গৌতম চক্রবতী: করোনাকালের অভিজ্ঞতা থেকে

জুবায়েদ দ্বীপ
Published : 15 July 2022, 06:32 AM
Updated : 21 July 2022, 09:27 PM


আমার এক আত্মীয় মারা যান গত বছরের মার্চ মাসের ৬ তারিখে। এই সংবাদের মাধ্যমেই আমার জীবনে করোনার অনুপ্রবেশ। এরকম একটা পরিস্থিতিতে হুট করে ৭ তারিখ দুপুরে সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্ধাবেলা আমি কোলকাতা চলে যাই। তো ৮ তারিখে সম্ভবত আমাদের এখানে প্রথম একজন শনাক্ত হন। এবং তার আগে কিন্তু আমরা করোনা নিয়ে খুব একটা কিছু শুনিনি, মানে এটা একটা আচমকা ব্যাপার। কোলকাতা গিয়ে দেখলাম সেখানেও এ্টা একটা আচমকা ব্যাপার। তো ওখানে আমার যারা বন্ধুবান্ধব তাদের দেখলাম যে সকলেই ইতিমধ্যে করোনার আতংক সমন্ধে অবগত। এক দুইদিন পরে দেখি সবাই বলছে এখানে যাওয়া যাবেনা, ওখানে এটা করা যাবেনা, এটা বাদ দিতে হবে, এবং কারও একজনের গাড়িতে যখন উঠলাম, দেখলাম যে স্যানিটাইজার ইত্যাদি সব গাড়িতে রাখা, যাই ধরা হচ্ছে তারপরেই সবাই স্যানিটাইজ করছে। তো এটাতো একটা নতুন অবস্থার নতুন ব্যবস্থা। আমি যখন রওয়ানা দেব তখন আমাকে একজন অফিসের কলিগ বলল যে, সাথে গ্লাভস মাস্ক এসব নিয়ে যান। আমি যখন একটা মাস্ক লাগিয়ে, গ্লাভস হাতে দিয়ে, এয়ারপোর্ট ক্রস করছি, এবং ততক্ষণের মধ্যে বিষয়টা প্রসেস করে নিলাম যে এটা বোধহয় খুবই সংক্রামিত কিছু একটা ব্যাপার হবে।

যাইহোক, এর মধ্যে ঢাকার সাথে কথা হচ্ছে। বলছে যে এখানে স্যানিটাইজার পাওয়া যাচ্ছে না। তুমি একটু পারলে নিয়া আসো। ওখানেও আমি খোঁজ করলাম, আমার বন্ধুকে বললাম, সে স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা করে দেবে বলল, কিন্তু যে সাইজটা সে ব্যবহার করছিলো সে সাইজের স্যানিটাইজার পাওয়া গেলনা, ছোট ছোট কিছু আমাকে জোগাড় করে দিল।
এরকম একটা পরিস্থিতির মধ্যে করোনা শুরু হলো এবং যেদিন আমার ফ্লাইট ছিলো, আমি ভুল না করলে ১২ তারিখে, সেটা বাতিল হয়ে গেলো। দুপুর বেলা আমি এয়ারপোর্টে যাবার একটু আগে জানতে পারলাম ফ্লাইটটা পরেরদিন যাবে।
আমি ১৩ তারিখে সন্ধ্যায় বাংলাদেশ আসলাম। এসে গোসল করে, ফ্রেশ হয়ে, আলাদা থাকা শুরু করলাম। পরেরদিন দেখলাম যে আমার ফোন নাম্বার দিয়ে আমার গেটে উপরে একটা নোটিশ টানানো যে আমি এত তারিখে ট্রাভেল করে বাইরে থেকে আসছি।


এই গেল করোনার সূচনার দিক। তখন থেকে শুরু হলো করোনা কী, করোনার নিউজ, কোভিড ১৯, এবং ওরকম সময়ে আমেরিকাতে ইলেকশনের সময় চলে আসলো, ওখানে দেখছি এগুলি নিয়ে বিভিন্ন বিষয় হচ্ছে, চারিদিকে বলা হচ্ছে দিজ ইজ আ কাইন্ড অফ আ বিজনেস, এইটাও বলা হচ্ছে যে এটা কন্সপাইরেসি থিওরি, তো যাইহোক, যেটাই হোক না কেন, এটা একটা ভয়াবহ মারাত্মক অসুখ। এবং তারপরে বলা হচ্ছে পৃথিবীতে এর আগে যে প্লেগ বা এরকম নানা ধরনের যেসব প্যানডেমিক তাতে কত কত লোকজন মারা গেছিলো ইত্যাদি নানারকম তথ্য উপাখ্যান আসা শুরু হল। আশেপাশের প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে একটা সাধারণ ব্যাপার দেখতে থাকলাম সেটা হছে করোনা ইজ আ ফাক্টর, এবং বারবার করে ডাক্তারা বলছে, এইটা চট করে চলে যাবেনা, এইটার সাথে আমাদের মানিয়ে নিতে হবে, এইটার সাথে আমাদের থাকতে হবে আরও অনিশ্চিত বহুদিন। তখন একটা শব্দ আসলো নিউ নরমাল।
নিউ নরমাল কী জিনিস, আমাদের কিভাবে চলতে হবে, এভাবে করতে হবে, ওভাবে করতে হবে, বাজার কিভাবে আসবে বাসায়, কারণ খেতে হবে, এখন নানা ধরনের বাজার আসবে, বাইরে থেকে লিমিটেড স্কেলে জিনিস আসবে, তবে সেই জিনিসটাকেওতো এমনি আনপ্রসেসড আমরা যেইভাবে পুরো বছর অভ্যস্ত ছিলাম, সেইভাবে ঘরে তুলতে পারব না।

অবশ্য আমার কিছু সুবিধা আছে, সেইটা আমার ব্যক্তিগত, কিন্তু আমি যখন জিনিসটা চিন্তা করছি বহু মানুষ, ধরুন একজনের কথা তার যতবড় বাড়িই থাকুক, সে একটা ফ্লাটে থাকে, তাকে তো তার জিনিসটা একটা দরজা দিয়ে ঢুকিয়েই ঘরে কোথাও রাখতে হবে, খুব কম মানুষ আছে যারা এক তলা এবং দোতলা বাড়ি মিলিয়ে থাকে, সে হয়তো এক তলার কলাপশিপ্যাল গেটের ভিতরে জিনিসটা ঢুকিয়ে রেখে দিল, হয়তো ২৪ ঘন্টা পর, ৪৮ ঘন্টা ফেলে রাখলো, আবার অনেক জিনিস আছে যেটা আপনি ২৪ ঘন্টা বাইরে ফেলে রাখতে পারবেন না, কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আপনাকে সেটার ব্যবস্থা করতে হবে। এমন একটা অবস্থা যে তখন সায়েন্টিফিক কোন একটা ব্যাখা পাওয়া যাচ্ছেনা, দেখা যাচ্ছে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত বলছে যে মাস্ক পরার দরকার নাই। আবার তার হেলথ আডভাইজার সে বলছে যে মাস্ক পড়তেই হবে, এটা ইনিভিটাবল। এইরকম একটা কন্ট্রাডিকশনের মধ্য দিয়ে সময় অতিক্রম করতে শুরু করলো।
এই করোনা নিয়ে যখন আমরা সবাই চিন্তিত, বেঁচে থাকা নিয়ে চিন্তিত, আমি যেন সংক্রামিত না হই, বা কাউকে সংক্রামিত না করি। তো, এইরকম একটা অবস্থার মধ্যে দিয়ে আমরা কয়েকটা মাস কাটালাম, এর মধ্যে ভ্যাক্সিন নিয়ে গল্প শুরু হয়ে গেল, ভ্যাক্সিন কবে আসবে, কারা পাবে ইত্যাদি। নিউজগুলিতে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ঘটাবলি দেখছি করোনাকেন্দ্রিক, এর মধ্যে আসলো একটা অর্থনৈতিক ভাবনা। প্রচুর মানুষের চাকরি চলে গেলো, প্রচুর মানুষ বেকার হয়ে গেলো।


আমি নিজে এমন একটা বিষয় নিয়ে কাজ করি যেটা ঐভাবে চাহিদাকেন্দ্রিক না। যেমন চাল ডালের চাহিদা, ছবির কিন্তু চাহিদা কিন্তু সেরকম না। তাও আমাদের দেশে যাওবা ছবির প্রতি একটা মনোযোগ তৈরী হচ্ছিল, সেইটাতেও একটা ছেদ পড়ে গেলো। এরমধ্যেও একটা দুইটা এক্সিবিশন আমরা শুরু করলাম। করোনার অবস্থার যখন একটু করে উন্নতি হচ্ছে, তখন সেগুলি আমরা অনলাইনে দিচ্ছি। পিডিএফ করে বিভিন্নজনকে সারকুলেট করছি, ফোনে সংযুক্ত করছি। করোনার মধ্যে অনলাইন ব্যাপারটার সাথে পুরোপুরি সংযুক্ত হয়ে গেলাম। যা আগে এতটা ছিলনা আমার ক্ষেত্রে।

এইবার অর্থনৈতিক যে অবস্থাটা তার কথা বলি। অনেকের কাজ চলে গেছে, বেকার হয়ে গেছে, আমার নিকটতম অনেকজনের বেতন কমে আসছে, আয় কমে গেছে। নানাভাবে মানুষজন এতে প্রভাবিত হয়েছে।
আরও সমস্যা দেখা দিল ব্যক্তিগত জীবন ঘিরে। আমার সন্তানের কথা বলি। তার বয়স ১২ বছরের মতো। তার মতো একটা টীনেজার ছেলে, এই বয়সটা হচ্ছে না মানার বয়স সবকিছুকে, ভেঙ্গে ফেলার বয়স এটা। বাইরের প্রতি, বন্ধুদের সাথে মিশতে বেশি আগ্রহী। ডাক্তারেরাও এমনটা বলে যে এই বয়সে মানুষের মধ্যে একপ্রকার ডিনায়েবিলিটি কাজ করে। তারপরে ধীরে ধীরে সময়ের সাথে সাথে তারমধ্যে র‍্যাশনালিটি তৈরী হয়। এই করোনার মধ্যে ওকেই সারাদিন ঘরে থাকতে হচ্ছে, স্কুলে যেতে পারছে না, অনলাইনে তাকে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে, এসব বিষয় তার জন্য প্রসেস করা যতটা কঠিন, আমাদের জন্য বিষয়টা হয়ে উঠলো আরও কঠিন। সে স্কুলে যেতে পারছে না, বন্ধুরা মিলে গল্প করতে পারছে না, হিউম্যান টু হিউম্যান ইন্টারেকশন এইটা সে পাচ্ছনা।


এমনই বেহাল অবস্থা, পারিবারিকভাবে একটা ক্ষতির সম্মুখীন আমরা, অর্থনৈতিকভাবেও, সারাটাদিন গৃহবন্দি, প্রায় একটা পশুর মতো দিন কাটাচ্ছি প্রতিদিন।

অন্যদিকে বৃহৎ পরিসরে, এই করোনা ক্রাইসিসটা নানা দেশ নানাভাবে ডিল করতে লাগলো। ভারত ইতালি বাংলাদেশ। দেখলাম বাংলাদেশে খুব ভালোভাবে ক্রাইসিসটা সামলাতে পারলো। বাংলাদেশ যে বিষয়টা এভাবে করতে পারবে তা আমি কখনো চিন্তা করিনি। এই যে ধরুন, ভ্যাক্সিনের রেজিস্ট্রেশান অনলাইনে করে ফেলা কয়েকমাসের মধ্যে। এটা বাংলাদেশ সাকসেসফুলি করে ফেলল। কিন্তু কয়েকমাস পর দেখা গেলো, আবার আমরা তালগোল পাকিয়ে ফেললাম। নির্দেশনা থাকলেও তা সঠিকভাবে এক্সিকিউট করা গেলনা।

তবে এই করোনার মধ্যে হয়তো শিল্পীদের কিছু উপকার হয়ে থাকতে পারে বা এই পরিস্থিতি তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারে। হয়তো তার নিজের কাজগুলিকে সে রিস্যাফলিং করবে অথবা নতুন কাজ করার আইডিয়া পাবে। সময়ই বলে দিবে আসলে করোনা আমাদের কি শিক্ষা দিয়ে গেলো।

এছাড়া এই করোনা পরিস্থিতিতে যেসব আমাদের প্রয়োজন ছিলো শারীরিকভাবে নিজেকে সুস্থ্য রাখা এবং আরেকটা বিষয় আছে সমমুল্যবান, মানসিকভাবে সুস্থ্য থাকা। নিজেকে মানসিকভাবে সুস্থ্য রাখতে চেষ্ট্যা করতে হবে। সবার সাথে এক নিয়মে ঘটবে তা নয়, একেকজন একেক উপায়ে তার নিজের জন্য যেভাবে ভালো মন করে সেভাবে নিজেকে সুস্থ্য রাখবে।


এই করোনার মধ্যে সময় থাকা সত্ত্বেও আমি ঐভাবে কোন কাজ করতে পারিনি, খুব সামান্য কিছু কাজ ছাড়া। মানে আমার নিজের ছবি আঁকা। আর যদি গ্যালারির কথা বলি তাহলে সেখানে গ্যালারি কায়াতে কিছু আয়োজন করেছি। আর অন্য শিল্পিরা মিলে ৩/৪ জনে হয়তো সিলেটে চলে গেছি কোন একটা রিসোর্টে, নিজেরা গল্প করেছি, ছবি নিয়ে আলাপ করেছি। এই। মানে পজেটিভ থাকার চেষ্ট্যা করেছি। ছেড়ে দেইনি বা আশা হারাইনি। বই মেলা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এক্সিবিশন হচ্ছেনা। সবকিছু ভার্চুয়ালে হচ্ছে। এর মধ্যেও আমরা সংযুক্ত থাকার চেষ্ট্যা করেছি। অর্থাৎ সবমিলিয়ে এটা একটা এবনরমাল সিচুয়েশন, তারমধ্যেও নিজেকে নরমাল রাখার চেষ্ট্যা করতে হবে আপনাকে, এটাই বলতে চাই। কেননা এটা কোন শর্ট টার্ম কিছুনা, এটা একটা লং টার্ম ব্যাপার। সুতরাং এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

অনুলিখন: জুবায়েদ দ্বীপ

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক