মুস্তাফা খালিদ পলাশ: আমরা প্রকৃতির প্রতি অত্যন্ত অনাচার করেছি

জুবায়েদ দ্বীপ
Published : 10 Sept 2011, 06:17 AM
Updated : 26 May 2022, 02:42 AM


এই করোনা মহামারী মতো সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা আগে কখনো যাইনি। প্রথম যখন ২০২০ সালের মার্চে ১০ দিনের একটা লক ডাউন হলো তখন বেশ ভালোই লাগছিল শুরুতে শুরতে। মনে হচ্ছিলো যে বেশ বসে গেলাম বাসায়। তবে ঘরের নিতান্ত যে কাজ এটা সেটা বাড়তে থাকলো। সেটাও খারাপ লাগছিলো না, ভাবলাম ঠিক আছে সংসার গুছিয়ে নিলাম সবকিছু, দিন দুনিয়া থেকে বাইরে বের হয়ে। এবং মনে করলাম প্রচুর ছবি আঁকবো এবং ছবিও আঁকলামও প্রচুর। কিন্তু সেটা কতদিন?


এই যে বিচ্ছিন্নতা, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, পৃথিবীর বৈষয়িক সব বিষয় থেকে বিছিন্ন করে নিজেকে শুধুমাত্র একটা শিল্প চর্চায় মনোনিবেশ করানোটা কিন্তু কঠিন। একটা সময় পর্যন্ত বেশ আনন্দের সাথেই প্রতিদিন ছবি আঁকতাম। আমি যেহেতু স্থাপত্য পেশায় আছি, আমার জন্য প্রতিদিন ছবি আঁকাটা একটু কঠিন হয়। কিন্তু তখন আমি ছবি আঁকতাম, প্রতিদিনই ছবি আঁকতাম। বরং স্থাপত্য নিয়ে কোন কাজই করিনি শুরুতে। মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত শুধু ছবি আঁকার চর্চাটাই করেছি। কিন্তু তারপরেও এটাও একঘেয়ে লাগতে শুরু করলো।


সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে মানব ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা, এরকম একটা আধুনিক যুগে এসে, এরকম একটা পরিস্থিতির মধ্যে আমরা পড়বো সেটা কিন্তু আমরা কেউই ভাবিনি। এমনকি আমরা অনুমানও করতে পারি না এটার ইম্প্যাক্টটা আসলে কতটা গভীর। সামাজিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে, ব্যক্তিগতভাবে এটা এক ধরনের ডিপ্রেশন তৈরী করার মতো অবস্থা। এই ডিপেশন থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য ঘরে বসে ছবি আঁকলাম, গান গাইলাম, এরও একটা শেষ আছে কিন্তু। একটা পর্যায় পরে এসবও আর ভালোলাগার কথা না। সেরকম পর্যায়েও পৌঁছেছিলাম। আর সব মিলিয়ে তো অবস্থা কোন উন্নতির দিকে যাচ্ছেনা তখন, বরং অবনতিই হচ্ছিলো, সেইজন্য সর্বদা সন্ত্রস্ত থাকা, মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে যাওয়া, এগুলি হয়েছে। আমরা এরমধ্যেও ধনাত্মক জিনিসগুলি খোঁজার চেষ্ট্যা করেছি, যেমন সংসারমুখি হওয়া, আমরা আমাদের সংসারে সময় দিচ্ছি, একসাথে খাচ্ছি। কিন্তু এটাই শুধু জীবন নয়, জীবনের অনেকগুলি মাত্রা আছে, সেই মাত্রা বেশিরভাগই আমরা পাচ্ছিনা। মাত্রাহীন জীবন হয়ে গেছে, একেবারেই একমাত্রায় চলে আসছি- হচ্ছে শুধু ঘরের ভিতরে থাকা। এই অবস্থায় মানসিক অবস্থা ভালো থাকার কথা না। মানসিকভাবে সামাজিকভাবে এই পরিস্থিতি কিছুতেই মেনে নেবার যোগ্য না, কিন্তু আমরা বাধ্য এরকম একটা পরিস্থিতি মেনে নিতে।

মহামারী সময়ের প্রভাব আমার ছবিতে পড়েনি তেমন একটা, কিন্তু আমি যেহেতু লেখালেখি করি, সেখানে একটা প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। যখন বাইরে তাকিয়েছি তখন নিস্তব্ধতা, কোন গাড়ির শব্দ নেই, কেমন একটা পরাবাস্তব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিলো। এখনতো নাই, প্রথম যখন লকডাউন হয়েছিলো তখন আশেপাশের জগত একটা কেমন যেন নিস্তব্দ নগরীতে পরিণত হয়েছিলো।


এই সময়ের মধ্যে ছবিতে আমি যেটা করেছি তা হচ্ছে আমি কিছু এক্সপ্রিমেন্টাল কাজ করেছি। আমার কাজের একটা ধরন, একটা স্টাইল আছে, সেটা থেকে বের হয়ে অন্য কিছু করতে চেয়েছি। সার্কেলের কাজ করেছি, কিছু নিসর্গের কাজ করেছি। এসব মিলিয়ে মজাই লাগছিলো। কিন্তু কোথায় জানি একটা ধাক্কা ছিলো। যেটা ভেবেছিলাম এই করুণ সময়ে, এই অন্ধকার সময়টাতেই বোধহয় আলোটা আসবে। সেটা যখন আসছিলো না দেখছি, একটা অস্থিরতা বিরাজ করছিলো, সেই অস্থিরতা থেকে অনেকদিন পর্যন্ত বের হতে পারিনি। ছবি অনেক এঁকেছি ঐসময়ে, মূলত এক্রিলিক এর কাজ করেছি ক্যানভাসে, কয়েকটা অনলাইন এক্সিবিশনে পার্টিসিপেট করেছি। কিন্তু যে পরিস্থিতিতে ছিলাম সেটাতো কোন জীবন হতে পারেনা, আমি নয় শুধু, যেকোন শিল্পীই কিন্তু তার শিল্পের গভীর জলে ডুব দিয়ে বসে থাকেনা, সে তার বাইরের সমাজে মিশতে চায়, ছবির উপাত্ত যেগুলো আছে, ছবির বিষয়বস্তু যেহেতু সমাজ থেকেই আসে, প্রকৃতি থেকে আসে, সেই জিনিসগুলি মিসিং হয়ে যাচ্ছে। আমিতো কিছু নিতে পারছিনা। সবকিছুতেই কেমন একটা বিমূর্ততার ছাপ। মানে এইটা আমরা যে সময়টা পাড় করছি সেই সময়টা আমি মনে করি একটা অসম্ভবরকমের পরাবাস্তব, মানে সুরিয়ালিস্টিক সময়, সেই সময়টা খুব বেশিদিন ধারণ করাটা খুব কঠিন হয়ে যায়।


প্রতিদিন সকালে উঠে যখন হঠাৎ করে দেখি খুব কাছের মানুষ চলে যাচ্ছে, শিল্পীরা চলে যাচ্ছে, বন্ধুরা চলে যাচ্ছে, মানে একটা নিয়ামক যারা ছিলো, আমাদের সমাজকে সঠিক পথে নিয়ে যাওয়া, আমাদের অর্থনীতিকে সঠিক পথে নিয়ে যাওয়া, তাদের মধ্যে থেকেই কিন্তু বলা নাই কওয়া নাই, অনেকেই চলে গেলেন। এটা সহ্য করা খুব কষ্ট, এবং এই যে প্রতিনিয়ত যাত্রা, এই যাত্রা কিন্তু খুবই মুশকিলের, কখন যে কে পরে যাবে তার কোন নিশ্চয়তা নাই। এটি একটি ভয়ংকর অবস্থা, ভিতরে ভিতরে ভয় পাওয়ার মতো একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিলো, যেকোন দিন আমার নামটাও চলে আসতে পারে। সবমিলিয়ে একটা বিষন্নতার বাতাবরনে আমরা নিজেদেরকে আটকে ফেলেছি।


করোনার আগে আমার জীবন যাপন ছিলো এমন যে আমি সকালে উঠে গোসল-নাস্তা করে অফিসে যেতাম, সেখান থেকে ফিরতাম ৫টার দিকে, এরপরে গানবাজনা করা বা ছবি আঁকা। বিকাল ৫টার পর সময়টাতে আমার লক্ষ্য ছিলো মূলত নিজেকে সময় দেয়া। আমার নিজের যে সৃজনশীল কর্মকান্ডগুলা আছে সেগুলাতে নজর দেয়া, এবং ঐটাতেই আমার একটা বিরাট আনন্দ ছিল যে আমি প্রতিদিন নতুন করে জীবনটাকে শুরু করতে পারি। শুধুমাত্র পেশায় নিজেকে সম্পূর্ণ নিয়োজিত না করে, জীবনের যে অনান্য সংসর্গগুলি আছে যেমন গান-বাজনা, লেখা, ইত্যাদি সৃজনশীল কাজগুলা করতাম। এটাই ছিলো আমার নিয়মিত আচার। কিন্তু করোনার পর যা হলো, সারাদিন বাসায়। বাসায় থাকলে যা হয়, একটা নতুন পোশাক পর্যন্ত পড়া হচ্ছেনা, বাসায় বসে কম্পিউটারে কাজ করা হয়, বাসাতেই স্টুডিও ছবি আঁকা হচ্ছে, বাসাতেই গান হচ্ছে, মানে একটা বন্দী জীবন। জেলখানাতেও এর থেকে বেশি স্বাধীনতা আছে, আজকালকার জেলখানায়, সেখানে মাঠ আছে, দৌড়ানো যায়। প্রতিদিন এভাবেই কাটছে, খাচ্ছি আর ঘরের মধ্যে হাঁটছি। সময় পাড় করছি। কিসের জন্য! সুদিনের জন্য। আসছে সুদিন। এই সুদিন আসছে আসছে করে বছর চলে গেলো, মানুষের জীবনে এটা কিন্তু অনেক বড় একটা সময়, আমাদের যদি ৭২ বছর গড় আয়ু হয় তাহলে এই দেড় দুই বছর প্রায় ২, ৩% সময় আমার জীবন থেকে করোনা খেয়ে ফেলল। তো, এসব বিষয়ও কিভাবে কাটিয়ে উঠবো, জানি না। তবে চেষ্টা করে যাওয়া। আমি যেটা করি, এই বিষন্নতা কমানোর জন্য সৃজনশীল কাজ করা, অন্য আরও অনেকেই করছে, আমি দেখেছি। যে কোনদিন ছবি আঁকে নাই, সেও ছবি আঁকছে, গান গাচ্ছে। অনলাইনে ডিসকাশন হচ্ছে, ওয়বিমিনার হচ্ছে, জুম মিটিং হচ্ছে। এগুলি দিয়ে আমরা আমাদের এই বিষন্নতার ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করেছি, নাহলে তো একাবারে নিঃস্ব হয়ে যেতাম। বিশ্বের সাথে, একে অপরের সাথে আমাদের কোন যোগাযোগই থাকতো না। এটাতে কিছুটা মানসিক প্রশান্তি পাওয়া গেছিলো।


করোনার মধ্যে একটা ব্যাপার হয়েছে সংসারে সময় দেয়াটা। পরিবারের সাথে সময় কাটাতে পেরেছি। রান্না করছি অনেক। বাচ্চাদের রান্না করে খাওয়াচ্ছি। একেকদিন একেক দেশের রান্না করছি, আমি আমার ওয়াইফ। আমরা এই বিষয়টাকে বেশ এনজয় করেছি। এই আনন্দটা যদি আমরা পারিবারিকভাবে সবাই করতে পারি তাহলে যে একটা একঘেয়েমি বোরিং ভাব আছে, বা বিষন্নতার যে একট পরিসর তৈরী হয়, সেটা থেকে বেরিয়ে কিছুটা হলেও ঘরের মধ্যেই মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নেয়া যায়।

পরিশেষে আমি বলতে চাই, এই মহামারী প্রকৃতির প্রতি আমাদের অবহেলা থেকে আসা। আমরা প্রকৃতির প্রতি অত্যন্ত অনাচার করেছি। আমরা প্রকৃতিকে তিরস্কার করেছি, অত্যাচার করেছি। কিন্তু আমরা প্রকৃতির কাছে অত্যন্ত ক্ষুদ্র, প্রকৃতির যে ক্ষমতা, তা দিয়ে সে আমাদের নিমিষেই নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারে। যেমন এই করোনাতেই পুরো বিশ্ব স্তব্দ হয়ে গেলো। তাই প্রকৃতির প্রতি আমাদের আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক