে চায়ের রংটা কেমন হাল্কা হয়ে উঠেছে। বাখ মুলিগান পকেট থেকে এক ফ্লরিন বের করে আঙ্গুল দিয়ে উল্টেপাল্টে দেখে চেঁচিয়ে উঠে:
–রীতিমত অলৌকিক ব্যাপার!
সে মুদ্রাটা টেবিলের উপর রেখে বৃদ্ধার দিকে ঠেলে দিয়ে বলে:
–আর দিতে পারবো না, লক্ষ্মী সোনা। যা পারলাম আপাতত তাই দিলাম।
স্টিফেন মুদ্রাটা মহিলার অনাগ্রহী হাতে তুলে দেয়।
–আমাদের আর বাকি থাকলো দুই পেন্স, সে বলে।
–পরে দিলেও হবে, স্যার, মহিলা বলে, মুদ্রাটা নিতে নিতে। তাড়া নেই। শুভসকাল, স্যার।
সে সম্ভ্রমের সাথে বিদায় নেয় আর সেই সাথে মুলিগানের সূক্ষ্ম সুর শোনা যায়:
–আমার হৃদয়পদ্ম তুমি, থাকতো যদি আরো বেশি,
দিতাম আমি পদপদ্মে তোমার উজাড় করে ঢালি।
সে স্টিফেনের দিকে চেয়ে বলে:
–তোমাকে সত্যি বলছি, ডেডোলাস, আমার হাত একদম খালি। তুমি জলদি ওই স্কুলের মাস্টারি থেকে কিছু টাকাপয়সা নিয়ে এসো। আজ এই কবিকুলদের পানাহার জরুরি হয়ে গেছে। আইয়ারল্যান্ড আশা করে আজ প্রতিটা মানুষ তাদের করণীয় কাজ ঠিকঠাক মতো করবে।
–এই কথায় মনে পড়লো, উঠে দাঁড়িয়ে হাইয়েন্স বলে, আমার আজ তোমাদের জাতীয় লাইব্রেরীটা দেখতে যাবার কথা।
–আমাদের সবার আগে সাঁতার কাটতে যেতে হবে, বাখ মুলিগান বলে।
সে স্টিফেনের দিকে তাকিয় মিষ্টি স্বরে জিজ্ঞেস করে:
–আজ তোমার মাসিক ধোয়াধুয়ির দিন না, কিঞ্চ?
এরপর সে হাইয়েন্সকে বলে:
–নোংরা কবিআল মাসে একবার ধোয়াধুয়ির দিন ঠিক করে রেখেছে।
–পুরো আইয়ারল্যান্ডের ধোঁয়ামোছা হয় উপসাগরের পানিতে, স্টিফেন পাউরুটির টুকরোর উপর মধু ছিটাতে ছিটাতে বলে।
হাইয়েন্স কোনায় দাঁড়িয়ে তার টেনিস সার্টের খোলা কলারে স্বছন্দে স্কার্ফের গিঠ বাঁধতে বাঁধতে কথা বলে:
–আমি ভাবছি তোমার লেখালেখি নিয়ে একটা সঙ্কলন করবো তুমি যদি সাহায্য করো।
আমাকে বলছে। ওরা ধোয় আর গোসল করায় আর কচলায়। বিবেকের দংশন। বিবেক। তবুও দাগ একটা থেকেই যায়।
–ঐ যে চাকরের চিড়খাওয়া আয়নাকে আইরিশ শিল্পকলার প্রতীক হিসেবে দেখা, অভিনব একটা ব্যাপার।
বাখ মুলিগান টেবিলের নিচে স্টিফেনের পায়ে একটা লাথি দিয়ে বেশ ঘনিষ্ঠ স্বরে বলে:
–তাও তো হ্যামলেট নিয়ে ওর কথা এখনো শোনোই নি, হাইয়েন্স।
–আমি কিন্তু সত্যি বলছি, হাইয়েন্স আবারও স্টিফেনকে বলে। ভাবনাটা মাথায় এলো ঠিক যখন ঐ বেচারি দুধওয়ালি ঘরে ঢুকলো।
–এতে কি আমার পয়সাকড়ির কোনো ফায়দা হবে? স্টিফেন জিজ্ঞেস করে।
হাইয়েন্স হেসে ওঠে হ্যামকের মাথায় গোঁজা তার নরম বাদামী হ্যাটটা নিতে নিতে বলে:
–আমি ঠিক জানি না, সে কথা নিশ্চয় করে বলতে পারি।
সে হেঁটে খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। বাখ মুলিগান স্টিফেনের দিকে ঝুঁকে বুনো তেজি কন্ঠে বলে ওঠে:
–প্যাঁচ তো লাগায়ে দিলা! ঐ কথা বলার কি দরকারটা ছিলো?
–মানে? বলে স্টিফেন। সমস্যাটা তো টাকাপয়সাই। কার কাছ থেকে কে পাচ্ছে সেটা তো কথা নয়, তাই না? দুধওয়ালির কাছ থেকেই পাই কিম্বা ওর কাছ থেকে। ব্যাপারটা বাজি জেতার মতো, অন্তত আমার কাছে।
–আমি ওকে তোমার কথা অনেক বলেছি, বাখ মুলিগান বলে, আর এখন তুমি তোমার লোল-পড়া লোভ আর কাওলা পুরোহিতের ক্যারিকেচার নিয়ে হাজির।
–কারো কাছ থেকেই আমি কিছু আশা করিনা, স্টিফেন বলে, না ঐ মহিলার কাছে, না ওর কাছ।
বাখ মুলিগানের বিষণ্ণ দীর্ঘশ্বাস, তারপর স্টিফেনের বাহুতে হাত রাখে।
–আমার কাছে করতে পারো, কিঞ্চ, সে বলে।
হঠাৎ কন্ঠস্বর পাল্টে সে যোগ করে:
–কিরে কেটে সত্যি বলি, তুমি ঠিকই বলেছো। ওরা কেউই কোনো কাজে আসবে না। আমি ওদের যেভাবে খেলাই তুমিও কেনো তাই করো না? জাহান্নামে যাক সব। নিজের কাজে মন দেই বরং।
সে উঠে দাঁড়ায়, রাশভারী ভঙ্গিতে বাঁধন ঢিলা করে তার গাউনটা শরীর থেকে খুলে রাখে, তারপর দৃঢ়তার সাথে বলে:
–মুলিগানের শরীর থেকে বস্ত্র উন্মোচিত হয়েছে।
সে তার পকেট খালি করে টেবিলে রাখে।
–এই থাকলো তোমার শিকনিঝাড়ার কাপড়, সে বলে।
সে শক্ত কলার আর তার জাহির করা টাই পরতে পরতে সেগুলোর সাথে কথা বলে চলে, বকা দেয়, ঝুলন্ত ঘড়ির চেনের সাথে বিরক্তি প্রকাশ করে। দুহাত সে তার সারা শরীরে ঢোকায়, হাতড়ায়, একটা পরিষ্কার রুমাল খোঁজে। বিবেকের দংশন। ঈশ্বর, সবারই নিজের চরিত্রের সাথে মিলিয়ে পোশাক পরা উচিৎ। আমার দরকার খয়েরি লাল দস্তানা আর সবুজ একজোড়া বুট। স্ববিরোধিতা। আমি কি নিজের সাথে নিজে বিরোধিতা করি? ঠিক আছে করি, নিজের বিরোধিতা নিজেই করি। সদাপরিবর্তনশীল (মারকিউরিয়াল) মালুকি। তার আলাপরত হাত একটা দোমড়ানো কালো মিসাইল ছুঁড়ে দেয়।
–আর এই তোমার ল্যাটিন কোয়ার্টার হ্যাট, সে বলে।
স্টিফেন ওটা তুলে মাথায় পরে। দরজার কাছ থেকে হাইয়েন্স ডাক দেয়:
–তোমরা কি আসবা, মিয়ারা?
–আমি তৈরি, বাখ মুলিগান উত্তর দেয়, দরজার দিকে যেতে যেতে। এসো কিঞ্চ। আমরা যা কিছু খাবার রেখেছিলাম টেবিলে সবই তো সাবাড় করেছো বলে মনে হচ্ছে। উদাসীনভাবে রাশভারী শব্দগুলো উচ্চারণ করে দ্রুত বেরিয়ে যেতে যেতে প্রায় বিষণ্ণ কন্ঠে সে বলে:
–এবং সেখানে যেতেই তার সাথে প্রজাপতির সাক্ষাৎ।
স্টিফেন, তার দেয়ালে হেলান দিয়ে রাখা হাঁটার ছড়িটা তুলে নিয়ে ওদের পেছনপেছন রওনা দেয়, সবাই মই দিয়ে নিচে নামে, মন্থর লোহার গেট টেনে খুলে বেরিয়ে এসে তালা দিয়ে বন্ধ করে। সে বিশাল চাবিটা তার ভেতরের পকেটে পোড়ে।
মইয়ের নিচে দাঁড়িয়ে বাখ মুলিগান জিজ্ঞেস করে:
–চাবিটা এনেছো?
–আমার কাছে, স্টিফেন বলে, তাদের আগে আগে যেতে যেতে।
সে এগুতে থাকে। পেছনে শুনতে পায় বাখ মুলিগান তার ভারি তোয়ালে দিয়ে ফার্ন কিম্বা ঘাসের মাথাউঁচু বড় বড় ডগাগুলো বাড়াচ্ছে।
–মাথা নিচু, মশাই। এতো বড় সাহস, মশাই?
হাইয়েন্স জিজ্ঞেস করে:
–দূর্গটার জন্যে ভাড়া দিতে হয় নাকি?
–বারো পাউন্ড, বাখ মুলিগান উত্তরে বলে।
–সরকারের যুদ্ধমন্ত্রীকে, স্টিফেন ঘাড় ফিরিয়ে যোগ করে।
সবাই থামে, সেই ফাঁকে হাইয়েন্স দূর্গটা ভালো করে জরিপ করে এবং শেষে বলে:
–শীতকালে বেশ বিষণ্ণ দেখায়, মনে হচ্ছে। তোমরা তো মারটেলো বলো, তাই না?
–বিলি পিট বানিয়েছিলো, বাখ মুলিগান জানায়, যখন ফরাসিরা সমুদ্র থেকে আক্রমণ চালায়। কিন্তু আমাদের কাছে omphalos—পৃথিবীর নাভীমূল।
–হ্যামলেট নিয়ে তোমার কিসব যেনো গবেষণা আছে? স্টিফেনকে জিজ্ঞেস করে হাইয়েন্স।
–না, না, বাখ মুলিগান আর্তনাদ করে চেঁচিয়ে ওঠে। আমি টমাস একুয়াইনেসের মতো জ্ঞানী নই, যে বায়ান্নটা যুক্তি নিয়ে সব সময়ই খাড়া। এক পাইট বিয়ার পেটে পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
সে স্টিফেনের দিকে ফিরে কথাগুলো বলতেবলতে তার বাসন্তী রঙ্গের ওয়েস্টকোটটা গা থেকে পরিপাটি করে খুলে ফেলে:
–তুমিও তো তিন পাইটের আগে তৈরি হতে পারবে না, কিঞ্চ, তাই না?
–এতোদিন যখন অপেক্ষা করতে পেরেছি, হতোদ্দম স্টিফেন বলে, আরো কিছুদিনও পারবো।
–তুমি আমার কৌতূহল বাড়িয়ে দিচ্ছ, হাইয়েন্স অমায়িকভাবে বলে। ব্যাপারটা কি সময়ের কূটাভাস নিয়ে?
–ফুহ! বাখ মুলিগান বলে। আমরা উইয়াল্ড আর কূটাভাসের যুগ পার করে এসেছি। ব্যাপারটা খুব সহজ। ও অ্যালজেব্রা দিয়ে প্রমাণ করেছে যে হ্যামলেটের নাতী সেক্সপিয়রের দাদা আর ও স্বয়ং তার নিজের বাবার প্রেতাত্মা।
–মানে? হাইয়েন্স বলে, স্টিফেনের দিকে ইঙ্গিত করতে করতে। ও স্বয়ং?
বাখ মুলিগান তোয়ালেটা চাদরের মতো করে তার ঘাড়ে ঝোলায়, তারপর হাসিতে ভেঙ্গে পড়ে স্টিফেনের কানেকানে বলে:
–ওহ, কিঞ্চের বাপ কিঞ্চ! বাপের খোঁজে জাফেথ!
–সকালে আমরা সবাই বেশ ক্লান্ত থাকি, স্টিফেন বলে হাইয়েন্সকে। আর তা ছাড়া ব্যাপারটা বলতে অনেক লম্বা সময় লাগবে।
বাখ মুলিগান, আবার সামনের দিকে এগিয়ে তার দু'হাত তোলে:
–একমাত্র পবিত্র পাইট ডেডোলাসের জিভের আড়ষ্টতা ভাংতে পারে, সে বলে।
–আমি বলতে চাচ্ছিলাম, যেতেযেতে হাইয়েন্স স্টিফেনকে ব্যাখ্যা করে, এই দূর্গটা আর পাহাড়গুলো কেনো জানি কোনো না কোনোভাবে আমাকে এলসিনরের কথা মনে করিয়ে দেয়। মানে That beetles o'er his base into the sea,আতঙ্কজনক খাড়াপাহাড় পানির উপরে ঝুলে আছে, ঠিক না?
বাখ মুলিগান হঠাৎ এক মুহূর্তের জন্যে স্টিফেনের দিকে ঘোরে কিন্তু কোনো কথা বলে না। সেই উজ্জ্বল নিঃশব্দ মুহূর্তে স্টিফেন দেখতে পায় তার নিজের প্রতিকৃতি সস্তা ধূলিধুসর শোকার্ত কালো কাপড়ে মোড়া, তাদের নিজ নিজ উচ্ছল পোশাকের ভেতরও।
–গল্পটা দারুণ, হাইয়েন্স বলে, সবাইকে আবার থামিয়ে দিয়ে।
চোখগুলো ম্লান, যেমন সাগরের সুবাতাস ম্লান করে তোলে, ম্লানতর করে, টানটান, সতর্ক করে। সাগরের নিয়ন্ত্রক, সে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দক্ষিণের পোতাশ্রয়ের দিকে, চারদিকে শূন্যতা, শুধু ডাকজাহাজের ধোঁয়ার কেতন ছাড়া, উজ্জ্বল দিগন্তরেখায় নিঃসঙ্গতা, ছোটোছোটো মাগলিন দ্বীপগুলো থেকে পালে বাতাস লাগে।
–আমি কোথাই যেন এর একটা ধর্মত্বাত্তিক ব্যাখ্যা পড়েছিলাম, তার বিমূঢ় বক্তব্য। পিতা আর পুত্রের ধারণা। পুত্র পিতার প্রতি অবিচারের প্রতিকারে বদ্ধপরিকর।

বাখ মুলিগান সঙ্গেসঙ্গে তার মুখে এক বিগলিত হাসি ফোটায়। দুজনের দিকে তাকায়, তার সুগঠিত ঠোঁট জোড়া আনন্দ আবেশে খোলা, চোখদুটো, যার ভেতর থেকে অকস্মাৎ তার সব ধুর্তামি উধাও হয়ে অকাতর উৎফুল্লতার ঝিলিক দেয়। সে তার মাথা পুতুলের মতো সামনে-পেছনে নাড়ায়, তার পানামা হ্যাটের প্রান্তভাগ কাঁপে। মুলিগান সে অবস্থাতে তার বেকুবি সুরে গাইতে শুরু করে:
–আমি যে এক বেখাপ্পা যুবক জব্বর।
আমার মা ইহুদী, বাবা যে ভাই আকাশে ওড়া খেচর।
জোসেফ মিসতিরির সাথে আমি একমত নই,
ভরসা আমার তালবিলিম আর ঘোড়সওয়ারে, জানেন সবাই।

সে তার তর্জনি তুলে সতর্ক করে:
-ভাবে যদি কেউ আমার দৈবগুণ নাই
দেখি, আমার সোমরসে সে কেমনে ভাগ চায়
পানি পানই হবে যে তার ভাগ্যের লিখন
বদলে দেবো মদকে ভাই সাদা পানির মতোন।

সে স্টিফেনের ছড়িটাতে একটা বিদায়ী হেঁচকানি দেয়, এবং সামনে পাহাড়ের এক খাঁজের দিকে দৌড়ে তার দু'হাত মাছের বা পাখির ডানার মতো দু'দিকে মেলে ধরে বাতাসে ওড়ার ভঙ্গি করে, সেই সাথে স্তব করে:
–বিদায়, এবারে, বিদায়। আমি বলেছি যাকিছু, রেখো লিখে
টম, ডিক, হ্যারি, সবাইকে বোলো আমার উত্থান মৃত্যু থেকে।
আমার অন্তর্গত অস্থির লালন আমাকে শূন্যে ওড়াবে নিশ্চয়
আলেভেটে সদাই বাতাস ধীরে বয় . . . বিদায়, এবারে, বিদায়।

তাদের দু'জনের সামনে সে ফরটিফুটের গহ্বরের দিকে নাচতেনাচতে এগোয়, ডানার মতো দু'হাত দু'দিকে ঝাপটিয়ে চঞ্চল লাফায়, তার মারকিউরি হ্যাট সতেজ বাতাসে কাঁপে আর সেই সাথে তাদের কানে পাখির ডাকের মতো শব্দ বয়ে আনে।

হাইয়েন্স পুরো সময়টাতে সতর্ক হাসে, স্টিফেনের সাথেসাথে হাঁটতেহাঁটতে বলে:
–আমার মনে হয় আমাদের হাসা উচিৎ না। ও ঈশ্বরবিরোধী। বলতে কি আমিও ধর্মে বিশ্বাস করিনা। কিন্তু তবুও ওর কাজকারবার একটু বাড়াবাড়িই মনে হয়, তাই না? কি জানি বলছিলো তখন? জোসেফ মিস্তিরি না কি?
–হ্যাঁ, যিশুকে নিয়ে ব্যাঙ্গকাব্য, স্টিফেন উত্তর দেয়।
–ও, হাইয়েন্স বলে, তুমি আগে শুনেছো কবিতাটা?
–দিনে তিনবার, খাবার পর, শুকনো কন্ঠে স্টিফেন বলে।
–তুমিও তো ঈশ্বরে বিশ্বাস করোনা, কর? হাইয়েন্স জিজ্ঞেস করে। মানে বিশ্বাস বলতে সংকীর্ণ অর্থে বলছি। শূন্য থেকে সৃষ্টি, অলৌকিকতা, কিম্বা নিজের একান্ত ঈশ্বর—ঐসব আর কি।
–আমার কাছে মনে হয় ঐ শব্দের একটাই অর্থ, স্টিফেন বলে।
হাইয়েন্স থামে, একটা মসৃণ রূপোর কৌটো বের করে। কৌটোটার উপর একটা সবুজ পাথর চকচক করছে। সে বুড়ো আঙ্গুলের চাপ দিয়ে কৌটোটা খুলে এগিয়ে দেয়।
–ধন্যবাদ, স্টিফেন বলে, একটা সিগারেট তুলে নিয়ে।
হাইয়েন্স নিজেও একটা নেয় তারপর শব্দ করে কৌটোটা বন্ধ করে। তারপর সেটা আবার তার পাশপকেটে ঢুকিয়ে রাখে, ওয়েস্টকোট থেকে একটা নিকেলের চকমকি বাক্স বের করে, টেনে খোলে, তার নিজের সিগারেট ধরিয়ে আগুনের শিখাটা তার হাত দিয়ে ঢেকে স্টিফেনের দিকে এগিয়ে ধরে।
–হ্যাঁ, অবশ্যই, সে বলে, দু'জনে আবার চলতেচলতে। হয় বিশ্বাস করবে, না হয় করবে না, তাই না? ব্যাক্তিগত ভাবে আমি ঐ নিজের একান্ত ঈশ্বরের বিষয়টা একদমই হজম করতে পারিনা। তুমিও ব্যাপারটার পক্ষে নয় নিশ্চয়, তাই না?
–আপনি কি আমার ভেতর এক, স্টিফেন গভীর অসন্তোষের সুরে বলে, জঘন্য মুক্ত চিন্তার উদাহরণ দেখতে পান?
সে হাটতে থাকে উত্তরের অপেক্ষায়, ছড়িটা হাতে টানতেটানতে। রাস্তার উপর তার জুতোর হিলের সাথে ছড়ির আংটার আর্তস্বর আলতো অনুসরণ করে। আমার অনেক চেনা, আমাকে ডাকে। স্টিইইইইইইইইইইইফেন। রাস্তা জুড়ে দ্বিধাবিভক্ত রেখা। ওরা রাতভর এভাবে হেঁটে যাবে, পৌঁছে যাবে এখানে, এই অন্ধকারে। ওর কাঙ্খা আকাশের। আমার ভাড়া মেটাবার সময় হয়ে গেছে। এখন আমি ওর নুন খাই। ওকে চাবিটাও দিয়ে দাও। সব, সবগুলো। ও সব চায়। ওর চোখে তারই ইশারা।
–আসলে, হাইয়েন্স শুরু করে . . .
স্টিফেন ফিরে তাকিয়ে দেখতে পায় তাকে পরিমাপ করা ওই শীতল চাউনিটা সবটাই অকরুণ নয়।
–আসলে, আমার মনে হয় তোমার নিজেকে স্বাধীন করার ক্ষমতা আছে। তুমিই তোমার মনিব। আমি তাই মনে করি।
–আমি আসলে দুই মনিবের চাকর, স্টিফেন বলে, এক ইংরেজ আর এক ইতালীয়র।
–ইতালীয়র? হাইয়েন্স বলে।
এক পাগলি রানী, বুড়ি আর হিংসুটে। আমার সামনে হাটুমুড়ে বোসো।
–আর তৃতীয় জন হলো, স্টিফেন বলে, আমাকে যে মান্ধাত্তার আমলের চাকরি দিতে চায়।
–কিন্তু ইতালীয়? হাইয়েন্স আবার বলে। ওটার মানে কি?
–রাজাধিরাজ ব্রিটিশ রাষ্ট্র, স্টিফেন উত্তর দেয়, তার পতাকার রং ক্রমবর্ধমান, আর পবিত্র রোমান ক্যাথলিক এবং অ্যাপোস্টোলিক গির্জা।
হাইয়েন্স কথা বলার আগে তার নিচের ঠোঁট থেকে তামাকের কয়েকটা টুকরো সরায়।
–আমি সেটা বেশ বুঝতে পারি, সে শান্ত কন্ঠে বলে। একজন আইরিশ মানুষের এমনটাই ভাবা উচিৎ, আমি সে কথা মানি। আমরা ইংল্যান্ডে বুঝতে পারি তোমাদের সাথে আমরা বেশ অন্যায় ব্যাবহারই করেছি। আসলে মনে হয় এর জন্যে ইতিহাসই দায়ী।

স্টিফেনের স্মৃতিতে এক অকাট্য গর্বের পদবি সরবে উচ্চগ্রাম—পিতলের ঘন্টার বিজয় নিনাদ: et unam sanctam catholicam et apostolicam ecclesiam: এক অভিন্ন পবিত্র ক্যাথলিক, অ্যাপস্টোলিক গির্জাতে: তার অস্বাভাবিক চিন্তার মতো, ভাগ্যচক্রের এক রসায়নের মতো, আচারআচরণ এবং ধর্মমতের মন্থর ক্রমবৃদ্ধি এবং পরিবর্তন। পোপ মারসেলসের পক্ষে যিশুর স্তোত্রবাণী প্রচারের যে প্রতীক, সেই স্তোত্রসুরের সাথে মিলিয়ে, একাএকা উচ্চনাদে স্বেচ্ছায় গেয়ে ওঠা: আর তাদের সেই স্তোত্রপাঠের পশ্চাতে গির্জার অতন্দ্র জঙ্গি দেবদূতরা নিরস্ত্র এবং সন্ত্রস্ত করে বিপথগামীদের। অপর একদঙ্গল বিপথগামী বিশপের চোখা টুপি ভুলভাবে মাথায় দিয়ে পলায়নপর: ফটিয়স আর তার উপহাসকারীর সন্তানসন্ততি, যার একজন ঐ মুলিগান স্বয়ং, এবং আরিয়াস, জীবনভর পুত্র আর পিতার ঐশ্বরিক সামঞ্জস নিয়ে লড়াই করেছে, এবং ভ্যালেন্টাইনও, খ্রিস্টের মাটির শরীর থেকে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, এবং আফ্রিকার বিপথী সাবেলিয়াস বিশ্বাস করেছে পিতা স্বয়ং তারই নিজ পুত্র। এই কথাগুলোই মুলিগান কিছু আগে পরিহাস করে উচ্চারণ করেছে আগন্তুকের কাছে। অকর্মণ্য পরিহাস। শূন্য বাতাসে যারা অলস পরিহাস বুনে চলে তাদের জন্যে শূন্যই অপেক্ষা করে: এক ভীতি, গির্জার সেই সব যুদ্ধংদেহী দেবদূতদের দ্বারা নিরস্ত্রীকরণ এবং পরাজয়, মাইকেলের অনুসারি, সঙ্কট সময়ে সদাই তাদের ঢাল তলোয়ার নিয়ে রক্ষা করে দেশমাতৃকাকে।
কি দারুণ বয়ান। লম্বা হাততালি। Zut! Nom de Dieu! জাহান্নামে যাও! অপদার্থের দল!
–আমি অবশ্যই ব্রিটিশ, হাইয়েন্সের কন্ঠস্বর শোনা যায়, আমি মনেপ্রাণেই তাই। আমি আমার দেশকে জর্মনদের কিম্বা ইহুদিদের হাতে চলে যাওয়া দেখতে চাইনা। এটা আমদের জাতীয় সমস্যা, দুঃখজনকভাবে, বর্তমানে।
পাহাড়ের কোণায় দাঁড়িয়ে ওরা দু'জন দেখে: একজন বণিক, একজন কর্ণক।
–ওটা বুলক বন্দরের দিকে যাচ্ছে।
কর্ণক উপসাগরের দিকে তাকিয়ে কিছুটা তাচ্ছিলের সাথে মাথা নেড়ে একমত হয়।
–ওখানে পাঁচ বাঁও পানি, সে বলে। একটার দিকে জোয়ার এলে ওটাকে ওই দিকে টেনে নিয়ে যাবে। আজ নিয়ে নয় দিন হলো।
যে লোকটা ডুবে মারা গেছে তার কথা। একটা নৌকা শূন্য উপসাগরময় ঘুরে বেড়াচ্ছে একটা ভোষকা বান্ডিল পানির ভেতর থেকে ভেসে ওঠার অপেক্ষায়, সূর্যের দিকে ফেরানো, লবণধোঁয়া ফ্যাকাসে ফোলা মুখ। আমিই সেই মানুষটা, এখানে।
ওরা ঘোরানো পথ ধরে নিচে খাঁড়ির দিকে এগোয়। বাখ মুলিগান একটা পাথরের উপর দাঁড়িয়ে, গায়ে ফুলহাতা সার্ট, ক্লিপছাড়া টাই বাতাসে তার কাঁধের উপর বাড়ি খায়। তার কাছেই এক তরুণ পাহাড়ের এক খাঁজ ধরে ব্যাঙের মতো তার দিকে ধীরে এগোয়, তার সবুজ পাগুলো তখনও বেশখানিক জেলির মতো জলের ভেতর ডোবানো।
–তোমার ভাই তোমার সাথে থাকে, মালুকি?
–ওয়েস্টমিথে। ব্যাননদের সাথে থাকে।
–এখনো ওখানে? ব্যাননের কাছ থেকে একটা কার্ড পেয়েছিলাম। লিখেছে ওখানে নাকি একটা মিষ্টি মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছে। ওর মতে, ঠিক ছবির মতো।
–ফ্রেমে আঁটা ছবি? ক্ষণিক প্রদর্শন।
বাখ মুলিগান তার বুটজুতোর ফিতে খোলার জন্য বসে। একজন বৃদ্ধলোক হঠাৎ পাহাড়ের খাঁজ থেকে লাল টকটকে চেহারা নিয়ে উদয় হয়। সে পাথর মাড়িয়ে ধীরে উপরে উঠে আসে, তার টেকো মাথায় বিন্দুবিন্দু পানির চিকচিক আর তার উপর ফুলের মালার মতো এক গোছা সাদা চুল, বুক এবং ভুঁড়ি দিয়ে পানির ধারা গড়াচ্ছে আর তার কালো কটিবস্ত্র থেকে ফোয়ারা ঝরছে।
বাখ মুলিগান তাকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাবার রাস্তা করে দেয় এবং, হাইয়েন্স আর স্টিফেনের দিকে তাকিয়ে, ভক্তির সাথে তার বুড়ো আঙ্গুলের নখ দিয়ে নিজের ভ্রু, ঠোঁট এবং বুকের হাড়ে ক্রুশ চিহ্ন আঁকে।
–সিমোর শহরে ফিরে এসেছে, সেই তরুণ বলে, পাহাড়ের খাঁজটা আবার আঁকড়ে ধরে। ডাক্তারি ছেড়ে সেনাবাহিনীতে নাম লেখাচ্ছে।
–আহ, ঈশ্বর মাফ করুক, বাখ মুলিগান বলে।
–আগামী সপ্তাহে আরো ঝামেলায় পড়তে যাচ্ছে। তুমি ঐ কালাইল জেটির লালচুলো মেয়েটাকে চেনো না, লিলি?
–হ্যাঁ, চিনি।
–গত রাতে ঐ জেটিতে সিমোরের সাথে জড়াজড়ি করে শুয়ে ছিলো। ছুকরির বাপ টাকার কুমির।
–মেয়েটা বখে গেছে মনে হয়?
–সে কথা সিমোরকেই জিজ্ঞেস করতে পারো।
–সিমোর একটা মারদাঙ্গা খেলাড়ি, বাখ মুলিগান বলে।
প্যান্ট টেনে খুলতেখুলতে সে নিজেনিজে মাথা নাড়ে, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে আনমনা বলে:
–লালচুলো মেয়েছেলেরা ছাগল স্বভাবের হয়।
সে বেশ ভয়ার্ত হয়, তার হাত দুপাশে ঝুলন্ত সার্টের ভেতরে ঢোকানো।
–আমার পাঁজরের বারো নম্বর হাড়টা উধাও, সে চেঁচিয়ে ওঠে। আমি এখন দন্তহীন কিঞ্চ দা ইবারমেঞ্চ (Uebermensch), আমিই সুপারম্যান।

–তুমি ওখানে যাচ্ছ নাকি, মালুকি?
–হ্যাঁ। আমার জন্যে বিছানাতে জায়গা করো।
যুবক নিজেকে জোরে পেছনের দিকে সরিয়ে নিয়ে দু'বার দু'হাত পানির ভেতর ঠেলে খাঁড়ির মাঝ বরাবর চলে যায়। হাইয়েন্স একটা পাথরের উপর বসে, ধুমপান করতে থাকে।
–তোমরা আসবে না? বাখ মুলিগান জিজ্ঞেস করে।
–পরে, হাইয়েন্স বলে। নাশতার পর সাঁতরাতে ভালো লাগে না।
স্টিফেন ঘুরে দাঁড়ায়।
–আমি চলি, মুলিগান, সে বলে।
–চাবিটা আমাদের দিয়ে যাও, কিঞ্চ, বাখ মুলিগান বলে, আমার সেমিজটা ছড়িয়ে রাখতে হবে।
স্টিফেন চাবিটা তার হাতে দেয়। বাখ মুলিগান সেটা তার স্তূপ করা জামাকাপড়ের উপর রাখে।
–আর দুই পেন্স, সে বলে, এক পাইটের জন্যে। ওইখানে ছুড়ে দাও।
স্টিফেন দুই পেনি সেই নরম স্তূপের উপর ছুঁড়ে দেয়। কাপড়পরা, কাপড়খোলা। দুহাত একত্র করা বাখ মুলিগান তার সামনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে:
–যে গরিবের কাছ থেকে চুরি করে সে আসলে বড়লোকদের সাহায্য করে। জরাথুস্ত্র বলেছেন।
তার নাদুসনুদুস শরীরটা পানিতে ঝাপিয়ে পড়ে।
–আমাদের আবার দেখা হবে, হাইয়েন্স বলে, বুনো আইরিশ স্টিফেনের দিকে ঘুরে মৃদু হেসে। স্টিফেন ততক্ষণে উঁচু রাস্তাটা হেঁটে এগোয়।
ষাঁড়ের শিং, ঘোড়ার খুর, স্যাক্সনের হাসি।
–জাহাজের কথা মনে রেখো, মুলিগান চেঁচিয়ে বলে। সাড়ে বারোটায়।
–ঠিক আছে, স্টিফেন বলে।
সে প্যাঁচানো রাস্তা বেয়ে হেঁটে উপরে উঠতে থাকে।
Liliata rutilantium
Turma confessorum.
Iubilantium te virginum
পাপস্বীকারকারীর দল,
উজ্জ্বল লিলির মতো তোমাকে আবৃত করুক।
সতীকুমারীরা তাদের উদ্বেলিত ধর্মসংগীতে তোমাকে স্বাগত জানাক।

পুরোহিতের সাদা চুলের ফুলমালা দৃশ্যমান হয় পাহাড়ের ফাঁকে যেখানে সে শালীনতার সাথে তার পোশাক পাল্টাতে পারে। আমি আজ রাতে এখানে ঘুমাবো না। বাড়িতেও আমি যেতে পারবো না।
একটা কন্ঠস্বর, সুরেলা এবং বিলম্বিত, তাকে আহ্বান করে সাগরের ভেতর থেকে। বাঁকটা পার হয়ে সে তার হাত নাড়ে। একই কন্ঠস্বরের আহ্বান আবার শোনা যায়। একটা মসৃণ ধূসর মাথা, সিল মাছের, দূরে জলের ভেতরে, গোলাকার।
দখলদার।
(চলবে)

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক